
হিমাচলপ্রদেশ স্বপ্নের মতো সুন্দর এক রাজ্য। যদিও বর্তমানে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতবিক্ষত। অতিবৃষ্টি, ধ্বস তার বুকের উপর রেখে দিয়েছে নির্মম আঘাতের চিহ্ন। তবু এবছর পুজোর ছুটিতে পাড়ি জমিয়েছিলাম আবারও হিমাচলেই। এবারে গন্তব্য ছিল বেশ কয়েকটি ভ্যালী। আজ বলব এমন এক ভ্যালীর কথা যার সৌন্দর্য দীর্ঘদিন আমায় মোহাচ্ছন্ন করে রাখবে। গ্রেট হিমালয়ান ন্যাশনাল পার্ক ঘুরে আমরা বানজার ভ্যালীর দিকে রওনা দিলাম যখন সূর্য তখন তেতে উঠেছে। চতুর্দিকে হিমাচল হিমালয়ের অপরূপ শোভা। পুরো এলাকাটি গ্রেট হিমালয়ান ন্যাশানাল পার্কের অন্তর্গত হওয়ায় প্রচুর পাখীর সমাবেশ। তাদের ডাক থেকে থেকেই শুনতে পাচ্ছি। ঘন সবুজ পাহাড়, দূরে ক্যানভাসে গাঢ় বেগুনি বাহার সেও আসলে সবুজই দূরে থাকায় এমন ভ্রম হচ্ছে, পথের ধারে কত না ফুল, বয়ে চলা নদীর বাহার, হঠাৎ দর্শন মেলে পাহাড়ি ঝরনার। কোথায় তার উৎপত্তি কোথায় সে চলেছে ধরা যায় না। আর রয়েছে পথের প্রান্তে ছোটোছোটো মন্দির। অপূর্ব কাঠের কারুকাজ করা সেই মন্দির একাকী পথিককে যেন ভরসা দেয়, আশ্বাস যোগায়। এই হল হিমাচলের প্রকৃত সৌন্দর্য। এমনি করে করে চলতে চলতে মুগ্ধ হতেই থাকি।
আমরা গ্রামে প্রবেশের মুখেই বাঁদিকের ছোট্ট দোকানটিতে দাঁড়িয়ে গেলাম সিড্ডু খাবার জন্য। বিশুদ্ধ ঘি সহযোগে সেই সিড্ডু দেবভোগ্য। দু একজন স্থানীয় মানুষও খাচ্ছেন। তাদেরই একজনের সাথে আলাপ হল। দোকানীর মতো তিনিও খুবই আলাপী। তবে মিতভাষী এবং শুদ্ধ হিন্দিতে কথা বলেন। পরিচয় পেলাম তিনি পণ্ডিত মানে পূজারী। শৃঙ্গাঋষির মন্দিরে যাবেন তিনি। দোকানটি থেকে প্রায় চার পাঁচ কিলোমিটার দূরে এই মন্দির। এখানে আমরা একটি খারাপ খবর পেলাম। দুর্যোগে চেহনি কোঠি সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়েছে, রাস্তা ধ্বস্ত। বহু উঁচু দিয়ে গ্রাম ঘুরে সেখানে যেতে হবে। তবে শৃঙ্গা ঋষির মন্দির অবধি সুন্দর যাওয়া যাবে। এই সমস্ত রাস্তায় কোনো পাবলিক ট্রান্সপোর্ট চলেনা। প্রাইভেট গাড়িগুলো পথ চলতি মানুষদের সাহায্য করে থাকে। আমরা পণ্ডিতজিকে আমাদের গাড়িতে লিফ্ট দিলাম। তিন চার কিলোমিটার পর গাড়ি থেকে নামতে হল। আর রাস্তা নেই। ডানদিকের খুব খাড়াই, ধ্বংসপ্রাপ্ত রাস্তাটি চেহনি কোঠি যাবার রাস্তা ছিল। আমরা ধীরে ধীরে পণ্ডিতজির পিছু পিছু ঘন দেবদারের জঙ্গলের ভিতর দিয়ে সরু পথ ধরে এগিয়ে চললাম। আজ ভাবি উনি না থাকলে এপথে যাবার কথা কখনই ভাবতাম কি? বোধহয় না। চড়াই ভেঙে, আপেল বাগানের মধ্যে দিয়ে এসে পড়লাম মন্দির চত্ত্বরে। কাঠ নির্মিত মন্দিরটি দেখেই তার প্রাচীনত্ব অনুমান করা যায়।
এবার আমাদের গন্তব্য জীবি। আমাদের গাড়ি চালক রাকেশজিকে বলেছিলাম এমন কোথাও থাকব যেখানে শান্তি আছে। কথা রেখেছে রাকেশজি পাহাড়ের বুকের উপর হাতে গোনা কয়েকটি বাড়ি ও হোটেলের মাঝে এসে পৌঁছালাম এক মায়াবী দুপুরের শেষে। চেক ইন করেই ছুট। পাহাড়ের নীচে নেমে মেন রাস্তা দিয়ে খানিক এগিয়ে বাজার পেরিয়ে জীবি জলপ্রপাত। কুড়ি টাকার টিকিট কেটে ভিতরে প্রবেশ করতেই মুহূর্তে সব বদলে গেল। আলো কমে এসেছে কিন্তু অন্ধকার নয়, জঙ্গলের ভিতর দিয়ে এগিয়ে চলেছি। পাশেপাশে বয়ে চলেছে কুলুকুলু শব্দে ক্ষীণতোয়া। ছোটো ছোটো কাঠের ব্রীজ পেরিয়ে হঠাৎ সামনে দেখলাম তাকে। ছোট্ট প্রাণোচ্ছল সুন্দরী এক। নাতিদীর্ঘ পাহাড়ের মাথা থেকে সশব্দে ঝাঁপিয়ে পড়েছে নীচে। চমৎকার বাঁধানো, পরিস্কার পরিচ্ছন্ন। বহু মানুষ ভীড় জমিয়েছে তাকে ঘিরে। ঝিঁঝিঁর শব্দ বেড়ে চলেছে। হোটেলে ফিরে একটু কফি খেয়ে আমরা গ্রাম ঘুরতে বেরোলাম। আপেল বাগান, ফুলের বাগান আর আসন্ন সন্ধ্যার প্রেমময় আকাশ। দাঁড়িয়ে পড়তে বাধ্য হলাম। পপিফুলের সমারোহ এক দোতলা কাঠের বাড়ি ঘিরে। এদিকে সন্ধ্যা নামে দেরিতে। ঘড়িতে ছটা কুড়ি অথচ আকাশে তখনও গোধূলীর রঙ। এখানকার মানুষজন এই ক্ষয়ে যাওয়া সময়েও বড্ড ভালো। এগিয়ে এলেন একজন মানুষ হাসিমুখে। আমার কৌতুহল দেখে সাদর আমন্ত্রণ জানালেন বাড়িটি দেখতে। ওটি আসলে একটি হোমস্টে। উনি হোমস্টেতে আলো জ্বাললেন আর আমি পৌঁছে গেলাম রূপকথায়। আকাশে কোজাগরীর চাঁদ, মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে পাহাড়শ্রেণী, পপি ফুলের সমারোহ এই অলৌকিক হোমস্টে আর একটানা ডেকে চলেছে দুটি পাখি। একজন ডাকে অপরে সাড়া দেয়। নিজের বাগানের ইয়া বড়বড় আপেল আমাদের উপহার দিলেন। বলে দিলেন আমাদের হোটেলের ঠিক নীচে জীবির বিখ্যাত মিনি থাইল্যান্ড আর ডানদিকে পাহাড়ের নীচের দিকে নামলে বহু প্রাচীন শেষনাগের মন্দির আছে। আমরা ঠিক করলাম পরদিন ভোরবেলা এই দুটি দেখে তবে জালোরিপাসের উদ্দেশ্যে বেরোব। কোলাহল বর্জিত জীবির রাত্রি যাপন মনে শান্তি এনে দেয়। দূরে পাহাড়ের গায়ে উজ্জ্বল জোনাকি বিন্দু। আকাশে তারা, কোজাগরীর চাঁদ সব মিলিয়ে মায়াময় পরিবেশ। হোটেলের কর্মচারী সদা হাস্যময়। দশেরার কারণে নিরামিষ ভোজন সাময়িক মন খারাপ করছিল বটে তবে গরম ধোঁয়া ওঠা ভাত, মুগমুসুর মেশানো ঘন ডাল, আলুভাজা আর পনীর সহযোগে মিক্সসব্জী খুবই সুস্বাদু ছিল। রাতে অনেকক্ষণ চুপ করে বসে ছিলাম ব্যালকনিতে।
ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে বেরিয়ে পড়লাম শেষনাগের মন্দিরের উদ্দেশ্যে। আমরা যেহেতু পাহাড়ের অনেকটা উপরে আছি তাই দেবদারু গাছের জঙ্গলের মধ্য দিয়ে বেশ উৎরাই পেরিয়ে মন্দির চত্ত্বরে আসতে হল। জীবি মার্কেট এরিয়া থেকে মাত্র পাঁচশো মিটার চড়াইতে এই মন্দির। কশ্যপ মুনির পুত্র শেষনাগকে আমরা অনন্তনাগ হিসেবে চিনি। যিনি বিষ্ণুর ভক্ত। তার উপরেই শায়িত থাকেন বিষ্ণু। এই মন্দিরটিও অতি প্রাচীন। হিমাচলের সব নির্মাণের মতো এও অতি আশ্চর্য নির্মাণ।খুব সকালে উপস্থিত হওয়ায় কেউই প্রায় নেই। সংলগ্ন কেন্দ্রীয় বিদ্যালয়ের দুজন শিক্ষক পাশের মাঠটিতে কসরৎ করছিলেন। আমরাই দরজা খুলে ঢুকলাম।
দেওয়ালে লেখা আছে কতটুকু যাওয়া যাবে। সূর্য তখনও ভালো করে আলো ছড়ায়নি তাই সেখান
থেকেই দেবতাকে অস্পষ্ট দর্শন করলাম। পাখীদের খেলা দেখতে দেখতে বনপথে ফিরে এলাম
হোটেলে। ফ্রেশ হয়ে গরম গরম রুটি আলুর তরকারি আর কফি খেয়ে চেক আউট করলাম। কয়েক
ঘন্টাতেই মানুষগুলো আপন হয়ে উঠেছিল। সবচে বড় কথা এত কম দামে থাকা খাওয়া সহ হোটেল
কোথাও পাইনি হিমাচলে। কিন্তু জীবির প্রেমে পড়ার কারণ আরও আছে।
হোটেল থেকে বেরিয়ে পাহাড়ের ঠিক নীচে বড় রাস্তার উল্টো দিকে একটা বনের ভিতর প্রবেশের গেট। এত সকালে টিকিট কাউন্টারে লোক নেই ফলে বিনা টিকিটে খোলা গেট দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করলাম। এখানে একটা কথা বলি এই স্থানটি হঠাৎ করেই একটু বেশি খাড়াই ভাবে নীচের দিকে নেমেছে। বয়স্ক মানুষ বা হাঁটু বা পায়ের সমস্যা যাদের তাদের একটু কষ্ট হতে পারে। তবে ধীরে ধীরে নামলে প্রকৃতির সৌন্দর্যে মন ভালো হয়ে উঠবে। এই জায়গাটির নাম মিনি থাইল্যান্ড। থাইল্যাণ্ডে যেমন বড় পাথরের ভিতর দিয়ে পান্না সবুজ জল দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। এখানেও তেমন ঝলক দেখা যায়। পরিস্কার টলটলে জল, নীচে বালি, সুন্দর পাথর দেখা যায়। জায়গটি ফটো তোলার জন্য খুবই আর্দশ তাই ভীড় খুব বেশি হয়। ফলে ভোর ভোর গেলে টলটলে জল পাওয়া সহজ হয় ও নিশ্চিন্তে ছবি তোলা যায়।
ফুল, পাখি, বন, জঙ্গল, ঝরনা, জলপ্রপাত, প্রাচীন মন্দির, সদাহাস্যময় আলাপী মানুষ নিয়ে গড়ে ওঠা জীবিতে বিভিন্ন দামের বহু হোটেল ও হোমস্টে রয়েছে। রয়েছে খুব সুন্দর সুন্দর হাতের তৈরী দ্রব্যের সম্ভার নিয়ে বাজার। স্বল্প মূল্যে গরম পোষাক খুঁজলেই পাওয়া যাবে ছোটো ছোটো দোকানগুলিতে। একটি দিন জীবির জন্য রাখতেই হবে। খুব ভালো হয় পায়ে হেঁটে যদি আবিস্কার করা যায় বানজারের ঐশ্বর্য কে তবে খুব ভালো হয়। মূলত জালোরি পাস হয়ে জীবি আসেন পর্যটকেরা আবার আমাদের মতো কেউ কেউ তীর্থান ভ্যালী হয়েও ঘুরতে আসেন। জীবি ভ্রমণ শেষে আমরা জালোরী পাসের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়েছিলাম। জালোরি পাসে দুটি ছোটো ট্রেক করা যায়। আমরা রঘুপুর ফোর্ট ট্রেকটি করেছিলাম। অসাধারণ সেই অভিজ্ঞতার গল্পটিও একদিন বলব।
সৌমী আচার্য্য

.jpg)



0 মন্তব্যসমূহ