শ্রাবণী গুপ্ত সরকার

 


পাঠ প্রতিক্রিয়া

বইয়ের নাম - বাজে গো বীণা 

লেখক -হিমাদ্রি কিশোর দাশগুপ্ত 


সাহিত্যের ধারায় উপন্যাস নিঃসন্দেহে অন্যতম জনপ্রিয় বিষয়। তার মধ্যেও বিশিষ্টতা দাবী করে ঐতিহাসিক উপন্যাস। কারণ সময় সরণি ধরে যাত্রা করতে হয় অতীত অভিমুখে।ইতিহাসের সঙ্গে সাহিত্যিকের কল্পনা মিতালী পাতায়।পাঠকদের নিয়ে চলে কখনো ইতিহাস প্রসিদ্ধ সম্রাট,সুলতান, রাজা রাণীর সুরম্য প্রাসাদে। আবার কখনও আমরা বিচরণ করি অখ্যাত, অনামী সাধারণ মানুষের দুঃখ,সুখের জগতে। আলোচ্য বইয়ে আছে মোট তিনটি ঐতিহাসিক উপন্যাস। অবশ্যই ইতিহাসের বিভিন্ন যুগ এবং চরিত্র অবলম্বনে রচিত হয়েছে এবং তৎকালীন কালসৌরভ সযতনে বয়ে এনেছে পাঠকের হৃদয়ে।

 প্রথম উপন্যাস - অপাপবিদ্ধ প্রাচীন ভারতীয় পটভূমিতে রচিত। গণরাজ্য লিচ্ছবী ষোড়শ মহাজনদের অন্যতম। তারই রাজধানী বৈশালীতে মগধ সম্রাট অজাতশত্রু কীভাবে কূটনৈতিক চালে নিজ অধিকার প্রতিষ্ঠা করলেন সেই কাহিনির পাশাপাশি চলেছে এক অপরাধী মনের প্রায়শ্চিত্তের আলোকঅভিসার।অন্যতম আকর্ষণীয় চরিত্র স্বয়ং ভগবান বুদ্ধ। সম্রাটের কুটিল রাজনৈতিক বুদ্ধির জটিলতার আবিল স্রোতের পাশেই বয়ে চলেছে শুদ্ধ চিন্তার স্বচ্ছ ধারা।যুগপুরুষ গৌতম বুদ্ধের ধৈর্য্য,আর দূরদর্শিতার সুন্দর প্রকাশ ঘটেছে কাহিনীতে।ষোড়শ মহাজনপদের অন্যতম গণরাজ্য লিচ্ছবীর রাজধানী বৈশালী।তারই এক পর্বতকন্দরে পাওয়া যায় সুদুর্লভ সুগন্ধি'গন্ধভান্ড'।মগধ নরেশ তখনও অধরা বৈশালী দখলের জন্য এরই ফাঁদ বিস্তার করলেন বৈশালী অধিকারের কৌশল হিসেবে।যার অন্যতম শিকার হলেন ঐহিক আর পারত্রিকের টানাপোড়েনে দোদুল্যমানা নগরশোভিনী নটী বিত্তবাসনা।কিন্তু এমন কাজ করে সম্রাট কী শুধুই জয় লাভই করলেন? নাকি হারালেনও কোনো বিশেষ অনুভূতি!সমগ্র উপন্যাসে বুদ্ধের পবিত্র উপস্থিতি প্রাণে বড়ো আরাম জাগায়।তাঁর শুদ্ধ চিন্তা রাজনৈতিক জটিলতার মধ্যে শান্তি আনে অনায়াসে।

 দ্বিতীয় উপন্যাস সঙ্গীতজ্ঞ তানসেনের আশ্চর্য প্রতিভার পরিচয় ধরা পড়েছে কিংবদন্তী বিষয়ক উপন্যাস - বাজে গো বীণাতে। আকবরের সভার অন্যতম শ্রেষ্ঠ রত্ন তানসেন গানের নিখুঁত সুরবিস্তার জ্বালাতে পারতো আগুন,কখনও বা বিশুদ্ধ মেঘমল্লারের সজল সুরে অঝোর ধারায় বৃষ্টি নামাতো আকাশ জুড়ে। কিন্তু তাঁর প্রেমে আত্মহারা অপরূপা রূপোয়াতীর আত্মনিবেদন চিরন্তন হয়ে আছে এই উপন্যাসে।হয়তো ইতিহাস উপেক্ষিতা এই সুন্দরী, গুণবতীর জন্য চোখের কোলে অশ্রু বিন্দু আসবে পাঠকের ।তৃপ্ত হবে সেই হারিয়ে যাওয়া নারীর সুতীব্র ভালোবাসার আবেগ হয়তো বা।তানসেনের সঙ্গীত তদগত আনমনা রূপটি অসম্ভব সুন্দর করে উপস্থাপিত হয়েছে উপন্যাসে।রূপোয়াতীর,একপাক্ষিক প্রেম কী শেষ পর্যন্ত স্পর্শ করতে পেরেছিল তানসেনের চিত্ত? নকি একনিষ্ঠ পত্নীপ্রেমের দায়বদ্ধতায় তার প্রতি নির্লিপ্তই রইলেন নবরত্ন সভার অন্যতম সেরা রত্ন? সেটা নাহয় নাই বললাম।

 তৃতীয় উপন্যাসে ইতিহাসের সঙ্গে মিশেছে লোককথা বা উপকথা থেকে পাওয়া কিছু অতিপ্রাকৃত ঘটনা। বর্গী আক্রমণের আশঙ্কায় কন্টকিত বাংলার অজয় নদের তীরে সমৃদ্ধ প্রাচীন গ্রাম সুপুর। পরম সুদর্শন, সুগায়ক বৈষ্ণব সাধক আনন্দ গোঁসাই তাঁর অলৌকিক শক্তি দিয়ে কী রুখতে পারলেন এই দুর্বিপাক?অতীতের শাক্ত সাধনাকালীন তন্ত্রগুরুর কাছে শেখা এক আশ্চর্য শিক্ষা তাঁকে সাহায্য করল বর্গীহানা প্রতিরোধ করতে। একই সঙ্গে তন্ত্রসাধক এবং বৈষ্ণব ছিলেন আনন্দচাঁদ। ব্যতিক্রমী এই উপন্যাস তন্ত্র সাধনার অসাধারণ আররহস্যময় জগতেও অনায়াসে পাঠকদের নিয়ে যাবে।গায়ে কাঁটা দেয় সেই সাধনার বিবরণে।আবারও বৈষ্ণব সঙ্কীর্তনের ছন্দে মন মাতে। শাক্ত আর বৈষ্ণব দুই বিপরীত চিন্তার সাধনাকে সম মর্যাদা দিয়ে এমন উপন্যাস নিঃসন্দেহে বাংলা সাহিত্যে খুব বেশি রচিত হয় নি। অজয়ের চরে বর্গী হানা এমনই এক অলৌকিক রসে সমৃদ্ধ ঐতিহাসিক উপন্যাস । দুই মলাটের মধ্যে ইতিহাস অনায়াসে ধরা দিয়েছে লেখকের বর্ণনা এবং ভাষার কুশলতায়।আরও অসাধারণ রচনার প্রত্যাশায় রইলাম আমরা।সঙ্গে আছে শিল্পী রঞ্জন দত্তের অসাধারণ সুন্দর প্রচ্ছদ ও অলঙ্করণ।দে'জ এর সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষ্যে এমন সুন্দর বইটির প্রকাশ।

 

 

বাজে গো বীণা 

লেখক -হিমাদ্রি কিশোর দাশগুপ্ত 

প্রকাশক-দে'জ পাবলিশিং

বিনিময় -২৮০ টাকা মাত্র।

 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন