সৈয়দ কওসর জামাল/জুন'২০২২

 


মিথ ও পুরাণ : নির্মাণ ও বিনির্মাণ


পরম্পরাবাহিত হয়ে পুরাণ আসে আমাদের কাছে। পুরাণ ইতিহাস নয়। তাই ঐতিহাসিকতা প্রমাণের দায় নেই পুরাণের। পুরাণ লোককথা ও কিংবদন্তির মতো। রূপককে আশ্রয় করে তার বেড়ে ওঠা। আর সেইজন্য রহস্যাভাষ তার মূল কথা। রহস্যের মধ্যে দিয়েই পুরাণ বলতে চেয়েছে তার অন্তর্গত কথা। সাধারণত ধর্মকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে পুরাণ। এ কারণেই পুরাণ দেবদেবীদের অবাস্তব ও অতিলৌকিক কাহিনি বলে। এ সবই প্রতীকী ও রহস্যাচ্ছাদিত। প্রতীক ও রহস্যের কারণে মিথ বা পুরাণ সাহিত্যকারের এত প্রিয়। মানব সমাজের গোড়ায় আদিম ধর্মীয় স্তর থেকে অবচেতন মনের আধুনিক অনুসন্ধানের সূত্র হিসেবে গ্রহণীয় হয়ে ওঠার মধ্য দিয়ে মিথ সাহিত্যের মর্যাদা পেয়েছে।

কিন্তু সাহিত্যে মিথকে বুঝে ওঠার জন্য মিথের একটা সংজ্ঞা নির্ধারণ করা জরুরি হয়ে ওঠে। নরথ্রপ ফ্রাই বলেছেন—‘In literary criticism myth means ultimately mythos, a structural organizing principle of literary form; কিন্তু এ কথা বলেও সবটা বোঝানো যায় না। আর একটি সংজ্ঞা দিয়েছেন ব্রনিস্ক মলিনোয়াস্কি—মিথ হল ‘a  narrative resurrection of a primeval reality, told in satisfaction of deep religious wants, moral cravings, social submissions, assertions, and practical requirementsএখানে আদিম সমাজের এক শক্তিশালী উপাদান হিসেবে মিথকে দেখানো হয়েছে। কিন্তু আধুনিক যুগেও মিথের প্রয়োজন শেষ হয়ে যায়নি, বরং স্থান করে নিয়েছে সাহিত্যে। হোমার ও সফোক্লিসের কাহিনিতে যেসব দেবতা ও বীরের দেখা মেলে তারা আক্ষরিক অর্থেই আগে পূজিত হয়েছে। আর ধর্মীয় অনুষ্ঠানের বাকিটা থেকে গেছে কিংবদন্তিতে। কিংবদন্তি লোকগাথা ও মিথ মিলেমিশে গেছে ইলিয়াডে। ট্রোজান যুদ্ধের কিংবদন্তি বা বীরগাথাকে মিথ থেকে আলাদা করা যাবে না। মিথের মধ্য দিয়ে এই আবেগ ও অচেতন সংযোগ প্রকাশ পায়। ফ্রয়েড মিথকে অচেতন কামনার প্রকাশ হিসেবে দেখেছেন, এর ফলে মনোজগতের বিশ্লেষণে সাহায্য করেছে মিথ। মিথ ও স্বপ্নের মধ্যেও সম্পর্ক স্থাপন করে গ্রয়েড মেটাফিজিক্সকে মেটাসাইকোলজিতে উন্নীত করতে চেয়েছেন। তিনি প্রাচীন গ্রিক ও ল্যাটিন সাহিত্যে পুরাণের ব্যবহারকে প্রবৃত্তিজাত কাজ ও অচেতনার অন্তর্গত বিরোধের প্রকাশ হিসেবে মনে করেছেন।

কল্পনা ও বাস্তব, নশ্বরতা ও অমরত্ব, প্রকৃতির কাছে অসহায়তা এবং সেইসঙ্গে প্রকৃতিকে জয়ের আকাঙ্ক্ষায় ইউরোপীয় মিথ ও ভারতীয় পুরাণের  সামাজিক ও মানবিক সংযোগ প্রথম থেকেই কবিদের প্রিয় বিষয়। কবিতায় পুরাণ কবিদের বাস্তব ও কল্পনার পরিপার্শ্বকে বিস্তৃত করেছে। কবিতায় পুরাণ বা পুরাণের কবিতা ভাবনার নিরিখে ভিন্ন তাৎপর্য সৃষ্টি করেছে। আমরা এখানে একটি মিথের কথা উল্লেখ করতে চাই। গ্রিক পুরাণের দেবী ডিমিটার আর তার কন্যা পার্সিফোনি। পাতালের রাজা হেডিস পার্সিফোনিকে হরণ করে নিয়ে যায়। ডিমিটার অনেক অনুসন্ধানের পর এ কথা জানতে পারেন। দেবতার অনুরোধে হেডিস বছরে ছ’মাস স্ত্রী পার্সিফোনিকে মায়ের কাছে ফিরিয়ে দিতে সম্মত হয়। এখন অনেক কবিই এই মিথটিকে কবিতায় ব্যবহার করেছেন। জন কিটস ‘ওড টু মেলানকোলি’তে পার্সিফোনি নামের সঙ্গে যে দুঃখবোধ জড়িয়ে আছে তার উল্লেখ করেছেন। একই মিথ তাঁদের কবিতায় ব্যবহার করেছেন রবার্টস গ্রেভ, ক্যাথারিন রেইন ও আমাদের বাঙালি কবি বিষ্ণু দে। বিষ্ণু দে এই মিথকে কাজে লাগিয়েছেন ইতিহাসের অগ্রগতির স্বার্থে।

রন্ধ্রহীন আর্তনাদে এ আঁধার হেডিসের মতো/ হৃদয় ধরেছে চেপে

একই কবিতা, ‘ওফেলিয়া’-তে আছে এলিসোনোরের পাতালরাজ্যের বর্ণনা—

        প্রসার্পিনা কুসুমে, বৈতরণী পাশে/ ছড়ায় আহা!

পার্সিফোনির মূল থিমটিকে অন্যভাবে ব্যবহার করলেন বিষ্ণু দে। ফুলসংগ্রহে রত প্রসার্পিনার যে ছবি তা কবির নিজেরই নির্মাণ।

        মিথ বদলায় কবিদের হাতে। মিথ নির্মিত হয় নতুনভাবে, কখনও তার বিনির্মাণ বা পুনঃনির্মাণও ঘটে। মিথ যেন একটা শিকড়, ফলে তার নিত্যনতুন নির্মাণ ঘটে। মিথ ব্যাখ্যার দায় কবির নয়। তিনি মিথের আশ্রয় নেন, মিথকে নতুন রূপ দিয়ে নিজের কথা বলেন। আধুনিক জীবনে বিশ্বাস ও শৃঙ্খলার তটভূমি ভঙ্গুর বলে  চোখ ফেরাতে হয় ঐতিহ্যের মধ্য থেকে আহরিত প্রতীকের দিকে। মিথ একদিকে মিথ্যা, অন্যদিকে আবার সত্যি। কারণ এইসব মিথ ‘express man’s deepest self-deception—his creation of gods in his own image his attribution to himself, or to a creature formed to mirror his marvelous fantasies, of powers of control beyond those of any human being ever born. (লিলিয়ান ফেডার, এনসেন্ট মিথ ইন মডার্ন পোয়েট্রি)ইংরেজ কবি ইয়েটস-এর আলোচনায় আর এক কবি অডেন দেখিয়েছেন পৌরাণিক কাঠামোর ব্যবহার কবিতায় কেন জরুরি। তিনি বলেছেন—any poet today, even if he denies the importance of dogma in life, can see how useful myths are to poetry—how much, for instance, they helped Yeats to make his private experiences public , and his vision of public events personal. (নির্বাচিত প্রবন্ধ)

            এই আলোচনায় আমাদের অন্বিষ্ট মিথ বা পুরাণের আধুনিক সময়োপযোগী ব্যবহার। এই কারণে রবীন্দ্রনাথ পরবর্তী কবিদের পুরাণ নির্মাণ বা বিনির্মাণের দিকে আমাদের দৃষ্টি। আলোচনায় যাওয়ার আগে আধুনিক বিনির্মাণ শব্দটির দিকে লক্ষ করতে হয়।

        বিনির্মাণবাদ হলো টেক্সট এবং তার অর্থের মধ্যে সম্পর্ক বোঝার একটা পদ্ধতি, বিশেষ করে দর্শন ও সাহিত্য সম্পর্কিত ভাষার একটা বিচারমূলক অনুসন্ধান যার ভেতর দিয়ে ভাষার অভ্যন্তরীণ ও ধারণাগত প্রকৃতির অবয়ব বোঝার চেষ্টা করা যায়। তাছাড়া অর্থ সম্পর্কিত গুণগত মান এবং যা বলা হয়নি সেসব না বলা কথার অর্থ যাচাইয়ের এক পদ্ধতির কাজে বিনির্মাণ শব্দটা ব্যবহার করা হয়। এটা কেন আমরা করবো? জাক দেরিদা বলছেন, ভাষার অন্তর্লীন লজিক এবং যে কোন টেক্সট অথবা অভিসন্দর্ভ বোঝার ক্ষেত্রে এর মধ্যে যে বিপরীত চিন্তা লুকিয়ে আছে সেটা আমাদের বুঝতে সাহায্য করবে, সেটা হতে পারে আইন, বিচার, রাজনীতি, অর্থনীতি, বিজ্ঞান এমনকি ধর্মীয় ভাবনাও। মিথ সম্পর্কে ভেবেছেন আর একজন তাত্ত্বিক, রলাঁ বার্ত, যিনি মিথের মধ্যে দেখেছেন ত্রি-স্তরীয় একটা পদ্ধতি—the signifier, the signified এবং the signsignifier হল আঙ্গিক, signified হল অর্থ, এবং sign হল তাৎপর্য। তাঁর মতে মিথকে ভেঙেচুরে উপস্থাপিত করলে একটা নতুন অর্থ ও তাৎপর্য তৈরি হয়। বাংলা কবিতায় মিথ বা পুরাণের প্রয়োগ বিশ্লেষণের সময় বিনির্মাণতত্ত্বের এই ধারণাটিকে লক্ষ করব। কেননা, কবিতায় এই নতুন অর্থ ও তাৎপর্য সংযুক্ত হতে আমরা দেখেছি।

                রবীন্দ্রোত্তর বাংলা কবিতায় জীবনানন্দ, বিষ্ণু দে, বুদ্ধদেব বসু ও সুধীন্দ্রনাথ দত্ত ইউরোপীয় মিথ ও ভারতীয় পুরাণকে একসঙ্গে ব্যাখ্যা করেছেন, পুনর্নির্মাণ করেছেন এবং নতুন  তাৎপর্য আরোপ করেছেন। কিন্তু জীবনানন্দ বিষ্ণু দে  বুদ্ধদেব বসুর পুরাণচর্চার সঙ্গে সুধীন্দ্রনাথের চর্চার পার্থক্য হল, অন্য কবিরা যখন পুরাণের কাহিনিকে নিজের উপলব্ধি দিয়ে ভেঙেছেন ও পুনর্নির্মাণ করেছেন, সুধীন্দ্রনাথ তখন পুরাণ-ভাবনার সঙ্গে ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখের অনুভূতির সংযোগ ঘটাচ্ছেন। নিজের জীবনের প্রেম-ভালোবাসার অভিজ্ঞতা, আনন্দ-বিষাদের স্মৃতির অভিঘাত তিনি পুরাণের প্রতীকে প্রকাশ করেছেন। পৌরাণিক চরিত্রের মধ্যে তিনি নিজেক ও পরিপার্শ্বের মানুষদের প্রতিচ্ছবি দেখেছেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তিনি কবিতায় এমন সব মিথ ব্যবহার করছেন যেখানে তিনি নিজেকেই প্রতিফলিত দেখতে পান।  উর্বশী  ও পুরুরবার আখ্যান উদ্ধৃত করে তিনি নিজেকে পুরুরবার মতো প্রত্যাখ্যাত মনে করছেন। যখন লেখেন, “কালের কবল হতে কেড়ে/ পারে না সাবিত্রীসম রক্ষিতে প্রেমের কঙ্কালেরে”, তখন ব্যক্তিগত প্রেমের অভিজ্ঞতা যে তাঁর মনকে প্রভাবিত করে রেখেছে তার পরিচয় মেলে। যেখানে ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ নেই সেখানে যুগের অন্তর্জালা ব্যক্ত করেছেন। যেমন, গ্রিক পুরাণের সিসিফাস মিথটিকে তিনি এভাবেই সময়ের প্রতীক করে তুলেছেন।  আবার ইন্দ্র, কুবের, অশ্বমেধ, সমুদ্রমন্থন ইত্যাদি পৌরাণিক নাম ও অনুষঙ্গ এনে নিজেকে যুক্ত করছেন। “প্রত্যাসন্ন নূপুরের মুগ্ধ আগমনী/ আমার উদবেল মর্মে ভরে দেয় স্বর্গ বিজিগীষা”—এই উচ্চারণের মধ্য দিয়ে সুধীন্দ্রনাথ নিজেকেই সংযুক্ত করেছেন পুরাণের সঙ্গে। এভাবেই তাঁর কবিতায় পুরাণ নতুন অর্থে সঞ্জীবিত হয়েছে।

        বিষ্ণু দে মিথের পুনর্নির্মাণ করেছেন সমাজের প্রগতির স্বার্থে। ব্যক্তিগত প্রেম ও প্রকৃতি ভাবনাও উদ্ভাসিত হয়েছে সমাজের সামগ্রিক পটভূমিতে। প্রেমের যন্ত্রণা আর শ্রেণিবিভক্ত সমাজের অসহায়তাকে তাৎপর্যময় করে তোলাই তাঁর পুরাণ প্রসঙ্গের অভিমুখ। এখানে প্রয়োজনে ইউরোপীয় মিথের সঙ্গে ভারতীয় পুরাণের মেলবন্ধন ঘটাতে তিনি পারদর্শী। “ভাষা তার কী বা বলে—ডায়ানা? উর্বশী?”—বন্য প্রকৃতির দেবী ডায়ানা, যা আর্টেমিসের রোমান নাম, উর্বশীর সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়—“আজও তাই পরিশ্রান্ত ম্যামন-মলিন/ জলস্থল কেঁপে ওঠে উর্বশীর দেহের আস্বাদে”। বন্ধ্যা রোম্যান্টিকতার পথ পরিহার করে নিতুন সৃষ্টির পথ খুঁজতেই আর্টেমিসের স্মরণ। বিষ্ণু দে-র চোরাবালি কাব্যগ্রন্থের ওফেলিয়া, যযাতি, মহাশ্বেতা কবিতাগুলো লক্ষণীয়। পুণ্ডরীক-মহাশ্বেতার কাহিনি, জন্মান্তর, পুনর্মিলন ও পুনরুজ্জীবনের কাহিনি। মহাশ্বেতা কবিতায় পুণ্ডরীকও প্রেমের হৃদয়পথে মুক্তির অন্বষণ করে—“আজ কি আমাকে ভুলেছে মহাশ্বেতা?” এর সঙ্গেই যোগ করেছেন সমসাময়িকতার ছায়া—“পশ্চাতে ধায় মরণ-চাঁদের আলো/ দিগন্তফেনা, তুহিন, পাণ্ডু, কালো।” প্রেম ও জীবনের প্রতীক মহাশ্বেতা দেশ আর সময়চেতনার আধারে প্রোথিত।

        জীবনানন্দের কবিতায় আদিম মিথের কথে এসেছে নানাভাবে, বিশেষ করে বেলা অবেলা কালবেলা, ধূসর পাণ্ডুলিপি, মহাপৃথিবী ও রূপসী বাংলায়।  ধূসর পাণ্ডুলিপি-র ‘জীবন’ কবিতায় দেখি—

        চারিদিকে বেজে ওঠে অন্ধকার সমুদ্রের স্বর

        নতুন রাত্রির সাথে পৃথিবীর বিবাহের গান

        ফসল উঠেছে ফলে রসে রসে ভরিছে শিকড়

        লক্ষ নক্ষত্রের সাথে কথা কয় পৃথিবীর প্রাণ।

প্রতিষ্ঠিত একটি মিথ ব্যবহার করেছেন কবি। সৃষ্টির পর ধরিত্রী ও আকাশের মিলন এবং শস্যসজ্জিত ধরিত্রীর ছবিতে উর্বরাকেন্দ্রিক কর্মধারার সঙ্গে সৃষ্টি মিথ মিশে গেছে। ইঙ্গিত দিয়েছেন পৃথিবীর প্রাণপ্রতিষ্ঠার। এই নির্মাণ কবির। পৃথিবীতে যখন মানুষের আবির্ভাব, মানুষই তখন সৃষ্টি করে দেবতার। ‘আদিম দেবতারা’ কবিতায় কবি বলেছেন—“আগুন বাতাস জল—আদিম দেবতারা তাদের বঙ্কিম পরিহাসে/ আমাকে দিল লিপি রচনার আবেগ/ যেন আমিও আগুন বাতাস জল/যেন তোমাকেই সৃষ্টি করেছি”। লোকপুরাণ থেকে জীবনানন্দ মনসামঙ্গলের কাহিনি এনেছেন। ইন্দ্রের সভায় স্বামীর প্রাণলাভের জন্য বেহুলার রূপ যৌবন ও লাস্যের অলজ্জ প্রদর্শনের বাধ্যতা চিত্রিত করে কবি যেন আমাদের জানান—সমাজের উঁচু স্তরের মানুষ সব অধিকার করে, ‘নারীকেও নিয়ে যায়’ এবং তাদের বাসনা চরিতার্থ করে। রলাঁ বার্ত-কথিত নতুন অর্থ ও তাৎপর্য দিয়েছেন জীবনানন্দ। চাঁদ, মনসা,গাঙুরের জল, বেহুলা ইত্যাদি লোকায়ত অনুষঙ্গ বাংলার মানসপ্রতিমা গঠনের সঙ্গে যুক্ত করে ফেলা হয়েছে। একই মিথের ব্যবহার করেছেন বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়—“গাঙুরের জলে ভাসে বেহুলার ভেলা/ দেখি তাই, শূন্য বুকে সারারাত জেগে থাকি/ আমার স্বদেশ করে কাগজের নৌকা নিয়ে খেলা”।

        শঙ্খ ঘোষের একটি কবিতা ‘জাবাল’— “সকলেই ভুল কথা বলে...যত দেরি হোক, জবালা যাবার পথ আমাকেই খুঁজে নিতে হবে।” গোত্রহীন অজানা জন্মসূত্র, অচেনা রাস্তা তার যাত্রাপথ হতে পারে যদি পথে সত্যের হয়। পুরাণের চরিত্র থেকে, তার সত্যনিষ্ঠা থেকে আদর্শের সৃষ্টি হচ্ছে। মিথকে আশ্রয় করে তৈরি হচ্ছে কবির আদর্শ। আবার জাবাল ও সত্যকামের কাহিনি থেকে উঠে আসছে কবির আত্মপরিচয়ের সংকট—

        “কোথায় আমার দেশ কোন স্থিতি

        মৃত্তিকার ফুল

        কোন চোখে চোখ রেখে

        বুকের আকাশ ভরে মেঘে

        দেশ দেশান্তর কাল কালান্তরের

কোথায় আমার ঘর

তুমি চাও বংশপরিচয়!

এই প্রশ্নেই মিথটি দেশকাল পেরিয়ে এই যুগের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যায়। কবির আবেগ থেকে সংকটের চরিত্রটিকে অনুভব করা সম্ভব হয়।

একটি পুরাণ কাহিনি থেকে কীভাবে আর একটি কাহিনি নির্মাণ করেন কবি তার উদাহরণ বিনয় মজুমদারের ‘মহাদেবের জটা’—

        এবং মহাদেবের জটা থেকে নদী বের হয়।

        প্রকৃত চুলের মধ্যে অমেয় জলের উৎস আঁচে।

        মহাদেব আর উমা যখন দুজন শুধু থাকে

তখন মহাদেবের প্রকৃত চুলের গুচ্ছ উমা

ভালোবেসে নাড়েচাড়ে নিজের চুলের সঙ্গে ঘষে।

ফলে জল বের হয় প্রকৃত চুলের মধ্য থেকে।

এই জল গিয়ে পড়ে সাগরে এবং সকলেই

জানি এই সাগরেই দেবী জন্মলাভ করেছিল।

পুরাণের বিনির্মাণ নয়, বিনয়ের কবিতা পুরাণের নির্মাণ করেছে এবং কাহিনির সঙ্গে যোগ করেছেন নতুনত্বের স্বাদ।

*****

৪টি মন্তব্য:

  1. Falguni Ghosh darun lekha congrats dada......riddho holam

    উত্তরমুছুন
  2. ভালো লাগল । তথ‍্য সমৃদ্ধ হয়েও সরেস।

    উত্তরমুছুন
  3. এতো সুন্দর করে বিশ্লেষণ করেছেন তা আমাদের ঋদ্ধ করেছে। আমার মতো সাধারণ কলমবাজের শেখার জন‍্য বহু কিছু এখানে আছে।

    উত্তরমুছুন
  4. খুব প্রজ্ঞাদীপিত একটা লেখা। এর আগে বিষ্ণু দে-র কবিতায় মিথের ব্যবহার বিষয়ে একটি অসাধারণ প্রবন্ধ পড়েছিলাম জামালদার ’’ কবির কথা কবিতার কথা ‘’ বইতে ।

    উত্তরমুছুন