একটি
ঋজু, ছায়াশীতল গাছ
এই যে আজ নিজেকে
অত্যন্ত নিঃস্ব, প্রান্তরে খড়কুটো মাথায় নিয়ে ওড়া ধূ ধূ হাওয়ার মতো লাগছে, সে তোমার জন্য।
এই যে আজ বাড়ি ফিরে দেখলাম কিছু আলোকিত, কিছু অন্ধকার ঘর জেব্রার মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে, সেও তোমার জন্য।
এই যে এখন টের পাচ্ছি কোনো বন্ধন নেই হাতে- পায়ে, কোথাও কোনো ভারী শৃঙ্খলের সরীসৃপ পড়ে নেই, এও তোমার জন্য।
দিনাবসানে এখন মানুষের মনে ক্ষুদে ক্ষুদে পাতার মতো শান্তি, যেন আজই পরাধীনতা শেষ হল- এমন একটি নিশান উড়ছে চারপাশে।
কতরকমের ভাষায় সকলে কথা বলছে।
এর কিছু কিছু মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনির মতো, কিছু কিছু মৌমাছির গুঞ্জনের মতো।
আমি কিছু আলোকিত, কিছু অন্ধকার ঘর পেরিয়ে ঈশ্বরের মতো একটি আয়নার কাছে দাঁড়াই।
ঘরে তখন কোথাও কোনো শব্দ হয় না।
যে একটি জীবিত মানুষ মৃতদেহের মতো শুয়ে আছে, তার মাথার ওপরে একটি পাখা কী কারণে যেন হিংস্র হয়ে ঘোরে।
ঈশ্বরের মতো আয়নায় দেখি আমার মুখে গুহামানবের মতো লোম।
যে দৃষ্টিতে কোনো আবেগ বা অনুভূতির ছাপ নেই, সেইরকম আমার চোখের দৃষ্টি।
কল খুললে জল অবশ্য পড়ছে সেই যে কবে একটি মথ এসে বসেছে আমাদের পৃথিবীর গায়ে, সেই পৃথিবীর মতো।
জানালা কখনো যেভাবে তোমার জলভারাক্রান্ত চুল অলক্ষ্যে টেনে খুলে দিয়ে নিজেই দূরদূরান্ত অবধি প্লাবিত হয়ে যায়, তার মতো
চারপাশে
অসংখ্য নিশান উড়ছে।
ঘোড়ায় চড়ে তাদের পেট দাবড়ে একদল মানুষ কোথাও চলেছে।
তাদের গায়ে লম্বা ঝুলের রেশমি পোশাক, মাথায় রঙচঙে শিঙার মতো টুপি।
এরা চলেছে আকাশে যে পাঁজরের মতো একটি চাঁদ ভেসে আছে, তার সামান্য নীচ দিয়ে।
যে পরাধীনতা আজই শেষ হল, হয়তো- বা এই শোভাযাত্রা তারই দূত।
ভাবি, খুব ভাল হত এখন যদি মনে ক্ষুদে ক্ষুদে পাতার মতো শান্তি টের পেতাম।
সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে কলঘরে ঢুকে আমি নিজেকে বন্দি করে ভাবতাম, কিছু ভয়ার্ত মাছ তো এখনো গুহার সবুজ অন্ধকারে থমকে আছে।
তারা সাঁতরে গুহা পেরিয়ে বাইরে গ্রহ- নক্ষত্রের নীচে কবে আসবে? সাধারণত দেখি, এই সময় তুমি উপস্থিত হাওয়ার মধ্যে থেকে কথা বলে ওঠো।
সেই কথা শুরু হয়, অসংখ্য কাচের চুড়ি ভাঙার মতো শব্দ দিয়ে।
ক্রমশ আমি তোমাকে দেখতে পাই।
কিছু লতা শুধু গায়ে জড়িয়ে এসেছ।
তার কোনো কোনোটিতে একটি নৌকোর কাছি যুক্ত করে রাখা।
তুমি আমার নগ্ন পিঠ মধ্যমা দিয়ে ঠেলে দিয়ে বল ‘পাত্রে খাবার ঢাকা দেওয়া আছে, খেয়ে নাও।
যে জীবিত মানুষ মৃতদেহের মতো শুয়ে আছে, তার কানে গিয়ে বল এমন মুক্তির দিন খুব বেশি দীর্ঘস্থায়ী হবে না।‘ আমার চিৎকার
করে তখন বলতে ইচ্ছে করে ‘এমন মুক্তি আমি চাই না।
এমন স্বচ্ছ স্ফটিকের মতো অন্তর, এমন মর্মভেদী আলো আমি চাই না।‘ চারপাশে
অসংখ্য
নিশান উড়ছে, অসংখ্য নিশান।
যেন খানিকপরেই অত্যন্ত গুরুতর কণ্ঠে মানুষকে কৃমি ও কীটের পেটে সেঁধিয়ে যেতে বলা হবে।
কৃমি ও কীটের পেটে সেঁধিয়ে যেতে বলা হবে
নিয়ন্ত্রক
বহুদূর
থেকে তুমি আমার দিকে তাকিয়ে থাক। সেখানে একখণ্ড লোহার জানালা। সেই জানালা থেকে তুমি আমার দিকে তাকিয়ে থাক। জানালার ওপারে কোনো একদিনের আতসকাচের মতো রোদ। উচ্ছ্বল লতাপাতার নকসা। তোমার ঘন চাদরের মতো চুলে সেই রোদ যেন রাফ্লেশিয়ার মতো ফুটে আছে। হাতে মুখ রেখে তুমি আমার দিকে তাকিয়ে থাক। যেন কোনো দুরূহ একটি প্রশ্ন করে উত্তর পাওনি। তোমার হাতের বালার নীচে একটি আশ্চর্য উলকি। এই অ্যাতো দূরে আমি তোমার সেই চাহনির দেখে ভেতরে ভেতরে কেঁপে উঠি। কী এক কুণ্ঠা আমাকে ঘিরে দাউদাউ করে জ্বলে। আমি আমার করোটি হারিয়ে ফেলি, সংবহন হারিয়ে ফেলি, অস্থিপঞ্জর হারিয়ে ফেলি। শুধু হেটমুণ্ড হয়ে ঝুলে থাকি যেন। এই প্রহসনে আর তুমি বিরক্ত হও না, অসংখ্য বুদবুদ উড়ে যাবার মতো করে অভিমান কর না, ক্ষুব্ধ হয়ে চলে যাও না কোথাও, মিলিয়েও যাও না। শুধু হাতে মুখ রেখে তাকিয়ে থাক। রূঢ়, কঠিন লাবণ্য নিয়ে তাকিয়ে থাক
কী বলব তোমাকে
আমি? শুধু একটি হেটমুণ্ড মাংসের তাল তোমাকে কী বলতে পারে? শুধু বিদেহী আত্মার মতো সে হয়তো কোনো গাছের আড়ালে লুকিয়ে দেখতে পারে তোমাকে। বালুচরে হামাগুড়ি দিয়ে তোমাকে দেখতে পারে। দেখতে পারে বহু বরষা- বসন্ত পেরিয়েও তোমার গাল তুবড়ে যায়নি একটুও, হাতের আঙুলগুলি হয়ে যায়নি কালো কালো ডালপালার মতো। বরং তোমার মুখের ব্রণের দৌরাত্ম্য কমে গেছে। সেখানে এখন স্বচ্ছ জলাশয়। বুঝি ঐ লোহার একখণ্ড জানালা তোমার রক্ষী। তোমার হাতের বালার নীচে যে আশ্চর্য উলকি- রক্ষী বুঝি সেও। আহা, তোমার ঘন চাদরের মতো চুলে যে রাফ্লেশিয়ার মতো রোদ ফুটে আছে- বুঝি সে নিয়ন্ত্রক। আহা, বিদেহী আত্মার তখন যেন অবিকল মানুষের কণ্ঠস্বরে তোমাকে বলতে ইচ্ছে করে ‘ভালবাসি।‘ আহা, তখন যেন সেই বিদেহী আত্মার গায়ে সরসর করে একটি বিদ্যুতের রেখা নেমে আসে। তার কঙ্কাল পুড়িয়ে দেয়। তখন যেন চেতনা ফিরে পাও তুমি। ভাব, যাহ! কত বেলা হয়ে গেল
নোলক
হয়তো ডোরাকাটা
কোনো চতুষ্পদ স্মৃতি তাড়া করেছে তোমাকে। আজ একটি জল থেকে লাফিয়ে ওঠা উচ্ছ্বল মাছের মতো দিনে ডোরাকাটা কোনো চতুষ্পদ স্মৃতি তাড়া করেছে তোমাকে। তুমি পালিয়ে যেতে চাইছ ওর হাত থেকে, হিমশীতল চোখের চাউনি থেকে কিন্তু পারছ না সেভাবে। দুরূহ স্বপ্নে যেমন মানুষের পা পাথরের মতো ভারী হয়ে আসে, ঠিক সেইভাবে আজ স্বপ্নের বাইরে, এই থকথকে বাস্তবে তোমার সঙ্গে তাই ঘটছে। আহা, শ্বেতপাথরের মতো তোমার সংসার, ঘরে ঘরে বিদ্যমান যে মহার্ঘ শূন্যতা, গানের কলির মতো বারান্দার লাইন বা হীরকচূর্ণের মতো যে সিঁড়ি নক্ষত্র থেকে নক্ষত্রে পৌঁছায় বা কখনো ঈশ্বরের মতো মাটিতে নেমে আসে বা তোমার যে নিজেকে উন্মুক্ত করে দেখার আয়না, তার সামনে খাটো একটি টুল টেনে বসতেই পারছ না তুমি, সেই ডোরাকাটা চতুষ্পদ স্মৃতি তোমাকে অনুসরণ সেখানেও পৌঁছে যাচ্ছে নিঃশব্দে। যেন ও তোমার সব অলিগলি বা দরজার ছিদ্র চেনে, যেন চেনে তুমি কখন কোন দৃশ্যহীনতার আড়ালে আছ বা যেন বুঝতে পারে তোমার উড়ে যাবার শৈলী। তোমার সুগন্ধও বুঝি অনুধাবন করতে পারে কখনো দূরে বাথরুমের কুণ্ঠিত আয়োজন থেকে। অথচ কী জল থেকে লাফিয়ে ওঠা উচ্ছ্বল একটি মাছের মতো দিন আজ। কোথাও কোনো বিশৃঙ্খলা নেই, গুলি- বন্দুকের শব্দ নেই। ছেঁড়া একপাটি চটি আটকে আছে এমন ঘাসের জটলা পৃথিবীতে নেই আর কোথাও। আজ বহু কথা ভেবে ফোয়ারার মতো হেসে ওঠা যেত। কিছু গুনগুনিয়ে চুলের যত্ন নেওয়া যেত। যে রোদের ফালি তোমাকে দেখে জানালায় এসে মনে অন্য কথা লুকিয়ে সারল্যে ঝিলমিল করে, এসে পড়ত সেও
তুমি যেন কী বলতে চাইছ টলোমলো
কাগজের নৌকোর মতো এক ঘর থেকে অন্য ঘরে ভেসে যেতে যেতে অথচ পারছ না। যে শব্দগুলি খুব আদরে ব্যবহার কর, সেইসব মনে পড়ছে না তোমার। পছন্দসই একটি বাক্যও তৈরি করতে পারছ না মনে মনে। যা ব্যবহার করে তুমি এই ডোরাকাটা চতুষ্পদ স্মৃতিকে কোনো তেপায়ায় রাখা একটি হাতে কলস নেওয়া নারীর মূর্তি বানিয়ে দিতে পার। অসহায়, অশান্ত হয়ে এই কেমন তুমি হাতের গ্লাসটিকে নির্মমভাবে টেবিলে রাখলে। করুণ চামচগুলি কেমন কামরাঙার মতো তোমাকে দেখে নিজেদের খোলসে ঢুকে গেল। হে ঈশ্বর, হাতের কাছে কিছুই খুঁজে পাচ্ছ না তুমি আর। এই একটু আগেই একটি আমুদে ঘোড়ার পিঠে পরবে বলে একপ্রস্থ পোশাক রেখেছিলে, তাতে কত ফুল ও লতার ঘনিষ্ঠতা! এখন তা নেই। আমুদে ঘোড়া কি চোখ নাচিয়ে তোমাকে কিছু বলল? হয়তো বলল। তোমার সে কথায় প্রয়োজন নেই। অমন তো কতই হয়। নগ্ন শরীরে যখন আয়নার সামনে দাঁড়াও তখন তো বুঝতেই পার আয়না তোমাকে কী বলে? কিন্তু আজ এই ডোরাকাটা চতুষ্পদ স্মৃতি তোমাকে যেন অগোছালো করে দিচ্ছে প্রতি মুহূর্তে। কখনো কখনো তোমার গায়ে শুকনো পাতা উড়ে খসে পড়ছে। তুমি কোথাও পালাতে পারছ না, কোথাও কোনো আড়াল পাচ্ছ না। ফরাসী জানালার কাচ চুঁইয়ে যেন আলো নয়, সরীসৃপ ঢুকছে ঘরে। নীরব, সুদূরাগত সব সরীসৃপ। একটি চিৎকারের জন্মও তুমি দিতে পারছ না। শুধু পায়ে পায়ে পিছিয়ে যাচ্ছ এই ঘর থেকে ওই ঘর, এই নৈঃশব্দ্য থেকে ওই নৈঃশব্দ্যে। এখন তুমি পৃথিবীর অসহায়তম মানুষদের একজন। যার দেহে একফোঁটা রক্তবিন্দু নেই
আহা, আজ রাষ্ট্রনায়কদের একটি প্রীতিভোজ হবে স্বর্গের চেয়েও উঁচু একটি ঘরে



0 মন্তব্যসমূহ