মহুয়া চৌধুরী/জুন'২০২২/পর্ব-৫

 


অলেখা অধ্যায়

পর্ব-৫


বিংশ অধ্যায় 


ইন্দ্রপ্রস্থের রাজপুরীতে খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল সেই সংবাদঅন্ধ রাজা ধৃতরাষ্ট্র দ্যুতক্রীড়ায় আমন্ত্রণ জানিয়েছেন জ্যেষ্ঠ পান্ডব যুধিষ্ঠিরকেবিষণ্ন মুখে বিদুর বললেনধৃতরাষ্ট্র ও পান্ডুর বৈমাত্রেয় ভ্রাতা তিনিদাসীপুত্র, তবু ধীমান ন্যায়বান এই ব্যক্তি রাজগৃহে পরম সম্মানিততিনি ধীর স্বভাবের কিন্তু স্পষ্টভাষীঅন্যায়ের বিরুদ্ধে সতত প্রতিবাদীকুটিল ও ক্রুর স্বভাবী দুর্যোধনের অন্যায্য উক্তির প্রতিকূলে দৃঢ় অমত প্রকাশ করে থাকেন বলে দুর্যোধন তাঁর প্রতি বিদ্বেষভাবাপন্ন

বিদুরের মুখ থেকে জানা গেছে, এক পরম রমণীয় সভাকক্ষ নির্মিত হয়েছে নাকি এই দ্যূত ক্রীড়া উপলক্ষ্যেধৃতরাষ্ট্রের বিশেষ অনুরোধ সকল পান্ডবভ্রাতারা যেন পত্নীগণসহ আসেন হস্তিনাপুরেকারণ এ তো ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয় শুধুই, প্রকৃত প্রস্তাবে এ এক পারিবারিক মিলনোৎসব

আজ ইন্দ্রপ্রস্থে রাত্রি যাপন করবেন বিদুরএকটি নিরালা কক্ষে তিনি বসেছেনসঙ্গে রয়েছেন যুধিষ্ঠির ও নকুলস্তব্ধ চারিদিকতাঁকে খুব উদ্বিগ্ন ও অন্যমনস্ক দেখাচ্ছে“ঈর্ষাঈর্ষাবুঝলে যুধিষ্ঠির, প্রবল ঈর্ষায় মানুষের চেহারা পর্যন্ত বদলে যায়তুমি না দেখলে বিশ্বাস করবে না, দুর্যোধনের দেহের উজ্জ্বল গৌর বর্ণ এখন একেবারে ম্লান হয়ে গেছেচোখের তলায় কালিমা

“ঈর্ষার মৌলিক সত্য এই যে, ভোগ্য যা কিছু, প্রত্যেকেই তার সর্ব বৃহৎ ভাগ দাবি করে ম্লান মুখ যুধিষ্ঠিরের

“কিন্তু বাস্তবে এই দাবি অলীক যুধিষ্ঠিরযোগ্যতম ব্যক্তিই লাভ করে শ্রেষ্ঠকেঈর্ষায় মনের সমতা নষ্ট হয়নষ্ট হয় যুক্তিবোধওদুর্যোধন ক্রুর ও খল একাধারেপ্রকৃত প্রস্তাবে সে এক তস্কর

“ভ্রাতৃগণ বাদে কাউকে বলিনি এতকাল, একটি বার্তা জানাই আজ হে তাতরাজসূয় যজ্ঞের পরে পিতামহ ব্যাসদেব এসেছিলেন এ ভবনে

“তাই নাকি? কোনো বিশেষ কারণ ব্যতীত নগরে তো তিনি পদার্পণ করেন না”- কৌতুহলী হয়ে জিজ্ঞাসা করেন বিদুর

“সত্যদ্রষ্টা তিনিএক নির্মম সত্য প্রকাশ পেয়েছে তাঁর মুখেদুর্যোধনের পাপে এবং ভীমার্জুনের মহাশক্তির প্রকোপে শীঘ্রই ভারতভূমি ক্ষত্রিয়শূন্য হবেসেই থেকে আমার মনে শান্তি নেই তাতজানি মহাকালের বিধান অতিক্রম করা অসম্ভবতাই এখন বিষণ্ণ প্রতীক্ষাচতুর্দিকে দেখি শুধু ধ্বংসের চিত্রমালা”- অতুল ঐশ্বর্যের মধ্যে বসে নিঃস্ব ভিখারির মতো উচ্চারণ করেন মহারাজ যুধিষ্ঠিরআনত নয়নস্তব্ধ হয়ে বসে থাকেন নকুলতাঁদের প্লাবিত করে বয়ে যায় বিষাদ স্রোত 

বিদুর কিছুক্ষণ স্তম্ভিত হয়ে রইলেনএই মহাভয়ের ইঙ্গিতই তো পেয়েছেন তিনিলক্ষ্য করেছেন দুর্যোধনের বাক্যে, আচরণে নিহিত রয়েছে এক গূঢ় অভিসন্ধিতিনি কাতর ভাবে দুর্যোধনের হাত দুটি ধরে বললেন,-“বৎস! আমি সতত এই অসার অক্ষক্রীড়ার বিরুদ্ধেআপন অভিজ্ঞতায় দেখেছি, এর ফলে ধনক্ষয়, কলহ, সর্বনাশের উৎপত্তি হয়ভেঙে খান খান হয়ে যায় সংসারকিন্তু ধৃতরাষ্ট্র আমার প্রভুতাঁর নির্দেশ অমান্য করতে পারি নাতাঁর আদেশেই তোমাদের আমন্ত্রণ জানাতে এসেছি, কিন্তু আমন্ত্রণ বাক্য উচ্চারণ করতে বড় কুণ্ঠা জাগছেতাই বলি, ধীর বুদ্ধির অধিকারী তুমিসুবিবেচনা অনুযায়ী যা উচিত বোধ হয়, তাই কর

“দ্বিতীয় উপায় নাই তাত! চুম্বক যেমন লৌহকে আকর্ষণ করে, তেমনি নিয়তি আকর্ষণ করছে আমাদের প্রবল বেগেতাত, আপনি ভ্রাতা দুর্যোধনকে বলবেন, যুধিষ্ঠির অতি দীন ব্যক্তি, তার আপাত দৃষ্ট সকল ঐশ্বর্য প্রকৃত প্রস্তাবে অলীকযুধিষ্ঠির, রাজা দুর্যোধনের ঈর্ষা ও ক্রোধের যোগ্য নয়পিতামহ ব্যাসদেবের কথা শুনে পর্যন্ত যুধিষ্ঠির অঙ্গীকার করেছে সে কখনও কারোর প্রতি কঠিন বাক্য উচ্চারণ করবে নাজীবনের সর্ব ক্ষেত্রে সমদর্শী হবেকি পুত্র, কি ভৃত্য, কি করদ রাজ্যের রাজাগণ সকলের প্রতিই সে পক্ষপাতশূন্য আচরণ করবেহ্যাঁ তাত, যুধিষ্ঠির নির্দ্বিধায় স্বীকার করছে যে, সে যুদ্ধ ভয়ে ভীতএ ভয়ে অগৌরব নাই হে মহামতিযুদ্ধ রক্তলোলুপ হিংস্র পশুর সমানতার চিত্ত নাই, বুদ্ধি নাই, ন্যায় অন্যায় বিবেচনা নাইআছে শুধু অন্ধ ক্ষুধানিরীহ বেতনভোগী সৈন্যদের রক্ত, মাংসে তার ক্ষুন্নিবৃত্তিসৈনিকের পরিজনগণের অবিরল অশ্রুধারায় সে আচমন করেসেই মহা সর্বনাশকে আহ্বান করার মধ্যে যুধিষ্ঠির তিলমাত্র পৌরুষও দেখে না”- তাঁর কণ্ঠস্বর আবেগে কম্পিত হয়বিদুর মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন এই প্রিয় ভ্রাতুষ্পুত্রটির দিকেনূতন রূপে যেন দেখলেন তাকে আজপ্রজ্ঞার নম্র আলো উজ্জ্বলতর করেছে তার মুখশ্রীকেনকুলের চোখের দৃষ্টি সহসা বাষ্পাচ্ছন্ন হয়ে ওঠেতিনি জানেন অগ্রজের অদৃশ্য মানস-তরঙ্গ, সর্বদাই তাঁকে স্পর্শ করে থাকেআরো একজন বোঝে তাঁকেসে করেণুমতীতার মনের একটি উদার আকাশ পট আছেঅবন্ধনা সুবাতাস বয়ে যায় সর্বদাঅকপটে তাঁরা পস্পরের মধ্যে বিনিময় করেন কত স্মৃতি, কত ক্ষোভ, কত ভাবনাপতি-পত্নীর সামাজিক সম্পর্ক অতিক্রম করে তাঁরা  হয়ে উঠেছেন বন্ধুযার বিচ্ছেদ অসহ, তাকেই তো বলে বন্ধু

      

 একবিংশ অধ্যায়   

“কাল প্রভাতেই আপনারা যাত্রা করবেন হস্তিনাপুরের উদ্দেশে?” বিমর্ষ স্বরে করেণুমতী বলেদ্রৌপদীসহ পান্ডুপুত্রদের অন্য পত্নীরা সঙ্গে গেলেও, করেণুমতী যাবে নাগর্ভিণী সেতার শারীরিক অবস্থার কথা ভেবে, জননী কুন্তী নিষেধ করেছেন তাকে যেতে  

“হ্যাঁ প্রথম প্রহরের মধ্যে”- নকুল উত্তরে বলেন,-“ জ্যোতিষবিদ গণনা করে দেখেছেন শুভক্ষণ নাকি তখনইতারপর

“আপনি বিশ্বাস করেন, শুভক্ষণ, অশুভক্ষণ?” মৃদু স্বরে প্রশ্ন করে করেণু

“বিশ্বাস অবিশ্বাসের সঙ্গে সংশ্রব নাই, এ শুধু এক বহুকাল ধরে প্রচলিত রীতি স্নিগ্ধ হাসি নকুলের মুখে

“সকল রাজাই শুভ মুহূর্ত দেখে যুদ্ধযাত্রায় বেরন, তবু কেউ বিজয়ী হন, কেউ বা পরাজিতশঙ্খধ্বনি, মন্ত্রোচ্চারণ, ললাটে চন্দন বিন্দু এঁকে দেওয়া, এগুলি কি সত্যই নিয়ন্ত্রিত করে মানুষের সাফল্য আর পরাভবকে? বলুন আর্যপুত্র-আপনার মনে হয় না কি?”- করেণু ক্রমশ উত্তেজিত হয়ে ওঠে

“না করেণু, ভবিষ্যৎকে নিয়ন্ত্রিত করে অতীতবর্তমান এ দুই কালের মধ্যে একটি ক্ষুদ্র যোগাযোগ বিন্দু মাত্রনিয়ত জন্মায়নিয়ত ধ্বংসপ্রাপ্ত  হয়অতীত প্রসব করে তাকে আর  ভবিষ্যৎ অবিরত ভক্ষণ করে

জানালার বাইরে বাতাস আজ উত্তাল হয়ে উঠেছেহানা দিচ্ছে স্তব্ধ নিশীথের শয়ন ঘরেউড়ে এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে তাঁদের শয্যা আস্তরণী, বসনপ্রদীপ নিভে গেছেনকুল দৃঢ় ভাবে বেষ্টন করে আছেন গর্ভিণী পত্নীকেতাকে স্নেহের সঙ্গে শদ্ধাও করেন তিনিএই মুহূর্তে তিনি যদি দিব্য চক্ষুষ্মান হতে পারতেনসময়কে বিদীর্ণ করে দেখে নিতে পারতেন ভবিষ্যৎকে? কখনও কখনও তিনি যে ক্ষমতা প্রাপ্ত হনক্ষণিকের জন্যআবার বিস্মৃতির আঁধার ঘিরে ধরে তাঁকে

নকুল জানেন স্পষ্ট উচ্চারণে না বললেও ভ্রাতা ভীম নিজেকে মনে করেন ধরিত্রীর শ্রেষ্ঠ বীরতাঁর আচরণে ফুটে ওঠে সে অহংকার! নকুলের ঠোঁটের কোণে বিদ্রূপের হাসি জাগেকে আছে সেই মহাবীর যে স্তব্ধ করে দিতে পারে সময়ের প্রবাহ! এখনকার এই মনোরম কালবিন্দুতে যদি স্থির হয়ে থেকে যেত জীবন? এই সুন্দর রাত্রিটিতে?  তবে কি হোত? গতানুগতিকতায় কি  বিস্বাদ হয়ে উঠত সকল অনুভব? কত প্রশ্ন আলোড়িত করছে নকুলকেএকটি দীর্ঘশ্বাস পড়েঅসীম এ সৌরলোককাল অনাদি অনন্তমানুষ কখনই চরম প্রশ্নের উত্তর পাবে না

সহসা তিনি দৃঢ়বদ্ধ করেন হাতের মুষ্টিযেন এই রাত্রিটিকে ধরে রাখবেন আপন মুঠিতেপর মুহূর্তেই হেসে ফেলেন নিজের বালসুলভ ভাবনায়শিথিল হয়ে যায় করেণুকে বেষ্টন করে রাখা তাঁর বাহুপাশ

করেণু নিজের ক্ষুদ্র করতল রাখে নকুলের গ্রীবায়অন্ধকারে নকুল অনুভব করেন শীতল হয়ে রয়েছেতিনি নিজের হাতের মৃদু ঘর্ষণে প্রিয় পত্নীকে দিতে চান যেন প্রাণের উত্তাপহঠাৎ সংকোচে অতি মৃদু স্বরে করেণু বলে,-“আর্যপুত্র এখন কি কিছু দেখছেন? আপনাদের হস্তিনাপুরে যাত্রার শেষে কি অপেক্ষা করে রয়েছে? কোনো বিপদ কি?” তারপর ঈষৎ অস্থির ভাবে সে বলে,-“প্রয়াস করুন সে দর্শনেরঋষিরা যে কত প্রক্রিয়ার কথা বলেন, মনঃসংযোগ, ধ্যানকিংবা আপনার ষষ্ঠেন্দ্রিয় কি বার্তা দিচ্ছে--”বড় অসহায় লাগে তার নিজেকেসে নির্ভর করতে চায় পতির অলৌকিক শক্তির উপর

“আমি চালনা করতে পারি না সে ক্ষমতাকেমাঝে মাঝে নিমেষের জন্য সে ক্ষমতা শুধু স্ফুরিত হয় শুনেছি প্রদীপ শিখার মতোআবার নিভে যায়”-

মধুর মতো বিন্দু বিন্দু মমতা যেন ক্ষরিত হয় নকুলের হৃদয় থেকেএই প্রিয় নারীর শরীরের নিভৃতে শ্বাস নিচ্ছে তাঁর সন্তানজ্যেষ্ঠ তাত ধৃতরাষ্ট্রের আহ্বানে কাল যাত্রা করবেন তাঁরা দ্যূতসভায় যোগ দিতেঅগ্রজ যুধিষ্ঠির ও মাতুল শকুনির মধ্যে হবে দ্যুতক্রীড়াশকুনি অতি ধুরন্ধরএ খেলায় দক্ষপান্ডব ভ্রাতারা জানেন এ হবে এক অসম প্রতিদ্বন্দ্বিতাঅগ্রজের এই একটি মাত্র নেশাকিন্তু তত নিপুণতা নেইঅবশ্য দ্যুতক্রীড়ার আমন্ত্রণ অস্বীকার করা রাজধর্মের বিরোধীইচ্ছা না থাকলেও যুধিষ্ঠিরকে যেতেই হোত নিজের সম্মান রক্ষার জন্যবিকর্ণের গোপন পত্রের কথা মনে পড়ে গিয়েছিল নকুলেরতার পত্রের বক্তব্যের সঙ্গে মিলে গেছে ক্ষত্তা বিদুরের ভাবনাও

এই মহার্ঘ মানব জীবনকে কেন আমরা সতত বিনষ্ট করি নিজেদের চিন্তা ও কর্ম দ্বারা? নকুল, করেণুর নাভিতলে হাত রেখে শিহরিত হনঅজাত শিশুটি, চঞ্চল হয়ে উঠেছেআন্দোলন জেগেছে মাতৃগর্ভেঅন্ধকারে মৃদু শব্দ করে করেণু উদ্বেগ ভুলে সুখের হাসি হাসে

আর নকুল সহসা নিজের বক্ষে হাত রাখেনভুলে গিয়েছিলেনসঞ্চিত পাপের বোঝা যে তাঁকেও ভারাক্রান্ত করে রেখেছেইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায়, সকল যোদ্ধৃকেই বহন করতে হয় সেই পাপ-ভারদুটি বিস্ফারিত কিশোর চক্ষু নিষ্পলক তাকিয়ে থাকে অন্ধকার ভেদ করেএই তো সেদিনরাজসূয় যজ্ঞের সূচনায় অগ্রজ যুধিষ্ঠিরের অনুমতিক্রমে, তাঁরা চার ভাই চারদিকে বেরিয়েছিলেন দিগ্বিজয় যাত্রায়অর্জুন উত্তরে, ভীম পূর্বে, সহদেব দক্ষিণে আর নকুল পশ্চিমেস্পষ্ট মনে পড়ে যাত্রা কালে, পাঞ্চালীর আনন্দে, গৌরবে উজ্জ্বল অপরূপ সে মুখখানিস্বামীদের মঙ্গল কামনায় আপন হাতে বিজয় তিলক এঁকে দিয়েছিলেন প্রত্যেকের ললাটেঅজস্র সৈন্যের সিংহনাদে, রথ চক্রের ঘূর্ণন শব্দে মুখরিত হয়ে উঠেছিল চতুর্দিক

নকুল প্রথমে রোহিতক দেশে উপস্থিত হয়েছিলেনমনোরম সে দেশ ময়ূর জাতির বাসভূমিধনধান্যে পূর্ণ, গোসম্পদে সমৃদ্ধিশালীনগরীতে অজস্র সুরম্য প্রাসাদএই শান্তিময় স্থানে মহা বিপর্যয়ের মতো উপস্থিত হয়ে নকুল রাজকর গ্রহণের দাবি ঘোষণা করলেনময়ূরগণ মহাবীর ও শস্ত্রনিপুণসম্মান রক্ষার জন্য প্রাণপণে যুদ্ধ করল তারারক্তস্রোত, আহত পশু ও মানুষের আর্তনাদে ভয়াল রণভূমি হয়ে উঠল সেই শান্ত দেশযুদ্ধব্যবসায়ী ছাড়াও স্বভূমি রক্ষার জন্য দলে দলে যোগ দিয়েছিল সে দেশের বালক, কিশোররাওঅনভিজ্ঞ তারাতাঁর সুশিক্ষিত সৈন্যদলের মতো নৈপুণ্য কোথায় তাদের! তবু কি পরাক্রম!নিশ্চিত মৃত্যুকে কি অনায়াসে অগ্রাহ্য করে দলে দলে এগিয়ে এসেছিল স্বদেশ রক্ষার্থেবিস্মিত হয়েছিলেন নকুলযুদ্ধের শেষ দিনে, অজস্র ক্ষয়ক্ষতির পরে ময়ূরগণের শক্তি যখন প্রায় নিঃশেষিত, তখনই শুধু পরাভব স্বীকারের বার্তা ঘোষণা করেছিল তারাহৃষ্টমনে নকুল ময়ূর-প্রধানের শিবিরের পথে চলেছিলেনসহসা একটি মাত্র অশ্বারোহী রণহুঙ্কার দিয়ে, নকুলের পথরোধ করলনকুল দেখলেন সুকুমার মুখের এক বালকময়ূরগণ প্রকৃতির বিধানে বলশালী দেহের অধিকারীএই বালকও দীর্ঘকায় ও সুদেহীস্পর্ধিত তার মুখের ভাবহাতে খোলা তরোয়ালতার মুখে রণহুঙ্কার বড় কৌতুকজনক মনে হয়েছিল নকুলেরউচ্চ স্বরে হেসে উঠলেন তিনি “পথ ছাড়ো ওহে বালকআপন গৃহে ফিরে যাওতোমার জননী এতক্ষণ তোমাকে না দেখে নিশ্চয় ব্যাকুলা হয়ে উঠেছেনদুগ্ধপান করে, কন্দুক নিয়ে খেলা কর বরংএ তরবারি বালকের খেলার বস্তু নয়”- হেসে উঠল নকুলের অনুচরের দলওএমন উপহাসে রাগে লাল হয়ে গেল বালকের মুখ“রে তস্কর, পরের সম্পদ অপহরণ করতে এসেছিসআমি ঘৃণা করি তোদেরআর এক পাও অগ্রসর হতে দেব না”- তলোয়ার উঁচিয়ে ধরল সে

বিস্মিত হয়ে তাকালেন নকুল  ওকি নিজের পরিণাম না বুঝে এমন কথা বলছে? একটু সমীহও এল যেন তার প্রতিসময়ে সামান্য ইতস্তত করছিলেন তিনিআর সেই মুহূর্তেরও ভগ্নাংশ সময়ে বালক উন্মুক্ত তলোয়ার আস্ফালন করে নিজের অশ্বকে চকিতে তাঁর দিকে চালনা করলনকুলের সামান্য বিভ্রান্তিতে তলোয়ারের আগা এসে বিদ্ধ হোল তাঁর চিবুকেক্ষত গভীর না হলেও তাঁর মুখ ও গলদেশ নিমেষে রক্তে লাল হয়ে উঠলআপন রক্ত দর্শনে ভীষণ ক্রোধে নকুল আত্মহারা তখনগর্জন করে নিজের আক্রমনোদ্যত অনুচরদের উদ্দেশে বললেন,-“থামো, এ অর্বাচীনকে আমি নিজ হাতে নিপাত করব”- পরমুহূর্তেই এক দ্রুত অসম যুদ্ধে বালকের ছিন্ন মুন্ড ভূপতিত হোল তার মৃত অশ্বের পাশেরক্ত হ্রদে ভেসে রয়েছে যেন সে মুন্ডতবু বিস্ফারিত হয়ে তার উন্মুক্ত দু চোখনকুলের মনে হোল তখনও প্রবল ঘৃণা বিচ্ছুরিত হচ্ছে সেই স্থির দৃষ্টি থেকেহঠাৎই তীব্র বমন বেগ এল নকুলের

ভুলে গিয়েছিলেনতারপর আরো কত তুমুল যুদ্ধশৈরীষক, মহেত্থ, দশার্ণ, শিবি, ত্রিগর্ত, অম্বষ্ঠএকের পর এক দেশ জয়কত ছিন্ন অঙ্গের স্তূপ, আর্তনাদ, রক্তস্রোত, অস্ত্রের ঝনৎকারসকল যুদ্ধের স্মৃতি- চিত্রমালা একই! মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় সববহু বিজয় লাভের শেষে ইন্দ্রপ্রস্থে ফিরে আসেন চতুর্থ পান্ডবসহস্র হস্তি তাঁর জয়লব্ধ ঐশ্বর্য বহন করে অতিকষ্টে

কিন্তু আজ হঠাৎ করেণুর জঠর স্পর্শ মাত্র সেই বালক হননের স্মৃতি কেন জেগে উঠল! সুদূর জনপদের কোন অনাম্নী নারী বহন করেছিল একদা সেই উদ্ধত বালককে আপন গর্ভেবালক বলেছিল তস্করক্রমাগত প্রতিধ্বনিত হতে হতে সে শব্দ ব্যাপ্ত হয় নিশীথ চরাচরেতস্কর তস্করতস্কর--                          

সহসা রাজপ্রাসাদের প্রাকারের বাইরে চিৎকার করে কেঁদে ওঠে এক রমণী কণ্ঠ “কে? কার কান্না?” চমকিত হয়ে বলেন নকুল

“ও উন্মাদিনীআমি জানি তাকেআপনাদের দিগ্বিজয় যাত্রার সময়ে আপনারই সৈন্যদলে ছিল ওর একমাত্র পুত্রদশার্ণ যুদ্ধে নিহত হয়সেই থেকে সন্তান শোকে উন্মাদিনী হয়ে উঠেছে ওই রমণীপথে পথে ঘোরে একাকিনী

যুদ্ধ কত প্রাণ যে গ্রাস করেঅন্ত নাই তাররাজাগৌরব প্রতিষ্ঠা পায় শত সহস্র প্রজার প্রাণের বিনিময়েকত রক্ত ও অশ্রুস্রোত বয়ে চলেবড় বিলম্বে এই বোধ এল  পিতৃব্য বিদুর দুর্যোধনকে তস্কর  বলেছিলেনকিন্তু হায় তাত, আমরা প্রতিটি ক্ষত্রিয় নৃপই কি তস্কর নই? পরস্বাপহারী সকলেইবহু প্রাণের বিনিময়ে এ প্রাসাদে সঞ্চিত মহার্ঘ রত্নরাজি কি অনর্থক মনে হয় আজ! আনত মুখে ভাবেন নকুল

আরো একবার আর্ত স্বরে কেঁদে ওঠে উন্মাদিনী নারীঅন্ধকারে নিজের ওষ্ঠ, অধর, নাসিকা, চক্ষু, গ্রীবাদেশ ছুঁয়ে ছুঁয়ে যান নকুলব্যাকুল প্রশ্ন করেন নিঃশব্দে নিজেকেইতিনিও কি তবে দুর্যোধনেরই প্রতিমূর্তি! ভ্রাতাদের মুখে, তাঁর পরিচিত প্রতিটি ক্ষত্রিয় নরপালের মুখে, গভীর আতঙ্কে তিনি দুর্যোধনকেই প্রত্যক্ষ করেনলোভ, আগ্রাসী লোভ শুধু সেই সব মুখেএক দুর্যোধন বহুধা হয়েছে তবে? আজ কে কাকে তস্কর বলে?     

 দ্বাবিংশ অধ্যায়

পান্ডবদের দ্রুতগামী অশ্ববাহিত রথগুলি, হস্তিনাপুরের দিকে যাত্রা করলইন্দ্রপ্রস্থ প্রাসাদের অলিন্দ থেকে করেণুমতী দেখছিল অনুচরীদের সঙ্গেঅশ্বক্ষুরের আঘাত উড়ছিল ধূলার ঝড়ক্রমশ অস্পষ্ট হতে হতে মিলিয়ে গেল তার দৃষ্টিসীমার বাইরেআর তখনই সে অনুভব করল, তার শরীরে মৃদু অস্বস্তিভয় পেল সেকেমন অন্য রকম কিছু “কি যেন হয়েছে আমারভাল লাগছে না”- বলল সে “কুন্তী মায়ের কাছে গিয়ে বলএ কি হোল আমার!”- তার সহচরীরা দৃষ্টি বিনিময় করে হাসল  

জননী কুন্তীর মুখেও মৃদু হাসি ফুটে উঠলতিনি আশ্বস্ত করলেন বধূকেতাঁর  নির্দেশে ওরা তাকে নিয়ে গেল প্রসব কক্ষেপ্রশিক্ষিত ধাত্রীকে সংবাদ দেওয়া হোলঅস্বস্তি বাড়ছিল ক্রমাগত

এক সময়ে শুরু হোল তীব্র যন্ত্রণাধাত্রীর নির্দেশানুসারে, সে নিঃশব্দে সহ্য করতে লাগল প্রবল সেই যন্ত্রণাধাত্রী বলেছিল আর্তনাদ করলে প্রসব হতে অধিক সময় লাগেকি দীর্ঘ এই প্রসব বেদনার কালঅপরাহ্নবেলায় সব যন্ত্রণার অবসানে সে জন্ম দিল একটি সুন্দর পুত্র সন্তানেরসে আচ্ছন্ন হয়ে যেতে যেতে শুনতে পেল, কে যেন বলছে,-“দেখ দেখ চক্ষু দুটি অবিকল যেন আমাদের চতুর্থ কুমারের মতো কি অনাবিল আনন্দ আর স্বস্তি তার সর্বাঙ্গেকোনো উদ্বেগ নাই এই মুহূর্তেক্রমশ সে ডুবে যেতে লাগল অতল দীঘিতে শান্তির অবগাহনের মতো গাঢ় ঘুমে

দিন ও রাত যায়, চন্দ্র সূর্যের নিয়মেসূতিকা গৃহ থেকে বেরনোর দিন কবে, সে হিসাব নাই তারএ বিশ্বের শ্রেষ্ঠ বিস্ময়ে সে এখন আবিষ্টপ্রাণ থেকে প্রাণের সৃষ্টি, এই আনন্দময় রহস্য অশ্রুত সঙ্গীতের মতো ধ্বনিত হয় তার চেতনায়নূতন এক প্রাণ কণিকানিজের গভীরে বহন করেছিল যখন, তার স্ফীত হয়ে ওঠা উদরের মধ্যে ঘন ঘন আন্দোলনে যে নিজের অস্তিত্ব ঘোষণা করতকি অসহায় এ শিশুবিশ্ব সংসারে অন্য কোথাও তার খাদ্য নাইসঞ্চিত হয়ে রয়েছে শুধু মাতৃস্তনেক্ষুধায় চিৎকার করে কাঁদে শিশুধাত্রী তখনই করেণুর স্তনে শিশুর মুখটি সংলগ্ন করে দেয়শিশুর কোমল ঠোঁট উদ্‌গ্রীব হয়ে ওঠে ক্ষুন্নিবৃত্তির জন্য

একটি প্রাণ ক্রমশ পুষ্ট হয়ে উঠছে তার স্তন্যদুগ্ধেকি অপূর্ব অনুভূতি একএখন সমগ্র জগৎ তার সূতিকা গৃহের দুয়ার প্রান্তে পড়ে থাকেভিতরে প্রবেশ করতে পারে নাঘুমহীন রাত্রে বিভোর হয়ে সে পুত্রের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকেএমন সুন্দর শিশু সে আগে কখনও দেখেনিএ গৃহে এখন এক জননী, এক শিশু ব্যতীত আর কেউ নাইধাত্রীগণকে তার ছায়ার মতো মনে হয়তারা এ শিশুর পরিচর্যার সহায়িকা মাত্রবিশেষ কথা বলে না তারাওকরেণুমতী যদি লক্ষ্য করত তবে বুঝতে পারত, এ প্রাসাদে এখন অনেক পরিবর্তন হয়েছেতার প্রিয় ধাত্রীগণ, যারা গর্ভাধানকালে হাসি, কৌতুকে তাকে আনন্দিত রাখতে চাইতে, তারা  যেন এখন যন্ত্রচালিত পুত্তলিবৎতাদের মুখে হাসি নাইজননী কুন্তী একদিন মাত্র সূতিকা গৃহে এসে নবজাতককে আশীর্বাদ করেছিলেনতাঁর মুখের গাঢ় কালিমা সে লক্ষ্য করেনি 

এখন এই সূতিকা গৃহ থেকে সে সঙ্গীত, বাদ্যরব, পুরাঙ্গনাদের হাস্যধ্বনি, কিছুই শুনতে পায় নাতার অবশ্য মধ্যে মধ্যে পতির কথা মনে হয়কিন্তু সে জানে রীতি অনুযায়ী, তিনি এই সূতিকা গৃহে প্রবেশ করবেন নাএক মধ্যাহ্নে স্তন্যপান করে শিশু যখন ঘুমিয়ে পড়েছে, হঠাৎ তার মনে হোল, এত দিনে পান্ডবেরা নিশ্চয় হস্তিনাপুর থেকে ফিরে এসেছেনতার মনে পড়ল যাত্রার আগের রাত্রিতে তার পতি বড় বিষণ্ন ও উদ্বিগ্ন ছিলেনগাঢ় আশ্লেষে আবদ্ধ করে রেখেছিলেন তাকেকিন্তু খুব অল্প কথা বলেছিলেনতখনই ভাসা ভাসা সে শুনেছিল কি সব যেন, বিদুর দ্যূতসভায় আমন্ত্রণ জানাতে এসে দুর্যোধনের ষড়যন্ত্রের আভাস দিয়েছিলেনকত কি গূঢ় অভিসন্ধি ছিল যেনতবে পান্ডবভ্রাতারা এত শক্তিশালী, বুদ্ধিমান যে দুর্যোধন তাঁদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে নানিশ্চিত হয় সেতবে ইচ্ছা থাকলেও নকুলের সম্বন্ধে কোনো সংবাদ জিজ্ঞাসা করতে লজ্জা বোধ করে সে 

এ সম্বন্ধে আর চিন্তা করে নামৃদু হাসি ফুটে ওঠে তার মুখেআজ মনে হয়, এতকাল নিজেকে সে চেনেনি সঠিক ভাবেনকুল রাজকার্যে যখন ইন্দ্রপ্রস্থের বাইরে গমন করতেন, তখন শূন্যশয্যাতে একাকিনী রাত্রিযাপন করত সেবিষণ্ন হয়ে থাকত তার মননকুলকে ছাড়া এই বিপুল বৈভবময় মনোরম প্রাসাদ তার অন্ধকার মনে হোতআর যেদিন তিনি ফিরে আসতেন তখনই আনন্দে হেসে উঠত চারিধারগহন রাত্রির প্রতীক্ষা করত সেঅতি যত্নে সজ্জিত করত নিজেকেতারপর আকাঙ্খিত মুহূর্তটি আসত যখন, শরীর-মনের সে কি নিবিড় মিলনঅজস্র চুম্বনে চুম্বনে, অর্থহীন কথা ও আনন্দের অশ্রুতে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠত রুদ্ধদ্বার কক্ষপতিকে ছেড়ে এমনকি সে পিতৃগৃহে যাবারও ইচ্ছা প্রকাশ করেনি কখনওসে শুনেছিল আগামী বছরে নকুলের যাপনকাল দ্রৌপদীর সঙ্গে নির্দিষ্ট হয়ে রয়েছেভাবলেই তার ক্ষোভ জাগতঅভিমানে জল আসত চোখে

কিন্তু আজ সে কথা ভাবলে হাসি পাচ্ছে তারতখনও পর্যন্ত সে বালিকা ছিলকত সামান্য কারণেই না অভিমান জাগত মনে! এই শিশু, মুহূর্তের মধ্যে তাকে মাতৃত্বের কোন্‌ বৃহৎ জগতে অধিষ্ঠিত করে দিয়েছে

“আর্যে”- এই ডাক শুনে নিবিড় চিন্তার জগৎ থেকে উঠে এল সেসামনে দাঁড়িয়ে কুশা, তার এক পরিচারিকামধ্যবয়সিনী, মুখে এখনও যৌবনের লাবণ্যসে বুদ্ধিমতী ও কর্মপটু বলে, করেণুর খুব প্রিয় “মাতা কুন্তী নির্দেশ দিয়েছেন, আজ আপনার হরিদ্রা স্নানের দিন” সে দেখল কুশার মুখ বিষণ্নকরেণু ঘুমন্ত শিশুর দিকে তাকালম্লান হাসি হেসে কুশা বলল,-“উদ্বিগ্ন হবেন নানবোজাত কুমারের পরিচর্যার দায়িত্ব আমারদুগ্ধ ধাত্রীও নিযুক্ত করা হয়েছেস্নান ও পূজা অন্তে মাতা কুন্তী তাঁর কক্ষে আহ্বান করেছেন আপনাকেস্থির হয়েছে কাল প্রভাতে সপুত্রক আপনি শুক্তিমতীর পথে যাত্রা করবেন

-কুশার ঠোঁট দুটি কাঁপছেকরেণু সব ভুলে গেলচকিত আতঙ্ক তাকে স্পর্শ করেহিম শীতল অনুভূতি জাগে বুকের মধ্যেসে এতকাল বাইরের জগৎ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে ছিলকিছু দুর্ঘটনা ঘটল নাকি তারই মধ্যেকুশার অভিব্যক্তিতে সে অমঙ্গলের আভাস পাচ্ছেএক নিঃশব্দ চিৎকার ওঠে তার অন্তর মথিত করেআর্ত রবে সে বলে,-“আর আর্য নকুল? কোথায় তিনি? কবে ফিরেছেন প্রাসাদে?”

“ফেরেননি, তবে শারীরিক ভাবে কুশলেই আছেন, সংবাদ এসেছেআসুন আর্যা দাসীরা আপনার জন্য নূতন বসন এনেছে”- অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে উত্তর দেয় কুশা

সে দুরু দুরু বক্ষে পরিচারিকাদের সঙ্গে স্নানাগারের দিকে যায়কত দিন পরে কক্ষের বাইরে এল সেপ্রভাতের আলোয় দেখে সে ভাবে অলিন্দ এমন ধূলিম্লান কেন? কেনই বা পারিপাট্যের অভাব চতুর্দিকেসমস্ত পরিবেষ অশুভ ইঙ্গিতবাহী যেন! স্নানের পরে নব বস্ত্র পরায় তাকে দাসীর দলনির্বাক তারাতাদের কোনো প্রশ্ন করতে সাহসী হয় না সে

ত্রস্ত মুখে সে মাতা কুন্তীর কক্ষে আসেকুন্তী স্বভাবে ধীরাঅচপল একটি ব্যক্তিত্ব আছে তাঁরকিন্তু তাকে দেখা মাত্র আজ কেঁদে ওঠেন তিনি আর্তস্বরেতাকে বুকে জড়িয়ে ধরেনকরেণুর কাছ থেকে এত দিন যে তথ্য তার অগোচরে রাখা হয়েছিল, এই মুহূর্তে বন্যার প্রবল স্রোতধারা হয়ে বেরিয়ে আসেমহা সর্বনাশের সেই সংবাদ পায় সে

দুঃস্বপ্নেরও অগোচরে ছিল যা, তেমনই ঘটেছে হস্তিনাপুরের দ্যূতসভায়যুধিষ্ঠির বারে বারে পরাজিত হয়েছেন ক্রীড়ায়একের পর এক পণ রেখে তাঁর সকল সম্পদ,রাজ্য,অলঙ্কার,এমনকি                       পঞ্চভ্রাতার স্বাধীনতা পর্যন্ত হারিয়ে ধৃতরাষ্ট্র পুত্রদের বশ্যতা স্বীকার করতে হয়েছিল তাঁদেরতখন নরাধম শকুনি, প্রস্তাব দেয় পান্ডবভার্যা দ্রৌপদীকে পণ রাখারসেই মুহূর্তে যুধিষ্ঠিরের নিশ্চয় মতি বিভ্রম হয়েছিলনয়তো অমন কদর্য প্রস্তাবে তিনি সম্মত হলেন কি করে? তখনই অক্ষের দান ফেলেছিল ধূর্ত বৃদ্ধআর কুটিল হাসি হেসে বলেছিল, - তাও জিতে নিলাম

বলতে বলতে ক্রোধে, ক্ষোভে আত্মহারা হয়ে উঠেছিলেন কুন্তীতাঁর দুই চোখ অগ্নি বর্ষণ করছিলআর তারপর দুরাত্মা দুর্যোধন উন্মাদ কুক্কুরের মতো উৎকট চিৎকার করে বলেছিল,- দ্রৌপদী এখন থেকে আমাদের দাসী, ওরে কে আছিস নিয়ে আয় তাকে, অন্য দাসীদের সঙ্গে মিলে সে আমাদের গৃহ ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করুক

দ্রৌপদী তখন রজস্বলা ছিলেনতাঁর কাতর অনুনয় গ্রাহ্য করেনি দুর্বৃত্তেরাদুঃশাসন অন্তঃপুরে গিয়ে সেই পান্ডব কুললক্ষীকে কেশাকর্ষণ করে প্রকাশ্য সভায় নিয়ে আসে “সুকুমারী, নীলপদ্মবর্ণা সেই কন্যা, --তখন রক্ত লাঞ্ছিত একটি মাত্র বসন তার অঙ্গেআহা কি অসহায়া সে তখন, বিপন্না হরিণী যেনএ কথা ভেবে হায় করেণু, আমার হৃদয় যন্ত্রণায় ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছেকত দুঃখ পেয়েছি আজীবন কিন্তু করেণু, আমার স্নুষার এই অপমান আমি সহ্য করতে পারছি নাআজ নিশ্চিত বুঝলাম, এ পৃথিবীতে ধর্ম নাই, সত্য নাই, ঈশ্বর বলে কেউ নাই! নয়তো পঞ্চপতির পত্নী সে, তবু তাকে অনাথার মতো ঐ কাপুরুষ দুঃশাসন কেশাকর্ষণ করে সভায় নিয়ে গেলতার আগে বজ্রাঘাতে সে দুর্বৃত্তের মস্তক বিদীর্ণ হোল নাতারপরেও আবার সূর্যোদয় হোল? সূর্যাস্ত হোল? দিন কাটতে লাগল নিজের নিয়মে?”- হাহাকার করে কেঁদে ওঠেন মনস্বিনী কুন্তীযেন দূতের মুখে বর্ণনা শোনা সে ভয়ঙ্কর দৃশ্য তিনি চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছেন

বিস্ফারিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে করেণু শ্বশ্রূমাতার দিকেএ কি শুনছে সে! সম্পূর্ণ বোধগম্য হচ্ছে না তারজননী প্রলাপ বকছেন না তো? অনুচারীরা তাঁকে ঘিরে বসেচোখের জলে ভেসে যাচ্ছে তাদের মুখসে ক্রমশ শোনে, এই  গ্লানিপূর্ণ ঘটনার পরে, নারীর এমন মর্মান্তিক অবমাননা দেখে, সভাস্থ সকলেই ধৃতরাষ্ট্র তনয়দের প্রকাশ্যে ধিক্কার দিয়েছিলতখন ধৃতরাষ্ট্র লোকলজ্জায় ভীত হয়ে,  পান্ডুপুত্রদের দ্যূতক্রীড়ায় পরাজয়ের শর্ত থেকে মুক্তি এবং শকুনির জিতে নেওয়া সকল সম্পদ ফিরিয়ে দিয়েছিলেনকিন্তু পর মুহূর্তেই আবার সে বুদ্ধিভ্রষ্ট বৃদ্ধ, অনাচারী পুত্রদের প্ররোচনায় দ্বিতীয়বার দ্যূতক্রীড়ার আয়োজন করেনযথারীতি পরাভব ঘটে যুধিষ্ঠিরেরএবারের শর্ত অনুযায়ী,  সকল পান্ডব ভাই, বধূ দ্রৌপদী সহ কাম্যক বনে গমন করেছেনদ্বাদশ বর্ষ বনবাসের পরে আরো এক বৎসর তাঁদের অজ্ঞাতবাসে থাকতে হবে

আগামী পূর্ণিমা তিথিতে দুর্যোধন সপরিবারে অধিকার করবে রমণীয় এই পুরীএ প্রাসাদের পরিচারক পরিচারিকাদের প্রভু নন তাঁরা আরকিন্তু দুঃশীল দুর্যোধনের প্রভুত্ব মানতে চাইছে না তারাউন্মত্তের মতো চিৎকার করে কাঁদছে

পান্ডববধূগণ - দেবিকা, বিজয়া, করেণু, সুভদ্রা, বলন্ধরা সন্তানসহ তারা যে যার পিতৃগৃহে গমন করবেকুন্তী বাস করবেন ক্ষত্তা বিদুরের গৃহেঅর্থাৎ সমগ্র পরিবারটি অনিশ্চিত কালের জন্য বিপর্যস্ত হয়ে গেল

সম্পুর্ন বিষয়টি হৃদয়ঙ্গম করতে অনেকক্ষণ সময় লাগল করেণুমতীরসে কাঁদল নাএকটিও আক্ষেপোক্তি উচ্চারণ করল নামর্মর মূর্তির মতো কুন্তীর পদতলে বসে রইলতার মনে হচ্ছিল অগ্নিস্রাবী পর্বত জীবন্ত হয়ে উঠেছেউত্তাপে ঝলসে যাচ্ছে তার স্বামী, তার পুত্র, তার সকল প্রিয়জনকতক্ষণ পরে সে অস্ফুট গুঞ্জনে বলে উঠল,-“জননী”

কুন্তী শূন্য দৃষ্টিতে তাকালেনকরেণু ব্যগ্র স্বরে বলল,- “মা, এ কি তবে খান্ডব দাহনে শত সহস্র জীবকে বাসভূমিচ্যূত করার প্রতিফল?” যে প্রশ্নের উত্তর মানব কোনোদিনই জানবে না, তেমন বহু প্রশ্ন মথিত করতে লাগল তার হৃদয়কে

কুন্তীর ভিতরে তীব্র আলোড়ন চলছিলপান্ডবদের বিপর্যয়, দ্রৌপদীর লাঞ্ছনা, আসন্ন ছিন্নমূল জীবন যাপনের অনিশ্চয়তার চেয়েও গভীরতর ছিল তাগ্লানি ও লজ্জায় গোপনে ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছিল তাঁর অন্তরতাঁর পুত্র কর্ণের শোচনীয় অধঃপতনের সাক্ষী হয়ে রইল হস্তিনাপুরের রাজসভাআপন ভ্রাতৃবধূ দ্রৌপদীকে সে বেশ্যা বলে সম্বোধন করেছিলঅট্টহাসি হেসে তাকে নগ্না করতে উৎসুক! হায় দৈব! এ মহাপাপে সে সমূলে বিনষ্ট হবে, বিন্দুমাত্র সংশয় নাই কুন্তীরভীমার্জুন মহা ক্রুদ্ধ এখনঅপমানের প্রতিশোধ নিতে প্রস্তুত হচ্ছে তারাভবিষ্যতের পটভূমিতে কুন্তী দেখতে পাচ্ছেন, ত্রয়োদশ বৎসর পরে, এক মহাযুদ্ধের সূচনানির্বোধ জননীগণ যুগে যুগে এইভাবেই বুঝি নির্মাণ করে ভ্রাতৃদ্বন্দ্বের ইতিহাস! বৃথা আক্ষেপে হাহাকার  করেন অসহায়া বৃদ্ধা       

তখনই এক দাসী সংবাদ নিয়ে আসে করেণুর অগ্রজ ধৃষ্টকেতু রাজপুরীতে উপস্থিত হয়েছেন

                                                                                            ক্রমশ

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন