শ্রীশুভ্র

 

 দুই মলাটের অন্তরে


শেষ হলো আরো দুটি বইমেলা। ঢাকা ও কলকাতায়। প্রতিবার কলকাতা শুরু করে। শেষ করে ঢাকা। এবার পাশা উল্টে গিয়ে ঢাকায় মেলা শুরু হয়ে শেষ হলো কলকাতায়। না দুটি আলাদা শহর। দুটি আলাদা দেশ। দুটি আলাদা মেলা। কিন্তু দুটিই বাঙালির বইমেলা। বাঙালির উৎসব। বাংলা ভাষার উৎসব। বঙ্গসংস্কৃতির উৎসব। সেখানে অন্যান্য নানা ভাষার সাহিত্যের জন্যেও অবারিত দ্বার খোলা থাকে। তবুও বাংলার দুটি প্রধান শহরের বার্ষিক এই আয়োজন মূলত বাংলা ভাষা সাহিত্য ও চেতনার উৎসব। অনেকেই বলতে পারেন। চেতনাই মূল বিষয়। জ্ঞান বিজ্ঞান দর্শনের আধারে যা ধরা থাকে। কোন না কোন একটি ভাষায়। ভাষা এখানে গৌন। চেতনাই মুখ্য। একথাও যেমন ঠিক। তেমনই, ভাষা ছাড়া চেতনার স্বতঃস্ফূর্ত বহিঃপ্রকাশও সম্ভব কি? ফলে চেতনা মুখ্য বিষয় হলেও। ভাষাই তার বাহন। সেই বাহনেরও ওজন রয়েছে বইকি। যে ভাষায় যত বেশি চেতনার চর্চা ও বহিঃপ্রকাশ ঘটে, ঘটতে থাকে। সেই ভাষা তত বেশি সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে। বিশ্বের দরবারে এর নিদর্শন রয়েছে। ফলে বাংলার বইমেলা। বাংলা ভাষার উৎসব। বাঙালির অহংকার। বিশ্বের প্রতিটি সমৃদ্ধ ভাষারই এমন একটি অহংকারের জায়গা রয়েছে। থাকার দরকারও আছে। এই অহংকারটুকু যদি না থাকে। কোন ভাষাই মেরুদণ্ড সোজা করে চলতে পারে না। পারার কথাও নয়। ভাষাকেও চলতে হয়। আর সেই চলার জন্যেই একটা সোজা এবং দৃঢ়। ঋজু এবং প্রত্যয়ী মেরুদণ্ডের প্রয়োজন রয়েছে। বইমেলা সেই মেরুদণ্ডের সঞ্জীবনী শক্তি।

 

আর বই তার প্রাণভোমরা। বইমেলা সেই প্রাণভোমরার গন্ধে মাতোয়ারা হয়ে থাকে। তাই আমরা বইমেলায় ছুটি। সেই গন্ধ আমাদের চেতনাকে উৎসাহী করে তোলে। দুই মলাটের ভিতরে চেতনা চর্চার একটা হাতছানি থাকে। না থাকলে আমরা বইয়ের সাথে মিতালী পাতাতে অমন অধীর হয়ে ছুটবো কেন? না, কথাটা পুরোপুরি সত্যও হয়তো নয়। বহু মানুষই বইমেলায় ছোটেন। বই নয়। মেলার টানেই। তাদের কাছে বইয়ের থেকেও মানুষের সাথে মিলন অনেক বেশি আকর্ষণের বিষয়। মানুষের সাথে মিলন, অন্যান্য যে’কোন মেলাতেই হতে পারে যদিও। তবু তার অমোঘ টান, বইমেলাতেও থাকে। থাকবেই। আবার মানুষের মেলার সাথে বইমেলা, বইয়েরও মেলা। নতুন বইয়ের মেলা।

 

অবশ্য নতুন বই মানেই যে নতুন চেতনার উৎস খুলে দেওয়ার শক্তি ধরবে। তাও নয়। বরং বলা চলে। অধিকাংশ নতুন বইয়ের দুই মলাটের ভিতরে সেই শক্তি থাকে না। বা থাকলেও পরিপুষ্ট নয়। তবু পাঠক মাত্রেই একটা বিশ্বাসকে লালন করে চলে। নতুন বই নতুন কথা বলবে। বলে না, এমনও নয়। তবে খেয়াল করে দেখলে দেখবো। বেশ একটু কমই বলে। বেশির ভাগ বই পুরোনো কথারই পুনরাবৃত্তি করে থাকে। তবে বলার ধরণে নতুনত্ব থাকতেই পারে। আর থাকেও। পাঠকের খুশি আর আনন্দের ভাগে সেও কম কিছু নয়। অধিকাংশ পাঠকই সেই আনন্দের ভাগ পেলেই সন্তুষ্ট। বেশি কিছু চাওয়ার থেকে যেটুকু পাওয়া যায়। সেটুকুই পরিপূর্ণ করে গ্রহণের ভিতরে বিচক্ষণতা রয়েছে। না হলে লোকসানের ভাগই বেশি হয়। নতুন কথা না থাক। বলার ধরণের ভিতরে যেটুকু নতুনত্ব থাকে। সেই সৌরভেরও একটা মৌতাত রয়েছে। যা পাঠককে ধরে রাখে। বা রাখার চেষ্টা করে। আবার একথাও ঠিক। দিনে দিনে সময়ের একটা পরিবর্তন ঘটতে থাকে। সেই পরিবর্তনের হাত ধরে নতুন নতুন বিষয়ের আবির্ভাব ঘটে। তাতে যে নতুন কথা থাকবেই। সেকথা বলা যায় না। নতুন কথা থাকতেও পারে। আবার নাও থাকতে পারে। ফলে নতুন নতুন বই নতুন নতুন বিষয়কে তুলে ধরবে। সেটা স্বাভাবিক। সেই বিষয়গুলি যদি নতুন কথা তুলে আনতে পারে। তবে সোনায় সোহাগা। ভাষা ও সাহিত্য। জ্ঞান ও চেতনা তাতে সমৃদ্ধ হয়ে উঠতে থাকে। কালের নিয়মেই তেমনটা হওয়ার কথা। আবার উল্টোটা ঘটলেও খুব একটা অবাক হওয়ার নাই। অনেক সময়েই দেখা যায়। আমাদের চেতনাচর্চা একটা সময়ের পরে থমকে দাঁড়িয়ে যায়। বেশ কয়েক কালপর্বের জন্য। আমাদেরকে তখন পুরানো মদ নতুন বোতলে ঢেলে কাজ চালিয়ে নিতে হয়। আমাদের গতি তখন নিজেরই চারপাশে ঘুরপাক খেতে থাকে।

 

বই নতুন। বিষয়ও হয়তো নতুন। কিন্তু তাতে নতুন কোন কথা যদি না থাকে। তবে সে কথার বলার ঢঙে নতুনত্বের আমদানি করেও বেশিদিন ধরে কাজ চালানো যায় না। বই তার পাঠক হারাতে থাকে। দুই বাংলা জুড়ে গত কয়েক দশকে বইমেলার চল ক্রমাগত ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে অনেক। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে, মুদ্রাস্ফীতির হাত ধরে বইয়ের ক্রয়বিক্রয়ের পরিমাণও অনেক বেড়েছে। কিন্তু সেই বইয়ের গত কয়েক দশকে নতুন নতুন কথা বলার শক্তি বৃদ্ধি পেয়েছে কি আদৌ? সবচেয়ে বড়ো প্রশ্নটা কিন্তু এইখানেই। বাংলা সাহিত্যের কথাই যদি ধরি। গত শতকের সত্তরের দশকের পর থেকে বাংলা সাহিত্য সেই রকম ভাবে নতুন কোন বাঁকে পৌঁছাতে পেরেছে কি আদৌ? গত পাঁচ দশকের বাংলা সাহিত্যে নতুন কোন কথা সেইভাবে আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ ও বেগবান করতে পেরেছে? মনে হয় না। আমি বলছি, হেম মধু বঙ্কিম নবীন যেভাবে বাংলা সাহিত্যে নতুন যুগের পথ কেটে ছিল। তারপর রবীন্দ্রনাথ। বিশ্বের যে কোন ভাষার সাহিত্যের পক্ষেই বিরল এক ঘটনা। কয়েক শতাব্দী পর পর। অমন এক শক্তির আবির্ভাব ঘটে। কিন্তু বাংলা সাহিত্য তো রবীন্দ্রনাথেই আটকিয়ে পড়েছিল না। শরৎচন্দ্র এবং নজরুল। গোটা বাংলাকে নাড়িয়ে দিয়ে গিয়েছিল। তারপর দুই বাংলায় কত সাহিত্য আন্দোলন। ধারা উপধারা। কত পরীক্ষা নিরীক্ষা। নতুন নতুন ভাবধারা। চেতনার আন্দোলন। নতুন ভাষা। নতুন কথা। নতুন যুগের নতুন বাণী। বাংলা সাহিত্যের ধারা ক্রমেই বেগবান হয়ে নানান শাখায় পল্লবিত হয়ে উঠেছিল। বাংলাদেশের মুক্তি যুদ্ধ। আর পশ্চিমবঙ্গের নকশাল আন্দোলনের সময় পর্ব অব্দি। মুক্তিযুদ্ধ কাঁটাতারের পূর্ব পারে, বিরাট একটা শূন্যস্থানের সৃষ্টি করেছিল। বুদ্ধিজীবী হত্যা। বাংলাদেশে যে অভিশাপ নামিয়ে নিয়ে এসেছিল। সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর মতো নতুন কথা সেইভাবে আমরা পেলাম কোথায় আর? ঠিক একই রকম ভাবে কাঁটাতারের এপারে। নকশাল আন্দোলনের সামূহিক ব্যর্থাতায় অত্যন্ত নিদারুণ ভাবেই মেধার যে শূন্যতা সৃষ্টি করেছিল। সেইখানেই আটকিয়ে রইলাম আমরা। কিছুদিন মধ্যমেধার দাপট রাজত্ব করে চলল। তারপর আজকে মেধাহীন জৌলুসে বাজার সরগরম। ফলে নতুন কথা ভাবার মতো এবং ভাবানোর মতো উপযুক্ত মেধার হাহাকার কাঁটাতারের দুই পারেই ঊনিশ-বিশ একভাবে কাজ করে চলেছে।

 

বিগত পাঁচ দশকে বাংলায় নতুন বই কম প্রকাশিত হয়নি। বাংলা সাহিত্যের প্রো‌ডাকশানও বন্ধ নেই। কিন্তু পাঁচ দশকে কয় পা এগোতে সক্ষম হয়েছে বাংলা সাহিত্য। জাতিকে শক্তি জোগানোর মতো কয়জন সাহিত্যিক উঠে দাঁড়াতে পেরেছেন। এই পাঁচ দশকে? ফলে নতুন নতুন বই রয়েছে। নতুন নতুন বিষয়ও রয়েছে কিন্তু নতুন কথা নেই। নতুন বই রয়েছে, চেতনার নতুন নতুন আলোড়োন নেই। জীবন ও জগতের সাথে মেধার যে মন্থনে চেতনা নতুন ভাবে আলোড়িত হয়ে ওঠে। কোথায় সেই মেধা? কোথায় সেই মন্থন। সেই মন্থন না ঘটলে। নতুন ভাষাই বা আসবে কোন পথে? নতুন ভাষ্যও বা সৃষ্টি হবে কোন শক্তিতে? নতুন কথা বলবেই বা কে? বিগত পাঁচ দশকের বাংলা সাহিত্য, বাংলা সংস্কৃতির চর্চায় নতুন নতুন কথা বলার মতো শক্তির আবির্ভাব হয়েছে বলে মনে হয় কি? যাঁদের কাছ থেকে আমরা নতুন কথা নতুন চিন্তার পুষ্টি পেয়েছি। তাঁরা আজ আর কেউ জীবিত নেই। সন তারিখ মিলিয়ে খোঁজ করে দেখলে। দেখা যাবে, বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে যাঁরাই নতুন নতুন বাঁকে পৌঁছিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাঁদের অধিকাংশের জন্মই ব্রিটিশ পাততাড়ি গোটানোর পূর্বে।

 

ফলে বছর বছর বইমেলা রয়েছে। বছর ভর বইমেলা হয়। বইয়ের ক্রয়বিক্রয়ও একেবারে কম নয়। প্রকাশনা জগতে এখনো তালা পড়ে যায়নি। মেলার টানেই হোক। আর বইয়ের টানে। মেলামুখী মানুষের ভিড় বৃদ্ধি পেয়েছে অনেক। নতুন বইয়ের প্রকাশও কমে যায়নি। তবু নতুন বইয়ের গন্ধে নতুনত্ব খুবই কম। প্রায় নেই বললেই চলে। পুরানো চাল ভাতে বাড়লেও বইয়ের জগতে নতুন নতুন কথা, নতুন কথার সুরভিই সভ্যতার প্রাণভোমরা। কাঁটাতারের দুই পারেই সেই প্রাণভোমরা খুব একটা সজীব রয়েছে বলে প্রত্যয় জন্মায় না। উপযুক্ত মেধার সঞ্জীবনী শক্তি ছাড়া বাংলা বইয়ের জগত বইয়ের স্তুপে ভরে উঠলেও তার প্রাণভোমরাকে সজীব ও সতেজ রাখতে পারবে কিনা। সেই বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ থেকেই যায়।

 

১৮ই মার্চ’ ২০২২

 

কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত

 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন