
রং
বাজারের ব্যাগটা হাতে নিয়ে বেরোতেই আজ সকালটা অন্যরকম লাগছে পরাণবাবুর। রোজকার চেনা সকালের চেয়ে একটু বেশিই উজ্জ্বল। সূর্যের আলোয় কি কোনো বিশেষ রঙের ছটা? নাকি চোখের ভুল? মনের ভুল?
মনটা আজ সত্যিই ফুরফুরে। যে দলটাকে ভোট দিয়ে এসেছিলেন, সেই দলই আজ রাজ্যের গদিতে। না, পরাণবাবু কোনো দলের পতাকা কাঁধে নেননি কোনোদিন। সাধারণ, নিরপেক্ষ মানুষ। তবু এবার একটা পরিবর্তন চেয়েছিলেন মনে। অন্য দলগুলোর ওপর আস্থা হারিয়েছিলেন। সে কথা বন্ধুমহলে ফলাও করে বলেননি। ভোটটা নীরবেই দিয়েছিলেন, কিন্তু বিশ্বাসটা ছিল সরব।
আজ গিন্নিকে বলেই বেরিয়েছেন, “খাসির মাংস করো তো। ডাক্তারের নিষেধ আছে জানি, কিন্তু বছরে একটা দিন তো জিভেরও উৎসব চাই।”
বাজারের ভিড় ঠেলে মাংসের দোকানের সামনে যেতেই থমকে দাঁড়ালেন পরাণবাবু। বছর পঁচিশ-সাতাশের কয়েকটা ছেলে দোকানিকে ঘিরে ধরেছে। অকথ্য গালাগাল, চোখ রাঙানি, আর শেষে সপাটে হুমকি— “দোকান বন্ধ করে দেব। জানে মেরে দেব।”
পরাণবাবু পা বাড়াতেই পেছন থেকে পরিচিত সুকমলদা হাতটা খপ করে চেপে ধরলেন।
“ওদিকে যাবেন না দাদা। ঝামেলা হচ্ছে।”
“কীসের ঝামেলা?” পরাণবাবু ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলেন।
সুকমলদা গলা নামিয়ে ফিসফিস করলেন, “আরে দাদা, তোলাবাজদের হুজ্জুতি। রোজকার ব্যাপার।”
পরাণবাবু চারপাশে তাকালেন। জনা দশেক লোক দাঁড়িয়ে আছে। কেউ চুপচাপ দেখছে, কেউ মোবাইলে ভিডিও করছে। কিন্তু কেউ এগোচ্ছে না। যেন এটা সিনেমার দৃশ্য, আর তারা নীরব দর্শক।
একটা অদ্ভুত রাগ মাথায় চড়ে বসল। আজকের সকালটা তো অন্যরকম হওয়ার কথা ছিল। পরিবর্তনের সকাল। পরাণবাবু সুকমলদার হাত ছাড়িয়ে সোজা এগিয়ে গেলেন।
ছেলেগুলো ওনার দিকে কটমট করে তাকাল। বয়স্ক, ভদ্রলোক, চোখে চশমা — হয়তো ঝামেলা বাড়িয়ে লাভ নেই ভাবল। কোনো কথা না বলে পাশ কাটিয়ে বাইকে স্টার্ট দিয়ে ধুলো উড়িয়ে চলে গেল।
মাংসের দোকানি তখনও কাঁপছে। ভয় আর রাগ মেশানো একটা দলা গলায় আটকে আছে। পরাণবাবুকে দেখে কোনোমতে সামলে নিয়ে জিজ্ঞেস করল, “কতটা দেব বাবু?”
পরাণবাবু তখনও ফুঁসছেন। “ওদের রোয়াব এখনও আছে? কালকের রেজাল্টের পরও? ভোটে এমনভাবে গো-হারা হেরে যাওয়ার পরেও লজ্জা নেই? নতুন সরকার তো এসে গেছে!”
দোকানি এবার ফ্যাকাশে একটা হাসি হাসল। মাংসের ছুরিটা ন্যাকড়ায় মুছতে মুছতে বলল, “বাবু, ভুল করছেন। ওরা হারেনি। ওরা জিতে আসা দলেরই লোক। কালকের জয়ের খুঁটির জোরটা আজ সকালেই দেখিয়ে গেল।”
পরাণবাবুর হাতের বাজারের ব্যাগটা হঠাৎ ভারী লাগল। সকালের উজ্জ্বল রংটা কেমন ফ্যাকাশে হয়ে গেল চোখের সামনে।
দোকানি মাংস ওজন করতে আপন মনে বলল, “আসলে বাবু, ব্যালটে কোনো রং হারে, কোনো রং জেতে। কিন্তু রাজনীতির রং একটাই... ক্ষমতার রং একটাই। আর সে রং পাল্টায় না। শুধু হাত পাল্টায়।”
পরাণবাবু চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন। হাতে খাসির মাংসের প্যাকেট। আজ আর উৎসবের স্বাদ পেলেন না। বুঝলেন, তিনি যে পরিবর্তনটা চেয়েছিলেন, সেটা ব্যালট বাক্সে ছিল, রাস্তায় নামেনি এখনও।
বাড়ির পথে পা বাড়ালেন। সকালের রোদটা আর উজ্জ্বল লাগছে না। মনে হচ্ছে, সব রংই আসলে ধূসর।


0 মন্তব্যসমূহ