মৌসুমী বন্দ্যোপাধ্যায়

 


চেনা

   

‘অ্যাই সৌম্য, তুই সিরিয়াস ?’ ফোনের এপাশে তটিনীর চোখ বড়বড় হয়ে গেল ।

‘অফ কোর্স । আমি সিরিয়াস নই বলে তোর কেন মনে হলো ? সৌম্য পালটা জিজ্ঞাসা করে । 

‘একটা ব্যাপার ভেবে দেখেছিস আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব কাউকে পাবো আমরা ?’ তটিনী বলে ।

‘হয়তো পাব না । কিন্তু বিশ্বাস কর তোকে ছেড়ে থাকতে আর একমুহূর্তও ভাল লাগছে না ।’ সৌম্য বলে ।

‘সে কি আমি বুঝি না বল ? কিন্তু তারপরেও...’

‘কী হলো ? থেমে গেলি কেন ?’ সৌম্যর অধৈর্য স্বরে বলে । 

‘জীবনের এমন গুরুত্বপূর্ণ দিনে কেউ থাকবে না ভাবলেই আমার মনখারাপ হয়ে যাচ্ছে ।’ তটিনীর গলায় মনখারাপের সুর ।

‘কতদিন হয়ে গেল বল তো ? আমরা দেখা করতে পারি না । ফোনের ভিডিও কলটুকু সম্বল ।’

‘সে তো অবশ্যই । কিন্তু...’ 

‘কোন কিন্তু নয় তটিনী । গতবছর থেকে অপেক্ষা করছি । বিয়ের দিন ঠিক হয়েও পরিস্থিতির জন্য বন্ধ করে দিতে হয়েছে । আর নয় । এই ভাইরাস এত সহজে যাবে না । তুই বিশ্বাস কর, আমার কাউকে লাগবে না । মন্ত্র, পুরোহিত, মালা, আলো, আড়ম্বর কিচ্ছু না । কাগজে সই করে তোকে স্বীকৃতি দিয়ে আমার ঘরে নিয়ে আসব ।’ গাঢ় স্বরে বলে সৌম্য । 

সৌম্যর সঙ্গে তটিনীর পরিচয় বছর তিনেক আগে । সিকিম বেড়াতে গিয়ে । সৌম্য বন্ধুদের সঙ্গে গিয়েছিল । তটিনী ছাত্রীদের নিয়ে কলেজ এক্সকারশনে । পাহাড়ে আলাপ । তাও এক অদ্ভুত পরিস্থিতিতে । রুমটেক মনাস্ট্রি দেখে তটিনী যখন ছাত্রীদের নিয়ে নামছে তখন দেখে তিনটে ছেলে গোল করে ঘিরে রেখেছে একটা ছেলেকে । সেই ছেলেটা যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে ।

‘আপনাদের কোনভাবে হেল্প করতে পারি ?’ তটিনী এগিয়ে এসেছিল ।

ছেলেগুলোর মধ্যে একজন বলেছিল, ‘আপনি কীভাবে হেল্প করবেন বলুন ? মনাস্ট্রি থেকে নামার সময় সৌম্যর পা মুচকে গেছে । এদিকে আমাদের গাড়িটাও বিগড়েছে । পারবেন একটা গাড়ির ব্যবস্থা করে দিতে ? কিংবা ডাক্তারের খোঁজ দিতে ? আপনার কাছে আছে এর সমাধান ? নেই তো ? তাহলে দাঁড়িয়ে না থেকে নিজের রাস্তা ধরুন ।’

তারপরেও আস্তে আস্তে বলেছিল, ‘যত্তসব ন্যাকা পাবলিক ।’

যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতেও সৌম্য প্রতিবাদ করেছিল, ‘ভদ্রভাবে কথা বল উদয় । বিপদে পড়ে মাথাটাই তোর কাজ করছে না ।’

তটিনী বলেছিল, ‘আমাদের গাড়িতে জায়গা আছে । ওঁকে তুলুন । সঙ্গে একজন আসুন । আমরা যে হোটেলে আছি সেখানে একজন ডক্টর আছেন । আশা করা যায় প্রাথমিক অবস্থাটা সামলে দিতে পারবেন ।’

সৌম্যকে হোটেলে নিয়ে এসেছিল তটিনী । ডক্টর রুদ্র সান্যাল মেডিসিনের ডাক্তার ।  দেখে বলেছিলেন, আমি যা বুঝছি ভাঙেনি । তবে ভালমতো চোট লেগেছে ।’ প্রেসক্রিপশন করে দিয়েছিলেন । সেইসঙ্গে এটাও বলেছিলেন, ‘এবারের মতো সিকিম ঘোরা বন্ধ । দু-একদিনের মধ্যে ব্যথা কমে যাবে । কিন্তু সেই নিয়ে এই পাহাড়ি জায়গায় ঘুরতে গেলে বিপদ ডেকে আনবেন । রেস্ট নিন । যেদিন ফেরার টিকিট আছে বাড়ি ফিরে যাবেন ।’

সৌম্যকে নিয়ে ফেরার সময় উদয় চোখ তুলে তাকাতে পারেনি তটিনীর দিকে । শুধু দুটো কথা বলেছিল, ‘স্যরি । থ্যাঙ্কস আ লট ।’

তটিনী হেসে উঠেছিল । 

সৌম্যর সঙ্গে আলাপ এভাবেই । ঘনিষ্টতা হয়েছিল সমতলে নেমে । সৌম্যর বাড়িতে লোক বলতে মা । তটিনীর বাড়িতে বাবা আর ছোটভাই । সৌম্য যখন ক্লাস নাইনে পড়ে বাবাকে হারায় । ক্যানসার । একেবারে শেষ অবস্থায় ধরা পড়ে । অনেক চেষ্টা করেও বাঁচানো যায়নি । 

আলাপ গাঢ় হতেই তটিনীকে নিয়ে এসেছিল সৌম্য মায়ের কাছে । তটিনীকে কাছে বসিয়ে ভাল করে দেখেছিলেন সৌম্যর মা । খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে অনেক কথা জিজ্ঞাসা করেছিলেন । 

বলেছিলেন, ‘সৌম্যর মুখে শুনেছি তোমার মা ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাকে মারা যান । সেটাই সত্যি তো ? আসলে কী বলো তো অনেকে সত্যি ঢাকতে এমন কথা বলে থাকে ।’

তটিনী ভাবতেও পারেনি এমন কথা সৌম্যর মা বলতে পারেন । খুব কষ্ট পেয়েছিল তটিনী । সৌম্যর মায়ের পরিবর্তে অন্য কেউ এই ধরণের কথা বললে তটিনী তাকে ছেড়ে দিতো না ।

এক্ষেত্রে পারেনি । তটিনী জানে কত কষ্ট করে সৌম্যকে তার মা বড় করেছেন । ক্লাস নাইনে পড়া ছেলেকে একা হাতে বড় করা যে কতটা কঠিন তা বুঝতে তটিনীর অসুবিধে হয়নি । নিজের খারাপ লাগা, কষ্ট নিজের মধ্যেই রেখে দিয়েছিল । 

সৌম্য রাতে ফোনে জানতে চেয়েছিল, ‘কী রে, আমার মাকে কেমন লাগল বলনি না তো ?’

তটিনী পারেনি সত্যি কথা বলতে । হেসে বলেছিল, মায়েরা সবসময় ভাল হন । এটা আবার আলাদা করে বলার কী আছে ?’

সৌম্যর হাসিতে তটিনী বুঝতে পারে সৌম্য আজ খুব খুশি ।   

তটিনী মাকে আচমকা হারিয়েছিল । সেদিন ছিল রুকু মানে ভাইয়ের জন্মদিন । খাওয়াদাওয়া মিটতে প্রায় বারোটা হয়ে গিয়েছিল । তারপর শুয়েই ঘুমিয়ে পড়েছিল । ঘুম ভাঙল বাবার ডাকে । ধড়মড়িয়ে উঠে দেখে বাবা ঠিক করে কথা বলতে পারছে না । শুধু নিজেদের ঘরটা দেখাচ্ছে । তটিনী দৌড়ে গিয়েছিল বাবা-মায়ের ঘরে । দেখে মা স্থির চোখে সিলিং-এর দিকে তাকিয়ে আছে । মাকে পাগলের মতো ঝাঁকিয়েছিল তটিনী । সাড়া মেলেনি । ডাক্তারকাকু এসে বলেছিলেন, ‘কাডিয়াক অ্যারেস্ট ।’ তটিনীর তখন মাস্টার্সের ফাইনাল ইয়ার আর ভাই বিএসসি ফার্স্ট ইয়ার । 

মা চলে যাবার পর থেকে তটিনী লক্ষ্য করেছে বাবা কেমন যেন হয়ে যাচ্ছে । অত হাসিখুশি প্রাণোচ্ছল বাবার মুখে হাসি নেই । সে আর রুকু নিজেদের মতো করে সামলেছিল । ওরা তিনজন একসঙ্গে বসে খাচ্ছে, কথা বলছে । অথচ তারই মধ্যে বাবা নিজের চারদিকে এক অদৃশ্য দেওয়াল তুলে রেখেছে । তটিনী অনেকবার চেষ্টা করেছে সে দেওয়াল পেরিয়ে বাবার কাছে পৌঁছতে । পারেনি । 

সৌম্যর ইচ্ছার কথা বাবাকে বলার পর তটিনী দেখল অনেকদিন পর বাবার চোখমুখে খুশির ছোঁয়া ।

‘সৌম্য তো ঠিক বলেছে । শুভ কাজে দেরি করতে নেই ।’

‘কিন্তু বাবা, এই পরিস্থিতিতে তোমাদের ছেড়ে যেতে মন চাইছে না ।’ তটিনী বাবার কোল ঘেঁষে বসেছিল । 

‘পাগলি আমার ।’ তটিনীর মাথায় হাত রেখে বাবা বললেন । 

অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে নতুন ঘরে পা রাখল তটিনী । সৌম্যর মাকে নিয়ে একটু হলেও সংশয় ছিল । নাহ্‌, ঠিকই আছে । প্রথমদিন ছাড়া আর কোনদিনই এমন কোন কথা বলেননি যাতে তটিনীর খারাপ লাগতে পারে ।

বিয়ের একমাস পার হওয়ার আগেই একদিন ভোরবেলা বাবার ফোন । 

‘যত তাড়াতাড়ি পারিস হসপিটালে আয় । রুকুকে অ্যাডমিট করিয়েছি । হসপিটালের নাম ঠিকানা ফোনে মেসেজ করে দিয়েছি ।’

ফোন রেখেই ধাক্কা দিয়ে সৌম্যকে ডাকে ।

‘শিগগির ওঠ । রুকুকে বাবা হসপিটালে নিয়ে গেছে । আমাদের এক্ষুনি যেতে হবে ।’   

‘কী হয়েছে রুকুর ?’ সৌম্য ঘুম চোখে বলে ।

‘জানি না । এত কথা বলিস না এখন । চটপট ওঠ । আমাদের এক্ষুনি বেরোতে হবে ।’

তটিনী আর সৌম্যর কথার শব্দে সৌম্যর মা ওদের ঘরে আসেন । সব শুনে বলেন, ‘তোমাকে কি যেতেই হবে তটিনী ?’

অবাক হয়ে যায় তটিনী । কী বলছেন উনি !

‘বাবা ওখানে একা । আমি এখনও জানি না রুকুর কী হয়েছে । এটা বুঝতে পারছি খুব সাংঘাতিক কিছু একটা হয়েছে । নাহলে বাবা এত ভোরে ফোন করে জানাত না ।’

‘দেখো, আমি সব বুঝতে পারছি । কিন্তু এই পরিস্থিতিতে তোমার হাসপাতাল ঘর করা কি উচিত ? এখন  প্রতিটা মুহূর্ত আতঙ্কের । সৌম্যকে যেতে অ্যালাও করব না । তাছাড়া এই বাড়ির নিরাপত্তার কথাটাও তোমার ভাবা উচিত ।’ সৌম্যর মা বলেন ।

সৌম্যর চোখে চোখ রেখে শান্তভাবে বলে তটিনী, ‘তোরও কি একই কথা ?’

সৌম্য চোখ নামিয়ে নেয় ।

 

আইসিইউতে রুকু যন্ত্রণায় ছটফট করছে । ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলেছে তটিনী । আশাও যেমন দেননি ডাক্তারবাবু, নিরাশও করেননি । তটিনী ভেঙে পড়ার মেয়ে নয় । 

কিন্তু আজ সে ভেঙেচুরে যাচ্ছে । লজ্জায়, অপমানে মিশে যাচ্ছে । বুকের মধ্যে দুঃসহ কষ্ট । ভালবাসার মানুষ চিনতে এত ভুল হলো তার ! 

‘দেখ কে এসেছে ।’ বাবার গলার শব্দে মুখ তোলে তটিনী । 

‘কী দেখছিস ?’ সৌম্য হাসিমুখে বলে । 

টের পায় তটিনী বুকের চাপা কষ্ট মিলিয়ে যাচ্ছে । হেরে যায়নি সে । ভালবাসা চিনতে ভুল করেনি ।     


ছবি ঋণ: গুগল

    

  

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন