দীপ শেখর চক্রবর্তী





ছায়ার ভেতরে রেখেছি ভিক্ষাপাত্র




ভালোবাসা এসো
জানাও, আমিও গ্রহণে সক্ষম
কত বিসর্জনের পর একটি ভেসে ওঠা প্রতিমার মুখ
হৃদয়ের এই অতল কালো জলে আমি দুহাতে রেখেছি
কঠিন এতসব কারিগরি শিল্পের স্থূলতার ভেতর
কোনভাবে লিখে রাখা একটি পাতার সহজতা
কত সামান্য প্রয়াসে সৃষ্টির ভেতর অবিরাম লিখে যায়
আলো ছায়ার অলৌকিক ঝিরিঝিরি কথা
অবদমন মানেনি যে নৈঃশব্দ,শব্দের মেধা ছাড়িয়ে 
লিখে রাখে কতরাত দুঃখের ভেতর আমি
তোমার সামান্য বুকের নরম পাবো বলে
জাগিয়ে রেখেছিলাম এই ক্লান্ত আত্মা আমার
ভালোবাসা এসো
একটি প্রকৃত কবিতার সহজতা দিয়ে 
আমার এই অভিশপ্ত লেখার হাত ধুয়ে দাও
সে হাত দিয়ে আমি জীবনের সমস্ত ব্যথা ছুঁয়ে দেখি
সেই ছুঁতে পারা বেদনার ভেতর এই সামান্য জলের জীবন আমি সমর্পণ করেছি।


সেই ঘর পছন্দ করি আমি যেখানে দীর্ঘ অন্ধকার পেরিয়ে পৌঁছতে হয়
লতা ও ফুল বিষন্ন সাপের মতো পা জড়িয়ে থাকে এমন পথের ভেতরে
বিরাট সমুদ্রের মতো এই পৃথিবী জানিনা একদিন কার অভিশাপে শুকিয়ে গিয়েছে,
তার উড়ুক্কু মাছেরা একদিন সন্ধেবাতির নীচে একা একা গান বাঁধে,মন্দির তলায় বসে ছিল যে ভিক্ষুক তার মনে আসে একদিন প্রেমিকের মতো সেও
একদিন পাখিদের মতো সেও
দুটি ডানা মেলে আকাশের স্তন থেকে ঠোঁটের পরশে টেনে নিত পৃথিবীর পরম অমৃত
তার হাতের পাতায় রেখে এসেছি আমার সামান্য দুটি চোখ
তা যদি বিক্রয়যোগ্য হয় তবে অন্ধ আমি দেখার সমস্ত অভিশাপ ফেলে লিখে যাবো 
কতরাত কত অন্ধকার ঠেলে প্রবেশ করেছি নিজের ভেতরে, ছুঁতে গিয়ে দেখেছি এই জীবনের সমস্ত স্বপ্ন ফুরায়,তবু জেগে থাকে এক ডাক
পিতা যে স্বরে ডেকে নেয় তার রাতজাগা শিশুটিকে
প্রিয়তমা যে স্বরে ডেকে নেয় তার উদাসীন প্রেমিকের মোহ
এমনকি নদী যে স্বরে তার শুকনো শরীরের ভেতর ডেকে নেয় বান
আমি সর্বস্ব খুইয়ে এই মুখস্ত করে গেছি সেই স্বর,সেই গান,সেই ডাক,আমি লিখে রেখেছি এক অন্ধকার পথের ভেতরে 
এই পথ পেরিয়ে সে ঘরের কাছে যেতে হয় যেখানে নীরবে বাজে সমস্ত বিচ্ছেদ,তবু বুঝি একদিন বুঝি কেউ সমস্ত অভিশাপ ফেলে আসে।
আমি মেলে রাখি দুপুরের ছাদে তার সুতির শাড়িটি
আমি তার বালিশের নিচে রেখে দিই ঘুমের সহজতা
পায়ে ফুটে গেছে যত কাঁচ সমস্ত তুলে নিয়ে আমি গড়ে তুলেছি তার হাতের শোভা
আমি তার আসার শব্দ শুনবে বলে সারাদিন শীতল মেঝেতে কান পেতে থাকি
সেই মানুষ পছন্দ করি আমিও যার কাছে দীর্ঘ অন্ধকার পেরিয়ে যেতে হয়
লতা ও ফুল বিষণ্ণ সাপের মতো জড়াজড়ি করে থাকে এমন মানুষের ভেতর।
তোমার বুকের তলায় ঠোঁট এনে বুঝতে চাই পেঁপে গাছের ফুল আকাশের দিকে তাকিয়ে কি মুগ্ধতায় জীবনের কথা বলে
ঘামে ভেজা কপাল মুছিয়ে দিতে গিয়ে দেখি মেঘ সরে গিয়ে এক নির্ভার আকাশের শূন্যতা,যেন পৃথিবীর দীর্ঘ চক্ষু মুদিত ধ্যান
বাতাসের জন্ম সেই পথে যেখানে আন্দোলিত হয় কিছু পাতা,দুয়েকটি চুল উড়ে যায় অনন্তের দিকে
একটি অভুক্ত কাকের ছায়া এসে বসেছে যৌবন শরীরে,সে ছায়ার ভেতর রেখেছি ভিক্ষাপাত্র
নীলাভ অলৌকিক প্রাণীর মতো লক্ষ বছর এই সুনিবিড় পৃথিবীর বুকে,তবু প্রথম তৃষ্ণার মতো পান করি তোমার শরীর
সেই চুমুকের শব্দে যে গান হয়,সেই গানে লিখিত হয়েছে সন্ধ্যা চিরকাল উপোসী গ্রামের দিগন্তরেখা ধরে।
তৃষ্ণা আমার এক প্রিয় সন্ধ্যাকালীন গান।
এই বেদনার ভেতর ধীরে ধীরে সয়ে যায়
আলো নিভে গেলে অন্ধকার
অন্ধকার ভেঙে হঠাৎ জ্বলে ওঠা আলো
তোমার স্তনের ছায়ায় বিন্দু বিন্দু গ্রীষ্ম রেখে গেছে কোন মূক বধির
চন্দনের টিপের ভেতর যেমন মৃত্যুর শুভ্রতা লেখা থাকে
তেমন নিষ্ঠুর অথচ সুন্দর স্পর্শখানি নিয়ে ঠোঁটের ওপর রেখেছি তৃষ্ণা
আমি তো আজীবন বৈরাগী তবু সন্ধের শঙ্খধ্বনি শুনে মনে হয় নাভিহ্রদ পার করে গৃহে ফিরে আসি,প্রদীপ জ্বালানো সহজ এভাবে হাতের ছায়ায়
কামিনীর গন্ধে ভরা অন্ধকারের ভেতরে ধিকিধিকি আগুন চলেছে,কাঞ্চন যৌবন তাপে বসিয়েছি দুজনে রাতের আয়োজন,ভুলে গেছি
ফ্যান পড়ে মাঝে মাঝে নিভিয়ে দিয়ে যায় আমাদের উদরের পবিত্র শিখাটি,দেখি
তোমার সমস্ত শরীর তখন এক বিন্দু গ্রীষ্ম হয়ে শুয়ে আছে আমার বৈরাগী হাতের তালুতে।

Attachments area