কাশ্মীরের প্রাকৃতিক শোভার নমুনা সচল তথা অচল চিত্রে দেখেছি বহুবার।এক সময় বলিউডের বিখ্যাত পরিচালক যশ চোপড়ার ছবির আমি খুব ভক্ত ছিলাম।তাঁর প্রায় সব ছবিতেই প্রধান নায়ক নায়িকার প্রতিস্পর্ধায় কাশ্মীরী প্রকৃতির একটি বিশেষ ভূমিকা থাকত।সেসব দেখেই প্রথম বুঝি যে জায়গাটি স্বতন্ত্র।অন্য কোনো জায়গার সঙ্গে এর মিল হতে পারে না।যা কিছু তুলনাহীন মহিমাবিশিষ্ট হয়ে এককত্বের অধিকারী,তার প্রতিই আমি ভয়ানক টান অনুভব করি।সেই হিসাবে কাশ্মীরের প্রতি আমার এক তীব্র টান থাকবে,সেটাই স্বাভাবিক।
চোখের ও মনের এই
উদারতার অধিকার নিয়েই কাশ্মীর পৌঁছাই।বন্দেভারতে বসেই একটা সময়ের পর কাশ্মীরী
প্রকৃতির অজস্র দূতেরা দেখা দিতে শুরু করে।ফলে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকতেই হয়
ট্রেনের কাচের বড় জানলায়।দেখতে দেখতে যাই গ্রামের রূপ।লম্বা লম্বা পপলার আর
কিঞ্চিত খাটো উইলো গাছের পাহারায় থাকা ছোট ছোট গ্রাম।পিছনে পাহাড়ের
নজরদারি।গাছপালার ফাঁকে ফাঁকে চেরিরঙের ইউরোপীয় কায়দার বাড়ি।অর্থাৎ গ্রামের লোকের
পয়সার খুব একটা অভাব আছে বলে মনে হয় না।চোখে পড়ে ফসলের ক্ষেতে হিজাব ও ফেরান পরা
মহিলাদের।এই পোশাকই জায়গাটিকে এক প্রকার বিশিষ্টতা দিয়েছে।যত্রতত্র ফেরান বা আবায়া
আচ্ছাদিত নারীপুরুষ চোখকে নতুনত্বের স্বাদ জোগায়।
শ্রীনগর হল শহর,কিন্তু
প্রকৃতির প্রসাদবঞ্চিত নয়।তাই পাকা রাস্তার উপর হুমড়ি খেয়ে আছে চিনার,পপলার,উইলো,পাইন,দেবদারু বা আখরোটের মতো বৃক্ষদল আবার কোথাও জলের উপর সেলাম করার
ভঙ্গিমায় অবনত হয়ে থাকতে দেখা যায় ব্রেমজি
কুলের মতো গাছকেও।এই গাছগুলিকে সারা কাশ্মীর জুড়েই দেখা যায়।দাল লেকের ধারে ধারে
খাঁড়া হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই গাছগুলিকে দেখলে মনে হয় জলে ও স্থলে আনন্দবিনিময়ই এদের প্রধান
কর্তব্য।বারামুল্লা নামক গ্রামের মধ্যে দিয়ে যাবার সময় খেয়াল করেছি এই গাছগুলিতেই
এদের আভিজাত্য।এই জন্য গ্রামগুলিকে কখনোই দরিদ্র মনে হয়নি।প্রকৃতির উদার ঐশ্বর্যে
গ্রামগুলি যেমন দৃষ্টিনন্দন তেমনই অভিজাত ও চিত্তনন্দনও।
শ্রীনগরে নদী
পেয়েছি।সে নদী রবীন্দ্রকাব্যধন্য ঝিলম।নোবেল প্রাইজ পাবার পর রবীন্দ্রনাথ একবার
শ্রীনগরে গিয়েছিলেন।তবে বেশিদিন তিষ্ঠতে পারেননি।বিখ্যাত কবির প্রতি সাধারণের
দর্শনলাভের আকাঙ্ক্ষায় অতিষ্ঠ হয়ে তাঁকে চলে যেতে হয়।তবে এক সন্ধ্যায় গিয়েছিলেন
ঝিলমের তীরে।মাথার উপর দিয়ে একপাঁতি বককে উড়ে যেতে দেখে 'বলাকা'র সেই বিখ্যাত কবিতাটির ভাবনা তাঁকে ভিতরে ঠেলা মারে।সেই কারণেই ঝিলমের
প্রতি আমার এক বিশেষ ঔৎসুক্য ছিল।কিন্তু আজকের ঝিলম সেদিনের মায়ায় আমার মধ্যে জেগে
উঠতে পারল না।বরং ভালো লেগেছে সোনমার্গের সিন্ধু এবং পেহেলগাঁও এ লিদার।সিন্ধু যেন
সদ্যকিশোর আর লিদার যৌবনের ঔদ্ধত্যে ও লাস্যে ভরপুর।সিন্ধুতীরে নির্জনতা পাইনি,তবে নিভৃতি মিলেছে লিদারের কূলে।যৌবনের তীব্রতায় তার যেন ছটফটানির শেষ
নেই।
গুলমার্গের কথা
বলে শেষ করি।সবচেয়ে ভালো লেগেছে গুলমার্গে।প্রকৃতির কী মহিমাময় শোভা!মালিন্য,দূষণ
বা কদর্যতার সাথে তার যেন ন্যূনতম কোনো সম্পর্ক নেই।মানুষের সভ্যতার কলুষ থেকে সে
এখনো সুরক্ষা পেয়ে আছে।গুলমার্গের উপত্যকায় গিয়ে মনে হয়েছে মানুষ জাতিটিকে নিয়ে এই
প্রকৃতির হয়তো কোনো উন্নততর অভিপ্রায় ছিল।
আরো কিছু জায়গা বাকি
রয়ে গেলো।পরেরবার সে শখ মেটানোর চেষ্টা করা যাবে।সে শখ মিটে যাবার পরেও আরেকবার
কাশ্মীর যাবার শখ যে ফুরাবে না সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।যার অদম্য প্রাণশক্তি সে
কখনও পুরনো হয় না।কাশ্মীরের প্রাণের প্রকাশ ঘটে তার ফুলে ফলে আর পাতার রঙে।
প্রীতম বিশ্বাস



0 মন্তব্যসমূহ