অঞ্জনা চট্টোপাধ্যায়





জাম রঙের জামদানি





আলমারি গোছাতে গিয়ে আবার রঙিন শাড়িগুলোর দিকে চোখ চলে গেল অনুমিতার। বছর খানেক হয়ে গেল এইসব লাল, নীল, সবুজ, কমলা, খয়েরী, বেগুনি, জলপাই রঙা শাড়িগুলোতে হাত পড়ে না। অথচ একটা সময় হালকা রঙের কোনো শাড়িই পরতেন না অনুমিতা। কেউ উপহার দিলে হয় ভাঁজ না ভেঙ্গে যত্ন করে তুলে রেখে দিতেন নয়তো বিলিয়ে দিতেন চেনা-পরিচিতদের মধ্যে। আর এখন... জীবনটাই বেরং হয়ে গিয়েছে। আর তার সাথে সামঞ্জস্য রেখে ফিকে হয়েছে অনুমিতার শাড়ির রং। বুকের ভেতর থেকে একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল বাষট্টি বছরের অনুমিতার।
 
তিথি হিসাবে পাঁচ দিন আগে হিমাদ্রি চলে যাওয়ার এক বছর পূর্ন হল। পুরুতমশাইয়ের অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেওয়া থেকে শুরু করে ফর্দ মিলিয়ে বাৎসরিক-কাজের যোগাড়যন্ত্র করা, আত্মীয়স্বজন চেনা-পরিচিতদের ওইদিন আসতে বলা, ক্যাটারার ঠিক করা সবই একাহাতে সামলাতে হয়েছে অনুমিতাকে। হিয়া আর দিয়া দুই মেয়েও অবশ্য এসেছিল 'বাবার কাজে'; তবে সেও ওই বুড়ি ছোঁয়ার মতো, ওদের ভাষায় 'হ্যারিকেন ট্রিপ'। পার্বতী খুব খেটেছে এ ক'দিন। সারা বছর খালি মাইনে বাড়াও, ছুটি দাও-য়ের মতো ফালতু দাবিদাওয়া করলেও এই সময়টাতে মাসিমাকে সাহায্য করার কেউ নেই দেখে নিজে থেকেই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে, তাও বখশিসের আশা ছাড়াই। সামনের সপ্তায় ওর বিবাহবার্ষিকী, ছুটির নেবে বলছিল; অনুমিতা ভাবলেন ছুটির সাথে পার্বতীকে কিছু টাকাও দিয়ে দেবেন।
আলমারির তাক থেকে শাড়িগুলোকে নামিয়ে বিছানার ওপর একটা একটা করে সাজিয়ে রাখলেন অনুমিতা। সবই গাঢ় রঙের দামী সিল্কের শাড়ি; বিয়ের টকটকে লাল আর বৌভাতের খয়েরি বেনারসি, ছোটভাইয়ের বিয়েতে নমস্কারি হিসাবে পাওয়া পেঁয়াজি রঙের কাঞ্জিভরম, বিয়ের পর প্রথম পুজোয় হিমাদ্রিবাবুর দেওয়া কমলা খোলের সাথে সোনালী জরির কাজ করা গাঢ় সবুজ পাড়ের সাউথ ইন্ডিয়ান সিল্ক; অনুমিতার গায়ের রং ফর্সা ছিল বলে যা পরতেন তাতেই বেশ ভালো মানাতো। শাড়িগুলোতে পরম যত্নে হাত বোলাতে লাগলেন অনুমিতা, প্রতিটি শাড়ির সাথে জড়িয়ে আছে একটা করে সুখস্মৃতি। ছোটবেলায় দেখতেন, প্রতি বছর ভাদ্রমাস পড়লেই মা-কাকিমারা শাল, সোয়েটার আর অন্যান্য গরম জামার সাথে দামী শাড়িগুলোকেও নিয়ম করে রোদে দিতো। সারাবছর ন্যাপথালিন সহযোগে বাক্সবন্দী হয়ে থাকা সিল্কের শাড়িগুলো সারা দুপুর ধরে মেখে নিতো চড়া রোদের আতপ।
"আরিব্বাস, মাসিমা তোমার কতো শাড়ি ?", ঘরের কাজ শেষ করে বাড়ি যাওয়ার আগে মালকিনের কাছে বিদায়ের অনুমতি নিতে এসেছে পার্বতী। অনুমিতা অল্প হাসলেন। পুরোনো শাড়ির ময়লা আঁচলটাতে হাত মুছতে মুছতে পার্বতী একদৃষ্টে চেয়ে আছে শাড়িগুলোর দিকে।
"এই জাম রঙের শাড়িটা জামদানী না ? সুতপা বৌদিরও আছে, হলুদ আর কালো। দাদা গেলোবার বিয়ের তারিখে দিয়েছে।", একনিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে দম নিল পার্বতী। অনুমিতা দেখলেন পার্বতীর চোখে লেগে রয়েছে এক অদ্ভুত ভালোলাগা; শুধু চোখের দেখা দেখে মিটিয়ে নিতে চাইছে গায়ে পরতে না পারার, হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখতে না পারার অক্ষমতাটা।
সোনালী, রূপোলী জরির কাজ করা ভারি ভারি সিল্কের শাড়িগুলোর সাথে স্বমহিমায় বিরাজ করছে একটা গাঢ় বেগুনী রঙের ওপর কালচে বেগুনী সুতোর কাজ করা একটা হালকা পাতলা সুতির শাড়ি; পার্বতীর ভাষায় 'জাম রঙের জামদানি'। মনটা উদাস হয়ে গেল অনুমিতার। এই জামদানি শাড়িটা হিমাদ্রিবাবু দিয়েছিলেন পঁচিশ বছরের বিবাহবার্ষিকীতে। অনুমিতার দুই মেয়ের কেউই সচরাচর শাড়ি পরে না, আর পরলেও নিজেদের পছন্দের ফিনফিনে শাড়ি পরে, যার পোষাকি নাম ডিজাইনার শাড়ি। এইসব সাবেকি শাড়ি ওদের দিলে ওরা কি আর পরবে ? হয়তো, কোনো বড় ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে যখন এক্সচেঞ্জ অফার চলবে তখন পুরোনো জামাকাপড়ের সাথে এগুলোকেও বদল করে টেন পারসেন্ট ডিসকাউন্টে চাল, ডাল, তেল, নুন কিনে নেবে।
পার্বতী এখনও জুলজুল করে তাকিয়ে আছে জামদানি শাড়িটার দিকে।
"তোর এই শাড়িটা খুব পছন্দ হয়েছে, তাই না ?", হাসিমুখে জিজ্ঞেস করলেন অনুমিতা। অপ্রস্তুতে পড়ে হাত কচলাতে কচলাতে মাথাটা ডানদিকে অল্প একটু কাত করল পার্বতী।
বিছানার তোষকের তলায় পাট পাট করে গুছিয়ে রাখা প্লাস্টিক ব্যাগগুলো থেকে একটা ব্যাগ বার করে নিয়ে, জাম রঙের জামদানি শাড়িটা তার ভেতর ভরতে ভরতে অনুমিতা বললেন,"এই শাড়িটা আমি তোকে দিলাম। তোর বিয়ের তারিখে পরিস।"
ব্যাগটা হাতে নিয়ে একগাল হেসে অনুমিতাকে পায়ে হাত দিয়ে ভক্তিভরে প্রণাম করল পার্বতী।