মধুছন্দা মিত্র ঘোষ

 


বনজ ঘ্রাণ, আরণ্যক স্নিগ্ধতা, খুনিয়া জঙ্গল ...

         

 

অরণ্যের গহীনে যত সেঁধাই, গাঢ়হয়বুনোছায়াঅরণ্য আবাসের গায় লেগে থাকে বন রোমাঞ্চ ঘেরা সবুজ সোহাগ। একফালি বিশ্রাম। কলকাতার দুগ্গাপুজো উৎসব ও ভিড়ে জেরবার সন্ধ্যে-রাত্রিগুলোকেনা-পসন্দ্ জানিয়ে আমরা পুজোর ছুটির দিনগুলোয় পাড়ি জমিয়েছি উত্তরবঙ্গেরজঙ্গলমহলে। উৎসবের ঢাকবাদ্দি রোশনাই থেকে ঢের দূরে। না-ফুরানো সবুজ ঘিরে এক পা এক পা ঢুকে যাচ্ছি বনপথে। পূর্ব অভিজ্ঞতায় টের পাচ্ছি এ পথে একবার আসা মানে বার বার ফিরে যেতে চাওয়া। এই যে বাঙালির একান্ত প্রিয় উৎসব, আনন্দ, ভিড়ভাট্টা থেকে দূরে, ‘দুয়ার’ হতে অদূরে – কোনও নিপাট অরণ্য ভ্রমণ, এই অনুভব কেবল সমমনস্ক পর্যটক মাত্রই অনুধাবন করতে পারবেন। যারা নিরালা নিরুচ্চার অন্য হাতড়ে চলে যান ‘দূরে কোথাও দূরে দূরে’।

          ডুয়ার্সের বনরোমাঞ্চ মানেই সবুজ ও শ্বাপদের মাঝে এক দ্বিধাহীন সফরনামা। যেদিকেই চোখ ফেরাই, সবুজে সবুজ। অনর্গল সবুজ ছড়াচ্ছে গাছপালা, ঝোপঝাড়, গুল্মলতা ও অফুরান চা বাগিচা। আশ্বিনের বাতাস তাতে উগড়ে দিচ্ছে বনের সুবাস। সেই বনজ ঘ্রাণ ও আরন্যক স্নিগ্ধতা নিয়ে খুনিয়া জঙ্গল। শরৎ মেঘের আকাশের নিচে জঙ্গলের তেজি বুনোট। নিউ জলপাইগুড়ি, শিলিগুড়ি, মহানন্দা অভয়ারণ্য, সেবক, বাঘপুল ছুঁয়ে মালবাজার, চালসা, পেরিয়ে গোরুমারা জাতীয় উদ্যানের থেকে চাপড়ামারি জঙ্গলপথে খুনিয়া জঙ্গল। বলা যায় পুব ও পশ্চিম ডুয়ার্সের আন্তঃসংযোগ হলো খুনিয়া। এইখুনিয়া বিট মূলত একটি সীমাহীন ছড়ানো তৃণভুম। মুর্তি অববাহিকায় অপার প্রসারিত জঙ্গলঘেরা লাটাগুড়ি - চালসা - মুর্তি - ধুপঝোরা - বাতাবাড়ি - রামসাই - নেওড়া নদীগর্ভে লালিত ক্ষেত্র। তৃণভূমির মাঝ বরাবর জেগে আছে এক বিশাল নজরমিনার। এই খুনিয়া নজরমিনারের পোশাকি নাম ‘চন্দ্রচূড় নজরমিনার’।

          আমাদের দিন তিনেকের ঠেক মুর্তি নদীকুলের দোরগোড়ায় বনআবাস ‘বনানী’তে। খুনিয়ায় পর্যটকদের থাকার কোনও ব্যাবস্থা নেই। শুধু জঙ্গুলে ঘ্রাণ নেওয়া ছাড়া। সকালটায় বরাদ্দ ছিল খুনিয়া জঙ্গল দর্শন। ডব্লু.বি.এফ.ডি.সি. অধীনে এই সুন্দর বনআবাস কতৃপক্ষ জঙ্গল ভ্রমণের টিকিটের ব্যাবস্থা করে দিয়েছে। অদ্ভুত নিস্তব্ধতাকেসঙ্গী করে বনবিভাগের জিপসি গাড়িতে চলেছি। যেখানে অরণ্যের প্রতিটি পাতা থেকে পাতার শরীরে লেপটে আছে বিশুদ্ধ বণ্য মহক। আছে ছমছমে রোমাঞ্চ। যে আলাদা রোমাঞ্চগুলি ডুয়ার্সের জঙ্গলমহলের জন্যই তোলা থাকে কেবল। মায়াবী ভ্রমণের রুদ্ধশ্বাসটুকু ধরা থাকে তাতে। কুয়াশার আস্তরণ চিরে ওই যে চা বাগান, অকাতর গাছপালা, এন্তার ঝিঁ ঝিঁ ডাক।

          খুনিয়া মোড় এ অঞ্চলের একটি উল্লেখযোগ্য সন্ধিস্থলবাতাবাড়ি বস্তি ও বাতাবাড়ি জঙ্গল একপাশে। গোরুমারা জঙ্গল পার হলে বাতাবাড়ি চা বাগান। সেখানে বাতাবাড়ি খামারের প্রায় উল্টোদিকে আঁকাবাঁকা ধানক্ষেতের মাঝ বরাবর এবড়োখেবড়ো পথটা থমকে দাঁড়িয়েছে ‘মাথাচুলকা’ এমন অদ্ভুত নামের আরেক বস্তিতে। নীল আকাশের ছাউনির নীচে মুর্তি নদীর কোলে নিঝুম প্রকৃতি আর সবুজের মাঝে রয়েছে ‘কাকুর বাড়ি’ নামের এক অবসরের ঠেক। ওপাশে ডানদিকে দক্ষিণঝোরাবিটের অধীনে শিমূল শিরীষ গাছের পরিবহে রয়েছে ‘গাছবাড়ি’। এই গাছবাড়ির কাছেই কাইঞ্জল নজরমিনার। খবর পেলাম, সন্ধ্যে ঢললে এই গাছবাড়িতে নাকি ভাওয়াইয়া গানের তালে স্থানীয় আদিবাসীদের নাচের আসর বসানোর ব্যাবস্থা আছে। পেছনেই জঙ্গল মাঝে সেই ‘কাকুর বাড়ি’ আস্তানা। আরণ্যক পরিবেশে বলাই বাহুল্য এই দুই ঠিকানা খুনিয়া সফরে অন্য মাত্রা এনে দেবে। খুনিয়া মোড় থেকে একটা পথ গেছে ভারত-ভুটান সীমান্তের শেষ গ্রাম বিন্দুতে। অন্য আরও একটা পথ চলে যাচ্ছে মালবাজার। ওদিকে আরও একটা পথ গেছে এক শৃঙ্গী গণ্ডারের আবাসভূমি জলদাপাড়া।

 খুনিয়া বস্তিও আগে ছিল ঘন ঘোর জঙ্গলের মাঝেসমস্ত এলাকাকে ব্যাপ্ত ও পরিচ্ছন্ন রাখার তাগিদে বনদপ্তর পরবর্তীতে বস্তির পরিবারগুলির থাকার জন্যআপাতত সেটিকে জঙ্গলের এক্তিয়ারের বাইরে পুনর্বাসন দেওয়া হয়েছে। যাতে জঙ্গলের পরিসর আরও কিছুটা বাড়ানো যায়। এপথে যেতে যেতে নিজের মতো করে চিনে চিনে নিচ্ছি ঘুরঘুট্টি সব গ্রাম্য বস্তি। মুর্তি নদীর অববাহিকায় গোরুমারা থেকে চাপড়ামারি অরণ্যপথেই খুনিয়া বিটের বিস্তৃতি। চাপড়ামারি থেকে খুনিয়া সাকুল্যে ১ কিলোমিটার মাত্র। জাতীয় সড়ক ৩১ সাঁতরে খুনিয়া জঙ্গলের অন্দরে পৌঁছে যাওয়া যায়। জাতীয় সড়কপথ ৩১ বি পারাপার করে বাঁদিকে সুরসুতি জঙ্গল থেকে ডাইনে গোরুমারা জঙ্গলপানে ঢুকে গেলেক দঙ্গল বুনো হাতি। আমরা তো বেবাক হাঁ করে চেয়ে আছি। আমাদের জিপসি গাড়ির গতিও রুদ্ধ। ওরা নাকি এরকমই জঙ্গল পারাপার করে। তবে মোবাইল ক্যামেরা তাক করতে না করতেই হাতি পরিবার জঙ্গলের ঝোপঝাড়ের আড়ালে গলে গেল। খালি চোখেই দেখে নিলাম ওদের চাল চমক। মুঠো ফোনে ধরে রাখা আর হলো না।অরণ্যের মাটিতে রাখা আছে হারানো এক সোঁদা গন্ধ। বর্ষা পরবর্তী ভিজে স্যাঁতস্যাঁতে পরিবহ। সেই সোঁদা ঘ্রাণ ভরছে প্রতিটি প্রশ্বাসবায়ুর সযত্ন লালনে। ফুসফুস ভরে যাচ্ছে অকৃপণ সবুজ সতেজতায়। এমন কী প্রাণখোলা মনও।

          এক টুকরো গ্রামই বলা যায় খুনিয়া বিট লাগোয়া অঞ্চলটিকে। মুর্তি নদীর ওপর যে লোহার রেলিং দেওয়া সাঁকোটা চলে গেছে, সে সাঁকো পেরোতেই ঝাঁপিয়ে এল গা ছমছমে জঙ্গল। অর্জুন, বয়রা, শাল, গামার, সেগুনের দামালঅরণ্যছায়ায় খুনিয়া জঙ্গলের তাবৎ পথও কিছুটা ছায়া মেখেছে। সাঁকোর নিচে মুর্তির চেনা কুল কুল চপলতা।  এ পথ কখনও পিচ মোড়া, তো কখনও আবার পায়ে চলা মেঠো জঙ্গুলে পথ। শুনলাম, এখানেই নাকি পরিচালক গৌতম ঘোষ তাঁর ‘দেখা’ ফিল্মটির কিছুটা চিত্রায়ন করেছিলেন। খানিক দূর যাওয়ার পর গাছের সারি ক্রমশ ফিকে হয়ে আসে। ফাঁকা এক জমির মাঝে গাঢ় সবুজ রঙা তিনতলা এক নজরমিনার। এটি খুনিয়া বিটের ‘খুনিয়া ওয়াচ টাওয়ার’ নামেই পর্যটকমহলে বেশি পরিচিত। তবে এই নজরমিনারের অন্য একটি পোশাকি নামও আছে ‘চন্দ্রচুড় ওয়াচ টাওয়াচ’এখান থেকে নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে অনেকখানি অঞ্চল দেখতে পাওয়া যায়। নজরমিনারটি বেশ সুবিধাযুক্ত পয়েন্টে গড়ে তোলা। তাই সামগ্রিক দৃশ্যপট ও মুর্তি নদীর আঁকাবাঁকা চলন দেখতে পাওয়া যায়।

          আমরা যে সময়টায় গেছি, দেখি নজরমিনারের একদম নিচের সিঁড়ির রেলিংটা সদ্য সারাইয়ের চিহ্ন। রঙের প্রলেপও পড়েনি ওই অংশটিতে তখনও। বনপ্রদর্শক জানালেন, গতকালই ভাঙা রেলিংটা তাপ্পি মেরে সারানো হয়েছে। তবে এই রেলিং ভাঙার কীর্তিটি নাকি এখানকারই এক গণ্ডারের। কাঠের সিঁড়ি বেয়ে উঠে যাই একদম টঙে। খালি চোখেই সুন্দর দেখা যাচ্ছে চারপাশ। এখান থেকে নির্জন দুপুরে অথবা ভোরের দিকে বাইসন, গণ্ডার, হাতি, সম্বরদের দেখে ফেলাটা আদৌ কষ্টকর নয়। সে কথা ভেবেই ক্যামেরায় চোখ লাগিয়ে কিছুটা সর্তক থাকি। ওই পেল্লাই ওজনদার বন্যপ্রাণীদের কেউ আমার লেন্সের আওতায় এলেই সাটার টিপে দেবো। হা হতোস্মি ! কোথায় কী ? আমার আর সাটার টেপা হয় না। ক্যামেরা থেকে চোখ সরিয়ে খালি চোখেই চারপাশ নজরআন্দাজ করতে থাকি। অদ্ভুত নীরবতায় আক্রান্ত হই।

          এখন এই মুহূর্তে হোটেল ঘরে ফিরেও চোখের পাতা জুড়ে ছুঁয়ে আছে জঙ্গলের গন্ধমাখা ঘুম।বাতাসে কিছুটা ভালবাসা ছড়িয়ে দিই। নদী ও জঙ্গল যেন একান্নবর্তী পরিবার। মুর্তি বনআবাসটাকে মনে হয় কোনও প্রিয়জনের ঠিকানা।ফ্যাকাশে চাঁদটা নিশ্চয়ই এখন জঙ্গলের বিরল হাওয়ায় কেঁপে কেঁপে ওঠা রূপে প্রতিভাত হচ্ছে।মূর্তির নদীজলে ফ্যাকাশে চাঁদের আলোর নিরাভরণ আসা যাওয়া। নিস্তব্ধ রাতকে জড়িয়ে নিঝুম এলিয়ে থাকে মূর্তি নদীর গা ঘেঁষে থাকা এই বনআবাস ‘বনানী’। ভরা জ্যোৎস্নায় মূর্তি নদী থাকে এক অদ্ভুত রম্যতায়। এখন চাঁদের ফ্যাকাসে রূপফিকে রৌণক। রাতের জঙ্গলে এই আবছা আঁধারটুকুই সম্বল।