যুগান্তর মিত্র/জুন'২০২২

 

এসেছে শরৎ


একটানা ষোলো দিন হল পিসিমণি বিছানায় শয্যাশায়ী। যে মানুষ তাকে পেলেই কলকল করে কথা বলে যেত সে এখন নির্বাক, নিশ্চল! ভাবছিল তিন্নি।

তিনদিন ধরে কিছুতেই জ্বর কমছিল না বলে অমৃতাকে আরোগ্য নিকেতন নার্সিংহোমে ভর্তি করা হয়েছিল। সেখানে দুদিনের মাথায় সুস্থ হয়ে ওঠার পরে বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। অমৃতাই আর থাকতে চাইছিল না। কিন্তু তৃতীয় দিন থেকেই কেমন যেন ঘোরের মধ্যে চলে গেল সে। মাঝে মাঝে চোখ মেলে কী যেন খোঁজে। বিড়বিড় করে কিছু-একটা বলে। সেই শব্দ কারও কানে এসে পৌঁছয় না। আবার নার্সিংহোমে নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও ঘোরের মধ্যেই প্রবল অনীহা জানিয়েছিল অমৃতা। তাই বাড়িতেই চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এখন একা পিসিমণির বিছানার পাশে বসে আছে তিন্নি। অমৃতাকে  বাড়িতে নিয়ে আসার দুদিন পরে তার বাবা বলেছিল, ‘এভাবে তো ব্যবসা চলে না তিন্নি মা! এবার আমি বরং বেরোই। তেমন ব…

[0:58 pm, 18/06/2022] Jugantar: এসেছে শরৎ

যুগান্তর মিত্র

একটানা ষোলো দিন হল পিসিমণি বিছানায় শয্যাশায়ী। যে মানুষ তাকে পেলেই কলকল করে কথা বলে যেত সে এখন নির্বাক, নিশ্চল! ভাবছিল তিন্নি।

তিনদিন ধরে কিছুতেই জ্বর কমছিল না বলে অমৃতাকে আরোগ্য নিকেতন নার্সিংহোমে ভর্তি করা হয়েছিল। সেখানে দুদিনের মাথায় সুস্থ হয়ে ওঠার পরে বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। অমৃতাই আর থাকতে চাইছিল না। কিন্তু তৃতীয় দিন থেকেই কেমন যেন ঘোরের মধ্যে চলে গেল সে। মাঝে মাঝে চোখ মেলে কী যেন খোঁজে। বিড়বিড় করে কিছু-একটা বলে। সেই শব্দ কারও কানে এসে পৌঁছয় না। আবার নার্সিংহোমে নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও ঘোরের মধ্যেই প্রবল অনীহা জানিয়েছিল অমৃতা। তাই বাড়িতেই চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এখন একা পিসিমণির বিছানার পাশে বসে আছে তিন্নি। অমৃতাকে  বাড়িতে নিয়ে আসার দুদিন পরে তার বাবা বলেছিল, ‘এভাবে তো ব্যবসা চলে না তিন্নি মা! এবার আমি বরং বেরোই। তেমন বুঝলে আমাকে ফোন করিস।’

তিন্নিই তখন বলেছিল, ‘তুমি যাও বাবা। আমি এদিকটা সামলে নেব।’

সামলানো বলতে তেমন কিছু নয়। পিসিমণি বিছানার সঙ্গে লেপ্টে আছে। যার প্রাণশক্তি নিঃশেষিত, বাহ্যিক জ্ঞানটুকু নেই, তাকে সামলানোর কিছু থাকেও না। শুধু সময় করে কিছু খাওয়ানোর চেষ্টা করা আর ওষুধ খাওয়ানো। চারদিনের মাথায় তিন্নির কথায় আয়াকে ছাড়িয়ে দিয়েছিল সুদীন। পিসিমণির জন্য এটুকু করা যাবে না? ভেবেছিল সে। 

চুপ করে পিসিমণির দিকে তিন্নি তাকিয়ে আছে। একের পর এক স্মৃতি ভেসে বেড়াচ্ছে ঘরের দেওয়ালে, খাটের প্রান্তে, বিছানার চাদরে, ড্রেসিং টেবিলের আয়নার কাচে। সেই ভাবনায় ডুবে যেতে থাকে তিন্নি।

খেয়ে নাও পিসিমণি। কেন এমন করছ?

আগে বল শরৎ আসবে তো?

আসবেন, আসবেন। এমন শিশুর মতো করলে হয় পিসিমণি? প্রতিদিনই আসেন।

আশ্বাস দিতে দিতেই মুখে ভাতের গরস তুলে দিয়েছিল তিন্নি। শরৎ আসবে শুনে অমৃতার উজ্জ্বল হয়ে-ওঠা মুখে ভাতের কুচি জ্বলজ্বল করে উঠেছিল। তবে অচিরেই মুখ কালো হয়ে গিয়েছিল তার। অভিমানী গলায় বলে উঠেছিল, আমার সঙ্গে কথা বলে না কেন শরৎ? কিছু না বলেই চলে যায়!

কী করে বলবেন পিসিমণি? তুমিই তো ঘুমিয়ে পড়ো। তাই কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে চলে যান।

সত্যিই রে। কেন যে ঘুম পায় কে জানে! তুই যে ওষুধটা দিস, তাতেই ঘুম চলে আসে। আজ আর ওষুধ খাব না। জেগে থাকব। শরতের সঙ্গে অনেক কথা আছে। নাকের পাটা ফুলিয়ে বলেছিল অমৃতা। তিন্নিকেই বলছিল, তবু বলার ধরনে মনে হচ্ছিল যেন নিজেকে বলছে। গম্ভীর মুখেই খেয়ে যাচ্ছিল। কালো মুখে আলো ফিরে আসেনি। বর্ষার আকাশের ঈশান কোণের জমাট মেঘের মতো থম মেরে ছিল। 

মুখে আলখাল্লার মতো হাসি ঝুলিয়ে তিন্নি বলেছিল, তোমার যে শরীর ঠিক নেই পিসিমণি। তাই ওষুধ তো খেতেই হবে।

তা ঠিক। কথাটা বলেছিল যেন জলের গভীর থেকে। তারপর তিন্নির দিকে তাকিয়ে আবার আকুতি জানিয়েছিল, আজ যদি ঘুমিয়েও পড়ি, আমাকে ডেকে দিবি পিপি? অনেক কথা জমে আছে। ওকে বলতে চাই।

তিন্নি ছোটবেলায় পিসিমণিকে ডাকত পিপি। উল্টে অমৃতাও তাকে পিপি ডাকে। এই ডাকটা ভীষণ পছন্দ তিন্নির।

ডেকে দিতে বলছ? কিন্তু উনিই তো বলেন না ডাকতে। বলেন তোমার ঘুমের দরকার। বিশ্রামের প্রয়োজন।

হুঁহ্‍, আমার বিশ্রামের দরকার? কেন রে? সারা দিনরাত তো বিশ্রামেই থাকি। আর কত বিশ্রাম করব?

আচ্ছা ঠিক আছে। আজ ওনাকে বুঝিয়ে বলব। এখন চটপট খেয়ে নাও দেখি!

অমৃতার মুখে ঝলমলে আলো খেলা করছিল। একসময় খাওয়া শেষ হলে মগে করে জল এনেছিল তিন্নি। অমৃতা মুখে জল নিয়ে কুলকুচো করে ফেলছিল প্লাস্টিকের গামলায়। গামছা দিয়ে মুখ মুছিয়ে তিন্নি পরম যত্নে পিসিমণির মাথায় বাম হাত রেখে বলেছিল, এবার লক্ষ্মী মেয়ের মতো ঘুমোও তো পিসিমণি। তার আসতে দেরি আছে এখনও। সময় তো হয়নি! কথাটা বলেই স্ট্রিপ ছিঁড়ে একটা ছোট্ট ট্যাবলেট বের করে অমৃতাকে খাইয়ে দিয়েছিল তিন্নি। অল্প সময় মাথায় হাত বোলাতেই ঘুমিয়ে পড়েছিল অমৃতা। ঘুমের ট্যাবলেট কাজ শুরু করে দিয়েছিল দ্রুত। সেই পিসিমণি এখন ঘুমোচ্ছে ট্যাবলেট ছাড়াই। ভাবে তিন্নি। 

মা মারা যাওয়ার পরে অমৃতাই মায়ের স্নেহে বড় করে তুলেছে তিন্নিকে। তার তখন মাত্রই তিন বছর বয়স। ক্যানসার কেড়ে নিল সুলেখাকে। অনেকেই বলেছিল সুদীন যেন আবার বিয়ে করে। অন্তত বাচ্চা মেয়েটার কথা মনে করে বিয়ে করা উচিত বলে মতামত উড়ে এসেছিল নানাদিক থেকে। কিছুতেই সুদীনকে রাজি করানো যায়নি। অমৃতা বলেছিল, 'দাদা বিয়ে করতে চাইছে না যখন থাক তাহলে। আমি তো আছি। আমিই ওকে মনের মতো করে মানুষ করব।' ততদিনে নিজস্ব ভুবনে ডুবে থাকা অমৃতার ডিভোর্স হয়ে গেছে। দাদা তাকে নিয়ে এসেছে নিজের কাছে। তখনও দাদা ছিল তার একান্ত আপন। চরম শত্রু মনে করত না তার দাদাকে।

সারাদিন দোতলার ঘরে নিজের বৃত্তে থাকতেই পছন্দ করত অমৃতা। সেখানে তিন্নি ছাড়া কারও প্রবেশাধিকার নেই। একমাত্র দিনে দুবার কাজের মেয়ে মাধবীর এই ঘরে ঢোকার অনুমতি দিয়েছিল অমৃতা। তিন্নি কলেজে গেলে এছাড়া আর উপায়ও ছিল না।

অমৃতা সকাল সকাল স্নান করে নিত। অ্যাটাচ বাথরুমে যখন স্নান সারত, তিন্নি তার সহায়তার জন্য দোতলাতেই থাকত। গামলায় জল ভরে দেওয়া, নাইটি এগিয়ে দেওয়া, ভিজে জামাকাপড় ধুয়ে মেলে দেওয়ার জন্য মাধবীকে দেওয়া, সব করে দিত। এই ঘরে একটা আলমারি আছে অমৃতার জামাকাপড়ের জন্য। টিভি নেই। বইপত্র নেই। আসবাব বলতে আর আছে ডাবল বেডের খাট, লম্বা আয়না লাগানো ড্রেসিং টেবিল, একটা কাঠের টুল। এছাড়া ছিল স্বপ্ন বোনার জন্য অখণ্ড অবসর। অন্য কাউকে যেমন আসতে বারণ করেছিল অমৃতা, তেমনি তারও নীচে নামা বারণ ছিল। কোনও ভাবে যদি নীচে নেমে যেত, তখনই তাকে ওপরে ঠেলে পাঠিয়ে দিত মাধবী। বিড়বিড় করতে করতে দোতলায় ফিরে আসত সে। 

ছোটবেলায় তিন্নিকে যত্ন করে খাইতে দিত পিসিমণি। মুখ ধুইয়ে দিত খাটে বসিয়েই। তারপর কোলে করে বাথরুম থেকে ঘুরিয়ে এনে ঘুম পাড়িয়ে দিত। ইদানিং রাতের দিকে প্রায়ই অমৃতা খেতে চাইত না। তখন তিন্নি খাইয়ে দিত। নির্বিবাদে খেয়ে নিত অমৃতাও। শৈশবে তাকে খাইয়ে দেওয়ার প্রতিদান ফিরিয়ে দেওয়ার সুযোগ পেয়ে খুশি ছিল তিন্নি।

(২)

