২০০৪ সালে আমার ‘বিষাদের লেখা কবিতা’ কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশিত হয়। তার বহু আগে থেকেই ভেবেছিলাম বিষাদ কি কবিতা লেখাতে পারে? কাব্যটি লেখার পর উত্তরও পেয়েছিলাম, হ্যাঁ পারে। কাব্যটির প্রতিটি কবিতাতেই ছিল বিষাদ-জীবনের উচ্চারণ। আমাদের জীবনের প্রতিটি মুহূর্তই কোনো না কোনো বিষাদে আচ্ছন্ন থাকে। আমাদের অন্তর্হিত বোধের মতন তাকে এড়াতে পারি না।
“সব যখন কেড়ে নিচ্ছ
আমাকে কে নেবে?
তোমার ছুরি উদ্ধত লিঙ্গ
রক্ত ঝরছে! কী বিচ্ছিরি ঘাম!
হাতের মুঠোয় তোমাকে আজ
সব তুলে দিলাম।
গোপন আর কী থাকে?
এই অশ্রু, এই ব্যর্থ
কবিতা
সীমান্তে ঘর বাঁধা এই ছোট্টগ্রাম।”
মনে হয়েছিল বিষাদই সব। বিষাদই আনন্দ। বিষাদই বেঁচে থাকা।
বিষাদই মৃত্যু। তখনই বুঝেছিলাম কবিতায় বিষাদ কেবল একটি আবেগ নয়,
বরং এটি একটি গভীর জীবনদর্শন। বিষাদ যখন দর্শন হিসেবে আবির্ভূত হয়,
তখন তা মানুষের অস্তিত্বের অসারতা, মহাকালের
নির্মমতা এবং না-পাওয়ার হাহাকারকে এক আধ্যাত্মিক বা শিল্পগত উচ্চতায় নিয়ে যায়।
সুতরাং বিষাদ কেবল কবিতা লেখাতেই পারে না, বরং সাহিত্যের
ইতিহাসে বিষাদই শ্রেষ্ঠতম অনেক কবিতার জন্মদাত্রী। কবিরা যখন জাগতিক সুখে তৃপ্ত
থাকেন, তখন তাদের সৃজনশীলতা অনেক সময় স্থবির হয়ে পড়ে;
কিন্তু বিষাদ বা 'Melancholy' যখন হৃদয়কে
মন্থন করে, তখন গভীরতর সত্য শিল্পের রূপ নেয়। ইংরেজ কবি
পার্সি বিশি শেলি (P.B. Shelley) বলেছিলেন:
"Our
sweetest songs are those that tell of saddest thought."
বিষাদ
কবির কল্পনাকে অন্তর্মুখী করে তোলে, যা জীবনকে সাধারণের ঊর্ধ্বে উঠে দেখার ক্ষমতা দেয়। এটি নিছক কান্নাকাটি নয়,
বরং এক প্রকার 'এস্থেটিক পেইন' বা নান্দনিক বেদনা।
তাহলে বিষাদের সেই দর্শনই বা কী?
বিষাদ কেবল একটি সাময়িক
দুঃখ বা মন খারাপের অনুভূতি যেহেতু নয়, সেহেতু
দর্শনের জগতে এটি অস্তিত্বের এক গভীর উপলব্ধি। জীবন যখন তার
অন্তঃসারশূন্যতা, নশ্বরতা এবং নিঃসঙ্গতাকে মানুষের সামনে
উন্মোচন করে, তখনই বিষাদের জন্ম হয়।
বিষাদের
দর্শনকে আমরা কয়েকটি মূল ভাবনার মাধ্যমে বুঝতে পারি:
প্রথমত,অস্তিত্ববাদ ও বিষাদ:
অস্তিত্ববাদী
দার্শনিকদের মতে (যেমন জঁ-পল সার্ত্র বা আলবেয়ার কামু),
বিষাদ হলো মানুষের 'অস্তিত্বের সংকট' থেকে আসা এক বোধ। যখন মানুষ বুঝতে পারে যে মহাবিশ্ব মূলত নিরর্থক বা
অযৌক্তিক (Absurd), তখন এক গভীর বিষাদ তাকে গ্রাস করে। তবে
এই বিষাদ নেতিবাচক নয়; এটি মানুষকে নিজের জীবনের অর্থ নিজে
তৈরি করার স্বাধীনতা দেয়।
দ্বিতীয়ত, নশ্বরতা ও সময়:
বিষাদের
একটি বড় অংশ জুড়ে থাকে 'ক্ষয়'। যা কিছু সুন্দর, যা কিছু প্রিয়—সবই সময়ের নিয়মে হারিয়ে যাবে। এই যে প্রাপ্তির মধ্যেই হারানোর ভয়, এটাই বিষাদের মূল সুর। জাপানি দর্শনে একে বলা হয় 'মোনো
নো আওয়ারে' (Mono no aware), যার অর্থ হলো—বস্তুর ক্ষণস্থায়ী প্রকৃতির জন্য এক ধরনের মৃদু দুঃখবোধ যা সৌন্দর্যকে
আরও গভীর করে তোলে।
তৃতীয়ত, সৃজনশীলতা ও বিষাদ:
অ্যারিস্টটল
থেকে শুরু করে আধুনিক কবি-সাহিত্যিকরা মনে করেন, বিষাদ হলো সৃজনশীলতার আধার। বিষাদগ্রস্ত মন জীবনের ওপরিতল ছাপিয়ে গভীরে
প্রবেশ করতে পারে। রোমান্টিক কবিদের কাছে বিষাদ ছিল এক প্রকার 'মধুর যন্ত্রণা' (Sweet Sorrow), যা ছাড়া মহৎ শিল্প
সৃষ্টি অসম্ভব।
দর্শনের
বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে বিষাদকে এইভাবে দেখা যায়—
বৌদ্ধ দর্শন জগৎ 'দুঃখময়'। তবে এই বিষাদকে মেনে নিয়েই নির্বাণ বা
মুক্তি সম্ভব।
শোপেনহাওয়ার এর দর্শনে
মানুষের ইচ্ছা বা কামনা অপূর্ণ থাকলেই বিষাদ আসে, আবার পূরণ হলেও একঘেয়েমি থেকে বিষাদ আসে।
আধুনিক মনস্তত্ত্বে বিষাদ
হলো নিজেকে চেনার একটি প্রক্রিয়া, যা মানুষকে
আত্মদর্শনে (Introspection) বাধ্য করে।
তাই একথা বলা ভুল হবে না, বিষাদ হলো সেই
বৃষ্টি, যা আত্মার মাটিকে নরম করে যাতে সেখানে নতুন উপলব্ধির
চারা জন্মাতে পারে।
বাংলা কবিতায় বিষাদের স্বরূপ
বাংলা সাহিত্যে বিষাদের কবিতার স্বরূপ, বিবর্তন
এবং কবিদের স্বতন্ত্র চেতনার সংক্ষিপ্ত আলোকপাত করলে বিষাদের স্বরূপও জানা সম্ভব।
বাংলা কবিতায় বিষাদ
বিভিন্ন রূপে ধরা দিয়েছে। এটি কখনো বিচ্ছেদ-কাতরতা, কখনো অস্তিত্বের সংকট, আবার কখনো সামাজিক নিঃসঙ্গতা
হিসেবে প্রকাশ পেয়েছে।
যেমন রোমান্টিক বিষাদ—যা না-পাওয়ার আকুতি আর স্মৃতির চাদরে মোড়া। যেমন
অস্তিত্ববাদী
বিষাদ—জীবনের অর্থহীনতা এবং মৃত্যুর অনিবার্যতায় যা
জন্ম নেয়।
আধুনিক
জীবনে দেখা যায় নাগরিক নিঃসঙ্গতা, যান্ত্রিকতা এবং মূল্যবোধের অবক্ষয়জনিত বিষাদ। বিচ্ছেদের চিরন্তন বিষাদ
বৈষ্ণব সাহিত্য থেকেই পথ চলা শুরু করেছে। এখানে বিষাদ মানেই 'বিরহ', যা এক পরম মিলনের আকাঙ্ক্ষা তৈরি করে।
কবি
বিদ্যাপতির চেতনায়
চিরকালীন প্রতীক্ষা ও নিঃসঙ্গতা:
"এ ভরা বাদর মাহ ভাদর
শূন্য মন্দির মোর।"
মাইকেল মধুসূদন দত্তের নিয়তিবাদ ও বিষাদ
গ্রিক ট্র্যাজেডির মতো। তাঁর কবিতায় বিষাদ আসে ব্যক্তিগত
ব্যর্থতা এবং অতিমানবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার পতনের করুণ রেশ ধরে।
জীবনের সায়াহ্নে এসে ফেলে আসা সময়ের জন্য অনুশোচনা:
"আশার ছলনে ভুলি কি ফল লভিনু হায়,
তাই ভাবি মনে।"
(আত্মবিলাপ)
রবীন্দ্রনাথ
ঠাকুরের আধ্যাত্মিক ও বৈশ্বিক বিষাদ নিছক দুঃখ নয়, তা এক প্রকার 'মধুর বিষাদ'।
তিনি বিষাদকে বিশ্বপ্রকৃতির সাথে একীভূত করেছেন। তাঁর কাছে দুঃখ হলো আত্মশুদ্ধির
পথ। কবির মৃত্যু ও অসীমের সন্ধানে এক প্রশান্ত বিষাদ:
“এই করেছ ভালো, নিঠুর,
এই করেছ ভালো।
এমনি করে হৃদয়ে মোর
তীব্র দহন জ্বালো।
আমার এ ধূপ না পোড়ালে
গন্ধ কিছুই নাহি ঢালে,
আমার এ দীপ না জ্বালালে
দেয় না কিছুই আলো।”
জীবনানন্দ দাশ বহন করেছেন অস্তিত্বের ধূসর বিষাদ। তাই
জীবনানন্দ দাশকে বলা হয় 'বিষাদের কবি'। তাঁর কবিতায় বিষাদ এক পরাবাস্তব ও নাক্ষত্রিক রূপ নেয়। তাঁর বিষাদ কোনো
সাময়িক কারণ নয়, বরং মানুষের মজ্জাগত নিঃসঙ্গতা। জীবনের
বিপন্নতা এবং এক অদ্ভুত আধ্যাত্মিক ক্লান্তি:
"আমি ক্লান্ত প্রাণ এক, চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন,
আমারে দুদণ্ড শান্তি
দিয়েছিল নাটোরের বনলতা সেন।"
আধুনিক
ও উত্তর-আধুনিক যুগেও
বিষাদের ধারক ও বাহক হয়ে উঠেছেন কবিরা।
শক্তি চট্টোপাধ্যায় বা বিনয়
মজুমদারের কবিতায় বিষাদ আরও ব্যক্তিক ও যন্ত্রণাক্লিষ্ট হয়ে উঠেছে।
শক্তি
চট্টোপাধ্যায় "অবনী বাড়ি আছো?"—এই পংক্তিতে ফুটে ওঠে এক ঘরছাড়া মানুষের অনন্ত বিষাদ।
বিনয়
মজুমদার প্রেমের ব্যর্থতা ও উন্মাদনার মধ্য দিয়ে তিনি বিষাদের এক নতুন ভাষা তৈরি
করেন।
বিষাদের বিবর্তনে দেখা যায় মধ্যযুগ বিষাদ ছিল বিচ্ছেদবাদী পরমাত্মার জন্য বিরহ।
রবীন্দ্রযুগে বিষাদ ছিল
মরমী ও আধ্যাত্মিক, প্রকৃতির মাঝে
আত্মাকে বিলীন করা।
জীবনানন্দ বহন করেছেন
বিপন্নতা বা ধূসরতা ঐতিহাসিক ও অস্তিত্ববাদী নিঃসঙ্গতা। লাশকাটা ঘর থেকে তাঁর সমূহ
বোধের দরজা এই বিষাদেই খুলে গেছে।
আধুনিক নাগরিক জীবনে নেমে
এসেছে ব্যক্তিগত শহুরে নিঃসঙ্গতা ও বিচ্ছিন্নতাবোধ।
কবিতার বিষাদ আসলে আমাদের
মনে করিয়ে দেয় যে, আনন্দ সাময়িক কিন্তু
গভীর উপলব্ধি অনেক সময় এই বিষাদ থেকেই জন্ম নেয়।
পাশ্চাত্য সাহিত্যেও
বিষাদের প্রভাব
পাশ্চাত্য
সাহিত্যে বিষাদকে একটি উচ্চতর বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থা হিসেবে দেখা হয়েছে।
জন
কিটস (John Keats) রোমান্টিক কবিদের মধ্যে তিনিই
বিষাদকে সবচেয়ে বেশি মহিমান্বিত করেছেন। তাঁর মতে, আনন্দের
মন্দিরেই বিষাদের দেবী বাস করেন:
"Ay,
in the very temple of Delight / Veil'd Melancholy has her sovran shrine."
(Ode on Melancholy)
ফরাসি কবি শার্ল বোদলেয়ার (Charles
Baudelaire)ও বিষাদকে আধুনিক নাগরিক জীবনের এক 'অভিশাপ' ও 'বিষ'
(Spleen) হিসেবে দেখিয়েছেন। তাঁর কাছে বিষাদ মানে এক অসহ্য
একঘেয়েমি এবং আত্মিক শূন্যতা।
টি.
এস. এলিয়ট (T. S. Eliot)ও প্রথম
বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী ইউরোপের যে হাহাকার, তাকে
'The Waste Land'-এ এক মহাকাব্যিক বিষাদের রূপ দিয়েছেন।
বাংলা কবিতায় এই বিষাদের প্রভাব
বাংলা
আধুনিক কবিতার মোড় যখন ঘুরছে (তিরিশের দশকে), তখন পঞ্চপাণ্ডব কবিরা সরাসরি ইউরোপীয় কবিদের বিষাদ ও ক্লান্তি দ্বারা
প্রভাবিত হয়েছিলেন। কিটসের মতো ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য রোমান্টিক বিষাদ রবীন্দ্রনাথের
গীতি-কবিতায় প্রভাব ফেলেছিল। তবে এর পূর্ণ প্রতিফলন দেখা যায় জীবনানন্দ দাশের
কবিতায়। কিটসের 'Nightingale'-এর বিষাদ আর জীবনানন্দের 'ক্যাম্পে' কবিতার নির্জনতা একই সুরের:
"একঘেয়ে মৃত্যু নেই তার / নেই কোনো বিনাশ..."
আবার এলিয়টের 'The Waste Land'-এর সেই অনুর্বরতা ও আধুনিক জীবনের বন্ধ্যাত্বের ছায়াও আমরা জীবনানন্দের
কবিতায় পাই।
এলিয়ট
বলছেন, "I will show you fear in a handful of dust."
জীবনানন্দ লিখছেন:
"অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ পৃথিবীতে আজ,
যারা অন্ধ সবচেয়ে বেশি আজ
চোখে দেখে তারা;"
বোদলেয়ারের 'শয়তানি' বিষাদও
সেই সময়ের কবিরা এড়িয়ে যেতে পারেননি।
বিশেষ করে বোদলেয়ারের সেই 'মন্দ-এর সৌন্দর্য'
এবং গভীর নিঃসঙ্গতা গ্রহণ করেছিলেন বুদ্ধদেব বসু। বিষাদ যখন
যন্ত্রণার চরম সীমায় পৌঁছে শিল্পের রূপ নেয়, তখন তা
বোদলেয়ারীয় ঘরানার হয়। শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের বিষাদও অনেকটা বোদলেয়ারীয় বা র্যাঁবো-র
মতো বাউণ্ডুলে ও ধ্বংসাত্মক:
"মানুষ বড়ো কাঁদছে, তুমি মানুষ হয়ে পাশে
দাঁড়াও।"
পাবলো নেরুদার 'Despair'
বা হতাশার সুর আধুনিক বাংলা কবিতার রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত বিষাদকে
প্রভাবিত করেছে। সুভাষ মুখোপাধ্যায় বা শঙ্খ ঘোষের কবিতায় সেই গম্ভীর, সংযত বিষাদের রূপ পাওয়া যায়।
রেইনার মারিয়া রিলকের
আধ্যাত্মিক নিঃসঙ্গতা বিষ্ণু দে, সুদীন্দ্রনাথ
দত্ত এবং অমিয় চক্রবর্তীর মধ্যেও দেখা যায়। তবে বিষাদ যখন মহৎ কবির হাতে পড়ে,
তখন তা কেবল 'দুঃখ' থাকে
না, তা হয়ে ওঠে 'শিল্প'।
সাম্প্রতিকের কবিতায় বিষাদ
সাম্প্রতিক কালের বাংলা
কবিতায় বিষাদ আর কেবল রোমান্টিক বিরহে সীমাবদ্ধ নেই; তা এখন অস্তিত্বের সংকট, একাকিত্ব এবং সময়ের
রুক্ষতাকে স্পর্শ করে। সাম্প্রতিক সময়ের কয়েকজন প্রথিতযশা ও শক্তিমান কবির কবিতায়
বিষাদের রূপটি নিরীক্ষণ করা যায়।
১.
জয় গোস্বামী
জয়
গোস্বামীর
কবিতায় বিষাদ আসে এক তীব্র ব্যক্তিগত হাহাকার এবং আত্মসমর্পণের
ভঙ্গিতে। তাঁর বিষাদ অনেক সময় ঘরোয়া বস্তুর মাধ্যমে মহাজাগতিক হয়ে ওঠে—
"আমি বিষাদ ভুলেছি অনেক বছর, কিন্তু আজ আবার
পুরনো সেই ঘা-টা টাটিয়ে
উঠেছে।
সব আলো নিভে গেলে যে অন্ধকার
থাকে, তার নামই কি তুমি?"
(কবিতা: ঘুমিয়েছ,
ঝাউপাতা?)
২.
শ্রীজাত
সাম্প্রতিক
সময়ের অত্যন্ত জনপ্রিয় এই কবির কবিতায় বিষাদ আসে নাগরিক ক্লান্তি ও প্রেমের
না-পাওয়ার সুর ধরে। তাঁর বিষাদ অনেক সময় খুব সহজ কিন্তু গভীর—
"সবটুকু পথ হেঁটে আসার পর মনে হয়,
এই পথটুকু না হাঁটলেই ভালো
ছিল।
আয়নার সামনে দাঁড়ালে এখন
নিজেকেই অচেনা লাগে,
যেন অন্যের কোনো দুঃখ আমি
ভুল করে পরে আছি।"
(কবিতা: অন্ধকার
বারান্দা)
৩.
মহাদেব সাহা
মহাদেব সাহার বিষাদ অনেক বেশি সামাজিক ও রাজনৈতিক
প্রেক্ষাপট-ঘেঁষা। মানুষের মূল্যবোধের পতন তাঁকে বিষণ্ণ করে। একাকিত্বে নির্বাসিত
করে—
"বিষাদ ছুঁয়েছে আজ,
মন ভালো নেই,
মন ভালো নেই;
ফাঁকা রাস্তা,
শূন্য বারান্দা
সারাদিন ডাকি সাড়া নেই,
একবার ফিরেও চায় না কেউ
পথ ভুলকরে চলে যায়,
এদিকে আসে না
আমি কি সহস্র সহস্র বর্ষ
এভাবে তাকিয়ে থাকবো
শূন্যতার দিকে?
এই শূন্য ঘরে,
এই নির্বসনে
কতোকাল,
আর কতোকাল!
(কবিতা: মন ভালো নেই)
৪.
বিনয় মজুমদার (উত্তর-কাল)
যদিও
বিনয় মজুমদার গত শতকের কবি, কিন্তু সাম্প্রতিক
কবিতার পাঠে তাঁর প্রভাব ও বিষাদ-দর্শন অবিচ্ছেদ্য। তাঁর বিষাদ গাণিতিক ও ধ্রুব—
"একটি উজ্জ্বল মাছ একবার উড়ে
দৃশ্যত সুনীল কিন্তু মূলত
স্বচ্ছ জলে
পুনরায় ডুবে গেল—
এই তো জীবন।"
(অঘ্রাণের অনুভূতি)
৫.বিভাস
রায়চৌধুরী
বিভাস
রায়চৌধুরীর কবিতায় বিষাদ আসে এক ধরনের মরমী ও বাউণ্ডুলেপনার হাত ধর—
“দুঃখের দিন এলে দম
বন্ধ হয়ে আসে।
খুবই কষ্ট হয়।
ভাবি,
কবে দিনগুলো পার হয়ে যাব?
দুঃখের দিন অন্য কাউকে
দুঃখ দিতে ফিরে যায়।
স্বাভাবিক।”
(
কবিতা: প্রজন্ম)
জীবন
এক পুরনো খাতা হয়ে পড়ে থাকে আর এই খাতাই হয়ে ওঠে কবিদের
পাণ্ডুলিপি। বিষাদ এসে কবিতা লেখায় আমাদের। যার পাতায় পাতায় কেবল ভুলের সংশোধনী
চলতে থাকে তাই কাটাকুটিও হয় বারবার। দুঃখের একটি পংক্তি কেটে আর একটা নতুন পংক্তি
লেখা হয়। সময় একজনের কাছে বিষাদ নিয়ে আসে, আবার বিষাদ চলে
যায় অন্য কারো কাছে।আমরা হারতে হারতে বারবার জিতার গল্প লিখি। বিষাদ যখন শব্দে
রূপান্তরিত হয়, তখন তা কেবল কবির ব্যক্তিগত থাকে না, বরং পাঠকদের কাছে তা এক সর্বজনীন আশ্রয় হয়ে ওঠে।

.jpg)

0 মন্তব্যসমূহ