মণিজিঞ্জির সান্যাল

 



বিদায় ডিপ্রেশন

(দ্বিতীয় পর্ব)

( ৪)

 

 ডিপ্রেশন থেকে মুক্তির উপায়

          

 

ডিপ্রেশন আপনাকে একেবারে অসহায় অবস্থায় পৌঁছে দেবে । ডিপ্রেশন থেকে মুক্তি পেতে বিভিন্ন ধরণের থেরাপি ও চিকিৎসার পাশাপাশি নিজেকে প্রস্তুত করতে হবে। নিজের চেষ্টা না থাকলে এ রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া প্রায় অসম্ভব। নিজের প্রতিদিনের কাজকর্ম, খাওয়া-দাওয়া, জীবনপ্রণালী এমনকি চিন্তা-ভাবনায়ও পরিবর্তন আনতে হবে ডিপ্রেশন থেকে মুক্তির জন্য।

 

ডিপ্রেশন থেকে মুক্তির জন্য যা করতে হবে -----

 

(   )   ডিপ্রেশন থেকে মুক্তি পেতে প্রতিদিনের জীবনকে একটা রুটিনের মধ্যে নিয়ে আসতে হবে। প্রতিদিনের কাজ-কর্মকে যদি একটা নিয়মের মধ্যে বেঁধে ফেলা যায় তবে তা ডিপ্রেশন কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করবে।

 

( ২ ) লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে। ডিপ্রেশনে যেহেতু কোন কাজ করতে ইচ্ছা করেনা তাই প্রতিদিন একটু একটু করে কাজ করার জন্য লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে।

 

ধরা যাক, প্রথম দিন আপনি ঠিক করলেন আপনি আজ একটা মজার কিছু রান্না করবেন। যদি আপনি সেই কাজটা ঠিক মত করতে পারেন তবে পরের দিন আর একটু বেশি কিছু করার কথা চিন্তা করতে হবে। এভাবে ধীরে ধীরে কাজের সাথে সম্পৃক্ততা বাড়াতে পারলে এক সময় ডিপ্রেশন কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।

 

( ৩  ) প্রতিদিন অল্প কিছু সময় ব্যায়াম করলে তা আপনার শরীর এবং মনকে সুস্থ রাখবে। ব্যায়াম করা মানে, ম্যারাথন দৌড় টাইপ কিছু না, আপনি যদি প্রতিদিন কিছু সময় হাঁটাহাটি করেন তবুও তা আপনার মস্তিষ্কে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। যা আপনাকে ডিপ্রেশন কাটিয়ে উঠতে সহায়তা করবে।

 

( ৪ ) সুষম খাদ্য গ্রহণের মাধ্যমে ডিপ্রেশন থেকে মুক্তি মেলে। লক্ষ্য রাখতে হবে যেন খাবারে প্রয়োজনীয় পুষ্টিগুণ থাকে। 

 

( ৫ )  পর্যাপ্ত ঘুম ডিপ্রেশন কমায় । ডিপ্রেশনের রোগীদের নিদ্রাহীনতা দেখা দেয়। তাই প্রথমেই ঘুম সমস্যার সমাধান করতে হবে। প্রতিদিনের জীবনযাপনে কিছু পরিবর্তনের মাধ্যমে নিদ্রাহীনতা দূর করা সম্ভব। প্রতিদিন ঠিক সময়ে ঘুমোতে যাওয়া এবং সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। দিনের বেলার হালকা ঘুমের অভ্যাস পরিত্যাগ করতে হবে। শোবার ঘর থেকে টিভি, কম্পিউটার, মোবাইল এগুলো সরিয়ে রাখতে হবে। এভাবেই অনিদ্রা রোগ ধীরে ধীরে দূর করা সম্ভব।

 

( ৬ ) সবসময়ই ভাল চিন্তা করতে হবে অর্থাৎ পজিটিভ ভাবনা একজন মানুষকে সামনে এগিয়ে চলতে সাহায্য করে। ডিপ্রেশনে ভুগতে থাকলে মানুষের মনে বিভিন্ন রকম নেগেটিভ চিন্তা ঘুরপাক খেতে থাকে। যেমন, আমিই বুঝি সবচেয়ে খারাপ, আমার মত দুঃখ কারো নেই, আমি সবার চেয়ে অসুস্থ, আমি ব্যর্থ একজন মানুষ- এই ধরণের চিন্তাগুলো সুস্থ হওয়ার পথে সবচেয়ে বড় বাঁধা। তাই, এই নেগেটিভ চিন্তাগুলোকে মন থেকে দূর করে পজিটিভলি চিন্তা করার চেষ্টা করতে হবে। যুক্তি দিয়ে সবকিছু বিচার করতে হবে। আশাহত হওয়া যাবে না কোনভাবেই।

 

( ৭ )  আনন্দদায়ক কাজের মধ্যে সময় কাটালে মন ভাল থাকবে । নতুন কিছু করার চেষ্টা করতে হবে। মজার কোন কাজ। যেমন, নতুন কোথাও ঘুরতে যাওয়া, মজার কোন বই পড়া, বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেওয়া। মন ভালো রাখার সবরকম চেষ্টা করতে হবে। মন ভালো থাকলে ডিপ্রেশন কেটে যাবে একসময়।

 

( ৮ ) সায়ক্রিয়াটিস্ট  ও সাইকোলজিস্টের পরামর্শ গ্রহণ করতে হবে প্রয়োজনে ।  ডিপ্রেশন পুরোপুরি না ভালো হওয়া পর্যন্ত পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হবে। 

 

                                                                       ( ৫ )

 

  নিজেকে নিজেই পাল্টাতে হবে 

 

ডিপ্রেশন বা বিষণ্ণতা যেহেতু মানসিক ব্যাধি সেহেতু আমাদের উচিত সর্বপ্রথম সেটাকে নিজে থেকেই প্রতিকারের চেষ্টা করা। 

সেগুলো হতে পারে ----

 

(  ১ )  ডিপ্রেশন থেকে নিজেকে দূরে রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় হল নিজেকে কাজে ব্যস্ত রাখা। এজন্য হালকা ধরনের সহজ ছোট-খাট  লক্ষ্য আমাদের সাহায্য করতে পারে। সেই সাথে একটি যুক্তিসঙ্গত  দায়িত্ব গ্রহণ। কারণ, কাজে ব্যস্ত থাকলে আমরা নিজেদের অপ্রয়োজনীয় সমস্যার দিকে মনোযোগ কম দিতে পারব। আমাদের যে কোন কারণে মন খারাপ বা ভাল এটা বোঝার জন্যেও সময় দরকার। সেই সময়টা যদি আমরা নিজেদের ব্যস্ত রাখি তাহলে এটি আমাদের ডিপ্রেশন কমাতে সাহায্য করতে পারে।

 

( ২  ) আপনজন বা বন্ধুদের সাথে সময় কাটানো যেতেই পারে । বিষন্নতায় একা থাকার চেয়ে বরং তাদের সাথে সময় কাটানো উচিত যাদের সাথে আমাদের থাকতে ভাল লাগে অথবা যাদের সাথে কথা বলে আমরা আরাম পাই। আমাদের এমন অনেক বন্ধুমহলই থাকে যাদের সাথে কখনো মন খারাপ করে থাকা যায় না বরং সেখানে সব সময় হাসি-ঠাট্টা হয়। এমন বন্ধুমহলের সাথে সময় কাটালে তা আমাদের সময় এবং মন দুটোকেই ভালো রাখতে সাহায্য করে। এমনকি বিষণ্ণতার কারণ নিয়েও তাদের সাথে কথা বললে ভালো লাগতে পারে। আপনজনদের সাথে গল্প গুজব করাটিও মন ভালো করার জন্য যথেষ্ট।

 

( ৩  ) ডিপ্রেশন বা বিষণ্ণতার প্রথম শর্তই হচ্ছে সব কিছুর খারাপ দিক চিন্তা করা , নেগেটিভ যা কিছু তাকে খোঁজা। হয়তো বা, আমরা জানিই যে এই কাজটি আমরা করতে পারব তারপরও শুধুমাত্র বিষণ্ণতার কারণে আমরা তার খারাপ দিকটা ভাবতে শুরু করি।

 

যা করা উচিত তা হল যত বাধাই থাকুক, যত নেগেটিভ চিন্তা ভাবনাই আসুক আমাদের সবার আগে নিজেদের মাঝে আলো জ্বালাতে হবে। নিজের মধ্যে থেকেই পজিটিভ যা কিছু তাকে খুঁজে বের করতে হবে ।  “এই কাজ শুধুমাত্র আমি ছাড়া আর কেউ করতে পারবে না ......" এই পজিটিভ ভাবনাটুকু আমাদের নিজেদের মাঝে বাঁচিয়ে রাখতেই হবে। একমাত্র তখনই নেগেটিভ যা কিছু সব দূর করা ।

 

( ৪ )  আমরা সবাই জানি যে আমাদের শরীর ও মন পরস্পর সংযুক্ত। তাই আমাদের মনকে ভাল রাখতে হলে অবশ্যই আমাদের একটি সুস্থ শরীর বজায় রেখে চলতে হবে। এজন্য আমাদের দরকার উপযুক্ত খাদ্যের পাশাপাশি ধ্যান বা শরীরচর্চামূলক কাজ করা।

কিছু শারীরিকভাবে নিঃসৃত হরমন রয়েছে যেগুলো আমাদের মন ভাল রাখতে ভূমিকা রাখে। এই হরমোনকে বলা হয় “এন্ড্রোফিন”। নিয়মিত শরীরচর্চা আমাদের দেহ থেকে এ হরমোন নিঃসরণে সাহায্য করে। যা মন ভাল রাখতে সাহায্য করে। এজন্য বিষণ্ণতা কমানোর জন্য নিয়মিত সাইকেল চালানো, সাঁতার, ব্যায়াম, হাঁটাহাঁটি-এসব করতে পারলে খুব ভাল ফল পাওয়া যাবে । এতে আমাদের শরীর-স্বাস্থ্য দুটোই বেশ ভালো থাকবে।

 

( ৫ ) প্রতিটি মানুষের সুস্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া উচিত । হাভার্ড মেডিকাল কলেজের এক গবেষণায় দেখা গেছে যে, একটি সুস্বাস্থ্যকর ডায়েট বিষণ্ণতা থেকে উত্তরণে বা মন ভাল রাখতে সাহায্য করে।

এজন্য বিষণ্ণতা দূরীকরণে আমাদের দৈনন্দিন খাবারের দিকে মনোযোগ দেওয়া উচিত। ভিটামিন বি, সি, ডি এবং আয়রনযুক্ত খাবার মন ও শরীর ভাল রাখতে সাহায্য করে। এজন্য আমরা নিয়মিত শাক-সবজি, ফলমূল বা ফলের জুস খেতে পারি। সেই সাথে পরিমিত পরিমাণ জল খেতে হবে। ক্যাফেইন এবং মদ জাতীয় পানীয় থেকে দূরে থাকতে হবে  ।

 

( ৬ ) পছন্দের কাজে নিজেকে নিয়োজিত করা ।

বিষণ্ণতায় আমাদের অপছন্দের বা কঠিন কাজ করতে ইচ্ছা করে না। স্বাভাবিকভাবেই সেই সব কাজে আমাদের মন বসতে চায় না। এমন সময় আমাদের সেই কাজ গুলো করা উচিত যা আমাদের আনন্দ দেয়, কঠিন কাজ হলেও করতে ভাল লাগে।

             পুরানো সেই সব কাজ যা একসময় আমরা করতাম এবং ভালোও লাগতো কিন্তু এখন করা হয় না এসব কাজও আমরা করতে পারি। এই কাজগুলো হতে পারে, ঘুরতে যাওয়া, আড্ডা দেওয়া, বই পড়া, সিনেমা দেখা, গান শোনা, রান্না করা বা যে কোন কাজ যা আপনার ভালো লাগে সেসব কিছুই বিষণ্ণতা দূর করতে সাহায্য করে।

 

( ৭ ) প্রার্থনা করলে মন শান্ত হয় । প্রতিটি মানু্ষই বাঁচে আশার মাধ্যমে। আর এই আশা পূর্ণতা পায় বিশ্বাসের মাধ্যমে। এই বিশ্বাস ধর্মের প্রতি, সৃষ্টিকর্তার প্রতি। সাধারণত মানুষ যখন ডিপ্রেশন বা বিষণ্ণতায় ভোগে তখন তাদের কোন আশার বিঘ্ন ঘটে যার ফলে তারা ধীরে ধীরে মানসিকভাবে ভেঙে পড়তে শুরু করে। এমন সময় ঈশ্বরকে স্মরণ করে নিজের বিশ্বাসকে শক্ত করার মাধ্যমে মানুষ শক্তি খুঁজে পায়।

কারো কারো মতে, বিষণ্ণতায় নিজ নিজ ধর্মের প্রার্থনা মন ভালো করতে এবং শক্তি যোগাতে সাহায্য করে।

 

( ৮ ) প্রকৃতির কাছে গেলে মন ভাল হয়ে যায়। বর্তমান যুবসমাজ বিষণ্ণতা দূর করতে সবচেয়ে বেশি যে কাজটি করতে পছন্দ করে তা হল স্বাভাবিক জীবনযাত্রা থেকে বিরতি নিয়ে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করা।

মানু্ষের মনের সাথে প্রকৃতির সম্পর্ক সেই আদিকাল থেকেই। আবহাওয়ার সামান্য পরির্বতন মানুষের মনে যেভাবে দোলা দেয় সেভাবে তা বিষণ্ণতা কাটিয়ে উঠতেও সাহায্য করে। সুন্দর কোন প্রকৃতির মধ্যে মানু্ষ চায় সবকিছু কিছুক্ষণের জন্যে ভুলে তারই মাঝে হারিয়ে যেতে। এভাবে প্রকৃতির মধ্যে নিজেকে মিশিয়ে ফেললে বিষণ্ণতা কাটতে খুব একটা সময় লাগে না ।

 

(  ৯ ) মানুষ যখন বিষণ্ণতায় থাকে তাদের মধ্যে কাজ করে অস্থিরতা। যেকোন সমস্যার তারা চায় তাৎক্ষণিক বা দ্রুত সমাধান। আর এ সমাধান না পেলে তারা আরো বেশি বিষণ্ণ হয়ে পড়ে।

এই সময় আমাদের সবচেয়ে বেশি যা করা দরকার তা হল ধৈর্য ধারণ। আমাদের মনে বিশ্বাস রাখতে হবে যে সব কিছুর সমাধান আছে এবং সব ঠিক হয়ে যাবে। প্রতিটি কাজের মাঝেই আমাদের বিশ্বাস আর ধৈর্য ধারণ করে এগিয়ে চলতে হবে। আমাদের এটুকু মাথায় রাখতেই হবে যে , বিষণ্ণতা একবারে যাবে না। ধীরে ধীরে মানসিক শান্তি আসবে , তারপরে নিজেরই অজান্তে বিষণ্ণতা কমে যাবে।

 

বিষণ্ণতা একটি মানসিক ব্যাধি। বাইরের যত চিকিৎসা বা পরামর্শই নেওয়া হোক নিজে থেকে সর্বাত্মক চেষ্টাই বিষণ্ণতা বা ডিপ্রেশন থেকে বেরিয়ে আসার প্রাথমিক উপায়।      ( ক্রমশ  )



 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন