সাম্প্রতিক

6/recent/ticker-posts

মহুয়া চৌধুরী: গল্প: স্টেজ রিহ্যার্সাল

 


স্টেজ রিহ্যার্সাল


আমাদের ছেলেবেলায় পাড়ার কমলদাদু ছিলেন বরাবরের নাটক-পাগলমানুষ। এককালে নাকি নামজাদা সব নাটকে অভিনয় করেছেন। হেঁজিপেঁজিনয়। রীতিমতো টিকিট কিনে দূরদূরান্তর থেকে সেই নাটক দেখতে আসত নাকি লোকজন। বিভিন্ন খবরের কাগজ, পত্র, পত্রিকাতে সমালোচকরা যে তাঁর অভিনয়ের কী সুখ্যাতি করত সে কথা বলতে বলতে উজ্জীবিত হয়ে উঠতেন দাদু। একটা ইয়া মোটা ফাইলে সেই সমস্ত হল্‌দে হয়ে যাওয়া কাগজের কাটিং যত্ন করে রাখা থাকত। আমাদের কতবার যে দেখিয়েছেন। বেজায় ধুলো জমে থাকত তাতে। বার করলেই আমাদের হাঁচি হতো।আমাদের পটু বলত,-‘বাব্বা, কত লোকে কত ভালো ভালো সব কথা লিখেছে গো তোমাকে নিয়ে। কৈ এত লোক আছে আমাদের পাড়ায়, আর কাউকে নিয়ে তো কক্ষণও সিকি লাইন লেখাও কোনো কাগজে ছাপেনি। তবে দাদু, তুমি ওসব কাগজ বেশি বার করো না। অনেক পুরনো হয়েছে যদি ছিঁড়ে যায়...আর তো হাজার খুঁজলেও ও জিনিস পাওয়া যাবে না।‘ কথাগুলো বলতে বলতে সে গলায় এমন দুশ্চিন্তার ভাব ফোটাতে পারত কি বলব। কমলদাদু নিজে পাকা অভিনেতা হওয়া সত্বেও পটুর কায়দাবাজি ধরতে পারতেন না,  বরং  খুশী হয়ে আমাদের  চকলেট দিতেন। 

আমাদের পাড়ায় রবীন্দ্রজয়ন্তী উপলক্ষ্যে বা পুজোর সময়ে নাটক হতো। আমরা সবাই তাতে অভিনয় করতুম। আর এইসমস্ত নাটকের আয়োজক, উদ্যোক্তা, পরিচালক একাধারে কমলদাদু। তাঁর উৎসাহ দেখে কে? তিনি রিহ্যার্সালের উপর খুব জোর দিতেন। তখন মেজাজই পালটে যেত তাঁর। এন্তার ধমক ধামক দিয়ে আমাদের ডায়ালগ মুখস্থ করিয়ে, হাঁটাচলার ভঙ্গি ঠিক করিয়ে তবে ছাড়তেন। ভয়ানক খুঁৎখুঁতে ছিলেন এ ব্যাপারে। যতক্ষণ না আমাদের কাজ পছন্দ হতো, ততক্ষণ রেহাই নেই।

বলাবাহুল্য প্রতিবারই আমাদের নাটক চমৎকার হতো।  নাটকের একমাস আগে থেকে কমলদাদু খুব চাপের মধ্যে থাকতেন। শেষে অনুষ্ঠান যখন ভালো ভাবে উতরে যেত সেদিন তাঁর মুখখানা হতো দেখার মতো। সকলে তাঁর ব্যবস্থাপনার প্রশংসা করলে বিগলিত হাসি হেসে তক্ষুনি নিজের সমস্ত ক্রেডিট দুহাতে বিলিয়ে দিতেন আমাদের।

‘যত রিহ্যার্সাল দিবি, তত তোদের আত্মবিশ্বাস বাড়বে। তা সে যে কোনো কাজের ব্যাপারেই হোক না কেন। মনে রাখিস কথাটা।‘ – বারবার আমাদের বলতেন তিনি।

একবার আমাদের পাড়া থেকে কয়কেটি পরিবার মিলে দল বেঁধে বেড়াতে যাওয়া হলো সাঁওতাল পরগনার এক ছোট শহরে। বড়দিনের ছুটি তখন। সব মিলিয়ে দলে ছিলুম আমরা তিরিশ জন। দলের অন্যতম প্রধান সদস্য কমলদাদু। যে কোনোরকম ব্যবস্থাপনায় তাঁর সুখ্যাতি আছে।

আমাদের ছেলেবেলায় বাইরে বেড়াতে গেলে প্রচুর জিনিসপত্র সঙ্গে নিতে হতো। কেউ কেউ মাটির কুঁজোটি পর্যন্ত, কখন কি কাজে লাগে ভেবে নিতে ভুলতেন না। তার ওপর আমরা থাকব পুরো দু সপ্তাহ। জোগাড় যন্ত্র কি কম? হোলডল, সুটকেস, বেতের ব্যাগ, প্ল্যাস্টিকের ব্যাগ, আরও শেষ মুহূর্তে মনে পড়ে যাওয়া অনেক কিছু দরকারী জিনিসের পোঁটলা সমেত বীরবিক্রমে আমাদের বিশাল দলটি, হাওড়া স্টেশনের ভূ ভার বাড়িয়ে যথা সময়ে ট্রেনের অপেক্ষায় গিয়ে হাজির হলো।

কমলদাদু একটা লম্বাটে খেরোর খাতায় সকলের নাম ঠিকানা লিখে সঙ্গে রেখেছিলেন। তখনকার সেই মোবাইল-ল্যাপটপহীন বিশ্বে কাগজ, কলমই ছিল মস্ত বড় ভরসার জায়গা।

কমলদাদু রোলকল শুরু করলেন।

ট্রেনে ওঠার পর হলো দ্বিতীয় দফার রোলকল। দাদুর বুক থেকে যেন একটা পাহাড় নামল। অন্তত তিনি তাই বললেন।

তারপর গন্তব্যে পৌঁছে ভারী মজায় কটা দিন কেটে গেল। এ সমস্ত জায়গায় ছুটি কাটানোর জন্য অনেক বাঙালী এককালে বিরাট বিরাট সব বাড়ি করেছিলেন। কিন্তু ইদানীং দেখাশোনার অভাবে বেশির ভাগ বাড়িরই ভগ্নদশা। তবে কোনো কোনো বাড়ির মালিকেরা আজকাল ছুটি কাটাতে আসা লোকজনদের থাকার জন্য নিজেদের বাড়িগুলো ভাড়া দেন।

এই রকমই একটা প্রকান্ড বাড়িতে আমাদের সকলের থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল। দারুণ আনন্দে ছুটির দিনগুলো কাটল। এন্তার খাওয়া দাওয়া, গল্প, আড্ডা, ঘোড়ার গাড়ি চড়া, ছোট্ট ছোট্ট ঢিপির মতো পাহাড় টপকানো আর সরু সরু নদীর ধারে লাফালাফি করে খেলা। মজার কমতি নেই।

কিন্তু ছুটি শেষ হতে চলেছে।সকলে মিলে এবার ফেরার পালা। ফেরার দু দিন আগে কমলদাদু খুব গম্ভীর হয়ে বললেন,-‘ট্রেন তো ভোর পাঁচটা দশে...তাই না?’

অন্যেরা সায় দিলেন। কমলদাদুর মুখ থেকে গম্ভীর ভাব কাটল না। বললেন,-‘অত ভোরে ওঠা আমাদের দলে অনেকেরই অভ্যেস নেই। ট্রেন মিস করলে ভোগান্তির শেষ থাকবে না।‘ এই পর্যন্ত বলে গলা খাঁকারি দিলেন দাদু। তারপর শেষ কথা বলার ভঙ্গিতে বললেন,-‘ঠিক মতো ট্রেন ধরার একটাই অব্যর্থ উপায় আছে।‘

বলে দম নেবার জন্যে পাঁচ সেকেন্ড চুপ করে রইলেন দাদু। বাকিদের চোখে অপার কৌতুহল। কারণ ওই ট্রেনের উৎকুট্টি সময় নিয়ে সকলের মনেই মেঘের মতো একটা টেনশান ঘনিয়ে আসছিল। বাবা, মা, কাকুরা, কাকিমারা সক্কলে নানা রকম মন্তব্য করেই চলেছিলেন,-‘রাত থাকতে উঠতে হবে বাবা গো’ ‘তার ওপর হাড় কাঁপানো শীত’, ‘খুব তাড়াহুড়ো করে তৈরি হয়ে নিতে হবে’। কেউ কেউ নিজেদের প্রাতঃকৃত্য সারার ব্যাপারেও দুশ্চিন্তায় ভুগছিলেন।

দাদু সকলের মুখের দিকে চোখ ঘুরিয়ে নিয়ে জলদ গম্ভীর স্বরে বললেন,-‘এই ্সমস্যা সমাধানের একমাত্র উপায়টি হলো স্টেজ রিহ্যার্সাল।‘ কারোর বোধগম্য হলো না। দাদু বুঝিয়ে বললেন,-‘স্টেশানটাই হবে আমাদের স্টেজ। আমরা কাল ভোর পাঁচটার মধ্যে সমস্ত ব্যাগ গুছিয়ে রেডি হয়ে স্টেশনে গিয়ে হাজির হব। ট্রেন আসবে পাঁচটা সাতে। তিন মিনিটের জন্য থামবে। ঠিক জায়গায় দাঁড়িয়ে পড়লে, চটপট ট্রেনে  ওঠার জন্য তিন মিনিট যথেষ্ট সময়। একবার এমন রিহ্যার্সাল দিয়ে অভ্যাস করে নিলেই পরের দিন আমাদের কোনো অসুবিধে হবে না।‘

কেউ কেউ ঢোঁক গিলে বলল,পরামর্শটা ভালোই। বেশির ভাগ অবশ্য মৌনতা দিয়ে অপছন্দ বোঝালো।কিন্তু নাট্যবীরের ঝোলাতে প্রচুর যুক্তিতর্ক আছে সকলেরই জানা।তাঁকে তাই আর ঘাঁটালো না কেউ।

পরদিন ভোরের স্টেজ রিহ্যার্সাল জমে কুলফি। জমবে নাই বা কেন? পরিচালক কি যে সে লোক? কমলদাদুর নিখুঁত তত্ত্বাবধানে আগে থেকে বলে রাখা আটখানা ঘোড়ায় টানা টাঙ্গা গাড়ি এসে পৌঁছল দোরগোড়ায়। সময় তখন ভোর সাড়ে চারটে। চতুর্দিক অন্ধকারে ঝুপ্‌সি হয়ে আছে। আলো জ্বেলে সমস্ত মালপত্র গুছিয়ে তোলা হল। নিষ্প্রাণ জড়বস্তুদের পরে সপ্রাণদের পালা। যুদ্ধকালীন তৎপরতায় মুখে টুঁ শব্দটি না করে উঠল সকলে একে একে। এমনকি আমাদের দলের সবচেয়ে ঝগড়ুটে,সম্পর্ক যাদের আদায় কাঁচকলায় সেই  দুই কন্যে বুলি আর পম্পা পর্যন্ত কে কোন দিকে বসবে তাই নিয়ে ঝগড়া করল না ঘুম চোখে। তীক্ষণ দৃষ্টিতে সব দিকে খেয়াল রাখলেন কমলদাদু। সকলে উঠে পড়লে শেষ টাঙ্গাতে উঠলেন তিনি। পনেরো মিনিটের মধ্যে স্টেশনে এসে পৌঁছল সেই টাঙ্গাযূথ।

যথা সময়ে ট্রেন এল। কমলদাদু পাক্কা তিন মিনিট ধরে তাকিয়ে রইলেন নিজের হাতঘড়ির দিকে। ট্রেন ছাড়ল। প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে বেরিয়ে গেল তখন তিনি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলে উঠলেন,-‘সাব্বাশ, ওয়েল ডান।‘ অবশ্য কাকে বললেন কেউ বুঝতে পারল না।

নির্বিঘ্নে স্টেজ রিহ্যার্সাল দিয়ে আমরা আবার অপেক্ষমান টাঙ্গা চড়ে ফিরে এলাম। আগামী কাল এইটুকুই যা তফাৎ হবে। টাঙ্গাওয়ালারা আর আমাদের জন্য অপেক্ষা করবে না। পৌঁছে দিয়েই তাদের কাম ফতে কাল।

সফল স্টেজ রিহ্যার্সালের আনন্দে আমরা ছোটরা আহ্লাদে আটখানা।



পরের দিন ভোর রাত। চারদিকে অন্ধকার। আমরা স্টেশনে এসে হাজির হয়ে দেখি ওমা! কোথায় কি? ওই অকৃতজ্ঞ হাড়-বজ্জাত ট্রেনের লেজটুকু ছাড়া আর কিচ্ছু নজরে পড়ছে না। পলক ফেলতে না ফেলতে সেটুকুও অদৃশ্য হয়ে গেল। মানে হতচ্ছাড়া ট্রেন  এসে পৌঁছেছে,বিশ্রামও নিয়েছে আর তারপরই দে দৌড়!। তিরিশজন নানান বয়সের লোকের তিরিশ জোড়া চোখে নানান রকম অভিব্যক্তি।কমলদাদু মুখ দিয়ে বার বার চূড়ান্ত বিরক্তিসূচক শব্দ করছেন। আর বিড়বিড় করে বলছেন,-‘জীবনে কক্ষণও এমন দেখিনি।অত চমৎকার স্টেজ রিহ্যার্সালের পরেও কিনা শেষে......অপদার্থ...অপদার্থ...সব কটা, নইলে কিনা সমস্ত গুবলেট করে দেয়।‘

 

 


মহুয়া চৌধুরী

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