পল্লববরন পাল

 


কবিতাড্ডায় ঈশ্বরনির্মাণ


কবিতার জন্ম হয় অন্তত দু’বার| প্রথমবারের মা হলেন অবশ্যই কবি স্বয়ং| দ্বিতীয় মা পাঠক| 

 

প্রবন্ধ-টবন্ধ বড্ডো ভারি কথা, গম্ভীর কথা, অধ্যাপকের বক্তৃতার মতো রসকষহীন – ভীষণ সিরিয়াস সিরিয়াস ব্যাপার - আমার ওসব আবার ঠিক আসেনা| আমি নিছক বাউণ্ডুলে অগোছালো আড্ডাবাজ মানুষ – 

মানুষ!!! 

উরিব্বাবা! এও তো বড্ডো শক্ত ও প্রমাণসাপেক্ষ্য কথা! পৃথিবীতে দেশে দেশে যত শাসক আছেন, তাদের কতজনকে আপনি মনুষ্য পদবাচ্য বলে মনে করেন? অবশ্য ওনারা নিজেরা নিজেদের মানুষ ভাবেন না, ঈশ্বর ভাবেন - যাগ্যে, কথায় কথা বাড়ে| মানুষ সত্যি সত্যি মানুষ হয়ে উঠতে পারে কিনা, বা আর কী কী করলে আমি মানুষ হয়ে উঠতে পারবো, আপনাদের অনুমতিসাপেক্ষে পরে কোনোদিন চাইলে এই বিষয়ে আড্ডা দেওয়া যেতে পারে| আপাতত আসুন, রসময়ের চায়ের দোকানের ছারপোকাসমৃদ্ধ তেল কুচকুচে বুড়ো থুত্থুরে বেঞ্চিতে পা তুলে জমিয়ে বসে – 

…‘দেশলাই? আছে|

ফুঃ, এখনও সেই চারমিনারেই রয়ে গেলে?

তোমার কপালে আর ক’রে খাওয়া হল না দেখছি|

বুঝলে মুখুজ্জ্যে, জীবনে কিছুই কিছু নয়

যদি কৃতকার্য না হলে|…

 

বিলক্ষণ ঠিক ধরেছেন| হ্যাঁ, সুভাষ মুখোপাধ্যায়| মুখুজ্যের সঙ্গে আলাপ| যত দূরেই যাই, ১৯৬২| এমনি আড্ডার মেজাজেই কবিতা লিখতেন সুভাষ মুখোপাধ্যায় – সহজ কথায়, আটপৌরে মেজাজে, উদ্বায়ী হালকা শব্দ বনতে বুনতে – 

…‘আকাশে গুড়গুড় করছে মেঘ –

ঢালবে|

কিন্তু খুব ভয়ের কিছু নেই;

যুদ্ধ না হওয়ার দিকে|

আমাদের মুঠোয় আকাশ,

চাঁদ হাতে এসে যাবে|

 

ধ্বংসের চেয়ে সৃষ্টির,

অন্ধকারের চেয়ে আলোর দিকেই

পাল্লা ভারি হচ্ছে|…’   

 

দেখলেন? আড্ডার এই এক মুশকিল| কোথা থেকে কোথায় ছুটে যায় – আগে থেকে অনুমান দুষ্কর| কবিতা নিয়ে নিছক আড্ডা মারতে গিয়ে সবেমাত্র দেশলাই চাইতেই কেমন ধাঁ করে সৃষ্টিতত্ত্বে পৌঁছে যাওয়া গেলো! আড্ডার শুরুতেই এই যে দুম করে একটা বোম্বাস্টিক কথা বলে ফেললাম – কবিতার জন্ম হয় অন্তত দু’বার - 

দাঁড়ান দাঁড়ান, আগে নিজে ব্যাপারটা বুঝি কিনা দেখি - নিজে বোঝার আগে অন্যকে বোঝানো যায় নাকি?  

 

আচ্ছা, জীবনে সব অভিজ্ঞতা কি আমরা জলের মতোন পরিষ্কার বুঝি? জল কি পরিষ্কার? স্বচ্ছ? তাহলে পরিশ্রুত জলের জন্য এতো ফিল্টার লাগে কেন? আচ্ছা, জল-কেও কি আমরা পুরোপুরি বুঝি? জলের অপর নাম জীবন – জীবন বুঝি? জীবনের কোন জিনিসটা আমরা পুরোপুরি বুঝি বলুন তো? আমার চৌঁত্রিশ বছরের চব্বিশ গুন সাত বউ – তিরিশ বছরের চব্বিশ গুন সাত পুত্র – চিনি? বুঝি? মাছ টাটকা না পচা বুঝি? পিকাসো গগ্যাঁ বুঝি? ফিদা হুসেন গণেশ পাইন বুঝি? ভীমসেন যোশী বিসমিল্লা খান? গুলাম আলি জগজিৎ সিং? গজল? রবীন্দ্রসঙ্গীত? ‘ফুলের মতো সহজ সুরে, প্রভাত মম উঠিবে পুরে’ – এর মানে কি? ফুলের আবার সুর কী? কী মানে এর? কী বুঝলাম? 

 

তবে হঠাৎ কবিতার আগাপাশতলা, মাথার চুল থেকে পায়ের নখ - প্রত্যেকটা অণু পরমাণূকে সেকালের বৌ পছন্দ করার মতো ‘একটু হাঁটো তো মা’ ‘খোঁপাটা খোলো তো মা’ করে বুঝতেই হবে – এ মাথার দিব্যি কে কখন কোথায় কবে কেন দিয়েছেন? পিকাসোর গুয়ের্নিকার সামনে দাঁড়িয়ে বিজ্ঞ মাথা দুলিয়ে আমরা বলে উঠি – বাঃ – ঋষভ-ধৈবত বুঝিনা, কিন্তু ভীমসেন কালোয়াতিতে চোখ বুঁজে আপ্লুত হয়ে উঠি – গুলাম আলি শুনে ঠোঁট উল্টে বলি – ওয়াহ্‌, কেয়া বাত – কিন্তু কবিতার ক্ষেত্রে? নাক সিঁটকে, মুখ ভেঙচে, ভুরু কুঁচকে চোঁয়া ঢেকুর কন্ঠে বলি – কিস্যু বুঝলামনা! সর্বনাশের বীজতলাটি ঠিক এইখানেই – ‘গভীরতম অসুখ’| কোন্‌ সংবিধানে লেখা আছে যে, কবিতার আপামাথা না বুঝলে সে কবিতাই নয়? বোঝার চেষ্টা করা যাক – চেষ্টাই বলছি, কারণ – জানিনা টার্মিনাস অবধি পৌঁছনোর মতো পেট্রল রসদ আছে কিনা – নিজের ক্ষমতা কি কেউ কোনোদিন সঠিক জানতে বা বুঝতে পারে? – তবু, এটা কৈফিয়ৎ নয়, বরং আত্মখনন সঠিকতর শব্দ – যদিও বীজতলার যেখানে কোদাল পড়বে, সেটা পাথর নাকি মাটি – জানিনা, এবং খনন সম্ভব হলেও কোনো নিরঙ্কুশ সত্যের শাশ্বত শিলালিপি উদ্ধার হবে কিনা – তাও জানা নেই|

 

তবু – এগোনো যাক| আড্ডাই তো – মহামান্য আদালতের সামনে গীতা ছুঁয়ে তো শপথ বাক্য পাঠ করছি না - প্রবন্ধ তো নয়, যে হাড়হিম কোনো উপসংহারে পৌঁছতেই হবে| 

 

গত শতাব্দীর সাতের দশকে কলকাতা রবীন্দ্রসদনে কোনো এক সঙ্গীতানুষ্ঠান শুরুর আগে এক অনু্রাগিনী একটা বিশেষ গানের অনুরোধ জানালে উত্তরে দেবব্রত বিশ্বাস বললেন – যদি আসে, গাইমু – তারপর স্টেজে উঠে শুরু করলেন তাঁর উপাসনা – গানের সূত্র ধরে কথার সঙ্গে কথা, শব্দের সঙ্গে শব্দ, সুরের সঙ্গে সুর, গানে গানে বন্ধন টুটে অনুভূতির সঙ্গে অনুভূতি বুনে বুনে আলোর মালা গাঁথতে গাঁথতে চললো তাঁর ভাবের বিস্তার – পূজা প্রেম বা প্রকৃতি সব একাকার - প্রত্যেকটা গান বর্ণ শব্দ সুর বোধ সহ নতুন করে আবিস্কৃত হলো একটা বৃহৎ শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ হিসেবে – সে শরীর সুন্দরের, সত্যের, জীবনের| আর সেই অনুরাগিনী? অনুরোধের সেই গানটির কথা ততক্ষণে হয়তো বিস্মৃতই হয়ে সেই মহাসত্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নিজস্ব আবিষ্কারে তন্ময় বিভোর| 

