শরীর
প্রতিটি অক্ষর নিজেই কথামালা — প্রতিটি চিন্তার ভেতর
ডুবে থাকে মানুষ, নিমগ্ন সভ্যতা। উঠে এলে
ভাবি: আমার ঈশ্বর আমাদের থেকে আলাদা নন
তাহলে। কীভাবে শরীর রক্ত-মাংসের সাথে আজও
লড়াই করে, আমি দেখি; আমিও অজান্তে সেসবের
অংশ হ'য়ে যাই — আমার অসুখ নেই, ফলত
আরোগ্যের কথা আজ বাতুলতা শুধু — পায়ে-পায়ে
যে-সকল চলে-যাওয়া থমকে রয়েছে, তার মধ্যে
কোনও রাজনীতি, ভাঙা-চোরা হয়তো-বা আছে।
এখনও সঠিক কোনও ঠিকানার খোঁজে আমি দুয়ারে
ঘুরি; এখনও আমাদের অপেক্ষার মাঝে বিবাহের দেখা নেই
চাঁদ
খুব সংক্ষেপে আজও তোমার কথা সারা হ'লে,
নিজের দুঃখ দিয়ে আনন্দ গড়ে নিতে তুমি
আজও সচেষ্ট হও। তোমার কাহিনী আজ শিশুর
মতোই ভয় পায়, কেঁদে ওঠে, যেন-বা,
দানব, অন্ধকার, বিবশ ছায়া, একইসাথে
খাচ্ছে
তোমারও ঘর-সংসার। লঙ্গরখানা থেকে ফিরে,
আমরা অতর্কিতে ক্ষুধার দিকেই ঢলে পড়ি। জ্ঞানত
এখানে দেখি, ভগবান এসে, ভক্তের আরাধনা সেরে
ফিরে যান নিজলোকে — বিস্তার নিজেই কি প্রতিভা
না নয়, তা নিয়েও মশগুল হওয়া যায়,
তত্ত্ব চলে। তোমার দুয়ারে আজ মৃত আলো,
মৃত তাপ সরবরাহের শেষ দিন; তারপর,
সব চাঁদ ভেসে যাবে অন্ধকারে, ভেসে যাবে জলে
লাঙল
শরীর কীভাবে শিখে নেয় সন্ন্যাস, জানি না
জানি না, কোটরাগত চোখে, কীভাবে, কখন,
কার
দৃশ্য ভাসে — এক জন্মভূমি ছেড়ে আরেক দেশে
এসে পড়ি। ভ্রূণ থেকে শবদেহ হ'য়ে ওঠা,
এমন পরিধি জুড়ে তুমি, রয়েছ অপরিবর্তিত
টিলা কখনও দ্যাখনি তুমি — দ্যাখনি অবরোধ, ভূমিক্ষয়
কখন তোমার জমি দখল ক'রে নেবে কেউ,
জানো না; কেবল অকাতরে পান্থশালা গড়ে-চলা
গতজন্ম তোমার কোথাও রাখা আছে? যেটুকু
দৃশ্যে ভেসে ওঠে, তা সত্যি, মিথ্যে-মেশানো
শরীরে কান্না নেই, প্রেম নেই, ভালবাসা নেই;
শুধু এক সন্ন্যাস, আশিরনখ তার বিরহে জড়ানো
দেখা
আমাদের আত্মীয়তার উপায় যেন-বা কিছু নেই
শিকারী নাকি নিজে শিকার হ'ব না-জেনে,
রক্তমাখা মুখে প্রস্তরযুগে জেগে-ওঠা। তখনও শব্দ
নেই আমাদের কোনও; তখনও মৃত্যুভয় আমাদের
ছিল। বিভাজন, রাজনীতি এত যে আদিম করেছে,
বুঝি-বা তার বেশি আদিম আমরা হইনি তখনও?
আমরা পতনের আওয়াজ উপেক্ষা ক'রে, যাচ্ছি চলে
কোন সম্মুখে, স্থির চিৎকারে? মৃত কিছু সংবাদ,
মৃত ঘটনা, ক্ষুধার অন্তিম অবধি আমায় নিয়ে
যাবে। যেখানে আমার বহু আগে তুমি এসে
পৌঁছেছে; এবং জানো না যে, শিকারী নাকি
তুমি নিজেই শিকার; নীরবতা দিয়ে তবে
আজ থেকে শুরু হোক বুঝে নেওয়া আর
বিনিময়, এছাড়া উপায় নেই আমাদের আলাদা আত্মীয়তার
খড়্গ
না, তত পারঙ্গম হইনি এখনও। তোমার সবলতা
চোখে চেয়ে দেখে, মনে হয়, স্থবিরতা,
খোলস ত্যাগ ক'রে বাঁচি। যদিও এখন জানি,
বাঁচা মানে নিজের মৃত্যু নিয়ে বাণিজ্য করা।
বদলে বলতে পারো: ‘এসো, মৃত্যু দিয়ে আরেক
মৃত্যুকে কিনে নিই আজ—’ তোমার সোৎসাহে
আজীবন গলা নামিয়েছি; এতই কপর্দকহীন আমি
কখনও দেখিনি — তোমার আলো দিয়ে নিজেকে
অন্ধকারে স্বাধীন ক'রে নেওয়া; এর ফলে যদি
ভাল থাকে থাক, প্রতিবন্ধকতা, সন্তান — দু'চোখ
বুঝেছি যত, নিজেরই প্রার্থনা চুপিচুপি আসে আর
আমাকে জবাই ক'রে যায়! রক্ত মুছে নিতে
তার এ-জীবন ব্যর্থ কেটে গেলে, অন্য কোনও
পশুর জন্ম কি চেয়ে নিতে দাও অধিকার?
অবশেষ
কথা সেটা নয়, যা তুমি বলছ এখন
কথার প্রাচীর ভেঙে দিলে, যতটুকু পড়ে থাকে,
জেনো, তা-ই কথা। অবশেষ কুড়িয়ে কুড়িয়ে
তোমাকে বানাই — এক অন্ধ খুঁজে পেতে পারে
যদি পথ আর দেশ, আরেক অন্ধ যদি
খুঁজে পায় তোমার জানালা, ঈশ্বর, তবে কি
আমারও চোয়াল-ভাঙা মুখ নিয়ে, পাণিপ্রার্থী হ'য়ে
তোমার দুয়ারে এসে দাঁড়ানো নশ্বরতা নয়? ভাঙন
বোঝো না তুমি, এখনও, আমার ঈশ্বর! পরিস্থিতি
আমাকে নীরব ক'রে দিয়ে, প্রতিবার নিজের গভীর
হ'য়ে যায়! তুমি সেই গভীরের বিস্ফার দু'চোখে
রেখেছ, যেন-বা, তোমার আত্মঘাতী মুখ ভেসে
উঠছে জলে, এবং শরীরে, এবং আমার আয়নায়
বিকার
যে-খেলায় হেরে গেছ তুমি বহু আগে, আজও
সেই খেলাতেই মেতে আছি আমরা এখনও —
জানি না, কখন শেষ, বিতরণ, সাক্ষাৎকার
জানি না, কীভাবে শুরু, আমাদের গ্রাস ক'রে
ফেলা — আমরা যুদ্ধের অবসরে এখনও প্রেম
খুঁজে পাই; চিঠি লিখি আর মনে-মনে
জিতে যাই! এখন মধ্যরাতে জেগে উঠে বাইরে
তাকাই — দেখি: ধূমকেতু ছাই হ'য়ে আমাদের
সমাধির খুব কাছে ঝরে গেছে কিনা — এখন
সময় বড় প্রতারণাময়! আমাকে জাগিয়ে রাখে,
অথচ, তোমাকে, দেখি, গভীর ঘুমের দিকে
টেনে
নিয়ে যায় — পুত্রবৎ তুমিও যৌনতা শিখেটিখে গেছ?
প্রতিটি শব্দ তাই, অধুনা শীৎকারের মতন শোনায়
রাধাবল্লভ চক্রবর্ত্তী



0 মন্তব্যসমূহ