অনিমেষ মণ্ডল

 



উন্মাদ বিকেলের জংশনে কিছুক্ষণ

          আলোচনায়: অনিমেষ মণ্ডল  

 


যতটুকু বেঁচে আছি,তার অধিক মৃত 

আস্ফালন যতটুকু,তার অধিক সংযত 

 

আলো ছায়ায়  হেসে ওঠে কারা?

উপলব্ধি খোলে না কপাট---

বিমর্ষ শকুন এসে বসে থাকে 

হাহা করে শূন্য বোধের মাঠ।

 

যতটুকু বেঁচে থাকা তার অধিক মৃত আর যতদূর আস্ফালন তার অধিক সংযত এই জীবনবোধ নিয়ে বাংলা সাহিত্যের সেবা করবেন বলে একদিন যে দিনমজুরের  ছেলে দুঃসাহসিক পাড়ি জমিয়েছিলেন তিনি নব্বইয়ের একজন অন্যতম  খ্যাতিমান কবি তৈমুর খান।বাংলা কবিতা আর সমান্তরাল গদ্য সাহিত্য তাঁকে যতটা না দিয়েছে পেয়েছে তার অধিক।একদিন বিস্তীর্ণ তৃণভূমিতে তিনি গোচারণ করতেন বলে তাঁর শব্দেরা ফুটে ওঠে তৃণশীর্ষে।শিশির বিধৌত হয়ে তারা নক্ষত্রের মায়ালোক দেখতে দেখতে ভুলে যায় আপন যন্ত্রণার কথা,মনুষ্য জীবনের অনালোকিত অপমানের কথা।ভুলতে পারে বলে উত্তীর্ণ হয় নিরাসক্ত এক বোধিকেন্দ্রে।তখন সে ফিরে পায় বিশ্বাস।এক ধূসর স্বপ্নের জগৎ ফুটে ওঠে চেতনায়।এক গোপন নীরবতার ভিতর দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে সে খুঁজে বেড়ায় এক অনির্ণেয় গন্তব্য। আর যা অনির্ণেয় তাই তো কবিতা । তাই একমাত্র কাব্যসাধনাই হয়ে ওঠে তাঁর ভবিতব্য,তাঁর ইহকাল ও পরকাল।

 

                  সারারাত বিস্ময়ের দরোজা ঠেলি 

                   ওপারে কারা থাকে?

                   কাদের এত লেলিহান শিখা আলোময়?

                   ভীরু তমসার গান গাইতে গাইতে 

                    আমিও এক মনুষ্যচরিতে পতিত হয়েছি 

                     এই নিষিক্ত মোহতে 

                      দরোজা খোলো।

                                                   (বিস্ময়ের দরোজা ঠেলি)

এক তীব্র ভাঙচুর সারাক্ষণ ঘটে চলে কবির অন্তরমহলে।পাওয়া আর না পাওয়ার ব্যবধান দীর্ঘ হতে হতে এই অনন্ত পথচলা।কবি তো পথিক তাই পিপাসারা কেঁদে উঠলেও তাঁকে চলমান থাকতে হয়।শুধু মাত্র শব্দকে পাথেয় করে।এর বেশি কবি আর কী-ই বা করতে পারে!সে-ও ভীরু এই মনুষ্য সমাজেরই অন্তর্গত।

এই দহন এই যন্ত্রণা শুধু কবি লিখে রাখতে পারেন বলে আমরা সান্ত্বনা পাই।তখন চরাচরকে আর শূন্য বলে মনে হয় না।মানবতার উপর আমরা ভরসা রাখতে পারি।তাই মানবতার অপমান কবিকে বারবার ব্যথিত করে।

               নক্ষত্রমণ্ডল হাসিতেছে

               রাত্রির নশ্বরেরা যাতায়াত করিতেছে 

              বাতাস তাহার বাতাসীকে ডাকিতেছে 

               সভ্যতা অসভ্যতাকে দেহ সমর্পণ করিতেছে 

               ধর্ম উলঙ্গ হইয়া অধর্মের ঘর করিতেছে 

                           (২, নতুন ধারণার নাম সক্রেটিস)

অসহায়তায় ছটফট করে তাঁর ডানা যখন দেখেন অসভ্যতা এসে সভ্যতার ঘাড়ে চাপে,যখন দেখেন অধর্ম ধর্মের টুঁটি চেপে ধরে।শব্দই তাঁর আয়ুধ।তাই এই লড়াই সম্মুখসমর নয় আবার অসহায়ের আস্ফালনও নয়।শুধু এক রক্তক্ষরণ ঘটে চলে ফল্গুর মতো।

 

এইরকমই সব আলোছায়ার ঘনঘটা তৈমুরের কবিতায়।বেদনা আছে কিন্তু তা উদযাপিত হয় না।কবিকে দীক্ষিত করে।হতাশা আছে কিন্তু তা মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয় না, উত্তীর্ণ করে।ব্যর্থতার গ্লানি আছে কিন্তু তা অভিশপ্ত করে না,মুক্তির আকাশ খোঁজে।সহজ এইসব কথামালা নিরন্তর পাঠকের সঙ্গে যোগসূত্র স্থাপন করে।কবি তখন হয়ে ওঠেন আত্মার আত্মীয়...

          সান্নিধ্য ছড়িয়ে আছে 

           কুড়িয়ে নিচ্ছে পাখিরা ঠোঁটে ঠোঁটে

           আর কথা জমছে পাখিদের 

            ঘর গেরস্থালি ভরে যাচ্ছে স্বপ্নের ইংগিতে 

                           

          লাল নীল পোশাকের ছায়ায় রাস্তা খুঁজতে এসে

           আমার সব বিভ্রম বাড়ছে 

            সব খোলা দুয়ারে দাঁড়িয়ে আছে মুগ্ধতা 

             মুগ্ধতার দুধ গড়িয়ে যাচ্ছে বিপন্ন রাস্তায় 

                                                               (সান্নিধ্য)

 

কবির আর এক অস্ত্র হলো ভালোবাসা।ভালোবেসে তিনি বিপন্নতাকে জয় করতে চান।মানবতার ধ্বজা উচ্চে তুলে রাখেন বলে মানুষের উপর বিশ্বাস হারাতে পারেন না।মানবতার অপমান তাঁকে অস্থির করে তোলে।তবু তিনি সমাজের ঘনঘটায় খোঁজেন মায়ের স্নেহের কোমলস্পর্শ,প্রিয়ার বিনিদ্র উৎকণ্ঠা।এসবের জন্য কবি ভিক্ষুক হতেও রাজি।কারণ কবি জানেন প্রেম আর ভালোবাসাই বিদ্বেষপূর্ণ শস্যক্ষেত্রে সোনার ফসল ফলাতে পারে।কাঁটাতারের সীমাহীন বঞ্চনাকে উপেক্ষা করে মানবমহিমার উদযাপন করতে পারে।এই প্রজ্ঞাময় ব্যাপ্তিই কবিকে সমাজের উচ্চাসনে বসায়।নিজের বিদীর্ণ সত্তাকে,অসহায় দীর্ঘশ্বাসকে  তিনি লেখার মধ্যে জাগিয়ে রাখেন অবিরল।প্রচণ্ড অন্তর্মুখী এই কবি বিবেকশূন্য,প্রেমহীন পৃথিবীর কাছে শুধু একটু মানবতা ভিক্ষা করেন।পুঞ্জীভূত হতাশার মধ্যেও স্বপ্ন দেখেন একটি প্রজাপতি নিষেক ঘটাবে বলে নিদারুণ মুদ্রায় বসে আছে পরাগধানীতে।

 

জন্ম ২৮শে জানুয়ারি ১৯৬৭।বীরভূম জেলার পানিসাইল গ্রামে।পিতা জিকির খান মায়ের নাম নওরাতুন বিবি।১৯৮৫ তে কলেজ ম্যাগাজিনে প্রথম কবিতা প্রকাশ।তারপর নিরন্তর কবিতাযাত্রা এপার বাংলা ওপার বাংলা সহ।বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর পাঠ শেষে পাটনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রেমেন্দ্র মিত্রের কবিতা নিয়ে গবেষণা।পেশা শিক্ষকতা।স্থায়ী বসবাস রামপুরহাট শহরে।

তাঁর অন্যান্য কাব্যগ্রন্থগুলি হলো:কোথায় পা রাখি (১৯৯৪ ),বৃষ্টিতরু (১৯৯৯),খা শূন্য আমাকে খা(২০০৩),আয়নার ভিতর তু যন্ত্রণা (২০০৪),বিষাদের লেখা কবিতা (২০০৪),একটা সাপ আর কুয়াশার সংলাপ (২০০৭),জ্বরের তাঁবুর নীচে বসন্তের ডাকঘর (২০০৮),প্রত্নচরিত (২০১১),নির্বাচিত কবিতা (২০১৬),জ্যোৎস্নায় সারারাত খেলে হিরণ্য মাছেরা(২০১৭),এছাড়াও পদ্য ও গদ্যে সমান সাবলীল এই কবির পাঁচটি গদ্যগ্রন্থ ও দুটি গল্প-উপন্যাস আছে।

 

উন্মাদ বিকেলের জংশন । তৈমুর খান 

প্রিয়শিল্প প্রকাশন,কলকাতা - ৭০০০৩২

প্রথম প্রকাশ:ডিসেম্বর ২০১৭

প্রচ্ছদ:নন্দিতা বন্দোপাধ্যায়।মূল্য:আশি টাকা ।

 

 




 

1 টি মন্তব্য: