সাম্প্রতিক

6/recent/ticker-posts

শ্রী শুভ্র




নিঃসঙ্গ দাম্পত্য



বিবাহটা চিরজীবনের পালাগান; তার ধুয়ো একটামাত্র, কিন্তু সংগীতের বিস্তার প্রতিদিনের নব নব পর্যায়ে না, স্বামী বা স্ত্রী হিসাবে এই সত্য খুব কম বাঙালির ভাগ্যেই সার্থক হয়ে ওঠে। কারণ বহুবিধ। প্রথমত রবীন্দ্রনাথের চোরাই ধন গল্পের এই বাণীটি অধিকাংশ স্বামী স্ত্রীরই অজানা। কজন আর রবি ঠাকুরের লেখা পড়ে থাকে। আবার এও কোন বড়ো কথা নয়, রবি ঠাকুরের লেখা না পড়লেই এই সত্য দাম্পত্য জীবনে সার্থক হয়ে উঠবে না। যাদের হয়, তাদের এমনিতেই হয়। রবি ঠাকুরের লেখা পড়া না পড়ার উপর নির্ভর করে হয় না। দ্বিতীয়ত আধুনিক কালে কজনই বা বিবাহকে চিরজীবনের পালাগান বলে স্বীকার করতে রাজি? বিবাহও জীবনের মতই একটি অনিত্য বিষয়। এই আছে এই নেই। আজ আছে কাল নেই। কে যে কবে কার সাথে কাকে ছেড়ে চলে যাবে তারই বা ঠিক কি? ফলে বিবাহ একটি সাময়িক অবস্থান মাত্র। বিশেষত আধুনিক সমাজে। উচ্চবিত্ত উচ্চশিক্ষিত সমাজে। আসল কথা যখন যার সাথে ভালো লাগে। তখন তার সাথে ঘর করা। বিবাহের অতি আধুনিক মনস্তত্ব। কিন্তু এর বাইরে যে বৃহত্তর জনসমাজ, যেখানে, বিবাহটা সত্যিই চিরজীবনের পালাগান, সেখানেও কি দাম্পত্য জীবনের প্রতিদিনের নব নব পর্যায়ে সংগীতের বিস্তার খেলা করে বেড়ায়

আটপৌরে বঙ্গ সমাজে প্রাথমিক ভাবে বৈবাহিক বন্ধন একটি ধর্মীয় সামাজিক বন্ধন। যে বন্ধনের তালাচাবি মূলত সন্তানাদি লোকলজ্জার দায়। আবার নারীর অবস্থান থেকে বৈবাহিক বন্ধনের আরও একটি তালাচাবি বর্তমান। সেটি অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার অক্ষমতার দায়। এবং এই তালাচাবিটিই অধিকতর শক্তিশালী। বস্তুত আটপৌর বঙ্গসমাজে অধিকাংশ বিবাহের স্থায়িত্ব স্ত্রীর এই অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার অভাবজনিত অবস্থানের উপরেই দাঁড়িয়ে থাকে। এবং সেটিকে আড়াল করে থাকে সন্তানাদি লোকলজ্জার দায়। ফলে ধর্মীয় সামাজিক বন্ধনের আড়ালে অর্থনৈতিক বন্ধনের যাঁতাকলেই আটকিয়ে থেকে স্থায়িত্ব পায় অধিকাংশ দাম্পত্য জীবন। সেই অবস্থানের সাথে স্বামী স্ত্রী উভয়কেই মানিয়ে নিয়ে চলতে হয়। এই মানিয়ে নিয়ে চলার ধরণ উৎকর্ষতার উপরেই নির্ভর করে দাম্পত্যসুখ। 

তাই ঘরে ঘরে বিবাহ নামক এই চিরজীবনের পালাগান অধিকাংশ দাম্পত্যেই আসলে মানিয়ে গুছিয়ে চলার সক্ষমতা দক্ষতা বাধ্যবাধকতার উপরেই নির্ভরশীল। অধিকাংশ প্রথম বিবাহেই নতুন বিবাহের মৌতাত সন্তানের জন্ম অব্দিই বজায় থাকে। সন্তানের জন্মেই বিশুদ্ধ দাম্পত্যের ইতি ঘটে যায়। তারপর পরস্পরের দেখা হয় সন্তানের মা এবং বাবার পরিচয়ে। অধিকাংশ দাম্পত্যেই স্বামী স্ত্রী রূপান্তর ঘটে গিয়ে আপন সন্তানের পিতা মাতার রূপ পরিগ্রহ করে। অর্থাৎ স্বাভাবিক দাম্পত্যের কেন্দ্রে সংযোগ সূত্র রূপে সন্তানের আবির্ভাব দাম্পত্যের বিশুদ্ধতা ঘুচিয়ে দিয়ে স্থায়িত্বের অভিমুখে পরিচালিত করতে থাকে। এবং অধিকাংশ দাম্পত্যেই এই স্থায়িত্বের মূল রক্ষকবচ স্ত্রী জননী রূপী নারীর অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার অভাবজনিত অবস্থান। 

বৃহত্তর বঙ্গ সমাজে দাম্পত্যের এটাই বাস্তব অবস্থান। সেই অবস্থানে দাঁড়িয়ে স্বামী স্ত্রী, পিতামাতা রূপে আপন সন্তানাদিকে কেন্দ্র করে দাম্পত্যকে ধারণ করে থাকে। অর্থাৎ বঙ্গ সমাজে দাম্পত্যের কেন্দ্রে নরনারীর প্রেম এবং যৌন ভালোবাসার বিষয়টি বেশিদিন মুখ্য থাকে না। অত্যন্ত গৌন নিয়মতান্ত্রিক একটি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। কিছুটা দৈন্দিন অভ্যাসের মতো। সাংসারিক প্রয়োজনে পরস্পরের কার্যকরি ভুমিকার বাইরে শরীর মনের স্বাধীন বিকাশের পথ অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। ফলে বিবাহ নারী পুরুষকে পূর্ণতা দিতে ব্যর্থ হয়ে নারী পুরুষকে স্বামী স্ত্রীরূপে পিতামাতায় পরিণত করে ফেলে। এর সাথে রয়েছে অধিকারের মনস্তত্ব। আমার স্বামী, তার পেশা সামজিক প্রতিপত্তি। আমার স্ত্রী তার রূপ যৌবন মাতৃত্ব। এই অধিকারের মনস্তত্বও প্রবল ভাবে ক্রিয়াশীল থাকে বিবাহোত্তর দাম্পত্য সম্পর্কে। 

ফলে কবি কথিত চিরজীবনের পালাগানে প্রতিদিন নব নব পর্যায়ে সংগীতের বিস্তার বাস্তবিক ভাবেই কোন পথ পায় না সত্য হয়ে ওঠার। স্বামীর কাছে স্ত্রী মূল প্রত্যাশা আর্থিক স্বচ্ছলতার। স্ত্রীর কাছে স্বামীর মূল প্রত্যাশা শারীরিক সেবা এবং সন্তানাদির দেখাশোনা করা। এই দুই প্রত্যাশা যতক্ষণ সন্তোষজনক, ততক্ষণই দাম্পত্য সুখের বাঁশি বাজতে থাকে। এটাই বঙ্গ সমাজের আটপৌর মনস্তত্ব। এর বাইরে দাম্পত্যের স্বাধীন পরিসর খুবই অপ্রশস্ত। এরপর রয়েছে বয়সের সাথে শারীরিক নানান প্রতিবন্ধকতার নিত্য নতুন অবির্ভাব। ফলে একে অন্যের উপর ক্রমশ নির্ভরশীল হয়ে উঠতে থাকাও দাম্পত্যের স্থায়িত্বের পক্ষে সুবিধাজনক হয়ে দাঁড়ায়। 

তাই প্রতিদিনের দাম্পত্যে সংগীতের বিস্তারের যে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন কবি, অধিকাংশ দাম্পত্য জীবনের পালাগানে সেই সংগীতের তাল লয় সুর মূর্ছনা সব কিছুই অধরা রয়ে যায় বৃহত্তর বঙ্গ সমাজের ঘরে ঘরে। উল্টে দাম্পত্য সম্পর্কের আগাগোড়া দাঁড়িয়ে থাকে পারস্পরিক দেওয়া নেওয়ার উপরেই। দেওয়া নেওয়ার প্রাত্যহিক হিসাবের বাইরে দাম্পত্যের মধু খুব একটা উদ্বৃত্ত থাকে না। দেওয়া নেওয়ার সেই হিসাবের ব্যালেন্স শীটের উপর নির্ভর করে পারস্পরিক সহাবস্থানের রূপ রস প্রকৃতি। 

কিন্তু মানুষের মনের ভিতরেও আর এক মন থাকে। সেখানে পারস্পরিক দেওয়া নেওয়ার বাইরেও অনেক কিছু অপ্রাপ্তি রয়ে যায়। অনেক অবরুদ্ধ ক্ষোভ বিক্ষোভ ব্যাথা যন্ত্রণা হাহাকার থাকে। থাকতেই পারে। প্রতিদিনের দাম্পত্য সম্পর্কের সাংসারিক বা সামাজিক সুখও হয়তো সেই ক্ষতে উপশম হয়ে উঠতে পারে না। সেখান থেকেই আপাত সুখের দাম্পত্যের ভিতেও সূক্ষ্ম ফাটল দেখা দিতে পারে। যে ফাটলের গুপ্ত পথে নিঃসঙ্গতা গ্রাস করতে থাকে ধীরে ধীরে। ঘূণ ধরা কাঠের মতো সেই ফাঁপা দাম্পত্য নিয়েই বিবাহের চিরজীবনের পালাগান চালিয়ে নিয়ে যেতে হয়। বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে পারস্পরিক প্রতিদিনের সম্পর্ক সহাবস্থানের ভিতর দিয়েই সেই নিঃসঙ্গতা দৈন্দিন সাংসারিক জীবনের অঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। পরস্পর কাছাকাছি থাকার বিষয়টি এতই স্বতঃসিদ্ধ হয়ে ওঠে, যে একই ছাদের তলায় নিঃসঙ্গতার চোরাবালির অস্তিত্ব টের পেতে পেতেই জল অনেকদূর গড়িয়ে যায়। 

পারস্পরিক সহাবস্থানের সমান্তরাল এই নিঃসঙ্গতা বঙ্গ জীবনের দাম্পত্য সম্পর্কের অন্যতম রসায়ন। খুব কম দম্পতিই এই বিষয়ে ওয়াকিবহাল। স্বামী স্ত্রীর মনস্তত্বে এই নিঃসঙ্গতা দিনে দিনে চীনের প্রাচীর হয়ে উঠতে পারে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে হয়ও। কিন্তু আপাত দৃষ্টিতে সন্তোষজনক দাম্পত্য সম্পর্কের বাতাবরণে সেই প্রাচীরের উপস্থিতি টের পেতে পেতে দেরি হয়ে যায় অনেকটাই। এই নিঃসঙ্গতার প্রধানত দুইটি দিক। এক দিকে শরীর। আর এক দিকে মন। দুই দিকই সাংসারিক নানান বাধ্যবাধকতায় অবহেলিত হতে থাকে। মানুষের মন শরীর সব অবহেলারই মূল্য সুদে আসলে উঠিয়ে নেয়। যদি না সময় মতো সঠিক ব্যবস্থা নেওয়া যায়। কিন্তু বঙ্গ জীবনের পরতে পরতে ধর্ম সমাজ অর্থনীতি দাম্পত্য জীবনের রক্ষাকবচ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে বলেই অধিকাংশ নিঃসঙ্গ দাম্পত্যই ভিতরের ফাটল নিয়েই জোড়াতালি দিয়ে চির জীবনের পালাগান হিসাবে চলতে থাকে। টিভির মেগা সিরিয়ালের মতো। 

বাঙালির সমাজ বাস্তবতায় দাম্পত্য সম্পর্কের ভিত সংসার। একদিকে সমাজ এক দিকে সন্তানাদি। ফলে দাম্পত্যের মূল বিষয়টিই অধরা রয়ে যায়। পিতা মাতার পরিচয়ের আড়ালে হারিয়ে যাওয়া নর নারীর সত্ত্বা নিজেদের প্রকৃতিগত জীবন উদযাপনে ব্যর্থ হতে থাকে। কেউই কারুর মাধ্যমে সম্পূর্ণ হয়ে উঠতে পারে না। শরীর মনের এই অসম্পূর্ণতা নিয়েই পিতা মাতার ভুমিকা দাদু দিদিমার ভুমিকায় পরিণত হয়ে যায় একদিন। অসম্পূর্ণ অবহেলিত অধরা দাম্পত্য প্রতিদিনের জীবন রচনায় সুদূর প্রসারী প্রভাব ফেলতে থাকে। ফলে নিঃসঙ্গ দাম্পত্য বঙ্গ সমাজ জীবনের প্রকৃতিগত বৈশিষ্টের উপরেও স্থায়ী প্রভাব ফেলতে থাকে। সেই প্রভাবই কালক্রমে বাঙালির ঐতিহ্য উত্তরাধিকার হয়ে ওঠে। 

সেই ঐতিহ্য উত্তরাধিকারই সাধারণ বাঙালির দাম্পত্যের ধারণাকে এমন ভাবেই খর্ব করে রাখে যে অধিকাংশ দাম্পত্য সম্পর্কেই গর্ব করার মতো নিজস্ব কোন অবলম্বন থাকে না। সেই ফাঁকটাই বাঙালি পূরণ করতে চায় সন্তানাদির সাফল্যের গরিমার মাধ্যমে। এই যে ফাঁকি, এই ফাঁকি বঙ্গ জীবনের মজ্জাগত। নিঃসঙ্গ দাম্পত্যের ফাটল নিয়ে ঘরে ঘরে দাম্পত্য সম্পর্ক কালাতিপাত করতে থাকে বিবাহ নামক চিরজীবনের পালাগানে। তার ধুয়ো একটি মাত্র বিষয়েই দাঁড়িয়ে থাকে। বংশবিস্তার। অন্যান্য জীবের মতোনই। মূলগত কোন পার্থক্য ছাড়াই। বলা যেতে পারে এটিই বাঙালিত্ব।

১৪ই মার্চ।

কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত।




শ্রীশুভ্র