পিসিমণির জন্য মাঝে মাঝে খুব কষ্ট হয় তিন্নির। মাতৃস্নেহে বড় করেছে তাকে। তার সমস্ত ব্যাপারে ভীষণ নজর ছিল। কখন খাবে, কখন খেলবে। ঘুমোনোর সময় নানা দেশবিদেশের গল্প বলা, অসুস্থ হলে সেবাযত্ন করা, সারারাত মাথার পাশে বসে থাকা পিসিমণি কেমন যেন বদলে যাচ্ছিল। বরাবরই কী যেন ভাবত প্রায়ই। বাবার থেকে শুনেছে দেখাশোনা করেই করেই বিয়ে দেওয়া হয়েছিল। যদিও অমৃতার মত ছিল না মোটেই। বিয়ের পর থেকেই নিজস্ব ভুবনে ডুবে থাকা শুরু হয়েছে। আজকাল সেই অন্য ভুবনে বাস করার প্রবণতা বেড়েছিল। এমন সব কথা বলত, যা ভেবে অবাক হত তিন্নিরা।

ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় ভেসে উঠল ছায়াচিত্র। প্রতিদিন কলেজ থেকে ফিরে ফ্রেস হয়েই প্রথমে পিসিমণির ঘরে আসত একবার। সেদিন ঘরে ঢোকার আগেই পিসিমণির বিড়বিড় কথা ভেসে এসেছিল কানে। কার সঙ্গে কথা বলছে! কেউ তো এ ঘরে আসে না!  পা টিপে টিপে জানালার ফাঁক দিয়ে চোখ রেখেছিল তিন্নি। দেখেই সারা শরীর শিরশির করে উঠেছিল। এ কী! ড্রেসিং টেবিলের সামনে পাতা টুলে বসে দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে কার সঙ্গে কথা বলছে পিসিমণি? সারা গায়ে এক টুকরো সুতোও নেই! দরজার দিকে পেছন ফেরা। এলানো চুল পিঠের ওপরে। জল ঝরছে সেখান থেকে টপটপ করে। সদ্য স্নান করল নাকি? তাছাড়া এইভাবেই-বা বসে আছে কেন? দরজা অর্ধেক খোলা। জানলাও সেরকমই। যদিও কারও আসার কথা নেই এই সময়!

তিন্নি এগিয়ে গিয়েছিল দরজার পরদার কাছে। তার ছায়া পড়েছিল আয়নায়। সচকিত অমৃতা ঘুরে তাকিয়ে বলেছিল, আয় পিপি। আজ আমার খুব আনন্দ হচ্ছে রে।

খাটের ওপর থেকে নাইটিটা নিয়ে পিসিমণির বুকের ওপর রেখেছিল সে। তারপর জিজ্ঞাসা করেছিল, কী হয়েছে বলো তো? এত খুশি খুশি কেন? কার সাথে কথা বলছিলে তুমি?

অ্যাডোনিসের সঙ্গে। কতদিন বাদে দেখা হল!

অ্যাডোনিস! সে কে? তাকে কোথায় পেলে এখানে?

অ্যাডোনিসকে চিনিস না? ও-ই তো আমার জীবনটা ভরিয়ে রেখেছিল। প্রায়ই বলত, তোমার জন্য জীবন বাজি রাখতে পারি আফ্রোদিতি! তুমিই আমার সব।

আফ্রোদিতি! তুমি নিজেকে আফ্রোদিতি মনে করো এখনও?

মনে করব কেন? আমিই তো আফ্রোদিতি। আমার প্রেমে পাগল ছিল অ্যাডোনিস। আমিও সুযোগ খুঁজতাম অ্যাডোনিসের সঙ্গে মিলনের। আমার স্বামী হেপাইসটাস নানা ফন্দি করেও আমাদের সঙ্গম আটকাতে পারেনি। অ্যাডোনিসের ভালোবাসায় আমি নতুন জীবন পেয়েছি পিপি।

গ্রিক সুন্দরী আফ্রোদিতির কথা জানে তিন্নি। জানে অ্যাডোনিসের সঙ্গে তার প্রণয়ের কথাও। হেপাইসটাস কৌশলে সবার সামনে আফ্রোদিতি ও অ্যাডোনিসের মিলনদৃশ্য প্রকাশ করে দিয়েছিল। কিন্তু তার সঙ্গে পিসিমণির সম্পর্ক কী? পিসিমণি কি জাতিস্মর? কেউ কি সত্যিই জাতিস্মর হয়? মাঝে কিছুদিন সবকিছুই প্রায় ঠিক হয়ে এসেছিল। মনোবিদের কাছে কিছুতেই যেতে চায়নি। তার পরিবর্তে ডাক্তারকেই ডেকে আনতে হয়েছিল ঘরে। অনেকটা ঠিক হয়ে এসেছিল। আবার কি আগের পর্বে ফিরে গেল?

নানা ভাবনার মধ্যেই পিসিমণির দিকে চোখ রাখে তিন্নি। যেন নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে। সেদিন পিসিমণি বলেছিল, জানিস তিন্নি, অ্যাডোনিস আমাকে সেজে থাকতে বলে সবসময়। আমিও খুব সাজতে ভালোবাসি। আজ অ্যাডোনিস এসেছিল তো, তাই সেজেছিলাম। ও তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিল।

আবার অ্যাডোনিস! প্রসঙ্গ ঘোরানোর জন্য তিন্নি জিজ্ঞাসা করেছিল, তুমি এইসময় স্নান করলে কেন পিসিমণি?

মিলনের পরে আমি সবসময়ই স্নান করি। মাথা নিচু করে লাজুক কণ্ঠে জানিয়েছিল অমৃতা।

মিলন? সে আবার কী?

হ্যাঁ তো। প্রসাধন শেষ হলে অ্যাডিসনের সঙ্গে মিলন হত আমার। তারপর স্নান করতাম। স্নান সেরে এলে আবার সাজতাম। অ্যাডোনিস আমার সাজ দেখত মন দিয়ে। তারপর চলে যেত নিজের কাজে। আজও চলে গেল! 

অমৃতার দিকে বিস্ময় নিয়ে তাকিয়েছিল তিন্নি। অমৃতা ঘোরের মধ্যেই বলে চলেছিল তার কথা।

একদিন আমি বসেছিলাম প্রাসাদের এক প্রান্তে। তন্ময় হয়ে দেখছিলাম একটা হেরন ফোয়ারার পাশ দিয়ে আস্তে আস্তে হেঁটে যাচ্ছে। খুব মন দিয়ে দেখছিলাম পাখিটাকে। সেইসময় দৈববাণী শুনলাম। আমি যাকে চাইব, শুধু তার কথাই মন দিয়ে ভাবব। তাহলেই দেখা পাব তার। এই তো আজ পবিত্রচিত্তে অ্যাডোনিসকে চাইলাম। ও চলে এল।

চলে এল মানে? চোখ সরু করে জিজ্ঞাসা করেছিল তিন্নি।

হ্যাঁ, এল তো। ঐ দেওয়ালের মধ্যে থেকে অ্যাডোনিস বেরিয়ে এল!

দেওয়ালের মধ্যে থেকে?

হ্যাঁ। আমি তো ওভাবেই ওকে পাই।

তিন্নির মনে পড়ছে সেদিন পিসিমণির চোখের মণি নীল হয়ে উঠেছিল কোন জাদুবলে! আসলে কাকে চাইত পিসিমণি? অ্যাডোনিস নাকি শরৎ? 

কে এই শরৎ কে জানে! তার বাবাও তাকে শরতের হদিশ দিতে পারেনি।

বাবা একবার খুব রাগারাগি করেছিল। কলেজ থেকে ফিরে তিন্নি শুনতে পেয়েছিল বাবার উষ্মামিশ্রিত কথা। পিসিমণি বাবাকে বলছিল, তুই কি আগামেননের দূত। নাকি তোকে দেবী এরিস পাঠিয়েছে?

আবার গ্রিক মাইথোলজি আওড়াচ্ছিস? তোর মাথাটা গেছে। এইজন্যেই তো তোকে ওরা আর রাখেনি। রাখতে চায়নি! বাবা চিৎকার করে উঠেছিল।

আমার মাথা ঠিক আছে। বরং তোর ওপর অপদেবতা ভর করেছে বুঝতে পারছিস না তুই। আমাকে মারতে চাস? আটকে রাখতে চাস? কিছুতেই পারবি না। এরিস আমাকে কিচ্ছু করতে পারবে না!

পিসিমণির রাগে আরক্ত মুখ দেখে ভয় পেয়ে গিয়েছিল তিন্নি। বাবাকে অনেক বুঝিয়ে শান্ত করেছিল।

নানা ঘটনা চোখের সামনে দিয়ে ছায়াচিত্রের মতো চলে যাচ্ছে। কলেজের এক বন্ধুর দাদা ডঃ হিরন্ময় গাঙ্গুলিকে পিসিমণির ব্যাপারে খুলে বলেছিল তিন্নি। সাইক্রিয়াট্রিস্ট ডঃ গাঙ্গুলিকে এও জানিয়েছিল কোনওভাবেই পিসিমণিকে নিয়ে আসা যাবে না তাঁর কাছে। এমনকি তাঁকেও পিসিমণির সামনে নেওয়া সম্ভব নয়। মনের ডাক্তার বুঝতে পারলে হুলুস্থুল বেঁধে যাবে। অনেকদিন আগে একবার এইরকম ঘটেছিল। সেই নিয়ে অনেক ঝামেলা হয়েছিল অমৃতা আর সুদীনের মধ্যে।

ডঃ গাঙ্গুলি ঘুমের ওষুধ ছাড়াও অন্য দুটো ওষুধ লিখে দিয়েছিলেন। অনেক বুঝিয়ে তিন্নি অমৃতাকে রাজি করিয়েছিল ওষুধ খেতে। 

একলা ঘরে বসে পিসিমণির কথা ভেবে চলেছে তিন্নি। নীচে মাধবী ঘরের কাজ সারছে। আজ একবার ডাক্তার এসেছিলেন সকালে। চেম্বারে যাওয়ার আগে ঘুরে গিয়েছিলেন। তিন্নিই ফোন করে বলেছিল আসতে। কিন্তু যার আসার জন্য অপেক্ষা করছে সে এবং নিশ্চয়ই পিসিমণিও তার অপেক্ষায় আছে, সেই অবিনাশকে প্রত্যেকদিনই একবার করে ফোন করে অনুরোধ জানায় তিন্নি। প্রতিবারই সে অসম্মতি জানিয়েছে। অবশ্য এও ঠিক, যখনই ফোন করে, তখনই ধরে। কখনোই বিরক্তি প্রকাশ করেনি। মুচকি হেসে জবাব দিয়েছে, 'তুমি তো বোঝো তিন্নি, কেন যেতে চাইছি না। তবু বারবার বলো কেন?' তিন্নি তবু হাল ছাড়েনি। আজ পিসিমণির অবস্থা একটু বেশিই খারাপ। ডাক্তার গম্ভীর মুখে বলেছেন, 'ব্যাপারটা ভালো ঠেকছে না। দেখা যাক কী হয়!'

কোনওরকমে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করার পর দাদা জোর করে কলেজে ভর্তি করিয়েছিলেন। কিন্তু অমৃতা আর পড়াশোনা চালিয়ে যেতে রাজি হয়নি। পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ার বছর চারেক পরে কর্পোরেট হাউসে চাকরি করা ব্রতীন দত্তের সঙ্গে বিয়ে হয় অমৃতার। তাঁকে দেখেই ব্রতীনদের পছন্দ হয়ে গিয়েছিল। মাত্র উচ্চমাধ্যমিক পাশ হলেও অপরূপ সৌন্দর্যের জন্যই অমৃতাকে পছন্দ হয়েছিল ব্রতীন ও তাঁর পরিবারের। বিয়ের বছর তিনেক ভালোই কাটছিল। কিন্তু একদিন আচমকা মাথায় চেপে বসল আফ্রোদিতি। মধ্যরাতে ব্রতীনকে ঘুম থেকে তুলে জানাল হেপাইটিসকে সে স্বামী হিসাবে মেনে নিতে পারছে না। এডোনিসই তার প্রেমিকপুরুষ। এই নিয়ে অনেক ঝগড়াঝঞ্ঝাট হয়েছিল। ডাক্তার দেখিয়েছিল ব্রতীন। কিছুতেই কোনও কাজ হয়নি। নানাভাবে স্ত্রীর মাথা থেকে ‘আফ্রোদিতির ভূত’ নামাতে চেষ্টা করেও যখন ব্যর্থ হল ব্রতীন, তখন অমৃতার সঙ্গে আর সংসার করতে চাইল না। দুজনের ডিভোর্স অনিবার্যই ছিল। হয়েও গেল একসময়। অমৃতা এমনকি খোরপোষ নিতেও চাইল না। 

ডিভোর্সের পরে অনেকদিনই নিজেকে আফ্রোদিতি ভাবা বন্ধ করেছিল অমৃতা। তিন্নিই তখন ছিল তার ধ্যানজ্ঞান। সারাদিনই পুতুল খেলার মতো তিন্নিকে নিয়ে কেটে যেত তার।

নানা কথা ভাবতে ভাবতে সময় গড়াতে থাকে। বাবাকে ফোন করে বলেছে ডাক্তারের সংশয়ের কথাটা। সুদীন হয়তো চলেও আসবে কিছুক্ষণের মধ্যেই।

মোবাইলে রিংটোন বেজে উঠল। অবিনাশ দত্ত! চোখ চকচক করে ওঠে তিন্নির। মনের ভেতর জ্বলে ওঠে আলো।

আমি কি এখন একবার আসতে পারি? তোমার বাবা…

বাবা সব জানেন। আমিই বলেছি। আপনি আসুন প্লিজ।

সব জেনেও আমাকে যেতে বলছ তোমাদের বাড়িতে? আমার পক্ষে কিছুতেই সম্ভব নয়।’ একবার অবিনাশ বলেছিল। সেদিন তার অফিসে দেখা করতে গিয়েছিল তিন্নি।

পিসিমণির কথা ভেবেও যাওয়া যায় না?

না যায় না। তুমি অনেক ছোট। সংসারের গতিপ্রকৃতি বোঝার বয়স হয়নি তোমার তিন্নি। তবু বলি, নিজের সংসারের প্রতি আমি দায়বদ্ধ। সেই জায়গাটা উপেক্ষা করতে পারব না। আমাদের দুজনের পারস্পরিক বোঝাপড়া আছে। সেটুকু নষ্ট করতে চাই না। আশাকরি তুমি বুঝবে।

সেই অবিনাশ দত্ত আসছেন।

একদিন অমৃতাকে জিজ্ঞাসা করেছিল তিন্নি, শরৎ কে পিসিমণি?

আমরা একসাথে পড়তাম। প্রথমে আমি ওর প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম। পরে শরৎও আমাকে ভালোবেসেছিল। আমি ওকে শরৎ ডাকতাম। আসল নাম অবিনাশ। তিন্নি শুনে মনে মনে হেসেছিল। ভালোবেসে প্রেমিক বা প্রেমিকা নানা নাম দেয়। পিসিমণি প্রেমিকের নাম দিয়েছিল শরৎ।

একবার আমাদের স্কুলে ঋতুরঙ্গ নাটক হয়েছিল। নাচ, গান, অভিনয় সবমিলিয়ে ছিল সেই নাটক। আমি শরৎকালের গানের সঙ্গে নাচ করেছিলাম। অবিনাশ শরৎকালের গান গেয়েছিল, অভিনয়ও করেছিল। সেই থেকে আমি ওকে আড়ালে শরৎ ডাকতাম।

তোমাদের প্রেম ভেঙে গেল কেন?

সরাসরি এই প্রশ্নের জবাব দেয়নি অমৃতা। তবে নানা কথা থেকে বুঝেছিল তার আর অবিনাশের সম্পর্কটা মেনে নিতে পারেননি অমৃতার বাবা-মা এবং দাদা। বিশেষ করে দাদাই বেশি বাধা দিয়েছিল। এই নিয়ে নানা সংঘাত হয়েছিল। এমনকি অবিনাশকে মার খেতে পর্যন্ত হয়েছিল সুদীনের বন্ধুদের হাতে। ঘটনাটা জানার পর বাবার ওপর খুব রাগ জন্মেছিল তিন্নির।   ডঃ হিরণ্ময় গাঙ্গুলির পরামর্শে তিন্নিই অবিনাশকে তাদের বাড়িতে আনার ব্যাপারে উদ্যোগ নিয়েছিল। কিন্তু ব্যর্থ হয়েছে সে। মনটা তখন থেকে আরও খারাপ হয়েছিল। অবিনাশ আসছে জেনে তার বুকের মধ্যে যেন একটা নদী বয়ে চলেছে। আর তাতে ভেসে চলেছে হাজার হাজার আলোকিত প্রদীপ।

কলিং বেলের শব্দ শুনে সিঁড়ির মুখে এসে দাঁড়ায় তিন্নি। নিশ্চয়ই বাবা এল! মাধবী দু ধাপ উঠে তিন্নিকে দেখে বলে, অবিনাশ বলে একজন…

কথা শেষ করতে দেয় না তিন্নি। ওপরে পাঠিয়ে দাও।

সিঁড়ি বেয়ে ধীরপায়ে উঠতে উঠতে অবিনাশ বলে, আমি এখানে এসেই ফোন করেছিলাম। যদি অনুমতি না পাই ফিরে যাব ভেবেছিলাম।

অবিনাশের কথার প্রত্যুত্তরে কিছু না বলে মুচকি হেসে তিন্নি অমৃতার ঘরে ঢোকে। পিসিমণির কানের কাছে মুখ এনে প্রায় ফিসফিস করে বলে, পিসিমণি, চোখ খোলো। শরৎবাবু এসেছেন। এসেছে শরৎ হীমের পরশ… তুমি হীমের পরশ পাচ্ছ না?

ধীরে ধীরে চোখ খোলে অমৃতা। অস্থির চোখের মণি কাউকে যেন খুঁজছে। একসময় মণি স্থির হয়। দৃষ্টি নিবদ্ধ হয় অবিনাশের মুখে। বিড়বিড় করে উচ্চারণ করে, অ্যাডোনিস! আমাকে নিয়ে চলো অন্য কোথাও। এখানে আমার খুব ভয় করছে। এরিসের লোকজন আমাকে বাঁচতে দেবে নাকক অ্যাডোনিস!

না পিসিমণি। অ্যাডোনিস নয়। শরৎবাবু এসেছেন। একবার ভালো করে চেয়ে দেখো। তোমার সেই অবিনাশ। আমিই আসতে বলেছি ওনাকে।

স্থির চোখের মণি স্থিত হয় অবিনাশের মুখে। ঘোলা চোখে নির্লিপ্ত দৃষ্টি। কিছুক্ষণ সেভাবেই তাকিয়ে থাকে অমৃতা। অবিনাশের মুখে হীরের কুচির মতো হাসি খেলা করে। অমৃতার মুখে হাসি ফোটে না। তাকিয়ে থাকতে থাকতে একসময় তার চোখের পাতা ভারী হয়ে বুজে আসে। ঘুমের অতলে তলিয়ে যায় সে।

ইতিমধ্যেই সুদীন চলে এসেছে। মাধবীও এসে দাঁড়িয়েছে তিন্নির পাশে। সকলে নির্বাক তাকিয়ে থাকে অমৃতার দিকে। তিন্নি বিড়বিড় করে বলতে থাকে, শরৎ এসেছে পিসিমণি, দেখো একবার। অন্তত একবার চোখ মেলো...

ঘরের বাতাসে হীমের পরশ, তিন্নি আর উপস্থিত সকলের শরীর ছুঁয়ে যাচ্ছে সেই ঠাণ্ডা বাতাস।

৫টি মন্তব্য: