ফকির ইলিয়াস

 



গুচ্ছ কবিতা


গেটের বাইরে যারা দাঁড়িয়ে আছে



এরা অপরিচিত কেউ নয়। অপরিচিত নয় এই গেট'টিও।
কারাগারের ফটক কিংবা সুউচ্চ প্রাসাদের বাইরে রোদের
ঝিলিক ঠিকই মানুষকে উদ্বেলিত করে।ঠিকই পাতাবাহারের
ছায়া এসে মুখে পড়ে শিশুর। যে শিশু কয়েকটি জবাফুল
হাতে দাঁড়িয়ে আছে গেটের বাইরে।অথবা পলিথ্যিনের ব্যাগে
হাওর থেকে তুলে আনা একগুচ্ছ কচুরি লতা হাতে দাঁড়িয়ে
আছেন যে পিতা,
  একনজর দেখা পাবার আশায়!

মানুষের ভালোবাসা সবসময় অর্থের নিরিখে বিবেচিত হয় না!
হয় কি? ঠিক জানি না আমি। অথচ এটা জানি যে পত্রিকা
হকার আমাকে বলেছিল,'মামা, ঠিকানা দিয়েন পত্রিকা পাঠায়া
দিমু বিদেশে! টাকা দিতে হবে না, মামা!'

আমি তাদের জন্য একটি গেট খোলা রেখেই প্রতিরাতে ঘুমাই।
যারা বৃষ্টিতে ভিজে,বজ্রকে উপেক্ষা করে আমার প্রিয় সবুজ মাঠে
নিড়ানি দেয়।যারা প্রকৃত অর্থেই কার্তিকের ফসলের মাঠে লিখে
একটি কবিতা ।



দৈত্যের ডানাগুলো দেখার পর



এমন হাসি আর কোনোদিন হাসিনি। এমন বিদ্যার বেসাতি দেখে
আর কোনোদিন বোকা ভাবিনি নিজেকে।খেল দেখাতে নগরে আসা
আদিম দৈত্য একদিন আমাকে বলেছিল; অনেক মানুষই ভাগ্যরেখা
নিয়ে জন্মায় নি!

কথাটি আমার মনে ধরেছিল খুব। প্যারিস ভ্রমণের সময় এই
কথাটিই তুলেছিলাম ফরাসি কবি বন্ধু আন্দ্রে উলাসা'র সাথে।
'ল্যাস প্লাজনার' ক্যাফে কর্নারে এসপ্রেসো খেতে খেতে তিনি
আমাকে বলেছিলেন, অনেক মানুষই তো মানুষ নয় জগতে!
‌তাদের আবার ভাগ্যরেখা কি!

আদিম সেই দৈত্যটিকেই আমার মনে পড়েছিল আবার!
তার ডানার রঙ আঁচ করতে করতে এটাও ভেবেছিলাম-
গিরগিটিদের দখলে যেদিন এই পৃথিবী চলে যাবে-
তখন প্রকৃত মানুষগুলোর ঠাঁই হবে কোথায়!




প্রণাম পদ্য


স্তাবক হিসেবেই পরিচয় থাকে অনেকের।স্তুতি ও বিস্মৃতির
গল্প আমাকে প্রথম শুনিয়েছিলেন নিশীনাথ-
আমি সেদিনই বুঝেছিলাম, তিনি মিথ্যে বলেন না! বরং
সত্যকেই রঙ মাখিয়ে আকাশে উড়িয়ে দেন।আর সেই আকাশ
থেকে মেঘগল্প ঝরে পড়ে মানুষের ঘরে ঘরে।

অথবা শরতেও আমরা যে কাশফুল গুঁজে দিই প্রিয়তমার
খোঁপায়, তাকেও প্রণাম পদ্য বলেই আখ্যায়িত করেন অনেক
কাব্যকারিগর।উজ্জ্বল দুপুরের কাছে জমা রেখে অন্য এক স্বর।



পেরেক বৃত্তান্ত



লোকটি টিন দিয়ে বানানো সাইবোর্ডটি লাগিয়ে দিল
বটবৃক্ষের বুকে! দুটি লোহার পেরেকবিদ্ধ সাইনবোর্ডে
লেখা আছে-'গাছে পেরেক মারবেন না!'

আমি অবাক না হয়েই খোলা আকাশের দিকে তাকালাম।
এই আকাশেও কয়েকটি পেরেক ঝুলিয়ে দেয়ার পর অন্য
একটি লোক আমাকে বলেছিল- 'বিদ্ধ করতে শিখেছি!'

আমি এখন প্রতিদিন গুলিবিদ্ধ পাখি দেখি
আমি এখন প্রতিদিন বুলেটবিদ্ধ শিশু দেখি
আমি এখন প্রতিদিন তীরবিদ্ধ নক্ষত্র দেখি
  আমার প্রতিরাত কেটে যায় পাথরবিদ্ধ
  মরুবাসী মানুষের খুলি দেখতে দেখতে।

আচ্ছা ফিলিস্তিন,ইয়ামেন কিংবা কাশ্মিরে কতটা
গোপন গোলা বিদ্ধ হয়, এর পরিসংখ্যান কি
কেউ আমাকে জানাতে পারেন!