
নারী লেখকের লেখা পড়তে পুরুষের এত অনীহা কেন?
‘হোয়াই ডু সো ফিউ মেন রিড বাই ওমেন?’ শিরোনামে ইন্টারেস্টিং একটি আর্টিকেল পড়লাম কিছুদিন আগে। বেশ পুরোনো লেখা।
বছর চারেক আগে দ্য গার্ডিয়ানে লেখাটা প্রকাশিত হয়। বিষয়বস্তু আনকোরা কিছু নয়,
কিন্তু দুঃখজনক সত্যিটা হলো এর প্রাসঙ্গিকতা এখনও ফুরিয়ে যায়নি। এই
লেখা মূলত মেরি অ্যানের সেই আর্টিকেল ঘিরেই।
যে প্রবন্ধের ছুতোয় এই লেখা, তার শুরুতে লেখকের নাম লেখা হয়েছে MA Sieghart, পুরো
নামের শর্টফর্ম। লেখকের পুরো নাম Mary Ann Sieghart হলেও
সেটা লেখা হয়নি। এমনটা কেন? এর পেছনে তিক্ত এক সত্যি লুকিয়ে
আছে। লেখক MA Sieghart মনেপ্রাণে চেয়েছেন তার লেখাটি যেন
পুরুষপাঠকও পাঠ করেন। পুরুষ পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য MA Sieghartকে ছোট্ট এই কৌশলের আশ্রয় নিতে হয়েছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে নারী
লেখকরা, সেই
ব্রন্টি বোনদের থেকে শুরু করে জর্জ এলিয়ট বা জে.কে. রোলিং, এভাবেই
তাদের লেখা পাঠে পুরুষ পাঠক যেন উৎসাহিত হন সে চেষ্টায় নিজেদের লিঙ্গ লুকাতে বাধ্য
হয়েছেন। কিন্তু এখন? এখনও কি এই কৌশল জরুরি? দুঃখজনক উত্তর হলো হ্যাঁ।
এই প্রসঙ্গে MA Sieghart বা মেরি অ্যান বলেন, আমার বই ‘The Authority
Gap’এ আমি দেখিয়েছি কেন নারী লেখকদের এখনও পুরুষদের তুলনায় কম
গুরুত্ব দেওয়া হয়। আমি Nielsen Book Research-এর কাছ থেকে
একটি গবেষণা করিয়েছিলাম। এই গবেষণার মাধ্যমে কে কী পড়ছেন তা নির্ধারণ করা সম্ভব।
আমি জানতে চেয়েছিলাম নারী লেখকদের কি কম প্রভাবশালী মনে করা হচ্ছে? না কি পুরুষরা প্রথম থেকেই নারী লেখকদের বই পড়া থেকে বিরত রয়েছেন? সেই গবেষণার ফলাফল আমার আশঙ্কাকে নিশ্চিত করেছে—পুরুষরা
অত্যন্ত কম সংখ্যায় নারী লেখকদের বই পড়ে থাকেন।
শীর্ষ ১০টি বিক্রি হওয়া নারী লেখকের(যাঁদের মধ্যে আছেন জেন অস্টেন, মার্গারেট অ্যাটউড, ড্যানিয়েল
স্টিল এবং জোজো ময়েস) বইয়ের পাঠকের মধ্যে ১৯% পুরুষ, আর ৮১%
নারী। পাশাপাশি শীর্ষ ১০টি বিক্রি হওয়া পুরুষ লেখকদের (যাঁদের মধ্যে আছেন চার্লস
ডিকেন্স, জে.আর.আর. টলকিন, লি চাইল্ড
এবং স্টিফেন কিং) বইয়ের ক্ষেত্রে এই বণ্টন অনেকটাই কম; ৫৫%
পুরুষ এবং ৪৫% নারী। অর্থাৎ, নারীরা পুরুষ লেখকদের বই পড়তে
আগ্রহী, কিন্তু অনেক কম পুরুষ নারী লেখকদের বই পড়তে
প্রস্তুত। আর শীর্ষ ১০ নারী লেখকের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পুরুষ পাঠক পেয়েছেন –
থ্রিলার লেখক এল. জে. রস। তাঁর নাম আদ্যক্ষর দিয়ে লেখা, তাই সম্ভবত পুরুষরা তাঁকে তাদের স্বগোত্রীয় ভেবেছেন। আমাদের সমাজে নারী
এবং পুরুষের সমান বৌদ্ধিক, শৈল্পিক, সাংস্কৃতিক
কর্তৃত্ব দেওয়ার ব্যাপারে পুরুষদের অনীহা সম্পর্কে এটি কী বলে?
মার্গারেট অ্যাটউড, যিনি একজন খ্যাতনামা সাহিত্যিক, সাহিত্যের সমঝদার যে
কোনো ব্যক্তির বইয়ের শেলফে তাঁর রচনা থাকা উচিত বলে মনে করেন মেরি অ্যান। তাঁর
জরিপকৃত খতিয়ান বলছে, অ্যাটউডের পাঠকদের মধ্যে মাত্র ২১%
পুরুষ। অন্যদিকে পুরুষ বুকার পুরস্কার বিজয়ী জুলিয়ান বার্নস এবং ইয়ান মার্টেলের
পাঠকের সংখ্যা অ্যাটউডের প্রায় দ্বিগুণ, ৩৯% এবং ৪০%। এমন
নয় যে নারী সাহিত্যিকেরা গল্প-উপন্যাস লেখায় কম দক্ষ। ২০১৭ সালের সর্বোচ্চ বিক্রি
হওয়া পাঁচটি উপন্যাসের মধ্যে পাঁচটিই নারী লেখকদের, এবং
শীর্ষ ১০টির মধ্যে নয়টি তাঁদের লেখা। পুরুষরা যখন নারী লেখকদের বই পড়েন তখন তাদের
সেটা উপভোগ করতে কোনো সমস্যা হয় না; বরং অনেক প্ল্যাটফর্মে
তাদের পছন্দের জরিপে নারী লেখকদের এগিয়ে থাকতে দেখা যায়। গুডরিডসের জরিপে দেখা
গেছে, পুরুষ পাঠকেরা নারী লেখকদের বই গড়ে ৫ এর মধ্যে ৩.৯
রেটিং দেন; পুরুষ লেখকদের বইয়ের জন্য সে বরাদ্দ ৩.৮।
নন-ফিকশন লেখার ক্ষেত্রেও একই ধারা দেখা যায়, যদিও এই প্রসঙ্গ ততটা সামনে আসে না। নন-ফিকশন বই
সাধারণত পুরুষরাই বেশি পড়েন, এবং এক্ষেত্রেও তারা পুরুষ
লেখকদের বই নারী লেখকদের তুলনায় অনেক বেশি পড়তে আগ্রহী। কিন্তু এখানে পার্থক্য
ততটা বড় নয়। কারণ নারীরা নারী লেখকদের বই পড়ার প্রতি পক্ষপাতীত্ব দেখান। তা
সত্ত্বেও একটি পার্থক্য রয়ে যায়। নারীরা পুরুষ লেখকদের লেখা নন-ফিকশন বই পড়ার
ক্ষেত্রে ৬৫% বেশি আগ্রহী, যে আগ্রহ পুরুষরা নারী লেখকদের
জন্য দেখান না। এই সমস্ত তথ্য নির্দেশ করে যে পুরুষ পাঠকরা, সচেতন
বা অবচেতনে,পুরুষ লেখকদের মতো নারী লেখকদের সমান প্রাধান্য
দেন না। অথবা প্রচলিত অনুমানের বৃত্তেই তারা আটকে থাকতে পছন্দ করেন যে, নারী লেখকদের বই তাদের জন্য নয়। হাস্যকর হলেও হয়তো তারা বইটি পরীক্ষা না
করেই সে সিদ্ধান্তে পৌঁছে যান। কিংবা সপাটে ভি. এস. নাইপলের মতো উন্নাসিকতা
প্রকাশে আত্মতৃপ্তি পেয়ে থাকেন--
“I can read two paragraphs and know immediately if it’s written by
a woman, and I just stop reading, because it’s not worthy of me.”
