সাম্প্রতিক

6/recent/ticker-posts

নিশীথ ষড়ংগী:প্রবন্ধ:শিল্পী রামকিঙ্কর ও আমরা

 




শিল্পী রামকিঙ্কর ও আমরা

 

 

শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথের সংস্পর্শে ও সাহচর্যে বেড়ে ওঠা রামকিঙ্কর কেন সেসময়ে যোগ্য পরিচিতি পেলেন না, সে এক বিস্ময়। তবে কি বাঁকুড়ার মতো অল্পখ্যাত জায়গা থেকে কৌলিন্যহীন একজন শিল্পীর যোগ্য মর্যাদা পাওয়াটা হয়ে উঠতে পারতো অগৌরবের?

  ‌‌ মাত্র ঊনিশ বছরের এক যুবক বাঁকুড়া থেকে এসে শান্তিনিকেতনে কলাভবনে ভর্তি হয়েছিলেন ১৯২৫-এ রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের হাত ধরে। ফোকও থিয়েট্রি- ক্যাল আর্টে রামকিঙ্করের ট্যালেন্টকে উপাচার্য নন্দলাল বসুর বুঝে নিতে একটুও দেরি হওয়ার কথা ছিল না।

১৯৩৮ থেকে ১৯৩৯-এর মধ্যেই তো তৈরি হয়ে গেছলো ভারতের প্রথম জনসাধারণের জন্য আধুনিকতাবাদী ভাস্কর্য সাঁওতালপরিবারনির্মিত হয়েছিল শুধু সিমেন্ট ও ল্যাটেরাইট নুড়ি দিয়ে। চল্লিশ থেকে পঞ্চাশের দশকের মধ্যেই সমাপ্ত হয়েছে হালতুলা’(হারভেস্টার) ও মিল কলনামে আরও দুটো অবিস্মরণীয় কীর্তি। মূলত ত্রিশের দশক থেকে পঞ্চাশের দশকের মধ্যেই বলা যায়, তাঁর উল্লেখ্যযোগ্য কাজগুলো শেষ হয়েছে।

১৯২৫-এ যখন রবীন্দ্রস্নেহধন্যে আর্দ্র রামকিঙ্কর, তখনই রবীন্দ্রনাথ বিশ্বখ্যাত। আর শান্তিনিকেতনে যাওয়া ইস্তক এবং রামকিঙ্করের গোটা জীবনপর্বে রবীন্দ্রের প্রতি শ্রদ্ধা ও মুগ্ধতার কোনো ঘাটতি ঘটেনি। শান্তিনিকেতনে বহু উল্লেখযোগ্য দেশি-বিদেশি মেধাবীদের যাওয়াআসা অব্যাহত ছিল সেসময়। কিন্তু ১৯২৫-১৯৩৫- এর মধ্যে কি রামকিঙ্কর যেসমস্ত সৃষ্টিশীল  কাজ করছিলেন,তাঁর কোনও মূল্যই থাকলো না তাহলে? সংক্ষেপে বলা যায়, এ সময়ের মধ্যেই তিনি প্রারম্ভিক ভাস্কর্য, চিত্রকলা ও মুক্ত-ভাস্কর্য নির্মাণ করেছিলেন। অতিখ্যাত সুজাতাও তাঁর প্রথমদিকের অন্যতম কাজ। সাঁওতাল পরিবারভাস্কর্যটির ধারণাগত ও উপাদানগত ভিত্তি এ সময়েই তৈরি হচ্ছিল। সময়ের থেকে এগিয়ে থাকা তাঁর হারভেস্টারকাজটির শুরুয়াতও এখনকারই।

     এই সময়পর্বে গুরুদেবের আহ্বানে শান্তিনিকেতনে এসেছেন Carlo Formichi, Gyula, Germanus, TanTun Shan, Vincenc Lesñy, Sylvain Levi, Stella Kramrisch, Arnold Bake, Giuseppe Tucci,Arthur Geddes, Yonejirō Noguchi সহ আরও অনেক ইন্টেলেকচুয়ালরা। প্রথিত যশের অধিকারী তাঁরা। কিন্তু রামকিঙ্করের কাজের সঙ্গে তাঁদের পরিচয় করিয়ে দেবা -র উদ্যোগ কি গ্রহণ করেছিলেন তখনকার বিশ্বভারতী  কতৃপক্ষ? যদি তাই হতো, তাহলে তো সেই সময়েই বিখ্যাত হয়ে যেতেন রামকিঙ্কর। দুর্ভাগ্য রামকিঙ্করের, দুর্ভাগা আমরাও যে, প্রায় অলক্ষ্যেই থেকে যেতে হলো তাঁকে। কিন্তু সত্যিই কি তা হওয়ার ছিল! রবীন্দ্রনাথের, অন্তত ১৯৪০ অব্দি, রামকিঙ্করের‌ বিস্ময়-কর কাজগুলোর প্রতি মুগ্ধতা ছিল, ধরে নেওয়া যায়। তাহলে হলোটা কী?

       মুগ্ধ হওয়ার, বিস্মিত হওয়ার, শিরোধার্য বিশিষ্টতা  রামকিঙ্করের তখন যথেষ্টই ছিল। তাঁর কাজ ছিল গভীরভাবে আধুনিক। তা যেমন ভারতীয় মন্দিরভাস্কর্য-এর পৌরাণিক মহিমার বিপরীত, তেমনি তা পশ্চিমী শিল্পের ধার করা রীতির থেকেও সমদূরত্বে স্থিত। তাঁর নান্দনিকতা ছিল রাফ, গতিময়, জীবন্ত, চেষ্টাকৃতভাবে অপরিশীলিত; কিন্তু বিস্ময়করভাবে অভিব্যক্তিময় আর মৌলিক। তাঁর কাছে আর্ট যেন এক প্রসেস; প্রাণবান অভিজ্ঞতা ও সামাজিক স্মৃতিমণ্ডিত। গ্রামীণ বাস্তবতা, সামাজিক প্রতিশ্রুতি ও নান্দনিক স্বাতন্ত্র্য মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল যেন রামকিঙ্করের শিল্পকর্মে। তাঁর সম্পর্কে মূল্যবান তথ্য এরকমই মনে হয় আমাদের যে, তিনি যে শুধুই ভারতের আধুনিক ভাস্কর্যের স্থপতি ছিলেন, এমনটা নয়; তাঁকে বলা যেতে পারে ভারতের প্রথম গ্রাসরুট মডার্ণিস্ট। সম্ভবত তাঁর সবথেকে বড়ো ঐতিহাসিক কৃতিত্ব হলো ভারতীয় ভাস্কর্যের দুটো প্রধান ও গতিশীল ধারা থেকে বেরিয়ে এসে নিজস্ব স্বতন্ত্র এক গতিপথ নির্মাণ করা। ব্রিটিশ অ্যাকাডেমিক বাস্তবতা ও বাংলার রোমান্টিক প্রবণতা এই দুই প্রবল ও প্রতাপা- ন্বিত পরিসর থেকে সমদূরত্বে স্থিত ছিলেন তিনি। কিউ- বিজম ও এক্সপ্রেসনিজম সম্পর্কে তাঁর যথেষ্ট পরিচিতি থাকলেও, প্রাণিত হলেও তাঁর সৃষ্টি নতুন দিগন্তে সাঁতার দিতে চেয়েছে প্রাণময়তায়। যুদ্ধপরবর্তী হতাশায় এবং নাগরিক একাকীত্বে পিকাসো যতটা আধুনিক, জীবনের আদিম প্রাণশক্তিতে, বেঁচে থাকার দুর্মর অভিব্যক্তিতে রামকিঙ্কর ততোটাই আধুনিকতম। শিল্পের হৃদয়গত যে সততা সমস্ত প্রাতিষ্ঠানিকতার যে মুক্ততা স্বাধীন অবাধ্য  যে শিল্পিত সত্তাতার নিরিখে রামকিঙ্কর এক বিস্ময়।  নিজের জন্মস্থান, শান্তনিকেতনের কর্মস্থানের মৃত্তিকার মতো তাঁর শিল্পও হয়তো হতে পেরেছিল বন্ধুর রুক্ষ ও প্রাকৃতিক আবার জীবন্ত গতিমান ও আবহমান।

তাহলে? না রবীন্দ্রনাথ, না তাঁর শিল্পশিক্ষক, না শান্তি- নিকেতনে আসা গুণীজনকারোরই দ্বারা প্রোজেক্টেড হলো না কেন তাঁর শিল্পকর্ম? ভাবতে হয় আমাদের।  তবে কি রবীন্দ্রনাথের অতি-ব্যস্ততা ও বেশিরভাগ সময় শান্তিনিকেতনের বাইরে থাকার জন্য রামকিঙ্করের প্রতি নিরবিচ্ছিন্ন মনঃসংযোগ রক্ষা করে যাওয়া সম্ভব হয়ে ওঠেনি? এটা ঠিক, ১৯২৫ সালের দিকে রবীন্দ্রনাথ শারীরিকভাবে অসুস্থ থাকায় বিশ্রামে‌ ছিলেন। তাসত্ত্বেও তাঁকে বিশ্বভারতী পরিচালনার‌ কাজে ব্যস্ত থাকতে হয়েছিল। বিশেষকরে বিশ্বভারতীর অর্থ সংগ্রহের বিষয়ে। এর মধ্যেই বেশকিছু কবিতা, প্রবন্ধও লিখে ফেলেছেন।কিন্তু শান্তিনিকেতনের শিক্ষাগত ও সংস্কৃতিগত মিশন নির্ধারনের ব্যাপারেই তিনি বেশিকরে সময় দিচ্ছিলেন। ১৯২৬-এর মার্চমাস থেকে বিদেশভ্রমণের ব্যস্ত কর্মসূচি ছিল তাঁর। এসময় ইতালি ভ্রমণকালে মুসোলিনির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন তিনি। সুইজারল্যান্ড,জার্মানি ও অস্ট্রিয়া গিয়ে ভারতীয় দর্শন বিষয়ে দ্য রিলিজিয়ন অফ ম্যান  শীর্ষক বক্তৃতা দেন। তারপর মিশর, পরে ইংল্যান্ড যান।

১৯২৭-২৮- এ এশিয়া ভ্রমণে তাঁকে যেতে হয় ব্রহ্মদেশ,মায়ানমার, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, চীন ও জাপানে। এসময় তিনি ব্যস্ত ছিলেন আন্তর্জাতিক সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ে। ১৯২৯-৩০ হলো তাঁর দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ পশ্চিমী সফর। তিনি ইংল্যান্ড ও আমেরিকায় হার্ভাট বক্তৃতা দেন অক্সফোর্ডে। মূলত বিশ্বভারতীর সাঙ্ঘাতিক আর্থিক বিপর্যয়ের জন্য অর্থসংগ্রহই ছিল তাঁর প্রধান উদ্দেশ্য।

      তাহলে দেখতে পাচ্ছি আমরা, ১৯২৫-১৯৩০-এ শান্তিনিকেতনে রামকিঙ্করের উন্মেষ ও গঠনপর্বটিতে রবীন্দ্রনাথ প্রায়শই বাইরে ছিলেন অথবা বিদেশ ভ্রমণে ব্যস্ত ছিলেন। দার্শনিকসৃষ্টি, রাষ্ট্রিক-সাংস্কতিক কাজকর্ম ও  প্রতিষ্ঠানগত নানান খুঁটিনাটিতে রবীন্দ্রনাথের আবদ্ধ ছিলেন এসময়। সম্ভবত সাহিত্য, সঙ্গীত ও শিক্ষা নিয়ে মূলত ব্যাপৃত তিনি স্বভাবতই ভিসুয়াল আর্ট-সম্পর্কীয় বিষয়গুলো নন্দলাল বসুর হাতেই তুলে দিয়েছিলেন।

এটা সত্যি যে, আধুনিক ভাস্কর্যে, রামকিঙ্করের বৈপ্লবিক পরীক্ষানিরীক্ষা এমনএকস্তরে ছিল যা সেসময়ে, এমন    কি শান্তিনিকেতনের শিল্পকলাক্ষেত্রও পুরোপুরি তাকে  নিতে পারে নি। প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশ দিয়েছিল একথা যেমন সত্য, তেমনি এও সত্য যে, তাঁর ব্যক্তিগত স্বীকৃতিকে, তাঁর রাডিক্যাল আধুনিকতাকে আন্তর্জাতিক বুদ্ধি-জীবীদের কাছে তুলে ধরার কোনও উদ্যোগ শান্তিনিকে তন সে অর্থে নেয়নি। এ দুর্ভাগ্যকে হয়তো অনিবারণীয় বলে মেনে নেওয়া ছাড়া আমাদের উপায়ই বা কী?

     কিন্তু এও কি সমান সত্য যে, রামকিঙ্করের‌ গ্রাম্যতা, বিনয় খরতা আত্মনিমগ্নতা কাব্যময় দার্শনিক পরিবেশ থেকে দূরে সরল, সাধাসিধে, সাধারণ যাপন, সীমিত ইংরেজি জ্ঞান, আত্মপ্রচার-বিমুখতা ও শাহরিকসংস্কৃতি -বলয়ের বাইরে থাকার ইচ্ছে এসবই আসলে তাঁর  বিরুদ্ধে গেছে?

      বাঁকুড়ার যুগীপাড়া- যেখানে রামকিঙ্করের জন্ম ও বেড়ে ওঠা - তার কিছুটা দূরেই এ প্রতিবেদকের থাকা। বেশ কয়েকবার তাঁর ভাইপোদের ও তাঁদের সন্তান-‌‌ সন্ততিদের সঙ্গে সময় কাটানো গেছে। স্মৃতি ছড়িয়ে আছে ও জড়িয়ে আছে তাঁর সেই পুণ্যভূমিতে। বেশ কয়েকবার সমরেশ বসু এসেছিলেন যুগীপাড়ায়, ‘দেখি নাই ফিরেউপন্যাস লেখার রসদ সংগ্রহে। তাঁর পুত্র নবকুমার বসু্ আমাদের সঙ্গ দিয়েছেন যুগীপাড়ায় তাঁর পিতার মৃত্যুর অনেক পরে।

   ‌‌ অতিসাধারণ, নিম্নবর্গীয় ও নিম্নবিত্তের মানুষ ছিলেন রামকিঙ্কর। কৌলিন্য ও বংশগৌরবহীন। গ্রাম্য-সরলতা  তাঁর রক্তে। বাঁকুড়ার লালমাটির, বৃষ্টিহীন রুখাঅঞ্চলের রাফনেস ও কর্কশতা তাঁর সর্বাঙ্গে। শ্রমজীবী, অন্ত্যজ- মানুষের বন্ধু ও সাথী। শান্তিনিকেতনে একপাশে নিতান্ত আটপৌরে জীবনেই দিন কাটিয়েছেন তিনি। তাঁর কি এ খ্যাতি সহজে প্রচারিত হওয়ার কথা?

     ১৯০৬ সালের ২৫ মে জন্মানো রামকিঙ্কর প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন অনেকটাপরে। তাঁর সৃষ্টিকর্ম নিয়ে আলোচনা  চলছেও নিরন্তর। তাঁর জন্মদিন আমাদের শুদ্ধিকরণের দিন। পাপস্খালনের দিন। সেই দিন পার হলো প্রায়- নিঃশব্দে। আমাদের খুব সামনে থাকা বিস্ময়কর এক মৌলিক প্রতিভাকে আমরাই যোগ্যতার স্বীকৃতি দিতে পারিনি সেসময়। সেভাবে চিনে উঠতেও কি পেরেছি?



নিশীথ ষড়ংগী









একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