তাহলে আজ বিকেলে
: তাহলে আজ বিকেলে? কফি, পাক্কা?
: পাক্কা।
: আরে, এত তাড়াতাড়ি রাজি হয়ে গেলি! সিরিয়াস তো?
: সিরিয়াস।
: সিরিয়াস কথাটা একটু সিরিয়াসলি বলা যায় না?
: যায় না।
: কেন?
: কারণ আমি খুব আনন্দে আছি। দেখ, আমার হিসেব মিলে গেছে।
: কিসের হিসেব?
: ধার-দেনা মিটিয়ে আমার ট্রিপের জন্য কত টাকা জমাতে পারব, সেই হিসেব।
: ট্রিপ? এই ইয়ার এন্ডিংয়ের কাজের চাপে আমরা মাথা
তুলতে পারছি না, আর লোক ট্রিপে কীভাবে যায়, আমরাও দেখব।
: কাজ কাজের জায়গায়। আমার পার্সোনাল লাইফ আর প্রফেশনাল লাইফ তোদের এই
ইঁদুর-দৌড় মানুষের সঙ্গে মেলাতে আসিস না।
: ওহ আচ্ছা! এত ভালো করে কাজ করেও আমি এখন ইঁদুর হলাম!
: তোদের মতো মানুষদের কথা বলছি, শুধু তোর একার কথা নয়।
: আমিও তো ওদের মধ্যেই পড়ি। করুন আপনি ট্রিপের হিসেব। আমি চললাম। ইঁদুর যখন
বলেইছেন, এবার দৌড়ই।
চেয়ার টানার হালকা শব্দ
হলো; তার মানে আহানা উঠে গেল।মাঝখানে দেওয়াল
থাকলেও খোলা দরজা দিয়ে ওদের গলার আওয়াজ থেকে আমি সবটাই শুনলাম। গৌতমের কথা শুনতে
ভালো লাগে। সব সময় ও একটা ঈর্ষণীয় আনন্দের মধ্যে থাকে। প্রতিটি বাক্যে ও নতুন
কিছু টুইস্ট আনে। আমার নিজেরই অনেক কথার উত্তর দিতে ইচ্ছে করে, কিন্তু ইচ্ছেটাকে দমিয়ে রাখি। আমাদের অনেকেরই রসালো আর আকর্ষণীয়ভাবে কথা
বলার ক্ষমতা থাকে না। তাই সেগুলো শ্রুতিমধুর হয় না।
আর্থিক বর্ষ শেষ
হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের এই অটোমোবাইল পার্টস তৈরির কোম্পানির সেলস
ডিপার্টমেন্টের উত্তেজনা ক্রমশ বাড়ছে। চারদিকে এক অস্থির পরিবেশ। রিংটোনের
আওয়াজে ফোনগুলো অনবরত বেজেই চলেছে; প্রিন্টারগুলো একটানা খটখট
শব্দে কাজ করে যাচ্ছে। চালান আর পেন্ডিং অর্ডারের স্তূপে প্রতিটি ডেস্ক শ্রীহীন
হয়ে পড়েছে। সেলস ম্যানেজার মানব দত্তের গলা আরও চড়া হয়ে উঠেছে। দূরে সৌম্য
রক্ষিত আর মিথুন সাহা গম্ভীর মুখে টাইপ করে চলেছে। ওদের দিকে তাকিয়ে উত্তেজনার
মাঝেও একটু হাসলাম। কিন্তু আমি লক্ষ্য করি কেবল গৌতমের আচরণ। এটা আমাকে নেশার মতো
ক্রমশ গ্রাস করছে।
ইমরান স্প্রেডশিটের দিকে
ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে, হয়তো হিসেব করছে নিজের
লক্ষ্য থেকে কতটা দূরে আছে। ঘড়ির টিকটিক শব্দ আর মাঝে মাঝে কারও দেওয়া উক্তি বা
দেরি হওয়া পেমেন্ট নিয়ে ফিসফাস আলোচনা— অফিসের অন্য সব আনন্দদায়ক কথাবার্তার
জায়গা দখল করে নিয়েছে।
সূর্যটা আস্তে আস্তে অস্ত
যাচ্ছে। ক্লান্তি, আশাহত হওয়া আর ভয়ের
সংমিশ্রণে এক গোধূলির আগমন। বছরের শেষে বাকি থাকা কাজগুলোকে আর একটু ঠেলে দেওয়ার
আপ্রাণ চেষ্টা। এমন উৎকণ্ঠার সময়ে আহানা আর গৌতমের কথাগুলো আমাকে মানসিকভাবে বেশ
আনন্দ দিল। আমি আবার অন্যমনস্ক হয়ে পড়লাম।
আমরা কোম্পানির সেলস
ডিভিশনে আছি। বিভিন্ন কাজের টার্গেট দেওয়া থাকে। কখনও সেই টার্গেট পূরণ করতে না
পারার ক্ষোভ আর দুঃখে চাকরি ছেড়ে দেওয়ার অবস্থা হলেও গৌতম কিন্তু দিব্যি
হাসিখুশি থাকে। আমি নিজে স্বল্পভাষী। তবুও জানি, চিন্তাগুলো মাথায় কিলবিল করে।
টার্গেটের কথা কোথাও একটা
ছেড়ে দিয়ে গৌতম আগে আমাকে প্রায়ই বলত— “সুজিত দা, টার্গেট টার্গেটের জায়গায় থাক। ওটা আমাদের কাজ, মানে জীবিকা। বাকি কাজের বাইরের সময়টা আমাদের জীবন। জীবিকা বাদ দিয়ে যেটা
থাকে, সেটা একান্ত নিজের জীবন। জীবনের উদ্দেশ্য
কেবল বেচাকেনা আর ঘ্যানঘ্যানানি কেন হবে দাদা?
So, we should cheer up.”
চিয়ার আপ করার জন্য আমি
বাড়িটাকেই সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি। বিয়ের তেরো বছর হলো। সন্তান-সন্ততির চিন্তা আর
চিকিৎসা— দুই-ই
ছেড়ে দিয়েছি। ফলাফল ফলদাতার হাতে ছেড়ে দিয়ে আমার স্ত্রী সুমনা ওরফে মনা সেই
চিন্তা মন থেকে মুছে ফেলেছে। সব সময় আনন্দে থাকার এই গুণটা মনাকে আমার চোখে দেবী
করে তোলে। তাই বাড়িতেই আমার ভালো লাগে। তবুও চিয়ার আপ করার জন্য আমরা কখনও গ্লাস
ভর্তি করি। নেশার ঘোরে মনা কখনও দুঃখের দু-একটি কথা বলে কি না শোনার জন্য আমি নেশা
করার অভিনয় করি। কিন্তু না। মনা আমাকে নিয়ে, আমার স্বাস্থ্য আর চাকরি নিয়েই নামমাত্র চিন্তিত, বাকি কোনও দুঃখ ওর নেই। তাই আমারও এ বিষয়ে কোনও চিন্তা নেই। আমাকে নিয়ে ও
যেমন ভাবে, মনাকে নিয়ে আমার তেমন ভাবার কিছু নেই। মনা
এদিক থেকে স্বাবলম্বী। নিজের যত্ন নিজেই নেয়।
মিথ্যা বলব না, আহানার সামনে ট্রিপের কথা বলা গৌতমের ট্রিপটা আসলে কী, তা জানার জন্য মাঝে মাঝে আমারও আগ্রহ জাগে। দুজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ নিজেদের
ইচ্ছেমতো কী কী করতে পারে বা করে, তা নিয়ে আমার কোনও কৌতূহল
নেই। কিন্তু চিন্তাহীন আনন্দের উৎস কী, তা জানার খুব ইচ্ছে হয়।
ওদের আবেগের ঘড়িগুলো ঠিক কীভাবে চলে, তা জানতে মন চায়। গৌতমের
স্ত্রীকে আমি দেখিনি। র ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার জন্য ওর পরিবার পৈতৃক বাড়িতেই
থাকে। সেই হিসেবে আমার চেয়ে ওর খরচ বেশি। দুটো সংসার চালাতে হয়। কিন্তু আমি
কোনওদিন ওকে পয়সা নিয়ে মাথা ঘামাতে দেখিনি।
খরচের দিক থেকে আমি একজন
নিশ্চিন্ত মানুষ। আমার কোনও বদভ্যাস নেই। সমস্ত ঘরোয়া কাজকর্মের হিসেব মনার কাছে।
ও স্বেচ্ছায় চাকরি ছেড়ে এখন পুরোপুরি গৃহবধূ। বাড়িতেই একটা নার্সারি করেছে।
ওতেই ব্যস্ত থাকে। আমি সুখী। ওর সমস্ত মনোযোগ আমার ওপরেই নিবদ্ধ। সেই অর্থে আমি একজন
সুখী গৃহকর্তা।
গৌতমের বাড়ির সেই সুখ আমি
দেখিনি। কিন্তু বাকিটা বুঝতে না পারলেও এক অদ্ভুত আনন্দে গৌতমের মুখ সব সময়
উজ্জ্বল থাকে। বছরের শেষে এই উত্তেজনাপূর্ণ পরিবেশেই নয়, গত কয়েক মাস ধরে লক্ষ্য করছি গৌতমকে অন্যদের চেয়ে আলাদা মনে হয়।
বিচার-বিবেচনা দিয়ে, ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করে
সব পরিস্থিতিতে কীভাবে স্থির থাকা যায়, সেই পরিণত চিন্তাধারা ও
কীভাবে আয়ত্ত করল, সেটা আমার গবেষণার বিষয়।
হয়তো সে কারণেই বড় বড় ব্যক্তিও মনার ভাষায় ওকে দেখে “ঘাবড়ে যায়” যায়।
এখনও উঠে গিয়ে একবার ওর
ঘরের সামনে দিয়ে গেলাম, ওকে দেখলাম। গৌতমের চোখে
সব সময় যেন একটা অর্থ আর সংযোগের খোঁজ। যেন ও প্রতি মুহূর্তে ওর অস্থির কৌতূহল
মেটানোর জন্য পরবর্তী কোনও জিনিসের সন্ধান করছে। আমি শুধু চেয়ে থাকি। A man ruled entirely
by appetite and impulse. কিন্তু তার সঙ্গে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার এক তীব্র সামাজিক সচেতনতা— এক ধরনের “ইরোটিক ইন্টেলিজেন্স” গৌতমের মধ্যে বিরাজমান। যা ওকে
সত্যিই আকর্ষণীয় করে তোলে। আমাকে দেখে ও একটু ব্যস্ততা দেখাল। হয়তো আমাকে
এড়িয়ে চলতে চাইছে। থাক, আমি কাউকে বিরক্ত করি না।
রক্ষিত বলেছিল, গৌতম এখান থেকে ট্রান্সফার
হওয়ার চেষ্টা করছে।
আহানা উঠে যাওয়ার পরেও
আমি ভাবছিলাম, অনেকদিন শাশ্বতী আর
অঞ্জুশ্রী ওর সঙ্গে দেখা করতে আসেনি। ওরা দুজনেই যেন আমার থেকে দূরে চলে গেছে। আমি
ওদের রাখি-পরানো দাদা। প্রত্যক্ষভাবে ওরা আমার ইউনিটে পড়ে না। কিন্তু আমাদের
ইউনিটের কাজ শেষ হয়ে শাশ্বতীর ইউনিটে যায়। তাই পরস্পরের কাজ একই গতিতে চলা
জরুরি। কাল সেলস ম্যানেজার ওটাই জিজ্ঞেস করছিলেন। প্রোডাকশন ম্যানেজারও হয়তো কোনও
ত্রুটি খুঁজে বের করবেন, কিন্তু খুঁজেও আমি
শাশ্বতীর দেখা পেলাম না।
কাজের প্রচণ্ড চাপের
মধ্যেই একদিন আমার মোবাইলে শাশ্বতীর একটা ছোট মেসেজ এসেছিল— “দাদা, তোমার সাথে একটু কথা ছিল।” কিন্তু পরে কথা বলার জন্য ওর দেখাই পেলাম না। কথা বলার কথা
আমিও ভুলে গেলাম।
কিন্তু আজ ওর সঙ্গেই দিনের
বেলা আমাদের উত্তরপাড়ার অফিসে যেতে হলো। এককালে কিংবদন্তি অ্যাম্বাসেডর গাড়ি
তৈরি করা উত্তরপাড়ার হিন্দুস্তান মোটরস এখন সময়ের পরিবর্তনের মুখে। পশ্চিমবঙ্গের
শিল্প প্রসারের সঙ্গে সংগতি রেখে অটো-কম্পোনেন্ট আর ইভি (EV) উৎপাদনের নতুন পরিকল্পনা করা হয়েছে। শাশ্বতীকে নিয়ে আমাকে সেই ইউনিটের সব
তথ্য আনতে উত্তরপাড়া যেতে হয়েছে।
যে সম্পর্কে কোনও সংযোগ
নেই, সেখানে কেবল কারও সঙ্গে লেগে থেকে জীবন পার
করাটা একটা বিশাল শূন্যতা। সেই শূন্যতায় অভিমান বা অভিযোগ কিছুই আসে না। শুধু
জীবন কেটে যায়। এমন সময়েও কখনও কখনও কেউ কোনও হৃদয়বিদারক ঘটনা বা দুর্ঘটনার
মাধ্যমে গভীর আত্মবিশ্লেষণের মুখোমুখি হতে পারে। সেই আত্ম-আবিষ্কার আমাদের মনকে খনন
করতে উৎসাহিত করে, যা নিজের এবং অন্যের সঙ্গে
আমাদের সম্পর্ককে নতুনভাবে গড়ে তুলতে পারে। ইভি ইউনিটের কাগজপত্রগুলো দেখতে দেখতে
আমি শাশ্বতীকেও মনোযোগ দিয়ে লক্ষ্য করলাম। মেয়েটা ভীষণ হতাশ। আমি তাকালেই ওর
ঠোঁটে একটা ফিকে, ক্লান্ত হাসি ফুটে ওঠে, যেন বলতে চায়—
“Don’t worry, সব ঠিক আছে।” কিন্তু আমি জানি ওর ভেতরটা
একদম ঠিক নেই।
শাশ্বতী আমার সঙ্গে কথা
বলার সুযোগ খুঁজছিল। আমার আন্দাজ মতোই ওর প্রাথমিক দু-একটা কথার পরেই বুঝলাম, আমি এ ক্ষেত্রে ওর সহায়ক হতে পারব না বলেই বুঝলাম। যেভাবে নাজনীন আর মানসীর
ক্ষেত্রেও হতে পারিনি। কিন্তু তখন আমি বুঝতে পারিনি আমার কী করা উচিত। এখন মনা
আমাকে সেই বিশ্বাসটা দিয়েছে। আমি খুব সাবধানে কিন্তু আন্তরিকভাবে শাশ্বতীকে
সুমনার কথা বললাম।
শাশ্বতীকে আমি খুব সাবধানে, প্রায় সন্তর্পণে সুমনার কথাগুলো বললাম। ওকে বললাম— 'শাশ্বতী, মনের ওপর দিয়ে কোনো ঝড় বয়ে গেলে আমরা নিজেদের কেবল এক অসহায় ভুক্তভোগী হিসেবে
দেখতে শুরু করি । কিন্তু গল্পের এই ধরনটা
বদলে ফেলা দরকার। যাকে তুমি খলনায়ক ভাবছ, তাকে আর নিজেকে—
দুজনেই এক বৃহত্তর যন্ত্রণার শরিক হিসেবে দেখার চেষ্টা করো । সহমর্মিতা
মানে তো অন্যায়ের অজুহাত দেওয়া নয়, বরং স্পষ্ট আর কোমলভাবে
সত্যকে চেনা। জীবনের আসল ছন্দটা ছিল তোমার সেই কাজগুলোতে, যা তোমাকে আগে সজীব রাখত । সেই পুরনো রুটিনে ফিরে
যাও। জীবিকার টার্গেট পূরণ করতে আমরা যতটা লড়াই
করি, নিজের ব্যক্তিগত শান্তিটুকু আগলে রাখতে ঠিক
ততটাই উদাসীন । আমাদের চারপাশের অনেককেই
দেখবে স্বার্থপর মনে হলেও ওরা আসলে সুখী, কারণ ওরা অপ্রয়োজনীয়
মানুষকে মুহূর্তেই জীবন থেকে সরিয়ে দিতে জানে ।আমি আগে কখনো এত কথা বলিনি, কিন্তু সুমনার শেখানো বুলিগুলো আজ নিজের অজান্তেই বেরিয়ে এল
শাশ্বতী অবাক হয়ে আমার
দিকে তাকিয়ে রইল। মুহূর্তেই ওর চোখ দুটো ছলছল করে উঠল, মুখ নামিয়ে ও বলল—
“দাদা, আপনি বুঝতে পেরেছেন আমি কী
বলতে চাইছি।”
আমি বললাম— “পেরেছি। জীবনমুখী আনন্দ
আমার ভালো লাগে। সবার আনন্দ দেখেও ভালো লাগে। কিন্তু ভালো লাগলেও অন্যের জীবন আমি
কেবল নিজের গণ্ডিতে থেকেই লক্ষ্য করি। দূর থেকে।”
ও আবার মাথা নিচু করল।
নিজের গণ্ডির কথা ওকে নিশ্চয়ই কষ্ট দেবে। কিন্তু এটাই সত্য।
বাড়ি ফেরার পথে ওকে দাঁড়
করিয়ে গোবিন্দভোগ থেকে জোর করে মিষ্টি খাওয়ালাম। কিছু ওর বাড়ির জন্যও পাঠালাম।
ও নিজেই বলল—
“আমি সুমনা দি-র কথাগুলো ভাবব। দাদা, সুমনা দিই বলেছিল—
কখনও কোনও ভাড়া বাড়িকে নিজের বাড়ি বলে ভেবো না। পরে ছেড়ে যেতে
খুব কষ্ট হয়।”
বাড়ি ফিরে সুমনাকে এ
বিষয়ে সব বলব ভেবেও নিজেকে আটকে নিলাম। অতীত টেনে আনলে সবারই কম-বেশি কষ্ট হয়।
আমি চেপে রাখতে পারি, সুমনা পারে না। পারে না
বলেই ও নিজে থেকে কিছু পদক্ষেপ নিয়েছিল। আমাদের অফিসের কোনও গেট-টুগেদার পার্টিতে
ও আর যায় না। সংসারী হয়েও অফিসের পিকনিকে আমি এখন একাই যাই। সুমনার কোনও সোশ্যাল
মিডিয়ায় উপস্থিতি নেই। ফোন করলেও ওকে সহজে পাওয়া যায় না। নিজেকে গুটিয়ে
নেওয়ার পরেও ওর মনের গহনে কী আছে তা, আমি কখনও জানতে চাইনি। ও
নিজেই মাঝে মাঝে আমাকে ঠাট্টা করে। পরিবারের পছন্দেই সুমনার সঙ্গে আমার বিয়ে
হয়েছিল। আমার কারও ওপর কোনও অভিযোগ নেই। আমি সুখী। আর এটাই সত্যি। কিন্তু অনেক
সময় মানুষ নিজের কর্মফলের চেয়েও কর্মের স্মৃতি থেকে মুক্ত হতে পারে না। সারা
জীবন সেই স্মৃতি থেকে মুক্ত হওয়ার চেষ্টায় অন্য কোনও সুখের কথা ভাবার সময় হয়তো
থাকে না।
শাশ্বতীর কথা না বললেও
সুমনাকে আমার উত্তরপাড়া ভ্রমণের সবটা চায়ের টেবিলে বসে শোনালাম। আমার অফিসের
কোনও কাজে সুমনা আগ্রহী নয়। ও শুধু বলল— “বাড়ি এসে অফিসের কথা বলবে না।” আমি চুপ করে রইলাম।
— “অন্য একটা বিষয় আজ শুরু করি? একদম আলাদা।” একটু সপ্রতিভ হওয়ার চেষ্টা
করে ওকে বললাম।
সুমনা কেবল মানসিক
যোগসূত্রের অভাবেই অসন্তুষ্ট হয়। সাধারণত ও কীসে খুশি হয় বললে আসবে কেবল বই, সিনেমা আর ভ্রমণের কথা।
ওর মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠল— “নতুন কিছু পড়লে নাকি?”
— “পড়িনি, ভাবলাম। ভাবনাগুলো তোমাকে
বলতে চাই। আসলে শাশ্বতীর জন্যই ভাবতে হলো।”
এবার সুমনার মুখে একটা
বিরক্তির ছাপ ফুটে উঠল। আমি নিমেষেই সেটা বুঝতে পারলাম। ওর হাতটা শক্ত করে ধরে
বললাম— “মনা, হাতের ওপর হাত রাখা সহজ কথা নয়। প্লিজ শোনো আমার কথা।” একটু সময় নিয়ে সুমনাকে শাশ্বতীর
কথা বললাম। ও শুনল।
আমার বুকের ধড়ফড়ানি ও
টের পাচ্ছিল। অনেকক্ষণ সুমনা চুপ করে বসে রইল। আমিও চুপ। আমি মন দিয়ে ওর মুখের
পরিবর্তন লক্ষ্য করছিলাম। কোনও নেশার সাহায্য ছাড়াই আজ ওর মনের কথা বের করার এটাই
আমার কাছে একমাত্র উপায়। ওকে কষ্ট পেতে দেখা আমার সহ্য হয় না। ওর মুখের ভাবে
কোনও পরিবর্তন হলো না।
“ভেতরে
এসো।” কিছুক্ষণ
পর ও বলল।
বারান্দা থেকে আমরা
বেডরুমে গেলাম। বিছানার সামনের দেওয়ালে সুমনার একটা লাইফ-সাইজ ফটো। বিছানায় বসে
ক্লান্তভাবে ও বলল—
“তুমি শোও, আমি তোমার বুকে মাথা রেখেই
কথা বলব।”
আমি অবাক হলেও ও যা বলল
তা-ই করলাম। অনেকক্ষণ ও কিছু বলল না। কিন্তু আমি টের পেলাম আমার গেঞ্জির বুকের
দিকটা ভিজে উঠছে। চোখে জল থাকলেও স্পষ্ট আর দৃঢ় গলায় সুমনা বলতে শুরু করল— “শাশ্বতীকে আমার বলা এই
কথাগুলো বলবে। তুমিই পারবে বলতে। তুমিই বলো।”
— “আমি গুছিয়ে বলতে পারব তো?”
— “পারবে। শোনো, অনেক ভেবে দেখলাম, বর্তমানের আধুনিক মনের মানুষদের চিন্তাভাবনা এক অদ্ভুত ধরনের। তথাকথিত কিছু
মানুষ নিজেদের ‘স্যাপিওসেক্সুয়াল’ বলে একটা আধুনিক তকমা দেয়।
বুদ্ধিমত্তার প্রতি আকৃষ্ট হওয়ার কথা বলে আসলে তারা নিজেদের প্রাথমিক অঙ্গীকারের
বাইরের কোনও মানসিক বা শারীরিক সম্পর্ককে বৈধতা দিতে চায়। যেন সবকিছুর ব্যাখ্যা
মনস্তত্ত্ব দিয়েই দেওয়া সম্ভব। নৈতিকতার কথা মনস্তত্ত্ব মানে না। অনেক ক্ষেত্রে
এই বৌদ্ধিক ঘনিষ্ঠতার আড়ালে সম্পর্কগুলো গোপনে চলতে থাকে। এমনকি সেই সব পরিবারেও, যেখানে এখনও পুরনো নৈতিক আদর্শ আঁকড়ে ধরা হয়।”
— “সবকিছুকে সাধারণ নিয়মে ফেলো না। ব্যক্তিগত কথা ব্যক্তিগতই হয়। ‘স্যাপিওসেক্সুয়াল’ শব্দটার অস্তিত্বই তো খুব অল্প সময়ের।”
— “না শোনো, আমি নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই
বলছি যাতে শাশ্বতী বা অন্যদের সাহায্য হয়। সাধারণত এই সম্পর্কগুলো শুরু হয়
বৌদ্ধিক সংযোগ হিসেবে, কিন্তু নিঃশব্দে তা আবেগ ও
শারীরিক সীমা অতিক্রম করে। যাকে প্রায়ই ‘গতানুগতিকের বাইরের প্রেম’ বলে যুক্তি দেওয়া হয়। তবুও তা সততা, দায়িত্ব আর বিশ্বাসের ভিত নাড়িয়ে দেয়। তা কিছু অস্থির প্রশ্ন তুলে দেয়।
বিশেষ করে আমাদের মতো পুরনো দিনের মানুষের কাছে, যাদের মজ্জায় নৈতিকতা মিশে আছে। সেখানে এমন দ্বৈত জীবন মানুষের বাসনা আর
আধুনিক যুক্তির মাঝখানের রেখাটাকে অস্পষ্ট করে দেয়। শাশ্বতীকে ওর সম্পর্কের ভিতটা
বুঝতে দিও। এই সম্পর্ক কি সত্যিই ওর ভালোবাসা, নাকি কেবল একাকিত্ব
কাটানোর একটা বিকল্প?”
— “আমি কীভাবে জিজ্ঞাসা করব? এত কথা আমার মুখে আসবেই
না।”
একটু থেমে সুমনা আবার বলল— “তাহলে ওকে আমাদের বিয়ের
কথা বলো। তুমি ছিলে এক লাজুক, নরম মনের ছেলে। নম্র
ব্যবহার আর অপরিসীম ধৈর্য। আমি ছিলাম ঠিক তার উল্টো— ছটফটে, বাচাল আর আনন্দের খনি। আমাদের বিয়ের সময় সবাই বলত, আমরা নাকি একে অপরের ভারসাম্য রক্ষা করব। তখন তোমাদের অফিসের কোনও পার্টি আমি
মিস করতাম না। এত সুখী দাম্পত্যের মাঝেও আমি অজান্তেই ধীরে ধীরে ‘স্যাপিওসেক্সুয়াল’ শব্দের মানে খুঁজতে শুরু করলাম। কারণ ওটা আমার কাছে নতুন ছিল। হয়তো
শাশ্বতীর কাছেও তাই। সেই নামেই মনের আর মুহূর্তের পেছনে ছুটলাম। প্রেম না কি
বিভ্রম— কিছুই বুঝতে পারলাম না। কিন্তু আমি সবার প্রতি সৎ
ছিলাম। কারও প্রতি আমার ঘৃণা ছিল না। ছিল শুধু ভালোবাসা।”
— “আমি জানি। তুমি বহুবার বলেছ।”
— “কিন্তু যখন সেই পরিচয়টা ভেঙে গেল, তখনই বুঝলাম জীবন কতটা ভঙ্গুর
আর অভাবনীয় নিরাশার হতে পারে। এই সব কিছুই তুমি জানতে। কিন্তু কখনও একটা শব্দও
উচ্চারণ করোনি। তুমি বলতে—
তুমি কখনও প্রেম করোনি, তাই অন্য কেউ প্রেম করলে
তা তোমার কাছে স্বর্গীয় মনে হয়।”
— “ওটা আমি এখনও বলি। তুমি খুব আনন্দে ছিলে। তার ছোঁয়া আমার ওপরেও এসে পড়েছিল।”
— “তুমি সব সময় সেই শান্ত আর যত্নশীল মানুষটাই হয়ে রইলে। আর সেই অকথ্য ধৈর্যের
মাঝে কোথাও আমি জীবনটাকে স্বপ্ন হিসেবে নয়, এক নিদারুণ সত্য হিসেবে
গ্রহণ করে শান্তি আর শাস্তি— দুই-ই পেয়েছি।”
— “দাম্পত্যের মাঝে আবেগীয় দূরত্বের প্রক্রিয়া আমাদের মানসিক বা নৈতিক জটিলতার
ওপর নির্ভর করে। এখানে দুটো বিপরীতমুখী স্বভাব থাকে— একটা লালন-পালনের মাধ্যমে
পাওয়া আশা, অন্যটা সজীবতা আর
আকাঙ্ক্ষার দ্বারা চালিত আবেগ। এই দুই মিলেই সুখী সহাবস্থান তৈরি হতে পারে। তোমার
আবেগ একটা বয়সে যা চেয়েছিল, আজ হয়তো তার প্রয়োজন
ফুরিয়ে গেছে। জীবনই এই বোধ ফিরিয়ে দেয়।”
— “সত্যিই। এই বোধ জীবনই এনে দেয়। তাই হয়তো অপরাধবোধ আর শান্তির মাঝে এখন
শান্তিটাই মুখ্য হয়ে উঠেছে সুজিত।”
— “দেখো মনা, মানুষের আবেগের প্রয়োজন, বৌদ্ধিক আকর্ষণের মোহ আর জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতা— এই সব মিলেই তো জীবন। এই
শান্ত জীবনের নিচে সহনশীলতা, ক্ষমা আর অপ্রকাশিত
প্রেমের সূক্ষ্ম দিকগুলো লুকিয়ে থাকে।”
— “কিন্তু সুজিত, মনে রেখো। তোমার নীরবতা
তোমার দুর্বলতা নয়। একদমই নয়। বরং এটা তোমার প্রবল মানসিক শক্তির পরিচয়। আমি
তোমার বুকে শান্তি খুঁজে পাই। পরিপক্কতা বা ম্যাচিউরিটি কেবল পূর্ণতা থেকে আসে না, জীবনের অসম্পূর্ণ সত্যগুলোকে মেনে নেওয়ার মাধ্যমেই আসে। আমি জানি শাশ্বতী
ছাড়া মিতালী, আক্ষী বা নাজনীনরা তোমাকে
কিছু বলেনি। ওরা বলবেও না। ওরা আধুনিক ব্যবস্থায় মানুষ। স্মৃতি নিয়ে বসে থাকা
ওদের ডিকশনারিতে নেই। শারীরিক ও মানসিক স্বাধীনতা ওদের জীবনের মানে। হয়তো গৌতমেরও
তাই। শাশ্বতী আমার মতো একটু আলাদা। তাই কষ্ট পাচ্ছে। কিন্তু তুমি তোমার মন থেকে এই
চিন্তাগুলো সরিয়ে ফেল সুজিত। আমি তোমার দিব্যি খেয়ে বলছি— আমি সুখী।”
সুমনাকে শক্ত করে জড়িয়ে
ধরলাম।
— “এই কথাগুলো কতবার যে শুনেছি! শুনে শুনেও আমার আশ মেটে না। আমি জানি ও সত্যি
বিশ্বাস থেকেই কথাগুলো বলে। ও বলতে পেরেছে কারণ ও জানে প্রেমিক হিসেবে আমি সফল না
হলেও স্বামী হিসেবে আমি সফল। অগ্নিকা সাক্ষী রেখে বলা প্রতিটি কথা আমি আজও মেনে
চলি।”
আর প্রেম!!!!
আমি নিজেও ভাবি। এটা
স্বর্গীয়। একে স্বর্গীয় অনুভূতি দিয়েই অনুভব করা যায়। এমন প্রেম কোনও
প্রতিশোধের আগুন জ্বালায় না। কিন্তু আমি চিন্তিত। অন্য কেউ যেন সুমনার মতো এই
যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে না যায়। হয়তো মিতালী বা নাজনীনরা আমার সাহায্য চায়নি।
কিন্তু ওদের স্বাধীনতার সংজ্ঞা আমি বুঝি না। আর শাশ্বতী একটু আলাদা।
সুমনাকে বললাম— “কখনও ভাবি জীবন আমাদের সাথে
বেইমানি করে না। আমরাই জীবনের থেকে অতিরিক্ত স্পষ্টতা আশা করে নিজের এবং অন্যের
সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করি।”
— “তাহলে এর থেকে বাঁচার উপায় কী?” ও খুব আন্তরিকভাবে জানতে
চাইল।
— “বিবর্তনের ইতিহাসে মানুষ অন্যের বিশ্বাসঘাতকতা সম্পর্কে সচেতন হতে শিখেছে।
আমাদের মতো সামাজিক প্রাণীর জন্য কাকে কতটা বিশ্বাস করা যায়, সেটা বোঝা বেঁচে থাকার জন্য খুব জরুরি।”
— “আর যদি নিজের আপনজনকেই বিশ্বাস করা না যায়? হাজার বার স্বীকারোক্তি করলেই কি বারবার প্রেমে পড়াকে শ্রদ্ধা করা যায়? তা সে স্বর্গীয় প্রেমই হোক না কেন? পাঞ্চালী হতে আমাদের
আপত্তি নেই, কিন্তু ব্যবহৃত হওয়াটা
ভয়াবহ।”
মাটির তলার কোনও গভীর
গহ্বর থেকে যেন সুমনার গলাটা ভেসে এল, আমার এমনটাই মনে হলো।
অনেকদিন পর গভীরভাবে সুমনার দিকে তাকালাম। বিছানার সামনের দেওয়ালে ওর বড় ফটোটার
চোখের মধ্যে যেন এক নীরব প্রার্থনা লুকিয়ে আছে— ক্ষমা পাওয়ার আকুতি। এই
মুহূর্তে আমি ছাড়া ওর কেউ নেই। এক অত্যন্ত সংবেদনশীল, মমতাময়ী নারী, যে আমার উপস্থিতিকে সম্মান
জানিয়েও নিজের হৃদয়ের ডাকে একজনকে ভালোবেসেছিল, আর আবার তার কাছেই প্রত্যাখ্যাত হয়ে আমার কাছে ফিরে এসেছে। এই ফিরে আসার
যাত্রাকে আমি কীভাবে গ্রহণ করলাম, তার ওপরই নির্ভর করছে
ভবিষ্যৎ জীবন—
যা আমাদের দুজনের জীবনে শান্তি আর ইতিবাচকতা ফিরিয়ে আনবে।
আন্তরিক সততা আর সাহস
নিয়ে সুমনার হাতটা আমার হাতের মুঠোয় নিলাম। আবার আস্তে আস্তে বললাম— “আমাতে বিশ্বাস রাখতে পারো।
আমি তোমার সব ধরনের প্রেমকে শ্রদ্ধা করি। জীবনের একাকীত্ব থেকে আসা শূন্যতায় যে
কোনও সংবেদনশীল মানুষেরই মানসিক সংযোগের তীব্র আকাঙ্ক্ষা থাকতে পারে। এটা
স্বাভাবিক। সেই সংযোগ শারীরিক, মানসিক বা কাল্পনিক হতে
পারে। পেরিয়ে আসা কোনও ঘটনা যেন তোমাকে কষ্ট না দেয়, বরং তা তোমার জীবনকে সমৃদ্ধ করার এক সুন্দর অনুপ্রেরণা হয়ে থাকুক। একদিন এই
অনুপ্রেরণার কথা দিয়েই তুমি অন্যদের উৎসাহিত করতে পারবে।”
স্থির হয়ে সুমনা আমার
দিকে তাকিয়ে রইল। মুখে সেই প্রশান্তি রেখেই ও হালকা করে জিজ্ঞেস করল— “প্রেমকে যদি এতই সম্মান করো, তবে শাশ্বতীকে নিয়ে তুমি এত চিন্তিত কেন? ও-ও তো প্রেমেই পড়েছে।”
— “চিন্তা তো হবেই। তোরা দুজনেই স্বভাবে এক। তার ওপর ওর একটা ছোট মেয়ে আছে। কাল
যদি ও-ও তোমার মতো কোনও বিপদ ডেকে আনে? আমি যদি সাহায্য না করি, তবে সেই অপরাধবোধ আমাকে সারা জীবন কুরে কুরে খাবে। তুমি ওকে সাহায্য করো মনা।”
— “বিপদ আটকানোর শক্তি কি আমার গলায় আর আছে?”
— “তোমার গলা কেন চিরদিনের মতো বন্ধ করে দিলে? কার পৈশাচিক হাতে ওই কাজ
করালে? কে তোমার গলায় হাত দিল? সেই হাতটা কি আমার ছিল না? আমি তো তখন আমার দুহাত
বাড়িয়ে দিয়েছিলাম তোমাকে আশ্রয় দেওয়ার জন্য।”
— “কেন দিয়েছিলে ওই হাত বাড়িয়ে? কেন দিয়েছিলে? তুমি কি জানো তোমার চোখে চোখ রেখে কথা বলা কতটা যন্ত্রণাদায়ক ছিল? সত্যি জানো? হাতের ওপর হাত রাখা সহজ
কথা নয়। হাত একটা ধরে রাখাও খুব কঠিন কাজ।”
— “আমার আর কোনও অভিযোগ নেই সুমনা। আমার শুধু কৌতূহল আছে। এখনও। প্রতি মুহূর্তে। I am driving my own
life car with so much pain. সবাই তোমার হার্ট প্রবলেমকেই মৃত্যুর কারণ বলে মেনে
নিয়েছে। আমাকে সান্ত্বনা দিয়েছে। গৌতমের মানসিক অবস্থা খুব মনোযোগ দিয়ে লক্ষ্য
করলাম। কোনও শোক বা অনুতাপ দেখলাম না। ও সুখী থাকলে আমিও সুখী। কী সুন্দর স্বাধীন
আধুনিক মনের মানুষ ও, সবাই ওকে কত ভালোবাসে!
শাশ্বতীও যদি এমন সুখী আর স্থির থাকত, তবে আমার কিছু বলার ছিল
না। কিন্তু ওরও তোমার মতোই অসুখ। সেই অসুখ দেখলে আমি প্রচণ্ড ভয় পাই। আমি বুঝতেই
পারলাম না আমার কোথায় ভুল হলো। এর উত্তর খুঁজতে আমি হয়রান হয়ে যাই।”
— “আমি জানি, তুমি বুঝতে পারোনি। সত্যিই
পারোনি? আমি সব জেনেও কেন তোমাকে এমন শাস্তি দিলাম, নিজেও জানি না। ঠিকই বলেছ— শাশ্বতীর যেন কোনও ক্ষতি না হয়। ওকে আমার কথাই বলবে।”
— “তোমার কথা বলতে গেলে আমাকেও তো জানতে হবে। কতভাবে ভেবেও আমি দিশাহারা হয়ে
যাই।”
— “আমার এই ব্যাখ্যাটাই যেন তোমার জন্য শেষ ব্যাখ্যা হয় সুজিত। শোনো, আমি শারীরিকভাবেই শুধু তোমার কাছে ফিরে এসেছিলাম। মানসিকভাবে আমি দ্বিধায়
ছিলাম। প্রথমে তোমার কাছে করা সব স্বীকারোক্তি আর তোমার মহানুভবতা আমাকে এক অদ্ভুত
বোধ দিয়েছিল। হয়তো তোমার স্বল্পভাষী স্বভাবের জন্য তৈরি হওয়া শূন্যতা পূরণ
করতেই আমার জীবনে অন্য কারও প্রবেশ হয়েছিল। কিন্তু আমি ফিরে আসায় তুমি আমাকে
ভরসা দিয়েছিলে, আমার সব দোষ ক্ষমা করে
নতুন জীবন দিতে চেয়েছিলে—
একজন আদর্শ স্বামী হয়ে। কিন্তু?”
— “কিন্তু কী?”
— “কিন্তু আমার তো আমার প্রশ্নের উত্তর দরকার ছিল। পরিবার, সমাজ সবকিছুর থেকে লুকিয়ে যদি প্রেমের নামে সম্পর্ক তৈরি হয়, তবে তাকে ব্যক্তিগত অভাব পূরণ বলে মেনে নিতেই হবে। কিন্তু একই সঙ্গে একজন
মানুষের কতগুলো ব্যক্তিগত পছন্দ থাকতে পারে সুজিত? সেটা লজ্জার। প্রতিটি মানুষ বাস্তবকে তার নিজের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখে এবং
প্রতিটি দৃষ্টিভঙ্গির একটা সীমা থাকে। দৃষ্টিভঙ্গির বহুত্ব আমি মানি। কিন্তু কারও
দৃষ্টিভঙ্গির ভুল আমাকে কষ্ট দেবে— এটা আমি সহ্য করতে পারিনি। ”
সুজিতের চোখের জলে ওর
গেঞ্জি তো বটেই, বালিশটাও ভিজে গেল। আলতো
করে চোখের জল মুছে সুমনা বলল— “আমার মনে তোমার বাইরেও অন্য কারও জায়গা ছিল। তিনি আমাকে
জায়গা দেননি তার ব্যক্তিগত অন্য পছন্দ-অপছন্দের জন্য। সেই দুঃখ আমার কাছে কিছু
নয় সুজিত। আমার সব দুঃখ তোমাকে নিয়ে। আমি যা করেছি সব তোমার প্রতি বেইমানি—
এক সাংঘাতিক অপমান। আমি তোমার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছি। কখনও কখনও
নিজেও প্রবঞ্চিত বোধ করেছি। কিন্তু যেখানে আমি নিজেই কারও সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা
করেছি, সেখানে আমার ওপর হওয়া
অন্যায়কে আমি কীভাবে বৈধতা দেব? এটা আমাকে নিজের কাছেই
ঘৃণ্য করে তুলেছিল। তাই সেই ঘৃণ্য শরীরটাকে আমি নিজেই কবরে পাঠিয়েছি। কিন্তু
শাশ্বতীর জগত যেন কেউ লণ্ডভণ্ড করতে না পারে। না না সুজিত, ওটা হতে দিও না। কখনও দিও না। আমিও হতে দেব না।”
— “তুমি কী করবে? আমিই বা কী করতে পারি?” আমি চিৎকার করে উঠলাম।
ও খুব করুণভাবে অসহায় হয়ে
আমার দিকে তাকাল। তারপর ধীর পায়ে উঠে গিয়ে দেওয়ালের সেই লাইফ-সাইজ ফটোর সঙ্গে মিশে
গেল। ঘরের বাতিটা যেন এক মুহূর্তের জন্য কেঁপে উঠল।
টলোমলো পায়ে আমি বিছানা
থেকে উঠলাম। বুকের ভেতরটা পাথরের মতো ভারী, কিন্তু মস্তিষ্ক বলছে— ইয়ার এন্ডিংয়ের সময় কোনো কাজ
ফেলে রাখতে নেই। ঘড়িতে রাত আটটা; আমাদের এই মফস্বল শহরে যা
কেবল সন্ধ্যা। আমি জানি, এখনই আমাকে শাশ্বতীর কাছে
যেতে হবে।
নিজের দৃষ্টিভঙ্গিকে জয়ী
করার জন্য ওর এখন প্রচণ্ড মানসিক জোর দরকার। মনার মতো ওকেও আমি হারিয়ে যেতে দিতে
পারি না। এবার আমি ব্যর্থ হব না।
টেবিল থেকে গাড়ির চাবিটা
তুলে নিলাম। পা টেনে টেনে ক্লান্ত শরীরটা নিয়ে যখন সদর দরজার দিকে এগোচ্ছি, ঠিক তখনই কানের কাছে ভেসে এল সুমনার সেই চিরচেনা, মায়াবী গলা—
“সাবধানে যেও।”
আমি একবারও পিছন ফিরে তাকালাম না। শুধু অন্ধকারের বুক চিরে
স্টার্ট দিলাম গাড়ির ইঞ্জিনে।

.jpg)

0 মন্তব্যসমূহ