আলোচনার স্বার্থে এই প্রসঙ্গে প্রিয় লেখক নবনীতা দেবসেনকে স্মরণ করতে
চাই, “আমাদের পুরুষতান্ত্রিক
সমাজব্যবস্থায় নারী যখন মননসমৃদ্ধ সৃজনের কাজে আসে, তখন সে
জোর করে পুরুষের এলাকায় অনুপ্রবেশ করে। শিল্পের জগতে তার গতিবিধিতে সমাজের সংশয়,
এবং প্রতিরোধ আপনা-আপনিই গড়ে ওঠে। মননজগতে নারী অনধিকারী। অনধিকারীর
শাস্তি আছে। সেই শাস্তির নানা রকমফেরও আছে।
সার্কাস পার্টি ডক্টর জনসন কি আর সাধে বলেছিলেন যে, স্ত্রীলোক কলম ধরলেই তাঁর মনে হয় অহো! কী অদ্ভুত
কৌতুক! ঠিক যেন কুকুরটি পিছনের দুই পায়ে খাড়া হয়ে হাঁটছে! আড়াইশো বছর পরে, এখনও সেই কুকুর তেমনই করে হাঁটছে। স্ত্রীলোকের লেখালেখি ওই সার্কাস
দেখানোর মতো। নকল করা চলন। অনুকরণের খেলা। লেখা তো মননের শিল্প। যুক্তি, বুদ্ধি, মেধা— এ সবই পুরুষের
নিজস্ব সম্পত্তি। নারীর আছে শরীর আর আবেগ। রমণীর রমণযোগ্যতা। নারীও শিল্পচর্চা
করবে? বেশ তো নৃত্যগীতাদি করুক না! নয়ন ভরে দিক, শ্রবণ ভরে দিক, ভরুক হৃদয়, কিন্তু
মনন?
পঞ্চেন্দ্রিয়ের সীমার বাইরে ঝুলছে মননের চাবিকাঠি। ভাষা, যা দিয়ে সাহিত্য গড়া হয়, সেও
তো ইন্দ্রিয়ের বেড়া পেরিয়ে কিছু শব্দের সংকেতের খেলা! কলমে অধিকার মগজের, আর মগজে অধিকার পুরুষের। এমন একটা সাবেকি হিসেব চলে আসছে। কিন্তু, মেয়েরা যখনই কলম ধরে, তখনই সেই হিসেবটা গুলিয়ে যায়।
তাই একটা নিঃশব্দ বাধা, নিঃশব্দ প্রতিরোধ আপনা আপনিই গড়ে
ওঠে। সারা পৃথিবী জুড়েই। কখনও সচেতন, কখনও বা অসচেতন।”
এই অসচেতন পুরুষতান্ত্রিক মনোভাবের কিছু উদাহরণও দিয়েছেন নবনীতা, “মনে হয়, মেয়েদের লেখা ছেলেরা
বড় একটা মন দিয়ে পড়েন না। অথবা, পড়ে ফেললেও সেটা চট করে
স্বীকার করেন না। অনেক দিন আগে আমি লিখেছিলুম, ‘‘প্রায়ই
দয়ালু ভদ্রলোকেরা আমাকে বলেন, ‘আমার মা আপনার লেখার খুব ভক্ত’
কিংবা ‘আমার স্ত্রী আপনার সব বই পড়েন’,
অর্থাৎ, তাঁরা নিজেরা কেউ ওসব পড়েন না।’’
মেয়েদের লেখা মেয়েরাই পড়বে, মেয়েদের গান
মেয়েরাই শুনবে বা মেয়েদের নাচ মেয়েরাই দেখবে, এমন নিয়ম নেই।
‘আমি পুরুষ, আমি আপনাদের লেখা পড়ি না’—
ঘুরিয়ে এটা বলতে কারও সঙ্কোচ হয় না।
মেয়েদের লেখাকে অস্বীকার করবার এটা একটা উপায়। আশাপূর্ণা দেবী
জ্ঞানপীঠ পাবার পরে এক জন যুবক সমালোচক ‘দেশ’-এ লিখেছিলেন, ‘শুনেছি,
তিনি খুব ভাল লেখেন, আমার এখনও অবশ্য ওঁকে পড়া
হয়ে ওঠেনি। কিন্তু, আপনাদের বলব, পড়ে
দেখুন।’ এও এক রকম অস্বীকার করার ধরন। কেন, পড়া হয়নি কেন? ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’ তো না পড়েই বলা হয় ‘পড়েছি’। যেমন, যাকে চিনতে চাই না, পথে
মুখোমুখি হলেও আমরা তাকে চিনি না। এও তেমনই।”
নবনীতা উল্লেখিত ডক্টর জনসনের পরিচয় দুটো কারণে স্পষ্ট করা প্রয়োজন
বলে মনে করছি। এক. ডক্টর জনসন কে ছিলেন, এবং দুই; নারী লেখক সম্পর্কে তাঁর ধারণা। ডক্টর জনসন
১৮শ শতকের বিখ্যাত ব্রিটিশ লেখক, সমালোচক এবং অভিধানপ্রণেতা স্যামুয়েল
জনসন (Samuel Johnson)। তিনি ইংরেজি ভাষার অন্যতম
গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত।
নারীদের লেখালিখি বিষয়ে
তাঁর বিখ্যাত যে মন্তব্যটিকে নিয়ে নবনীতা স্বভাবসুলভ রসিকতা করেছেন, তার উল্লেখ আছে জেমস বসওয়েলের লেখা ‘The
Life of Samuel Johnson’ (১৭৯১) বইতে। মূল বক্তব্যটি ছিল,
"A woman's preaching is like a dog's walking on his hind legs. It is not
done well; but you are surprised to find it done at all."
জনসন যদিও নারীদের প্রচার
বা বক্তৃতা দেওয়ার প্রসঙ্গে কথাগুলো বলেছিলেন, তবে পরবর্তীতে এটি নারীদের লেখালিখির ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হয়েছে। জনসনের
দৃষ্টিভঙ্গি ছিল যথেষ্ট রক্ষণশীল এবং নারীদের সাহিত্যচর্চাকে তিনি তেমন গুরুত্ব
দেবার প্রয়োজন মনে করেননি।
স্পষ্টত নবনীতা তাঁর বক্তব্যে যে সত্যের দিকে আঙুল তুলেছেন তার
ইতিহাস বহুদিনের পুরোনো। যেসময় নারীদের লেখালিখি ছিল নিদারুণ অবহেলার বস্তু। এই
প্রসঙ্গে আবারও একটু পেছনে ফিরে তাকাতে হচ্ছে। আশা করি তাতে বিষয়টি স্পষ্ট হবে-
থমাস পেইন(Thomas Paine: February
9, 1737 – June 8, 1809) এবং মেরি ওলস্টোনক্র্যাফট্ ( Mary
Wollstonecraft: April 27, 1759, September 10, 1797) দুজনেই ছিলেন
অষ্টাদশ শতকের ইউরোপের এনলাইটেনমেন্ট যুগের চিন্তক। এই দুজনের প্রায় কাছাকাছি সময়ে
দুটি বই প্রকাশিত হয়। থমাস দুই খণ্ডে লিখেছিলেন দ্য এইজ অফ রিজন(The Age of
Reason- 1794) এবং মেরি লিখেছিলেন অ্যা ভিন্ডিকেশন অফ দ্য রাইটস অফ
উইমেন A Vindication of the Rights of Woman (1792)। বিষয়বস্তুর
ভিত্তিতে দুটি বইই ছিল অমূল্য। অথচ দুই বইয়ের ভাগ্যে একই সমাদর জোটেনি। থমাস
পেইনের দ্য এইজ অফ রিজন প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে- যার ঢেউ
পৃথিবীর অনেক দেশে আছড়ে পড়েছিল। অন্যদিকে, পশ্চিমের উন্নত যে দেশটিতে বসে মেরি বইটি লিখেন এবং প্রকাশ করেন, সেই ইংল্যান্ডের শিক্ষিত সমাজ সেটা প্রত্যাক্ষান করেন। মেরির বইটিকে
পাঠকের সমাদর অর্জন করতে অপেক্ষা করতে হয়েছিল আরো পঞ্চাশ বছর! নারীর লেখা
মূল্যায়নে পুরুষতান্ত্রিক মনোভঙ্গির প্রয়োগ ছিল সময়ক্ষেপণের বাহানা মাত্র, সেটা বলাই বাহুল্য।
প্রশ্ন উঠতে পারে কেন নারী লেখকের লেখা পাঠ করা পুরুষ পাঠকের জন্য
গুরুত্বপূর্ণ? নারীর
লেখা না পড়লে তাদের কী যায় আসে? এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ নারীর লেখাকে পাশ কাটালে পুরুষদের ক্ষেত্রে নারীর জগৎ দেখার অভিজ্ঞতা
সংকুচিত হয়ে পড়ে। পুরুষের সৃষ্ট সাহিত্যে নারীর যে চিরন্তন ছবি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে-
তা একান্তই পুরুষের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন ঘটে থাকে। অনেকক্ষেত্রে, নারী সেখানে তাদের মনের মাধুরী মেশানো এক রচনা মাত্র। সেই মনগড়া বৃত্তের
বাইরে নারীর বহুমাত্রিক উপস্থাপন অনেকটা অধরা মাধুরী হয়েই বুঝি থেকে যায়। যার
সার্থক রূপায়ন নারীর কলমেই ঘটে থাকে। উদাহরণ হিসেবে, জেন
অস্টেনের প্রাইড অ্যান্ড প্রেজুডিস, টনি মরিসনের সুলা,
বেলাভেড, সিলভিয়া প্লাথের দ্য বেল জার,
চিমামান্ডা এনগোজি আদিচির আমেরিকানা, অ্যালিস
ওয়াকারের দ্য কালার পার্পল ইত্যাদি গাইনোসেন্ট্রিক সৃষ্টি এবং স্রষ্টাদের নাম
বলা যায়। পাশাপাশি অ্যান্ড্রোসেন্ট্রিক সৃষ্টি হিসেবে হারম্যান মেলভিলের মোবি ডিক,
আর্নেস্ট হেমিংওয়ের দ্য ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি, জেমস জয়েসের ইউলিসিস, ফিওদর দস্তয়েভস্কি’র ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট, আলবেয়ার কামু’র দ্য স্ট্রেঞ্জার ইত্যাদির নাম করা যায়। বিশ্বব্যাপী এই দুই শ্রেণি
লেখকের বইয়ের পাঠক যে সমান নন সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। নারীদের জীবনের বিভিন্ন
দিক, সামাজিক বাধা, এবং নারীত্বের
সঙ্গে সম্পর্কিত প্রসঙ্গগুলো আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা গাইনোসেন্ট্রিক
রচনাগুলো পাঠ থেকে পুরুষেরা যদি দূরে থাকেন তাহলে কি আদের জানার ক্ষেত্রে ফাঁক
তৈরি হওয়ার কথা নয়?
বুকার পুরস্কারপ্রাপ্ত ঔপন্যাসিক বার্নার্ডিন এভারিস্টো মেরি অ্যানকে
The Authority Gap বইয়ের এক
সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “আমি বহুদিন ধরেই জানি যে, পুরুষেরা আমাদের সাহিত্য পড়তে আগ্রহী নয়। আমাদের সাহিত্য এমন একটি মাধ্যম,
যার সহায়তায় আমরা কাহিনিকে অনুসন্ধান করি, আমাদের
ধারণাগুলিকে বিশ্লেষণ করি, আমাদের বুদ্ধিমত্তা ও
কল্পনাশক্তির বিকাশ ঘটাই। যদি আমরা নারীদের গল্প লেখি, তাহলে
সেখানে আমরা নারীদের অভিজ্ঞতার কথা বলি। আমরা পুরুষের অভিজ্ঞতার কথাও বলি, তবে তা নারীর দৃষ্টিকোণ থেকে। আর যদি তারা তাতে আগ্রহী না হন, তাহলে এটি অত্যন্ত দুঃখজনক এবং উদ্বেগজনক।” এই
মন্তব্যের ভিত্তিতে মেরি অ্যানের মতামত হলো; যদি পুরুষেরা
নারীদের লেখা এবং তাদের অভিজ্ঞতার গল্প না পড়েন, তাহলে তারা
আমাদের মানসিকতা এবং জীবনযাপনের অভিজ্ঞতাগুলো বুঝতে ব্যর্থ হবেন। তারা পৃথিবীটিকে
একটি একতরফা পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে থাকবেন, যেখানে
পুরুষের অভিজ্ঞতাই হবে মূল। এই সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের সঙ্গে তাদের সম্পর্ককে
প্রভাবিত করবে-সহকর্মী, বন্ধু এবং সঙ্গী হিসেবে। পাশাপাশি,
এটি নারী লেখকদের জন্যও ক্ষতিকারক। তাদের কাজকে প্রাথমিকভাবে
কেবলমাত্র নারীদের দ্বারা উপভোগযোগ্য মনে করা হলে তা মূলধারার চেয়ে গৌণ হয়ে যায়।
তারা কম সম্মান, কম মর্যাদা এবং কম অর্থ উপার্জন করেন।
ঔপন্যাসিক কামিলা শামসি একাধিক পুরস্কারের বিচারকের প্যানেলে ছিলেন
এবং এই বৈষম্যটি নিজে প্রত্যক্ষ করেছেন। মেরি অ্যানের সঙ্গে আলাপচারিতায় তিনি
বলেছিলেন, “নারী বিচারকেরা পুরুষ এবং
নারীদের উভয়ের বইকে প্রস্তাবিত করেন। আর পুরুষ বিচারকেরা প্রধানত অন্যান্য পুরুষের
বইকে প্রস্তাব করেন।” ডলি অ্যালডারটন একজন সফল লেখক। তাঁর
স্মৃতিকথা Everything I Know about Love ২০১৮ সালের সেরা
আত্মজীবনী হিসেবে ন্যাশনাল বুক অ্যাওয়ার্ড জিতেছিল। কিন্তু অন্তত ব্রিটেনে এটি
পুরুষদের কাছ থেকে খুব কমই সাড়া পেয়েছিল। সেই সময় সংবাদমাধ্যম বা পত্রিকার যে
সাংবাদিক তাঁর সাক্ষাৎকার নিতে এসেছেন, তারা সবাই নারী। এবং
এটি, তাঁর কথায়, “আমার লিঙ্গের কারণে
এমনভাবে বাজারজাত, বোঝাপড়া এবং গ্রহণ করা হয়েছিল যেন এটি
অত্যন্ত গৌণ একটি বিষয়। অথচ নারীর অভিজ্ঞতা কোনো গৌণ বিষয় নয়; এটি একটি সার্বজনীন এবং সাধারণ আগ্রহের বিষয়।”
তবে, তিনি যখন
ডেনমার্কে একটি প্রচার সফরে যান, সেই অভিজ্ঞতা ছিল একেবারে
ভিন্ন। তিনি যে পুরুষ সাংবাদিকের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে বসেছিলেন, তাকে বলেছিলেন যে তিনিই প্রথম পুরুষ সাংবাদিক যিনি তার সাক্ষাৎকার নিতে
এসেছেন। “তিনি বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না যে এটি কতটা
অদ্ভুত।” বিশের কোঠার সেই তরুণ ডলির কথায় বিস্মিত হয়ে বলেন,
“তিনি ও তার বন্ধুরা নারী লেখকদের স্মৃতিকথা বা উপন্যাস ঠিক ততটাই
পড়েন, যতটা পুরুষ লেখকদের।” বিষয়গুলো
ভিন্ন হতে পারে। এবং এটি পুরুষদের জন্য সমাধান করা খুব সহজ একটি সমস্যা। তাদের
শুধু নারী লেখকদের বই সক্রিয়ভাবে খুঁজে পড়তে হবে।
যদি পুরুষরা সন্দেহ করেন যে নারী লেখকরা তাদের আগ্রহের বিষয়ে লিখবেন
কি না, তবে তারা প্যাট বার্কারের প্রথম
বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে লেখা বই বা হিলারি ম্যান্টেলের হেনরি অষ্টমের রাজদরবারের রাজনীতি
নিয়ে লেখা বই পাঠের চেষ্টা করতে পারেন। একবার তারা এতে অভ্যস্ত হয়ে গেলে, তারা হয়তো দেখবেন যে এগুলো বিশেষ নারীর গল্প নয়, বরং
মানবিক গল্পে পরিণত হয়েছে—এবং তারা এগুলো উপভোগ করছেন।
পুরুষেরা তাদের দৃষ্টিভঙ্গি ও রুচি প্রসারিত করলে লাভ বৈ ক্ষতি হবে না; বরং কিছু অর্জন করতে পারেন। একটি বই নারী লিখেছেন বা নারীদের সম্পর্কে
বলেই সেটা তাদের জন্য মূল্যহীন নয়। বরং নারী হিসেবে এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকা কেমন,
তা অনুধাবনে লেখাটি তাদের সাহায্য করবে,। তাছাড়া
এটি সহমর্মিতা শেখার প্রথম পদক্ষেপ হতে পারে। এবং এটি হয়তো এমন এক বুদবুদকে ফাটিয়ে
দিতে পারে, যেখানে অনেকে অবচেতনভাবে বাস
করছেন, যা নতুন চিন্তা ও অন্তর্দৃষ্টি অঙ্কুরিত করতে সাহায্য
করবে। শিল্পকলার উদ্দেশ্য কি এটাই নয়?
ঋণস্বীকার:
‘Why do so few men read books by women?’ by MA Sieghart
নারীর কালি-কলম মন নিয়ে; নবনীতা দেবসেন
নারীর লেখা নারীর কথা, দীপা বন্দোপাধ্যায়
নাহার তৃণা
.jpg)

0 মন্তব্যসমূহ