অভিজিৎ চৌধুরী

 



ফুটপাথ 

 


 

আপনি যদি বইটা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পড়েই শেষ করে দেন- আমার লাভটা কি হবে!

এরকম একটা প্রশ্ন আসবে ভেবেই ছিল স্বর্ণেন্দু।পকেটে হাত দিয়ে টের পেল কোন উত্তাপ নেই।পাঁচ টাকাটা ভিজে একসা হয়ে গেছে।কলেজ স্ট্রীট একটু বৃষ্টিতে ডুবে যায়।ফুটপাথই ভরসা আর এই বইয়ের দোকানগুলি।

কিছু বলছেন! 

নেবেন বইটা! বইগুলি পরম ধনের মতোন 

গুছোতে গুছোতে বলেন বইওয়ালা।

কতো দাম!

দাম তো বিস্তর। আপনি কতো দিতে পারবেন!

মনে মনে হিসেব করে সে।

দোকানদার নস্যি নাকে দিয়ে তাকিয়ে থাকেন ও একটু হেঁচেও নেন।কিছু গুঁড়ো ছড়িয়ে পড়ে বইগুলিতে, নোংরা একটা রুমাল দিয়ে মুছে নিলেন।

দু- টাকা দিতে পারব।

এই বই পড়ে বিপ্লব হবে।সমাজ বদলে যাবে।মানুষে মানুষে সাম্য প্রতিষ্ঠিত হবে।

কলেজ স্ট্রীটের ফুটপাতের বই বিক্রেতারা অনেক কিছু জানেন।এনজিনিয়ারিং মেডিক্যাল থেকে সাহিত্য এবং বিপ্লবও।

স্বর্ণেন্দু বলল,চিন্তা নায়কেরা তো প্রলেতারিয়েত হয়।

কে বলল আপনাকে!

সামান্য চুপ করে রইল ও।

তখন বইওয়ালা ভদ্রলোক বললেন,এঙ্গেলস অরবিন্দ ঘোষ  আর অনেক নাম রয়েছে কেউই প্রলেতারিয়েত ছিলেন না।

তারপর চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে বললেন,বয়স কতো হে তোমার!

সামান্য অভিমান হল স্বর্ণেন্দুর।একেবারে বিনা অনুমতিতে তুমি!

তোমার বয়স ১৯/২০ হবে।তাই তো!

স্বর্ণেন্দু বলল,উনিশ।

আমার ছেলে থাকলেও এই বয়স হতো।

লজ্জা পেল এবার ও।

২ টাকাতে দেবেন!

মিসা চলছে জানো তো! অকারণে টি আই প্যারেডে দাঁড় করাবে।

অকারণে কেন!

তুমি বিপ্লব করতে পারবে না।সেই সাহস নেই তোমার।

সাহস কি বাইরে থেকে বোঝা যায়।

বোকামি বোঝা যায়।

আমি কি বোকা না বিপ্লবী!

কোনটাই নয়।

তার মানে!

দ্বিধাগ্রস্ত। যেমনভাবে আলিপুর বোমার মামলার বারীণ ঘোষেরা ছিল।

স্বর্ণেন্দু বলল,চরমপন্থী আন্দোলনের সূচনা তো!

স্বাধীনতা আনল কারা!        শ্লেষ নিয়ে বললেন ভদ্রলোক।

এ আজাদি ঝুটা হ্যায়।

হো হো করে হেসে উঠলেন ভদ্রলোক।

তারপর বললেন,মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী এবং ইংরেজদের উদারতা।ভিক্ষে ছুঁড়ে দেওয়া।

সবটা তা নয়।সুভাষও রয়েছেন।সূর্য সেন,বাঘাযতীন,বিনয় বাদল দীনেশ।শহীদের রক্ত মিথ্য নয়।

আর সত্তরে! ভয় পাচ্ছ বলতে!

স্বর্ণেন্দু বলল,আপনি তো বইটা কিনতে চাইছি বলে মিসার কথাও বলছেন।

এই সমাজে ভয় পাওয়া সুস্থতা।একটু বিপ্লবী, আরেকটু চালাক।তারপর সমঝোতা।

জহরলাল নেহেরুও সমাজতন্ত্রের সমঝদার ছিলেন।

পণ্ডিত মানুষ কিন্তু বোকা নন।দারুণ বুদ্ধিমান।এবং সমঝোতা গভীরভাবে বুঝতেন।

বৃষ্টি ধরে এসেছে।লাজুক রোদ্দুর উঠেছে।

স্বর্ণেন্দু বলল,বইটা কতো টাকায় দেবেন!

এই বই আমি বিক্রি করি না।

কেন! খানিকটা রুষ্ট হয়ে বলল।

ছেলে ধরি, তোমার মতোন দ্বিধাগ্রস্থদের।বিপ্লব এই দেশে কেন হবে!

কালোবাজরি নেই! বেকারি নেই!মানুষে মানুষে বিভেদ নেই!সবই তো বিপ্লবের উপযোগী।

আছে।বিবেকানন্দও তো বিপ্লবী ছিলেন।

ওসব ভাববাদ চলে না এখন।দ্বন্দ্বমূলক বস্তবাদ,মার্কসের যুগ।

মুখের দিকে খানিকটা তাকিয়ে বললেন,কতো দেবে!

জেদ চেপে গেছে ওর।বলল,পাঁচ।

প্রকৃত প্রলেতারিয়েত  হয়ে বইটা কিনবে।তাই তো!

সেটা তো আমার ব্যাপার।

খেয়েছো কিছু!

এটা কিন্তু বেশী হয়ে যাচ্ছে।অপমানজনক।

খাওনি কিছু।

এবার লক্ষ করল স্বর্ণেন্দু। কাগজের অস্থায়ী স্মৃতিসৌধ ঝোলা থেকে বের করলেন।

তারপর ভাঙলেন।বের হল ছ- টা রুটি আর তরকারি।

খিদের ফলে এই সামান্য খাবার দেখেও লোভ হল।

মাটিতে বসে পড়ো।এই কাগজটা পেতেই বসো।

বসল স্বর্ণেন্দু। 

তিনটে নয় বৃদ্ধ চারটে রুটি অনেকটা তরকারি দিলেন খেতে এনামেলের থালায়।

তৃপ্তি হল স্বর্ণেন্দুর।খিদের উপশম হল।

তারপর হাত ধুয়ে সে বলল,শহীদ বেদীটা কার ছিল!

শক্ত গলায় বললেন,আমার ছেলের।বাকীটুকু তুমি জানো।

তারপর বললেন,বিকেল গড়িয়ে যাবে।পুলিশ ছেলের মৃত্যুর কারণে বইটা আমায় অ্যালাও করছে।

কারা এটা দেখে খোঁজও নেয়।হয়তো আড়াল থেকে তোমায় দেখেছে।বাড়ি যাও।

স্বর্ণেন্দু আর দাঁড়াল না।অদ্ভুত একটা অনুভূতি নিয়ে হাঁটতে লাগল ও ফুটপাথ ধরে।

এসব স্বপ্নের বিপ্লবগাথা ঝেড়ে ফেলতে কয়েক রাত মাত্র লেগেছিল।

আজাদি এখন ঝুটা মনে হয় না।সয়ে গেছে বেশ।তবে ফুটপাথে আর কখনও দেখা পাইনি অমন মানুষের।সময়,প্রযুক্তি, লক ডাউন নিশ্চয় সেই স্বপ্ন দেখানো ফুটপাথ একেবারে নিকেশ করে দিয়েছে।বরং এখন দোলা দেয় অর্থহীন এক বানান বিভ্রাট – কোনটা সঠিক ছিল – ফুটপাত না ফুটপাথ!

 







কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন