লকার ছেলে কবর পেল না। কবর দিতে যেতেই বৃষ্টি নামল ঝমঝম। উথালপাথাল
বৃষ্টিতে মাটি ধুয়ে সাফ হয়ে গেল। লকার ছেলে জলে পড়েই পচে ঢোল হল, কুকুর-শিয়ালে ছিঁড়ে খেল। গুণিন বলে এ জগতে বৃষ্টি
নামে বেগনি ফুলের ফোটায়। বেগনি ফুল ফুটলেই বৃষ্টি হবে। এই হল খোদার নিয়ম। পৃথিবীর
সব বেগনি ফুল যেদিন শেষ হবে সেদিন বৃষ্টি-বাদলাও বন্ধ হয়ে যাবে। লকা মনের দুঃখে
হাতে কুঠার আর কাঁধে চিরেগুড়ের পুঁটলি নিয়ে রওনা দিল দুনিয়ার সব বেগনি ফুলকে আগা
থেকে কাটতে। অনেক দূরের দুর্গম পথ। কিনারে কিনারে জংলি পশু আর চোর-ডাকাতের ভয়। লকা
চলল বীরের মতো বুক ফুলিয়ে, কুঠার নিয়ে হাতে। চোখের সামনে এক
এক করে বেগনি ফুলের গাছ দেখে, রাগে দুঃখে তাদের ঝেড়ে সাফ করে,
তারপর ফের হাঁটা দেয়। এভাবে লকার বয়স হল, হাড়ে
জোর কমে এলো, অনেকদিনের কম খাওয়ায় শরীরের মাংস গলে পাঁজরা
বেরিয়ে পড়ল। একদিন সে এসে পড়ল আল্লাদিয়ায়। সে গাঁয়ে জনমনিষ্যি নেই। যেদিকে তাকাও
শুধু ধুলো, মাটি আর ধুধু প্রান্তর। তার মধ্যে থরেথরে সাজানো
বেগনি ফুলের গাছ। লকা শুধু হাঁপায় আর গাছ কাটে। তার গাঁয়ের কথা মনে পড়ে না। বউয়ের
মুখ মনে পড়ে না। মরা ছেলের কথা মনে পড়ে না। বাড়ি ছেড়ে কেন বেরিয়েছিল তাও মনে পড়ে না। তার
চোখের সামনে শুধু বেগনি ফুলের গাছ ভাসে। যন্ত্রের মতো সে কুঠার চালায় ঘ্যাঁস্, এক ঘায়ে তাদের উপড়ে ফেলে। একদিন ফুলগাছের আগা ছাঁটতে
ছাঁটতে লকা মাটিতে লুটিয়ে পড়ল, আর উঠল না। একবেলা ওভাবে পড়ে
থাকার পর লাখো লাখো পিঁপড়ে ঢিবি থেকে বেরিয়ে তার শরীর ছেয়ে ফেলল, তার কবর জিয়ারাত করল। তারপর ঝেড়ে বাদলা হল। সেই থেকে আল্লাতালার নিয়ম হল
মেঘ-বাদলার আগে পৃথিবীর যত পিঁপড়ে বেরিয়ে আসবে মাটির উপর, তারপর
শূন্যে দোয়া দেবে মরা লকার নামে।
রুদ্রাঞ্জন মুখোপাধ্যায়



0 মন্তব্যসমূহ