দেবব্রত বিশ্বাস নির্মাণ করলেন, আর সেই অনুরাগিনী সমেত সদন ভর্তি শ্রোতারা প্রত্যেকে নিজস্ব বোধের জমির ওপর নির্মাণ করলেন নিজস্ব নিজস্ব শ্রবণ অভিজ্ঞতায়| কবিতাই তো লিখলেন দেবব্রত সুনীল সাগরে, সহস্র শ্রোতার বুকের শ্যামল কিনারে আলাদা আলাদা করে যার জন্ম হলো – সে-ই তো তুলনাহীনা, তারও নাম তো কবিতা| 

 

শুয়ে আছে বিছানায়, সামনে উন্মুক্ত নীল খাতা

উপুড় শরীর সেই রমণীর, খাটের বাইরে পা দু’খানি

পিঠে তার ভিজে চুল

                     এবং সমুদ্রে দুটি ঢেউ

ছায়াময় ঘরে যেন কিসের সুগন্ধ,

                           জানলায়

রৌদ্র যেন জলকণা, দূরে নীল নক্ষত্রের দেশ|

 

কী লেখে সে কবিতা? না কবিতা রচনা করে তাকে?       [কবিতা মুর্তিমতী – সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়]

 

কবিতার শরীরটা লক্ষ্য করুন – প্রথম দু’টি লাইনে দুটি করে চারটি বাক্য বা ছবি – মধ্যিখানে যতিচিহ্ন| লাইনের শেষটা মুক্ত| তৃতীয় লাইনটি দৈর্ঘ্যে ছোটো - একটি ছবি, যতিহীন, আর চতুর্থ লাইনে বাঁদিকের মার্জিন থেকে অনেকটা শূন্যতার শেষে ‘এবং সমুদ্রে দুটি ঢেউ’| তৃতীয় লাইনের ‘ভিজে চুল’ থেকে লাইনের শেষাংশ হয়ে চতুর্থ লাইনের প্রথমাংশ – পাঠকের স্বাধীনতা – খোলা আকাশ – যেন দুটি দ্রষ্টব্যস্থলের মধ্যবর্তী পথ - ইচ্ছেমতোন ভ্রমণ করুন – পায়ে হেঁটে বা ঘোড়ায় টানা টাঙ্গায় - রমণীশরীরের মধ্যবর্তী আরো কোনো স্টেশনের ছবি ওই শূন্যস্থানে বসিয়ে বিশদ হতে চাইলে হোন, অন্যথায় ওই শূন্যতার ছবিও রাখতে পারেন – শূন্যতারও নিজস্ব সম্ভ্রান্ত বর্ণমালা আছে, সুর আছে, সরগম আছে - তা দিয়েও মহাকাব্য লেখা যায় বৈকি| লক্ষ্য করুন, দ্বিতীয় লাইনের রমণী চতুর্থ লাইনে সমুদ্র হয়ে গেছেন উপুড় শরীরের রেখায় ঘাড় থেকে নিতম্ব ঢেউ রচনা করে| ছবির আবহ তৈরি হচ্ছে পরবর্তী তিন লাইনে – ঘর, ঘর থেকে জানলা গলে বাইরে এসে মহাশূন্য - একমাত্রিক, দ্বিমাত্রিক, ত্রিমাত্রিক - এবং শেষে দাড়ি, পূর্ণযতি| সিনেমার ভাষায় ‘কাট্‌’| অষ্টম লাইনে বিরতি| 

এবারে দ্রোণাচার্যের সরাসরি প্রশ্ন একশো পাঁচ ছাত্রদের উদ্দেশে – 

কী দেখছো সামনে? 

প্রশ্নটাকে আরো সহজ করে দিলেন কবি -  

কে কাকে লিখছে – উপুড় শুয়ে রমণী কি কবিতা লিখছে, নাকি কবিতা সেই রমণীর ছবি আঁকছে? 

এসো অর্জুন – সপাট জবাব দাও দেখি – পাখির চোখ

 

একদম সিনেমার মতো - পথের পাঁচালী - ইন্দির ঠাকরুণের দাওয়া – সন্ধ্যেবেলা – স্ক্রিন জুড়ে মাটিলেপা এবড়োখেবড়ো দেয়ালে পিসি আর ছোট্টো দূর্গা-অপুর মুখোমুখি ত্যারাব্যাঁকা ছায়া – এত্তোবড়ো - পিসির হাড়জিরজিরে হাত নড়ছে, আঙুল নড়ছে, পিসি গল্প বলছেন – হাঁউমাউখাঁউ – ক্যামেরা পিছিয়ে গেলো – দাওয়ায় বসে ভাইবোনে – হাঁ করে পিসির দিকে তাকিয়ে – উভয়ের মাঝখানে হ্যারিকেন না তেলকুপি মনে নেই, কিন্তু আলো কাঁপছে, ছায়া দুলছে – ক্যামেরা আরো পেছোচ্ছে – পিসির জীর্ণ ঘর, উঠোনের মাঝখানে তুলসীমঞ্চ … যেন ওই হাঁউমাউখাঁউ গল্পটা আস্তে আস্তে দাওয়ার মাটিলেপা মেঝে থেকে গড়িয়ে এইমাত্র নেমে এলো উঠোনে

 

এটা কী? সিনেমা? নাকি সিনেমায় কবিতা লিখলেন সত্যজিৎ? 

‘কী লেখে সে, কবিতা? না কবিতা রচনা করে তাকে?’

 

কোনটা কবিতা? সুনীল যা করলেন, সেটা কী - ছবি লেখা নাকি কবিতা আঁকা? শেষ লাইনের প্রশ্ন দুটি কি আদৌ প্রশ্ন, নাকি উত্তর? ছয় বাই সাত বিছানা থেকে এই যে অসীম অনন্ত ছ’লক্ষ বাই সাতলক্ষ আলোকবর্ষ নক্ষত্রের দেশ – অথচ সুনীল পৌঁছে গেলেন মাত্র সাত পা হেঁটে – সাত লাইনের শেষে সপ্তম স্বর্গে পৌঁছোলেন সুনীলের হাত ধরে পাঠকও - এই যে পথ, যে বেঁধে দিলো বন্ধনহীন গ্রন্থি – এই তো কবিতা!

 

Poetry is a journey of experience with imaginative awareness expressed through meaning, sound, and rhythmic language choices so as to evoke an emotional response. Poetry is an ancient form that has been going through numerous and drastic reinvention over time. The very nature of poetry as an authentic and individual mode of expression makes it nearly impossible to define.

আদৌ কোনো সংজ্ঞা হয়না, এটাই বোধহয় কবিতার আসল সংজ্ঞা| 

 

পাবলো নেরুদার কবিতার অংশ – কবিতার নাম ‘কয়েকটা জিনিস বুঝিয়ে দিচ্ছি’ - অনুবাদ সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের – এখানে কবিতার শরীর অতো গোলগাল নয়, টানটান মেদহীন, শপাং – কবিতার চরিত্র গঠনে শরীরের ভূমিকা কতোখানি, বোঝা যায়|   

       এসো দেখ রক্ত রাস্তাময়,

এসো দেখ

রক্ত রাস্তাময়।  

এসো দেখ রক্ত

 

রাস্তাময়

চারটি শব্দ নিয়ে প্রথম বাক্য বা লাইনে একটা গোটা বিবৃতি – শ্লোগানের মতো| পরবর্তী দুটি বাক্যেও ঐ চারটিই শব্দ – পরপর, একইভাবে – অথচ দুটি বাক্যের দুটি ভিন্ন শরীর – মাঝখানে লাইন ভাঙতেই ভিন্ন ছবি, ভিন্ন বিবৃতি, ভিন্ন অভিঘাত – আবার শেষ বাক্যে ‘রক্ত’ ও ‘রাস্তাময়’-এর মাঝে একটা আস্ত লাইনের নিস্তব্ধতায় যেন রক্তের স্রোত বা বিস্তৃতির গতিটাও পাঠকের বোধগম্যতাকে ছুঁয়ে যায়| নৈঃশব্দের দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে খেয়ে অনুভূতি ক্রমাগত প্রতিধ্বনিত হয় – যেন অক্ষরগুলো আস্তে আস্তে বড়ো হয়ে উঠছে – ১২ পয়েন্ট থেকে ১৪ ১৬ ১৮ ২৪ ৩৬ …… তিন অঙ্ক, চার অঙ্ক …… 

এই পংক্তিগুলো এভাবেও তো লেখা যেতো – 

এসো দেখ রক্ত রাস্তাময়

এসো দেখ - রক্ত রাস্তাময় - 

এসো দেখ রক্ত – রাস্তাময়

 

একইরকম কি হলো? অর্থ? কবিতার মেজাজ? হলো না| চাবুকের ঘায়ের মতো চিড়বিড় করে উঠলো? না। তীরের ফলার মতো বিঁধলো? বিঁধলো না| ধারালো শব্দগুলো কেমন যেন সেই তীক্ষ্ণতা বা নিজস্ব ঝাঁঝ হারিয়ে ফেললো| আর, কবিতার শরীরের সেই ঋজু বলিষ্ঠ সিক্সপ্যাক্‌ চরিত্রটাও উধাও| অর্থাৎ, কবিতার ক্ষেত্রেও ‘পহলে দর্শনধারী’ তত্ত্ব পূর্ণমাত্রায় বলবৎ| 

আরো একটা কারণে কবিতার শরীর খুব গুরুত্বপূর্ণ – ছন্দ| তাল| কবিতার মেজাজ অনুযায়ী কবি ছন্দে বাঁধেন কবিতাকে –

‘বাবুদের      লজ্জা হলো

আমি যে      কুড়িয়ে খাবো

সেটা ঠিক     সইল না আর

আজ তাই     ধর্মাবতার

আমি এই     জেলহাজতে

দেখে নিই     শাঠ্যে শঠে|...

 

হ্যাঁ| শঙ্খ ঘোষ| লজ্জা| কবিতার শরীর দেখেই পাঠের সময়ে পাঠক ছন্দটাকে বুঝে ফেলছেন অনায়াসে| এই প্রসঙ্গে অন্য এক কবির একটা কবিতার উদাহরণ দিই – কবি লিখলেন - 

চুম্বন          এক মন্দির উপাসনার

চুম্বন          মহাকাব্য সংস্করণ

চুম্বন          মৃতসঞ্জীবনীর সুধা

চুম্বন          দুই ওষ্ঠে সেতুর গড়ন ...    

এ কবিতায় ছন্দটা লক্ষ্য করুন| সহজ ছন্দ – 

চুম্বন এক | মন্দির উপা | সনার  

চুম্বন মহা | কাব্যসঙস্‌ | করণ … ইত্যাদি – 

অথচ কবির লেখার বিন্যাসে ‘চুম্বন’-এর পরে খানিকটা শূন্যস্থান| কেন? – আরে মশাই, সামান্য জল খেলেও ঢেকুর তোলার সময়টা লাগে, চুমু খাওয়ার জন্য সময় দেবেননা? ‘চকাস্‌’ – ব্যাস, শেষ? ছোঁয়াটা একটু প্রলম্বিত করবেননা? চুমুর রেশটাকে মাথায় রাখবেননা? ছন্দের সঙ্গে সঙ্গে এই যে প্রতিটি স্তবকে প্রতিটি লাইনে ‘চুম্বন’ ফিরে ফিরে আসছে – মাথা থেকে পা অবধি – শরীরের মহাদেশ জুড়ে - বৃষ্টির মতো - এরও একটা আলাদা ইয়ে আছে বৈকি! 

এখন এই কবিতাটা একটি পত্রিকায় ছাপা হলো এইভাবে – 

চুম্বন এক মন্দির উপাসনার

চুম্বন মহাকাব্য সংস্করণ

চুম্বন মৃতসঞ্জীবনীর সুধা

চুম্বন দুই ওষ্ঠে সেতুর গড়ন ...

 

কবির তো মাথায় হাত| নিজের সন্তানকে চিনতেই পারছেন না কবি| কেমন অন্যরকম দেখতে| কবিতাটাও বোধবুদ্ধিহীন শান্তিগোপাল হয়ে পড়লো না কি? 

 

শরীর| সৌন্দর্য বা চরিত্র নির্মাণে এই শরীরের ভূমিকাটাকে ছোটো করে দেখা – মস্ত বড়ো এক ভুল বা ভণ্ডামি আমাদের| মেয়েটি দেখতে বেশ সুন্দর – বললে আশেপাশের শ্রোতাদের আড়চোখের আমিষ দৃষ্টি এসে পড়বে আপনার ওপরে| এবারে আপনি যদি বলেন – চোখদুটি যেন শ্রাবণদিঘির মতো টৈটম্বুর, ঠোঁট যেন ...... বলতে বলতেই আপনার ঘোর কেটে যাবে – আপনার মাথায় আসবে - কে কী মনে করবে! অথচ আপনার অনুভূতি ততক্ষণে তার ঠোঁট, বুক, নাভি, কটিদেশে আপনার দৃষ্টিপূজার নৈবেদ্য পৌঁছে দিয়েছে – গোপনে| ডেভিডের মর্মরমুর্তির সামনে দাঁড়িয়ে আমরা তার ঊরুসন্ধির দিকে লুকিয়ে দৃষ্টি ফেলবো, মুখ ফুটে কিছু বলতে পারবো না| শরীর নিয়ে আমাদের এ ভণ্ডামির মধ্যেও একরকম অন্ধ মৌলবাদী সন্ত্রাসের বীজ নিহিত| 

 

ধন্যবাদ| অন্য প্রসঙ্গে চলে যাচ্ছিলাম| ধরিয়ে দিলেন বলে| ভাগ্যিস! আড্ডার এই মুশকিল| কখন কোনদিকে যে অন্যমনষ্কে হৈহৈ করে – আসলে আড্ডা তো রসময়ের দোকানের তিনফুটি চায়ের মতো তরল, যেদিকে ঢালু দেখবে, জিভ বের করে গড়িয়ে যাবে – কারণ, তরল কোনো শাসন মানে না। 

 

দেবব্রত বিশ্বাসের গানে ফিরে যাই| বিখ্যাত গান| যতোটা রবীন্দ্রসঙ্গীত, ততোটাই দেবব্রতসঙ্গীত| দেবব্রতর কন্ঠেই এ গান অমর| ‘তোরা যে যা বলিস ভাই’ – প্রতি স্তবকের শেষে ঘুরে ঘুরে আসছে – ‘আমার সোনার হরিণ চাই / আমার সোনার হরিণ চাই / তোরা যে যা বলিস ভাই, আমার সোনার হরিণ চাই’ – সুরটা স্মরণ করুন আর দেবব্রতর গায়কিটা মনে করুন – যদি লিখে বোঝাতে চাই, ব্যাপারটা এইরকম দাঁড়ায় –

আমার সোনার হরিণ চাই

আমার সোনার হরিণ চাই

তোরা যে যা বলিস ভাই

আমার সোনার হরিণ চাই ……… 

 

এই যে এক একটা শব্দের ওপর বিশেষ ঝোঁক দিয়ে অর্থ থেকে অর্থান্তরে যাত্রা – এ আবিষ্কার কি গানের রচয়িতার, নাকি কন্ঠশিল্পীর? নাকি এও সেই আদপে কবিতাই|

 

আর একটা মজার ব্যাপার ঘটে কবিতায়| শুধু কবিতায়ই নয়, যে কোনো সৃষ্টিকর্মেই| ওই যে প্রথমেই যে কথা বলেছি – কবি তো তাঁর ভাবতন্ময়তায় জন্ম দিলেন কবিতার| এবারে পাঠকের ভাব থেকে ভাবান্তরে কবিতার বারবার জন্ম হয়| 

 

‘সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মতোন সন্ধ্যা আসে’ 

– শিশির পড়ার শব্দ? তার মানে নৈঃশব্দ, অর্থাৎ নিঃশব্দে সন্ধ্যার আগমন বোঝাচ্ছেন কবি| তাহলে শিশিরের মতোন বললেই পারতেন| শিশিরের শব্দ বললেন কেন? নৈঃশব্দের শব্দ? আমার নির্জন উৎসবে অম্বরতল হয়নি উতল পাখির কলরবে– উৎসব, কিন্তু নির্জন – নিঃশব্দে তো নিদ্রাও আসে, খিদেও আসে, পটিবেগও আসে, প্রেমও আসে, দুঃখ আসে – শিশির কেন? পাঠক আবার গর্ভবতী হলেন – চললো গর্ভযন্ত্রণা – শিশিরের মধ্যে একটা সদ্যজাত শিশুর পবিত্রতা আছে – নিষ্পাপ ভেজালহীনতা আছে - ঈশ্বরনির্মাণ আছে… ‘শিশিরে ধুয়েছো বুক, কোমল জ্যোৎস্নার মতো যোনি…’ - কবি লিখেছিলেন ভাবের ডালে চড়ে, পাঠক দৌড়ে বেড়াচ্ছেন পাতায় পাতায় – বিভিন্ন কৌণিক দূরত্ব থেকে কবিতাটিকে দেখছেন – ‘এসো দেখ রক্ত রাস্তাময়’ ‘এসো / দেখ রক্ত রাস্তাময়’… ‘আমার সোনার হরিণ চাই / আমার সোনার হরিণ চাই’… আর ক্রমাগত নতুনতর মাতৃত্বের উল্লাসে মেতে উঠছেন|     

 

এক একবার পাঠের সময়ে এক একটা শব্দের ওপর ওই ঝোঁক আমূল বদলে দেয় অর্থ – কবিতার মাত্রার বদল হয়ে যায় হঠাৎ করে –

‘এতোদিন কোথায় ছিলেন?’

বিগত ষাট বছর ধরে পৃথিবীর সর্বত্র বাঙালি কবিতাপ্রেমীকে এই প্রশ্ন লক্ষাধিকবার করেছেন, করে চলেছেন বনলতা সেন – অথচ এ প্রশ্ন উচ্চারণের সুর নিয়ে গবেষণা সেই প্রথমদিন থেকে শুরু, চলবে আরো ছ’শো বছর – স্বরলিপিও লিখে যাননি জীবনানন্দ – প্রশ্নটায় ঠিক কোন শব্দে জোর – 

এতোদিন কোথায় ছিলেন?’

নাকি

‘এতোদিন কোথায় ছিলেন?’

দুইভাবে উচ্চারণ করলে দুটি প্রশ্নের আলাদা আলাদা অর্থ| আলাদা আলাদা অভিঘাত| পাঠক নিজস্ব বোধ অনুযায়ী নিজস্ব অর্থ নির্মাণ করে নেন| তেমনি –

পৃথিবীর সব রঙ নিভে গেলে পাণ্ডুলিপি করে আয়োজন?

নাকি

পৃথিবীর সব রঙ নিভে গেলে পাণ্ডুলিপি করে আয়োজন?

অথবা

পৃথিবীর সব রঙ নিভে গেলে পাণ্ডুলিপি করে আয়োজন

 

কোনটা সত্যি? 

 

১৩৫০০-র ওপর ছবি এঁকেছেন পাবলো পিকাসো তাঁর ৯১ বছরের জীবনে| গ্যুয়ের্নিকা তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ একটি কীর্তি – ১৯৩৭ সালের কাজ| গ্যুয়ের্নিকা শহরের ওপর নাৎসি সেনাবাহিনীর বোমাবর্ষনের প্রতিবাদে আঁকা তাঁর এই সাদা কালো ছবি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ যুদ্ধবিরোধী চিত্রশিল্প হিসেবে স্বীকৃত| আধুনিক চিত্রশিল্পে ফ্যাসিবাদের চরম বীভৎস ও ক্রুর রূপ - যেন নাজিম হিকমতের কবিতা – এক নারী ও তার প্রসারিত হাত, যন্ত্রণাক্লিষ্ট ঘোড়া ও মহিষ সহ ছবির প্রত্যেকটি এলোপাথাড়ি উপাদানের রঙ রেখা ও আকার, গাঢ় অন্ধকারের একবর্ণ চরিত্রের মধ্য দিয়ে বিমূর্ত যেন এক দীর্ঘ কবিতার সংলাপ| সেই পাবলো পিকাসোর উক্তি - Painting is a blind man's profession. He paints not what he sees, but what he feels, what he tells himself about what he has seen." 

 

কবিতাও তো আদপে তাই – দৃশ্য থেকে অদৃশ্যে অথবা দৃশ্যান্তরে – শব্দ থেকে নৈঃশব্দে বা শব্দান্তরে যাঁর অনায়াস ভ্রমণ, তিনিই তো কবি|

 

এক কবির জবানবন্দীতেই বলা যাক -

লিখবো বলে যখন সাদা পৃষ্ঠার মুখোমুখি হই – যেন বিবাহসন্ধ্যায় শুভদৃষ্টি অনুষ্ঠান – পরস্পরের চোখে চোখে সেতু – রোজ যে সেতুবন্ধন হয়, তা নয় – আয়নার সামনে তো রোজ চুল আঁচড়াই, চোখাচোখি তো রোজ হয়না – রোজ তো জিজ্ঞেস করিনা – ‘কী হে, ভালো তো?’ কিন্তু সাদা পৃষ্ঠার মুখোমুখি যখনই আসি, রবীন্দ্রসংগীতের সুরে প্রশ্ন করি - ‘ভালো আছো সোনাই?’ উত্তরের মেজাজ ওতরফের রোজ থাকেনা – তাই সেতুবন্ধন রোজ হয়না – সব বীর্যের গায়ে কি সন্তানঠিকানা লেখা থাকে? কিন্তু যেদিন হয় – যে মুহূর্তে হয়, তার পরের ব্যাপারটায় আর আমার কোনো রাশ থাকেনা – আমার হাতে থাকে নিদেন একটা কলম কিম্বা ল্যাপটপের অক্ষরবোতাম – ব্যাস্‌ – 

আমার কাজ গণেশের, বেদব্যাসের নাম সময়| 

 

নিজস্ব বোধ ও অনুভূতির স্খলিত বীর্যে অবশ্যই নির্মাণ-তাগিদ মিশে থাকে শ্বেতঅম্লকণা হয়ে – কিন্তু এটাও সত্য যে, তখন সেই ঝোড়ো অন্ধকারে, সেই পর্বতের অন্দরদেশে তছনছ ভাঙচুরের মধ্যে ছেনিহাতুড়ির ধাতবশব্দ – যেন কাঁসরঘন্টা ধূপধুনোর আবহে কবি ও সাদা পৃষ্ঠার যৌন-উপাসনা শৃঙ্গারআরতি – ঈশ্বরনির্মাণ - নিরন্তর খোদাই হচ্ছে, একটু একটু করে আবিষ্কৃত হচ্ছে প্রেম - এক আশ্চর্য সুন্দর সত্য মুর্তি – বনলতা সেন থেকে অনামিকা সেন মিলে মিশে যেন একই মিছিলের সম্মিলিত একাকার রূপ – যেন স্বপ্নের সেই শ্রেণীহীন সমাজ – সমস্ত অস্তিত্ব মিলে এক মহা অস্তিত্ব – সাত রঙ মিলে এক সাদা রঙ – সব অনুভূতি মিলে এক মহা সত্য – জীবন| 

 

এই একই শৃঙ্গার সমান্তরাল বেগে চলে পাঠকেরও বোধে মননে – কখনও কবির অনুভূতির সঙ্গে সাজুয্য রেখে, আবার কখনও বা অন্য কোনো নতুন উপলব্ধির আলোয় গা ভাসিয়ে 

 

কবিতার জন্ম ঘটে যায় আপনা আপনি – নিজস্ব খেয়ালে – মাদাম ক্যুরি নিমগ্ন থাকেন গবেষণায়, রেডিয়মের জন্ম হয় কালের নিয়মে| 

 

কবি ও পাঠক উভয়েই ডুব দেন সাদা পৃষ্ঠার শরীরে – ডুব দেবার তাগিদ হয়তো ভিন্ন ভিন্ন জাগতিক অনুভূতির তাড়নায় – অসহ্য একাকীত্ব থেকে নয়তো একটা শাস্ত্রীয় চুম্বন থেকে উঠে সাদা পৃষ্ঠায় ডুব দিয়ে গভীরতম পাতালপ্রদেশ থেকে দু’হাত ভরা মণিমুক্তো নিয়ে ভেসে ওঠেন দুজনেই – প্রথমে কবি, তারপরে পাঠক – ব্যক্তিগত ইন্দ্রিয়সুখ ছাপিয়ে মুখ্য হয়ে ওঠে আবিষ্কার – তার গায়ে কিসের গন্ধ – সুখের না বিষাদের – সে যাচাই ডুবে যায় সানাইয়ের জোয়ারসুরে – রজনীগন্ধার শ্বেতবিলাসে – ভালোবাসার অমোঘ গোপন অভিসারে

 

সে অভিসারের সাথি কে – কবি বা পাঠক কেউই উচ্চারণের বিড়ম্বনায় তখন ক্লিষ্ট হতে চাননা| বরং সদ্যোজাত কবিতাকে সন্তানের মতো বুক দিয়ে আগলে উভয়েই একাকী হেঁটে যান সেই অন্ধকার নির্জনতার দিকে, যেখানে পরস্পরকে ছুঁয়ে ফিসফিস করে বলে ওঠেন –

 

পাগলি,

তোমার জন্য স্বপ্নের বাসস্টপে অনন্ত অপেক্ষায় রাজি

তোমার জন্য আর একটুও অপেক্ষা করতে হলে মরে যাবো  

তোমার জন্য রসময়ের দোকানের উনুনে আঁচ নেভেনা, লাবডুব লাবডুব - কেটলি ফুটছে তো ফুটছেই - সারাক্ষণ, দিনরাত, বছরভর, 

 

হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে……  

 

বাবা রসময়, তোমার ঐশ্বরিক রসভাণ্ডার থেকে আর এক ভাঁড় উষ্ণ রস নির্মাণ করো – তৎসহ একটি চার্মিনার