সমর্পিতা ঘটক

 



জেগে থাকাও একটা ধর্ম

 

 “... আমি সর্বনাশ দিয়ে সর্বনাশ বাঁচাতে গিয়েছি

হাত ছুঁতে গিয়ে শুধু আগুন ছুঁয়েছি, আর তুমি

শূন্যের ভিতরে ওই বিষণ্ণ প্রতিভাকণা নিয়ে

আমার মুখের দিকে চেয়ে আছো বিষম পাহাড়ে।...” 

বিষম পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে আমরা তো একথাই বলতে চেয়েছি কবিকে। কুয়াশার মতো বিষণ্ণতা ঘিরে ধরেছে আমাদের। শুধু কি অসুখ শরীরে কিংবা মনে? কঠিন সময় এখন সর্বার্থে। সমাজ, রাজনীতি, নৈতিক পরিমণ্ডলে নৈরাজ্য কেবল।  এ হেন সময়ে কবির প্রস্থান ভীষণ করুণ।  রোগ, জরা, বার্ধক্য এসব কিছু্র অজুহাত চলে না কারও কারও প্রস্থানে। কবি শঙ্খ ঘোষে্র চলে যাওয়া এমনই তাঁর পাঠকের কাছে। মহামারীর তান্ডবে শোকের অবকাশটুকুও নেই। তিনিও হয়তো চাইতেন তেমনি, হই চই কম কিন্তু উষ্ণতাটুকু থাকুক অন্ধের স্পর্শের মতো। 

শুয়ে পড়া, বেঁকে যাওয়া ভীরু শিড়দাঁড়ার ভিড়ে আমরা তো চেয়ে থাকতাম তাঁর মুখের দিকেই। আত্মদীপ ভব কথাটি তিনি বিশ্বাস করতেন তাই বাঙালি জাতিকে আত্মজাগরণের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন আমরণ। সম্পূর্ণ মানুষ হওয়ার কথাই যেন উচ্চারিত হয়েছে তাঁর শব্দে, ভাবনায়। কবি মানেই আত্মকেন্দ্রিক, বাউন্ডুলে, আত্মভোলা, কিংবা নানান দোষে দুষ্ট এই বহুচর্চিত সংজ্ঞার বাইরে ছিলেন তিনি। আর এমন মানুষই হয়ে ওঠেন যথার্থ প্রতিভূ, একটা সমগ্র জাতির বিবেক। শব্দে শব্দে নস্যাৎ করেছেন শাসকের চোখ রাঙানি এবং অনুগামী হওয়ার প্রবণতা এবং প্রতিযোগিতা। প্রধানন্ত্রীর হাত থেকে সরস্বতী পুরস্কার নিতে অসম্মত হন এই তো কিছুদিন আগেই এবং পুরস্কারের অর্থ দান করে দেন একটি বিদ্যাচর্চার কেন্দ্রে। দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠেন বারবার অথচ জাহির করেন না একবারও আর পাঁচজনের মতো। কোনো দলের মুখ না হয়ে কবি একা থাকেন নিমগ্ন। প্রতিবাদে পথ হাঁটেন। বেশিরভাগ প্রতিবাদের মুখগুলো দলের মুখ হয়ে যায় অচিরেই, কিছুদিন পরে। কবি দূরত্ব রেখে একা।  শাসক আসে, শাসক যায়। কবি নিজের শর্তে আপসহীন। তরবারির মতো ঝলসে ওঠে কলম। 

 

এই কি তবে ঠিক হলো যে দশ আঙুলের সুতোয় তুমি

ঝুলিয়ে নেবে আমায়

আর আমাকে গাইতে হবে হুকুমমতো গান?

এই কি তবে ঠিক হলো বৃষ্টিভেজা রথের মেলায় সবার সামনে বলবে ডেকে, ‘এসো

মরণকূপে ঝাপাও’?

আমার ছিল পায়ে পায়ে মুক্তি, আমার সহজ যাওয়া এ গলি ওই গলি

আমার ছিল পথশ্রমের নিশানতোলা শহরতলি উত্তরে-দক্ষিণে

আমার চলা ছিল আমার নিজস্ব, তাই কেউ কখনো নেয়নি আমায় কিনে

এমন সময় তুমি আবিল বাড়িয়ে যা পাও

স্বাধীনতায় দিচ্ছ গোপন টান...

এই কি তবে ঠিক হলো যে আমার মুখেও জাগিয়ে দেবে

আদিমতার নগ্ন প্রতিমান? (পুতুলনাচ)

  

১৯৫১ সালে খাদ্যের দাবিতে মিছিল করছিল ভুখা মানুষের দল, আমাদের এই রাজ্যেই। কোচবিহারে। সেই মিছিলের ওপর চলে পুলিশের গুলি। পনেরো-ষোল বছরের কিশোর কিশোরীরা রক্তাক্ত দেহে লুটিয়ে পড়ে রাস্তায়। পরদিন কাগজ পড়ার পর মুহ্যমান কবি স্থবির হয়ে বসে থাকেন আর লিখে ফেলেন সেই অত্যন্ত জনপ্রিয় কবিতাটি- ‘যমুনাবতী’। 

‘নেকড়ে-ওজর মৃত্যু এল

মৃত্যুরই গান গা-

মায়ের চোখে বাপের চোখে 

দু-তিনটে গঙ্গা।’

সত্য বলার রোখ ছিল শঙ্খ ঘোষের। তিনিই তো বলেছিলেন আমাদের, “ আর সকলে মিথ্যে বলে বলুক, দু-চার জনের কাছে আমরা সত্য চাই। আর সকলে ভ্রান্ত করে করুক, দু-চার জনের কাছে আমরা ব্রত চাই।” বই- “শব্দ আর সত্য”।  বলে যাওয়া আর নিজের বলা কথা অভ্যাস করার মধ্যে বিস্তর ফারাক থাকে আমাদের। তাঁর ছিল না।  তিনি বুঝেছিলেন অচেতন মানুষের চেতন ফেরানোটাও একটা ধর্ম।

‘দাহকাজ সাঙ্গ করে যে যার মতো ফিরে গেছে সবাই

গোটা পাড়া শুনশান

কাছেই শেয়াল ডাকছে

ঘরের পাশে লেগে থাকা রক্তদাগ মুছে নিতে নিতে বিড়বিড় করছে দাওয়ায় বসে থাকা একলা বুড়ো

জেগে থাকাও একটা ধর্ম’  (বুড়ো)

ইতিহাস, সমাজ, চেতনা, দায়বদ্ধতা সবই কবিতার বিষয় হয়ে ওঠে। রাজনৈতিক অসাম্য, বঞ্চনা, স্খলন দেখে হতাশগ্রস্ত মন আগুন খুজে পায় এই কবিতাগুলোর পংক্তিতে পংক্তিতে। তাঁর প্রবন্ধই হোক কিংবা কবিতা কিংবা অন্যান্য বিচরণ ক্ষেত্র, যাই হোক না কেন সে সব কিছুতেই নিখাদ সত্য উদ্ভাসিত। প্রসাধিত কৃত্রিমতার লেশ মাত্র নেই। 

সবাই যখন ঢক্কানিনাদে মশগুল, এখনকার নিয়মে নিজের কথাই ইনিয়ে বিনিয়ে চতুর্দিকে। কবি চুপ থাকেন। শোনেন। এত কথা, কথা, কথার মাঝখানে কবি চুপ থেকেই সোচ্চার ভীষণ। “ এত বেশি কথা বলো কেন? চুপ করো শব্দহীন হও/ শষ্পমূলে ঘিরে রাখো আদরের সম্পূর্ণ মর্মর/ লেখো আয়ু লেখো আয়ু...” মুখরতার মাঝে মৌন কবি আয়ু লেখার দিকেই ঝুঁকে থাকেন।  তিনি উপলব্ধি করেছিলেন “নীরবতারও একটি ভাষা আছে। সে-ভাষা পড়তে অনেকসময়ে ভুলে যাই আমরা। শুধু যে পড়তে ভুলি তা নয়, তার ব্যবহারও হয়তো ভুলে যাই জীবনে, ভুলে যাই যে অনেকসময় নীরাবতা একটা সামর্থ্য। ভাষার সংযোগের সঙ্গে নীরবতার সংযোগ মিলে গিয়ে যৌথভাবে গড়ে ওঠে একটা সংযোগের ভাষা। জীবনব্যবহারে সেই ভাষাটাকে বারেবারেই হারিয়ে ফেলি আমরা। আর তখনই বেড়ে ওঠে চিৎকার, তখনই বেড়ে ওঠে আমি, তখনই বেড়ে ওঠে পরস্পরের মধ্যে সেতুহীন এক দূরত্ব।” (অন্ধের স্পর্শের মতো)

কবিতা লেখার কৌশল, আবশ্যিকতা নিয়ে অনেক কবি অনেক কথাই বলেছেন। কবি শঙ্খ ঘোষের দৃষ্টিভঙ্গি সুগভীর এবং অবশ্যই প্রণিধানযোগ্য। বিস্তর জটিল করে, অবোধ্য ভাষায়, দুর্গম রাস্তায় তিনি ফেলে দেননি নতুন কবিদের। বরং আলো দেখিয়েছেন। সদ্যজাত কবিদের সৃষ্টির জন্মলগ্নে লেগে থাকুক সেই আলো। “শব্দবাহুল্যের বাইরে দাঁড়িয়ে, ভুল আস্ফালনের বাইরে দাঁড়িয়ে সত্যিই যদি নিজেকে, নিজের ভেতর এবং বাহিরকে, আগ্নেয় জীবনযাপনের বিভীষিকার সামনে খুলে দিতে পারেন কবি, সেই হবে আজ তাঁর অস্তিত্বের পরম যোগ্যতা, তাঁর কবিতা।” (শব্দ আর সত্য)

তিনি অনায়াসে বিচরণ করতেন ভিতর ও বাহিরে।  সমাজে ঘটে চলা শোষণপীড়ন, বঞ্চনার বিরুদ্ধে তিনি লিখে গেছেন শেষ দিন অবধি, আবার অবচেতনের অতলে নিমজ্জিত ভিতর-মনের কথা তুলে আনতেন তিনি মুক্তোর মতো। 

“রাতের পেয়ালা শেষ হলে

দেবতা ভোরের আলো খান

আঙ্গুল এখনও বিজড়িত

পুতুলে লাগেনি আজও টান

নিঃশেষের কাছে এসে গেলে

অপ্রেমিকও প্রেমিকসমান”

 

কিংবা আরো সব অমোঘ পংক্তি... ছত্র...

 

“আমার মেয়েকে নিয়ে বুকজলে

যাবার সময় আজ বলে যাব:

এত দম্ভ কোরো না পৃথিবী

রয়ে গেল ঘরের কাঠামো।...

আমরা কি কিছু শিখি তাঁর যাপন থেকে? যদি পারি এতটুকু সেই তো হবে আসল শ্রদ্ধার্ঘ্য। তাঁকে নিয়ে লেখার ধৃষ্টতা নেই কিন্তু তাঁর যাপন, কবিতা, সততা, বিশ্বাসটুকু সার্বিক বিবেকের মতো, ঘূর্ণি সময়ে বিভ্রান্ত নাবিকের কাছে বাতিঘরের মতো আলো দেখায়। কত শত চোখ রাঙানি, এমনকি জরুরি অবস্থার সময়েও তিনিই তো পেরেছিলেন উপেক্ষা করতে! তিনিই তো পারেন বারবার, এমনকি মৃত্যুর পরেও সরকারি স্যালুটের তোপ অগ্রাহ্য করার।


--------------------------------------

ছবি ঋণ: গুগল


 


৬টি মন্তব্য:

  1. উত্তরগুলি
    1. খুব আনন্দ হল। আন্তরিক ভালোবাসা ও শুভেচ্ছা।

      -- সমর্পিতা

      মুছুন
  2. উত্তরগুলি
    1. আন্তরিক ধন্যবাদ ও শুভেচ্ছা নেবেন। ভালোলাগা অনেকখানি।
      -- সমর্পিতা

      মুছুন