পিয়াংকী

 



দাগ। একটি শব্দ। দুটি শব্দ। তিনটি শব্দ... 


 

দাগ আসলে বহু শব্দের সমষ্টিগত যোগাযোগ। আমি যোগফল  বললাম না কারণ যোগফল নির্দিষ্ট-তে আটকে নেয় নিজেকে।যোগাযোগ তা নয়। যোগাযোগ ভাসমান, পাখির মত। 

'দাগ' তাই  আমার কাছে 'একটি নির্ভার যোগাযোগ'

 

...এতক্ষণ ধরে "দাগ" শব্দটা ব্যবহার করে যাচ্ছি অথচ এখনও অবধি জানানো হয়নি দাগ আসলে কী? এটি একটি কাব্যপুস্তিকা। নব্বইয়ের  বিশিষ্ট কবি সজ্জ্বল দত্ত-র কলমে গড়ে ওঠা ১৪ টি কবিতার অমোঘ চুম্বকীয় আকর্ষণ। এক ফর্মার এই বইটিতে খুব যত্নে এবং আদরে আগলে রাখা হয়েছে অক্ষরদের। কাওকে পরানো হয়েছে শীতের  উল কাওকে গ্রীষ্মের সুতি।

 

 'এককোণে কেন্নোশরীর' থেকে 'ব্রহ্মের দুই ডানা' ... এখানে গেঁথে রাখা হয়েছে খানকতক মাছ। আমরা পাঠকরা বড়শি ফেলছি আর তুলে নিচ্ছি আমিষ প্রোটিন। এই আমিষ প্রোটিন কবিতার মাথা তৈরির জন্য কতটা প্রয়োজনীয় তা তো আর বলার অপেক্ষা রাখে না। কিছুটা মজার ছলে আমি বলতে চাইলেও সর্বসাকুল্যে প্রশ্ন একটাই পাঠকের মনকে কতটা কাটাকুটি করে দিতে পেরেছে 'দাগ'? 

 

  সত্যি বলতে কি কবিতা তো একটা মায়ার শরীর যেখানে ফুলের মত করে ফুটিয়ে রাখা হয় অঙ্গপ্রত্যঙ্গ, একটু একটু করে আলো আর আঁধার ফেলে সঠিক অনুপাতে মিশ্রিত করে করা হয় মরীচিকা। আর এই অবিন্যস্ত মিশ্রণটা যিনি যতটা বেশি পাটিগণিত দিয়ে করতে পারেন বা পেরেছেন তিনি স্বাভাবিকভাবেই ততটা তীক্ষ্ণ কবিতাস্রষ্টা।

 

 সরাসরি কবির হাত থেকে তাঁর নিজের লেখা অক্ষরসমূহ  উপহার  পাবার পর থেকে আস্তে আস্তে  জলের সিঁড়ি দিয়ে নামতে থেকেছি নীচে আরও নীচে। সাত নম্বর পাতায় এসে থমকে যাচ্ছি বারবার 'চুম্বন' কবিতায় কবি বলছেন "তিনভাগ জলে ডুবে অমৃত তুলে মেখে ভিজে ভিজে একভাগ স্থল"। কী এই অমৃত? এখনো সম্পূর্ণ জেনে ওঠা হয়নি ভেবে পৃষ্ঠা ওল্টাই। সামনের দিকের পৃষ্ঠা। দেখি প্রথম পাতা প্রথম কবিতা 'কবিতা'য় লেখক বলছেন, " আধা আমি পুরো আমি শূন্য ফোঁপড়া আমার"। এই বোধের কাছে মাথা নত করে বসে থাকি, বুকের ওপর দিয়ে বয়ে যায় জল, সাথে লরির আটচাকা

 

কেন জলের সাথে লরির চাকা বললাম? কেন কঠিনের সাথে রাখলাম তরলকে?কেমিস্ট্রি এই ইকুয়েশন দেখে জানাবে, খুব শিগগিরই বিক্রিয়া শুরু হবে।হ্যাঁ, আমিও বলছি হবে। বিক্রিয়া হবে পাঠকের মনে এবং মাথায়। 'দাগ' কাব্যগ্রন্থের প্রতিটি কবিতাই হয়ত এমন বিক্রিয়া সৃষ্টি করে। 'রজনীগন্ধা চাষ' কবিতায় কবি ছন্দের দোলাতে লিখছেন,"আগুন পোড়া বিষের জ্বালা অপূর্ব সহবাস/তবুও সেই হৃদয় খুঁড়ে রজনীগন্ধা চাষ"। আসলে ছন্দ তাল মাত্রা লয় নিখুঁত রেখে এই যে ভাব বিনিয়োগ বা বলা যায় বোধের উত্তরণ তা হয়ত খুব দক্ষ শিল্পী না হলে করাটা অসম্ভব। 

 

 'শ্রী ও শ্রীমতী' কবিতার একটা লাইন বরং বলি আপনাদের, "দুই বিন্দু ভ্রমণসঙ্গী, মাঝে/আগুন ছুঁয়ে এপাশ ওপাশ হাওয়া... "... আট লাইনের একটি কবিতায় আর কীই চাওয়া থাকতে পারে যেখানে মেল-ফিমেল দুই সূক্ষ্মতম কেন্দ্র। ষোল পাতার ঝিরিঝিরি শব্দ, মিটমিটে আলো, ধোঁয়াশা সন্ধ্যা পেরিয়ে চলে এলাম শেষ পাতায়। আমি যেন আচমকা আটকে গেলাম লিফটের বন্ধ দরজায়। কোন দরজা কতটা বন্ধ কতটা খোলা কিবা প্রস্থান... কিচ্ছু জানি না। শুধু দেখছি ব্রহ্ম দাঁড়িয়ে আছেন সটান। তার দু'পাশে জেগে আছে ডানা। একদম ঠিক ধরেছেন এই গ্রন্থের শেষ কবিতা 'ডানা'। কবিতালেখক লিখছেন," আদিতে ব্রহ্ম হলে ব্রহ্মের দুই ডানা...... বিকেল হলেই গায়ে গন্ধ ডিও স্প্রে মেরে অন্য ডানার খোঁজে যাই"

 

বইটি উপহার পাবার জন্য যতটা ধন্যবাদ জানাব কবি সজ্জ্বল দত্তকে ঠিক ততটাই ধন্যবাদ প্রাপ্য প্রকাশক মৃদুলা ভট্টাচার্য-র। একদম ছিমছাম পরিস্কার প্রিন্টমিসটেক বর্জিত এমন একটা বই পাঠকদের হাতে তুলে দেবার জন্য তাঁর পরিশ্রমও কম নয়। সাথে অতি অবশ্যই বলতে হয় প্রচ্ছদশিল্পী রাজদীপ ভট্টাচার্য-র কথা। এবং সবশেষে বলি কবিতার সূচি শুরু হবার ঠিক আগের পাতায়  ফাউ ফুচকার মত একটি অতিরিক্ত চারলাইনার পড়ার সুযোগ করে দেবার জন্য কবিকে অনেক ভালবাসা।

 

 ...অনন্ত এ যাত্রাপথ আরও আরও দীর্ঘায়িত হোক, এই শুভকামনাটুকু রেখে গেলাম

  

1 টি মন্তব্য: