প্রদীপ চক্রবর্তী


 জিরো দশকের কবিতা ও তারপর

এক .

 দশক আসে দশক যায় বাংলা কবিতার পাঠকদের নিয়ে সংশয় আরও ঘনীভূত হয় | একসময় পরাধীন রাষ্ট্রে দেশের আপামর মানুষের একমাত্র লক্ষ্য ছিল দেশের

 স্বাধীনতা |দেশের শত সহস্র তরুণ স্বাধীনতাকেই মোক্ষ ভেবে অকাতরে প্রাণ দেয় ইংরেজ অপশাসন থেকে দেশের মুক্তির আশা নিয়ে | নানাবিধ কারণের ফলশ্রুতি দেশের স্বাধীনতা ও দেশভাগ | তার সদর্থক ও নেতিবাচক দিক নিয়ে হাজার একশোটা কথা ভেসে আসে | অনেকেই আক্ষেপ করে বলেন এই স্বাধীনতা কী আমরা চেয়েছি ? কেউ কেউ বলেন , এ আজাদী ঝুটা হ্যায় ! তবু স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্মদিন , পনেরোই আগস্ট আজও ধুমধাম করেই পালিত হয় | 

বাংলা কবিতার ক্ষেত্রে তিরিশের দশকের কবিরা চেয়েছিলেন , রবীন্দ্রনাথের প্রভাব থেকে বাংলা কবিতা মুক্ত হোক | জীবনানন্দ , বুদ্ধদেব বসু , সুধীন্দ্রনাথ দত্ত , বিষ্ণু দে , প্রেমেন্দ্র মিত্র , সমর সেন প্রমুখ কবিরা বাংলা কবিতার খোলনলচে অনেকটাই বদলে দিলেন | এরপর দশকের পর দশক ধরে বাংলা কবিতা নিয়ে বহুস্তরীয় কাজ হয়েছে | ষাট দশকে এসে বেশকিছু কাব্যিক আন্দোলন আমাদের নাড়া দেয় | হাংরি , শ্রুতি , শাস্ত্রবিরোধী , থার্ড লিটারেচার , নিম সাহিত্য আন্দোলন পরোক্ষ ভাবে প্রভাবিত করতে থাকে পরবর্তী দশকগুলোতে বাংলা কবিতাকে | কিন্তু এরপরেও থাকে , কিন্তু ,  এবং , তবুও নামক কতগুলো সংশয়বাচক শব্দ | 

যেকোনো দশকের কাছে আমরা চাই নতুনত্ব | অর্থাৎ পুরোনো , বস্তাপঁচা , সাবেকি , হয়ে গিয়েছে এমন কাজ থেকে মুক্তি | তারজন্যই আলোচক নতুন দশকের নতুনত্ব নিয়ে ভাবেন এবং অনুসন্ধিৎসু মনে এক্সপ্লোর করেন , নতুন কাজের দিক ও দিশা গুলোকে | দিশা ও বিদিশা গুলোকে | কবিতার বহুস্তরীয় দিক আমাদের চেনায় আবহমান বাংলা কবিতার নতুন কী কী কাজ হচ্ছে | কিন্তু আজও অবাক হতে হয় , প্রাতিষ্ঠানিক অনেক কবি কেবল অধিক সংখ্যক পাঠকের মনপ্রীতি লাভ করার জন্য , নিজের পুরোনো লেখার থেকেও আরও পিছিয়ে যান রবীন্দ্রযুগের লেখা নতুন করে উপহার দেন পাঠকদের | আমরা বিস্মিত হই | 

 

যেমন ধরুন , এই আজ , ১২  অগ্রহায়ণ ১৪২৮ , রবিবার , ২৮  নভেম্বর ২০২১ | আজ সকালে ফেসবুকে পরম শ্রদ্ধেয় কবি সুবোধ সরকারের একটি নতুন কবিতা পাঠকের মুখে মুখে ঘুরছে | কবিতার নাম ' ইরাবতী '|  কবিতার শুরুর পংক্তিগুলো এরকম ....

" ভালোবাসা যদি বিপজ্জনক হয় 

 অঘ্রাণ হবে রাত্রে হিরণ্ময় |

হরিণ যখন হেমন্ত রাত পায় 

মানুষের পাপ কুয়াশায় ঢেকে যায় | 

 

চাঁদের ভেতর আমি নবান্ন করি 

মাঠে মাঠে আজ ধান কাটা হল সারা 

তোমার ভেতরে আমি নবান্ন করি 

আমার ভেতরে গোধূলির আশকারা | 

 

সোনালী যখন হয়ে ওঠে নিজে সোনা 

সোনালী যখন ধানখেত ছুঁয়ে যায় 

চাঁদ থেকে চাঁদ নেমে আসে পৃথিবীতে 

ইরাবতী , আমি তোমাকে দেখতে পাই " 

 

ইত্যাদি ইত্যাদি | পাকা হাতে লেখা অত্যন্ত উপভোগ্য কবিতা | কবিতাটি  দীর্ঘ কবিতা এবং শত সহস্র পাঠক মুগ্ধ এতে  | এখন আমার কতগুলো সরল

 প্রশ্ন | কবি সুবোধ সরকার ইংরেজি সাহিত্যের দিকপাল অধ্যাপক | সারা পৃথিবীতে ঘুরেছেন , সাহিত্য কর্মের জন্য | তিনি সমস্ত আন্তর্জাতিক কাব্যিক ও শিল্পকেন্দ্রিক আন্দোলনগুলো সম্পর্কে সম্যক জানেন | প্রায় সবই গুলে খেয়েছেন | তাঁর দ্বিতীয় কবিতার বই , "  ঋক্ষ  মেষ কথা " | তাঁরই আরেকটি কবিতার বই , একাকী নরকগামী | ছন্দের কবিতায় তিনি নমস্য | কিন্তু তিনি আগে যা লিখেছেন , এই লেখাটি কী তাকে ছাড়িয়ে গেছে ? কবি জসীমউদ্দীন , সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত , কাজী নজরুল ইসলাম , যতীন্দ্রমোহন বাগচী কী আগে এরম কবিতা লেখেন নি ? বাংলা কবিতার গত আশি বছরের ইতিহাস ধরলে সেই সমস্ত কবিতার চেয়ে কী এই কবিতাটি এগিয়ে আছে ? তাহলে দুহাজার একুশে দাঁড়ানো পাঠক , কবিতার শিক্ষিত পাঠক , তাঁরা এই কবিতাকে এতো প্রশংসা করছেন কেন ? তার মানে কী এই বুঝতে হবে যে কবি সুবোধ সরকার ভালো করেই জানেন , বাংলা কবিতায় যতই আন্দোলন হোক , নানারকমের নতুন কবিতা লেখা হোক , তাতে কী ? পাঠকের বোধ এখনো রবীন্দ্রনাথ , সত্যেন্দ্রনাথের কবিতা থেকে  বেরোতে পারে নি ! অতএব , পাঠকের মনপ্রীতি অর্জন করে নিজেকে জনপ্রিয় রাখতে গেলে এরম আঙ্গিকেই , এরম প্রকরণেই এখনো কবিতা লিখতে হবে | তা সে নিজের লেখা অতীতের কবিতা থেকে পিছিয়ে থাকুক ক্ষতি নেই | ,যেমন কবি জয় গোস্বামী , ক্রিসমাস ও শীতের সনেটগুচ্ছ , আলেয়া হ্রদ , ভুতুম ভগবান এসব লেখার অনেক পরে লিখেছিলেন , বেণীমাধব বেণীমাধব তোমার বাড়ি যাবো ! যেটি তুমুল জনপ্রিয় | এবং এই সমস্ত জনপ্রিয় কবি নিজের সেলেব সত্তাকে বজায় রাখার জন্য নিজের নিকৃষ্ট কবিতাকে নিজের উৎকৃষ্ট কবিতার আগে রাখেন | এগুলোই বাজারে প্রচার পায় | পাঠ্যপুস্তকে ঠাঁই পায় | নতুন প্রজন্মের পাঠক ও কবি হাতের কাছে এগুলো পেয়েই , অচলায়তনের গাড্ডায় মহা খুশিতে থাকেন | তাদের অধিকাংশ খুঁজেও দেখেন না , সেই শক্তিশালী কবি' র গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোকে | কেউ কেউ দেখেন কিন্তু তারা সংখ্যায় অনেক কম |  এবংঅধিকাংশ গা জোয়ারি  পাঠক হয়ে ওঠে আরও সংশয়ের | সে একই সঙ্গে এসমস্ত কবিতার পাশাপাশি , জীবনানন্দ , মণীন্দ্র গুপ্ত , উৎপল কুমার বসু , আলোক সরকার , অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত , প্রণবেন্দু , মলয় রায়চৌধুরী , প্রভাত চৌধুরী , বারীন ঘোষাল , রঞ্জন মৈত্র , প্রণব পাল , স্বদেশ সেন সবার কবিতায় একই সঙ্গে লাইক দেয় | এমনকি শূন্য দশকের তরুণ কবি সব্যসাচী হাজরা ওরফে দেব জীবনকেত , দেবযানী বসু , অরবিন্দ চক্রবর্তীর কবিতাতেও | 

অবাক পাঠক ۔۔۔۔ অবাক পৃথিবী ! 

 

দুই .

 

গত আড়াই দশক ধরে কবিতার নতুনত্ব ও অস্বীকৃত শক্তিশালী কলমকে তুলে ধরার জন্য আমার সাধ্যমতো আমি প্রয়াসী | আমার প্রকাশিত গদ্যগ্রন্থে এবং নতুন পাণ্ডুলিপিতেও সেই কাজের চেষ্টা | পরিশ্রমী এবং সৎ , সুকবি শীলা বিশ্বাস , তাঁর স্বপ্নের পত্রিকা ,

 এবং সই কথার , সাম্প্রতিক সংখ্যাটিকে চেয়েছেন শূন্য দশকের কবিতায় সাজাতে | সেই কবিতার প্রসঙ্গেই এই গদ্য লেখাটি | 

আগেই বললাম , সঠিক ও মেধাবী পাঠক কবিতার কাছে নদীর বহমানতা চায় | দশকে দশকে কবিতার চরিত্র সামাজিক ও ব্যক্তিক চরিত্রের মতো বদলে বদলে যায় | কবিতা কী লিখবো তা এখন বিচার্য্য বিষয় নয় | কীভাবে লেখা হবে সেটিই জরুরি এখন | নতুন পথের অভিযাত্রী যারা তাঁরা সব সময় চাইবেন কবিতা টু কবিতার পরিবর্তন | হ্যাঁ তাতে স্বকীয় বৈশিষ্ট পুরোমাত্রায় থাকবে কিন্তু বিষয় বর্জিত , কাহিনী হীন , গল্পহীন , গদগদে আবেগের বাহুল্যবর্জিত এমন এক চেতনাশ্রয়ী এই যাত্রা যার সামনে কোনো উদাহরণ নেই | বিমূর্ত কবিতার সাংকেতিক পথ ধরে কেন্দ্র থেকে বিকেন্দ্রীকরণের পথে এই চলাচল | উৎস কবিতা কেউ লিখতে পারে না | কবিতা সর্বত্র কেবল  পিপাসার্ত কবির অন্বেষা ও খোঁজ কবিতার কাছাকাছি নিয়ে যায় | সেই সাংকেতিক পথে কল্পচিত্রের সমাহারে , ভিশন থেকে নন ভিশনে যাত্রা হলো নতুন পথের কবির যাত্রা | এই চেতনা কী ? তা কোনো উদাহরণ দিয়ে বোঝানো যাবে না | কারণ চেতনা যার সেই উপলব্ধি করতে পারে | কিন্তু তার রিলেট করতে গেলে , সংযোগস্থাপন করতে গেলে তাকে নানারকম প্রকৌশলের আশ্রয় নিতে হয় | দৃশ্যকল্প , ধ্বনিগুণ , পুরোনো শব্দের নতুন প্রয়োগে অসম্ভব উচ্চতায় ওঠা , প্রচল শব্দের পাশাপাশি নানান গ্রাম্য , মফস্বল , প্রান্তিক পৃথিবী , নগর জীবন , আঞ্চলিক ভাষ্য ও শব্দের গুণ বুঝে তাকে প্রয়োগ করার জন্য স্বশিক্ষার প্রশিক্ষণের দরকার | পরিশ্রম এবং পাঠক ও কবি হিসেবে সুইচড অন অফ করা শিখতে হয় |  পূর্বসূরী কবি কী লিখেছেন এবং কী কী কাজ করেন নি , কোন۔۔ কোন۔۔ পথ এখনো অনাঘ্রাত |

পূর্বের কোন লক্ষণগুলো ক্লিশে এবং কোন লক্ষণগুলো ব্যবহৃত হয়ে হয়ে অতি পুরোনো ঝুরঝুরে হয়ে গেছে বুঝতে হবে | 

শূন্য দশকের আগের দশক নব্বই দশক | একটা অতি বর্ণময় ঘাত প্রতিঘাত ও বিচিত্র ইতিহাসের সাক্ষী এই  শতাব্দী |  শেষ দশক নানান রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পালাবদল , সামাজিক ও মানসিক পৃথিবীর  পরিবর্তন , একান্নবর্তী পরিবারের মূল্যবোধ ও সম্পূর্ণ ভাঙনের শেষে , ক্লিশে হয়ে টিকে থাকা কিছু বহমান ধ্বংসের স্মৃতিচিহ্ন নিয়ে যে নিউক্লিয়ার ফ্যামিলি গড়ে উঠেছে এই 

দশকে ,সেখানে যেমন বাতিল হয়ে যাওয়া রেডিয়োয় মহালয়ার ভোরে যেমন বীরেন্দ্রকৃষ্ণকে শোনা তখনো বন্ধ হয়ে যায় নি , ঠিক তেমনি রান্নাঘর থেকে জ্বালানি হিসেবে বিদায় নিয়েছে উনুন , হিটার | এসেছে গ্যাস | কম্পিউটার | ইকো ফেমিনিজম ভালোই মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে | শুরুর দিকে বেসরকারি টিভি চ্যানেল নেই , কিন্তু ধীরে ধীরে দূরদর্শনের চাহিদা কমছে | পুরোনো টেলিফোনও আছে , আবার আসছে ছোট ছোট চেহারা নিয়ে "নিজস্ব " সেলফোন | ধীরে ধীরে ই মেইল , ইন্টারনেট , ই কমার্স | ক্যাপিটালিজমের সংজ্ঞা বদলে দিচ্ছে কোল্ডওয়ার | রেডিওর অনুরোধের আসর বদলে যাচ্ছে জীবনমুখী গানে | একটা ডিসকোর্স , নতুন বিশ্বব্যবস্থা মাথা তুলছে ,  নয়া উপনিবেশবাদের পাশাপাশি | একটা নতুন শব্দ , লাইন অব কন্ট্রোল ও দেশপ্রেমের হিড়িক | নৈরাজ্যবাদ ও পপ আর্ট , পপুলার কালচার ও পর্নোগ্রাফি | দ্বন্দ্বমূলক জীবনে , পুরোনো ও নতুনের টানাটানিতে অবিমিশ্র বহুস্তরীয় যাপনে এলো নয়া শব্দ | পোস্ট কলোনিয়াল , পোস্ট মডার্নিজম , পোস্ট মার্ক্সিজম , বাংলা ব্যান্ড - বাঙালি নতুন উদ্বাস্তু - বিচ্ছিন্নতাবাদ ও বিকল্প পরিবার | ব্রত কথার পাশাপাশি বুর্জোয়া , মিথের পাশাপাশি মাল্টিমিডিয়া | লোকগীতির পাশাপাশি সাবল্টার্ন , সাবকালচার , সিন্ট্যাগমা ও প্যারাডাইম | ভাষার পরিবর্তন , হকিংয়ের কাল দর্শন , অন্যদিকে বিপণন , ডাডাইজম , ডিকন্সট্রাকশন , নয়া থার্ড ওয়াল্ড এবং থিসারাস | এক অদ্ভুত অবস্থা নব্বই দশকের | পুরোনো মূল্যবোধ ও যাপন এবং নয়া জীবনধারণা  ও প্রযুক্তি' র দড়ি টানাটানিতে অদ্ভুত হাঁসফাস অবস্থা | একদিকে জয় গোস্বামী , শঙ্খ ঘোষ , সুনীল গাঙ্গুলি ۔۔۔ অন্যদিকে সমীর রায় চৌধুরী , বারীন ঘোষাল , মলয় রায়চৌধুরী , প্রভাত চৌধুরী | বাংলা কবিতার সম্পূর্ণ বিপরীত দুটো দিকের মতোই জীবনের সমস্ত ক্ষেত্রে বৈষম্য ও বৈপরীত্য নিয়েই নব্বই দশক শেষে শুরু হয় শূন্য দশক | শূন্য দশকও শেষ হয়ে গেছে প্রায় একদশক আগে | আগেই বলেছি , এক একটা দশক নতুন করে বাংলা কবিতার খোলনলচে বদলাতে এসে কিছু ভালোমন্দ রেখে যায় বহমান নদীর বেলাভূমিতে | 

 

"এবংসইকথার " সম্পাদক শীলা বিশ্বাস ঠিক করেছেন , তিনি নির্বাচিত একটি শূন্যের ওপর সংখ্যা করবেন | এবং এই সংখ্যায় তিনি অনেক শূন্যদশকের  শক্তিশালী কবির কবিতা রেখেছেন , সেইসব কবিতার বেশ কিছু পড়তে গিয়ে আমি বিস্মিত হয়েছি এবং মুগ্ধ , এর ব্যাপক বৈচিত্রের জন্য   | কারণ নব্বই দশকের অনেক সংশয় ও দ্বন্দ্ব কাটিয়ে এ দশকে আমরা পাচ্ছি নানান বিচিত্র স্বাদ ও বহুরৈখিক কবিতার চর্চা | আবহমান কবিতার শরীরে লেগেছে নানারকম ডিসকোর্স ও চর্চার নয়া ভাষা ও ডিকশন | সব্যসাচী হাজরা , অভিজিৎ দাস কর্মকার , অনিকেশ দাশগুপ্ত , বিশ্বজিৎ লায়েক , সব্যসাচী মজুমদার ,  পার্থজিৎ চন্দ , রবিন বণিক , নিমাই জানা , সৌরভ বর্ধন , প্রসাদ সিং , সৌমনা দাশগুপ্ত , দেবযানী বসু  , রত্নদীপা দে ঘোষ , অরণ্যা সরকার , মানসী কবিরাজ , সোনালী ঘোষ , মনোনীতা চক্রবর্তী , মন্দিরা ঘোষ , পলাশ দে , অরুণ পাঠকের কবিতা পড়তে পড়তে অবাক হলাম এই ভেবে যে কোনও কবির সঙ্গে কোনও কবির মৌলিক মিল নেই | যে যার জায়গায় স্বতন্ত্র এবং নিজস্ব | এরা কেউই কারোর অনুকারী , বৎসল অনুগ্রাহী নয় | কোনও ছত্রছায়া নেই সরাসরি |  নিজস্ব পথ ও নিরীক্ষাক্ষেত্র তৈরী করা সহজ নয় | তাই বৈপরীত্য ও বৈচিত্র নিয়েই কবিরা তৈরী করেছেন কেউ কেউ ধ্বনি বোধ এবং আংকিক জীবনসূত্রের নয়া অবয়ব | কেউ বা প্রাচীন বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস ও সমকালীন সময়ের নাগরিক অস্থিরতায় মিশিয়েছেন নিজস্ব অবস্থান | কেউ বা ষাটের নিরীক্ষামূলক কাব্যআন্দোলনের যে নিঃসৃত ভাবকল্প তার সঙ্গে পরোক্ষ ভাবে নিজেকে খুঁজে পেয়েছেন | কেউ বা দ্যুতিকঠিন বৈদগ্ধ্যে উপাসকের মতো | কেউ বা শুদ্ধ চৈতন্যে , ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা , রুচি , বিপ্রকর্ষ টানাপোড়েনে ভাষার অস্থিরতায় ভাবনার নতুন জমিতে পা রেখেছেন | কেউ দার্শনিকতাধর্মী , যতটা না ইন্দ্রিয়ধর্মী তার চে বেশি ভাব নির্ভর |  অস্তি - নাস্তি বোধের দ্বন্দ্ব কারোর কারোর লেখায় | কেউ অত্যন্ত ছন্দ দক্ষ অথচ সেই দক্ষতার মধ্যে দাঁড়িয়ে প্রচল , অপ্রচল শব্দের হাটে নানান কিসিমের বিকিকিনি সেরেছেন ভাবনার সাম্প্রত ও শাশ্বতের জটিলতায় | কেউ বা ইম্প্রেশনিজমের নিয়মে ভাব ও অনুভূতিকে মিশিয়ে জীবন্ত ভাবনার ছবি এঁকেছেন | কেউ বা অন্তর্মুখ অনুভূতিপ্রধান | কেউ অধিদৈব - প্রদোষলোকে আচ্ছন্ন | কারোর মনোভঙ্গি মরমী তো কেউ অপরিচিত সান্দ্রতা ও রহস্য কুয়াশার স্তর ভেদ করে করে  তার নীল চৌতিশায় ফোটে আফোটা মঞ্জরী | কেউ চকিতে এমন কিছু ভাবনা কল্প তৈরী করেছেন যে বিশৃঙ্খল সময়ের উদ্ভট অনিশ্চিত জীবনের অভিজ্ঞতা অনুভূতি নিংড়ে আমাদের কয়েক মুহূর্তের জন্য হৃদপিণ্ডের রক্তসঞ্চালন বন্ধ করে দেয় | কেউ মস্তিস্কপ্রবণ তো কেউ মরমী | কারোর লেখায় দূরবিসর্পী শূন্যতা , কেবল শূন্যতার মধ্যে বেড়ে ওঠে নিরালম্ব ক্রোধ ও দুঃখ | কেউ বা ক্লিব্য , হৃদয়হীনতা ও মনুষ্যত্বের অপস্মার থেকে নিয়ে গেছেন প্রান্তিক জীবনের কয়েক দণ্ড ছায়ায় | কেউ বা মানুষের সমব্যথায় ও বিদ্রুপে অপ্রতিরোধ্য | বাংলা কবিতার ক্ষেত্রে বা বলা চলে অধুনান্তিক সময়ে দাঁড়িয়ে আন্তর্জাতিক কবিতার ক্ষেত্রেও একজন কবি প্রকৃত প্রস্তাবে সমকালীনতায় দ্বিধাবিভক্ত হন দুটো ক্ষেত্রে | যখন তিনি কবিতা নিয়ে প্রবন্ধ লেখেন তখন তিনি যুক্তি পরম্পরায় কবিতার নানান দিক নিয়ে বিশ্লেষণ করেন , কিন্তু সেই কবিই সুইচড অন অফের খেলাটা খেলেন কবিতা লেখার ক্ষেত্রে | সেই সময় তিনি যুক্তি শৃঙ্খলের ফাঁটল খুঁজে পান | যেটা আমরা লজিক্যাল  ক্র্যাক বলে জানি | এবং এভাবেই একজন অপর ভাবনার কবি বা যিনি নতুন পথের যাত্রী তিনি ইনফিনিটিতে চলে যেতে পারেন | 

 

 তিন .

 আমরা একটা ধারণার পৃথিবীতে বসবাস করি | মানবসভ্যতার সমাজকেন্দ্রিক যাবতীয় ঘটনার অনুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করলে দেখতে পাই , ধর্ম , মোক্ষ , সম্পর্ক , বন্ধন কিংবা মানুষের যাবতীয় বাহ্যিক প্রতিক্রিয়ার সংশ্লেষ হলো এই ধারণাপ্রসূত | 

কিন্তু ব্যক্তিমানুষের অভিজ্ঞতাপ্রসূত ঘটনা যখন তার ভাবনাক্ষেত্রকে নাড়া দেয় এবং তার ভেতরের চেতন ও মনন এ সাড়া ফেলে তখন সেই সংশ্লেষিত জগৎই হলো তার জগৎ | সেটাই তার পৃথিবীর সীমা | কবি সেই সীমাকেই কাল্পনিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে প্রসারিত করে | এবং কবি' র সেই হাঁটা পথ শাহী সড়কের মতো সাবলীল হলে গতানুগতিক মনে হয় | যে ভাবে সবুজ আছে বলেই পৃথিবীতে আছি , না হলে নরকের ধারণাও নান্দনিক হতে পারে | ঠিক তেমনি কবি' র পথ বিস্ময় ও হোঁচটের | আলোর অন্ধকার এবং অন্ধকারের নিজস্ব আলো , নতুন নতুন দেখায় আমাদের থামিয়ে দেয় | কবি' র সঙ্গে সঙ্গে নিজেকেও আমরা এক্সপ্লোর করতে থাকি | 

নতুন পথের কবির থাকে মননজাত যুক্তিবোধ | ল্যাটারাল থিংকিংএর প্রসেস অনুযায়ী , আমাদের কবিতার নতুনত্ব আমরা আবিষ্কার করি , রক লজিকের মধ্যে দিয়ে নয় | আমাদের নতুন কবিতা জলের মতো ছড়িয়ে পড়া , বিভিন্ন সম্ভাবনার খোঁজ থেকে নতুন আবিষ্কার | এই প্রসেস হলো ওয়াটার লজিকের | 

শূন্য দশকের এই অবিমিশ্র অভিজ্ঞতাপ্রসূত কবির মধ্যেও আমরা পড়তে গিয়ে দেখছি , বহু বিচিত্র ছবির " বিদ্যুৎ স্পৃহা " বা স্পার্ক | অনেক কবিই শব্দ ও ভাষার গঠন নিয়ে খেলতে গিয়ে , কাব্যশৈলীকে , শব্দজাত মিউজিক রেজোন্যান্সের কাছাকাছি নিয়ে যেতে আগ্রহী | যেহেতু কবিতা বিভিন্ন মিডিয়ামের সঙ্গে যুক্ত এবং এই লেখনীর বিমূর্তকরণের অংশভাগ শব্দে নিয়ে আসার প্রসেসটা যেহেতু জটিল সেহেতু বলা যায় , নতুন পথের কবি নিজের ভাষাকে এক্সপ্লোর করেন , মানসচিত্রের অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে | অভিজ্ঞতা থেকে কাল্পনিক অভিজ্ঞতার অবিমিশ্র মিশ্রণ | অভিজ্ঞতার বাইরে সব টুকু অন্ধকার | সেই অন্ধকারকে স্পর্শ করলে যে  জার্ক বা নতুন অভিজ্ঞতার অনুরণনে কবি আলোকিত করে তোলেন চেতনায় এবং তিনি তার বহনক্ষম ভাষায় তাকে এক্সপ্রেস করেন , চেতনার সঞ্চারমান পদধ্বনির মধ্যে দিয়ে | এর ফলে তার শব্দ চয়ন , বাক্য গঠন কখনোই , নিছক শব্দের আভিধানিক অর্থের অভিজ্ঞতা দিয়ে বোঝানো যায় না | 

এরফলে কবি সব্যসাচী হাজরার দুটো কবিতা , আষাঢ়ভবনে ও স্ত্রী সমেত পড়ি আমরা , তখন ব্যাখ্যাতীত অনেক বাস্তবতা কবির ভাষায় চোখে নতুন ব্যঞ্জনায় আলোকিত হয় ...

" এই মাত্র নক্ষত্রের বুকে গ্যাস ভরছে ছেলে | / এই মাত্র মেয়ের জন্য ঘুরিয়ে দেখছি প্রভু |/ এ আমার লিঙ্গটুকু ফাঁকা ... এই আমার আয়তনপাড়, এসো স্ত্রী সমেত নামি | / কামনাস্ত্র হই | / যদিও ছেলেচাষের মেয়ে / তবুও রাজনন্দিনী / এ আমার পাখিবেলা নয় / এই আমার যৌনাস্ত্র নাও ... ( স্ত্রী সমেত ) 

 

অভিজিৎ দাস কর্মকার যে দুটি কবিতা লিখেছেন বা আগেও যত কবিতা তার পড়েছি তাতে মনে হয়েছে , এই তরুণ কবি নিজেকে ক্যালাইডোস্কোপে নানাভাবে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখেন | তার কবিতা অবিমিশ্র চেতন খননের কবিতা | যেখানে বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন ইতিহাস , ভিক্তোরিয়া যুগের ইংরেজ কবি' র কবিতাভাষ , বিজ্ঞানের যোগ্যতমের উৎবর্তন থেকে অভিযোজন হয়ে , বৈষ্ণবপদাবলীর অভিসার পর্যন্ত মিলে মিশে একাকার | কাল্পনিক ও ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য সমস্ত অভিজ্ঞতা ও অনুভূতি তাঁর কবিতায় সরাসরি না এসে , মস্তিষ্কের মধ্য দিয়ে  পরিশ্রুত , মার্জিত ও অপর কবিতার নানান ডিকসন নিয়ে উপস্থিত হয়েছে | অনেকটাই কোলাজ ধর্মী এবং গঠনে নতুন ۔۔۔۔যেমন 

" জ্যোৎস্নার সময় সীমায়  চাতক পাখিটি রঙ বদল করে ۔۔۔"  ( প্রত্ন  স্বাক্ষর ) বা " সমস্ত অভিযোজন থেকে অভিসার নামে " ۔۔۔ এমন গুরুত্বপূর্ণ পংক্তি লিখে ফেলেন কবি | 

 

বারবার "  আর্শি লেখনের " মতো আমি পড়ছি অনিকেশ দাশগুপ্তের দুটি কবিতা | কবিতা দুটি হলো ,  সূর্যাস্তের মাটি এবং আকাশের হাসি - কান্না | প্রত্যেক কবির মনের ভিন্ন ভিন্ন প্রবণতা থাকে | থাকে নিঃস্বন নিষিক্ত আভা | কবি তার কল্প পৃথিবীর নিজস্ব অভিজ্ঞতায় দেখে নেন , গির্জাঘর থেকে উড়ে আসা নতুন রোদের থাক , দূর রামধনু টিপ , ধূসর তারার আঙুল , সহস্র বছরের পাঠশালা | কবি লেখেন , " আত্মার গোঙানিতে ফেটে যাচ্ছে ঈশ্বরের গর্ভ / পুরনো পাউরুটির গায়ে হামাগুড়ি দিয়ে ওঠে একটি প্রথম জীবন / পাথরে লেগে অনন্ত তরঙ্গে ভেঙে যায় তার স্বপ্নের ভারসাম্য , / তারই একটি খরতরঙ্গ ছুটেছে তোমার দিকে " ( সূর্যাস্তের

 মাটি ) 

 

বিশ্বজিৎ লায়েক রাজনৈতিক সচেতন এক কবি | এই কবির ভাবনা জগতে সমকালীন বাস্তবতার ক্ষয়িষ্ণু ঘুণে ধরা সমাজের পচনশীল স্থবিরতার ছবি তুলে ধরেন | কিন্তু পাশাপাশি সম্পূর্ণ বিপরীত একটা জীবনবোধের ঘূর্ণি অদ্ভুত মিথস্ক্রিয়া তৈরী করে তার কবিতা | প্যারাডক্স |

যেটা তার লেখনীর মৌলিক ইন্দ্রজাল | এমন উজ্বল পংক্তি তিনি আমাদের উপহার দেন , যা আমাদের অসাড় মধ্যজীবী চেতনায় হাতুড়ির আঘাত হানে | আমাদের স্বকপোলকল্পিত কাচের ঘরে বসে কখন যেন অলক্ষ্যে দেখি একটি মাত্র বস্তু পাথরের টুকরো ভেঙে খান খান করে দিচ্ছে আমাদের যাবতীয় কৃত্রিম  অভিলাষা | " গাছ থেকে খসে পড়ছে পুরোনো চিৎকার " ... আমাদের সহনশীল প্রতিবাদহীন স্থবিরতা যেন ভেঙে যায় এই একটি পংক্তির ঘায়ে | নিস্তরঙ্গ ঘুণে ধরা এই জীবন যা একইসঙ্গে পরশ্রীকাতর ও তৈল নিষিক্ত | কবি লেখেন " পড়ে রইলো বাঁশ / ক্ষমতার চারপাশে এখন ঠান্ডা ভিড় / ভাঙা কেল্লা আগলে বসে আছে প্রতিশোধ ..." 

 

কবি সব্যসাচী মজুমদার অত্যন্ত ছন্দ দক্ষ | ক্লাসিক ঘরানার  প্রত্যয়ের সঙ্গে মিশিয়ে দেন মিথ ও সমকালীন সময়ের বিপরীত অভিঘাতে ভরা বাস্তবতা | তার কবিতায় উঠে আসে ইতিহাসের করুণ পরিণতি , ধর্মীয় দ্বন্দ্ব ও লোকাচার | সভ্যতার নানাস্তরীয় শোষণ ও অবমানুষের প্রবাহন | তিনি লেখেন " শিকারি বেড়ে চলে অমেয় শৃঙ্খলে / শিকারি ঠোকরায় হিমের ধান / তবুও জলভরা বাতাসে চবুতরা / পেতেছো তুমি , দুধ খাওয়ার গান " ( অন্ধগ্রীব )

 

" নিঃসঙ্গ উটের শরীরে গোলাকার ছায়া পড়ে আছে " ... চমকে গেলাম পার্থজিৎ চন্দের কবিতা পড়তে গিয়ে | তার রেগিস্তান কবিতার প্রথম পংক্তিই শুরু হচ্ছে এভাবে | বিস্মিত হবার মতো কবিতা খুব কম চোখে পড়ে | পার্থজিৎ তার দুটো কবিতা , রেগিস্তান এবং ছাদ আমাকে অভিভূত করেছে | একটি ছাদ যেন পৃথিবীর একটা নিজস্ব সমতল | যার প্রাণ আছে , আছে চেতনা | বহুস্তরীয় অভিজ্ঞতা ও অনুভবের শব্দে মূর্ছিত এক প্রত্ন যাদুঘর | চিরাচরিত  নৈঃশব্দের 

বনিবনা আমাদের অভ্যস্ত ঐতিহ্যের অন্তর্গত এক মূল্যবোধ | কিন্তু সেই মূল্যবোধকেই যখন ছাপিয়ে যায় কবির কল্প জগতের গূঢ় সৌন্দর্য্য ও  সুদূরতা নিয়ে | বিশ্বজাগতিক শেষাদ্রি চূড়োয় | সব কিছুর ব্যাখ্যা হয় না | পাঠক নিজেই পড়ে দেখুন | 

 

রবিন বণিক ব্যক্তি অভিজ্ঞতার ভাবনাকল্পকে ছড়িয়ে দেন , জিভের শীত থেকে সন্ন্যাসীর চলা নির্বিকল্প পথে | তিনি লেখেন , " জিভের গায়ে লেপ্টে আছে শীত / অপরাহ্ন কতো সন্ন্যাসী চলা পথ / দৃশ্যে রেখে গেছে কত উপসংহার / মানুষ কেবল নির্বাসন ( রাত্রির উপাচার ) 

 

কবি নিমাই জানা , স্মার্ট গদ্য কাঠামোয় লিখে ফেলেন বিষ নিষিক্ত জীবনের বিচলিত মানসিকতার  সংক্রামে , অসুস্থ এক দুর্নিবার পৃথিবীর অপচয় | আত্মধ্বংসের খেলা | মৃত্যুর সম্মোহন | মৃত্যুর সঙ্গে বাজি রেখে গভীর তামাশা উপভোগ | জ্ঞান ও প্রজ্ঞার সঙ্গে স্বীকারোক্তিমূলক তির্যকতা ...

" তারপর আমি আর হোমার একসাথে ১০০ এম এল হেমলক ভাগ করে খেয়ে অবনত মুখে গুহার লিপিগুলো  পড়ে ফেলতে পারবো , নেশাখোর লাল রঙের নার্স রোগীদের মতো 

( অবলিক ভ্রুণ অথবা ফিউচার পারফেক্ট কন্টিনিউয়াস )

 

সৌরভ বর্ধনের কবিতায় আমরা পাই , নাগরিক সমাজবাস্তবতার এমন কিছু দিকচিহ্ন , যেখানে সম্পর্ক তার কমনীয়তা হারাতে হারাতে অধুনান্তিক সময়েও তার আক্ষেপ হাতড়ে বেড়ায় অন্ধকারের ফাঁটল দিয়ে সূক্ষ্ম আলোর অভিমান | সৌরভ লেখেন , 

" খুলে রাখা ক্লিভেজের দিকে তাকালে / চাঁদের ওপিঠে মৌমাছি ডানা মেলে " ( দরজা ) 

বা " সাইলেন্ট মোডে আসার পর ভেসে আসে / আপনার শব্দঋণ প্রবাহিত করুন প্লিজ "

 ( রিলেশনশিপ ) 

 প্রসাদ সিং - এর কবিতায় পাই প্রিয় মিলনের  বিরহ ও সম্পর্কের আক্ষেপ | " কি করে বলি বল তো / এই পৃথিবীটাকে গোল / যেখানে তোর সাথে / দেখা হয় নি / দীর্ঘ সাত বছর

 ( জ্যামিতিক ) 

 বাংলা কবিতার সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র একটি ধারার কবি হলেন সৌমনা দাশগুপ্ত | এই শক্তিশালী কবি ক্রমশ যথার্থই , গীতা চট্টোপাধ্যায় , কবিতা সিংহ , দেবারতি মিত্র , দেবাঞ্জলি মুখোপাধ্যায় - এর ঘরানার উত্তীরাধিকারী হয়ে ওঠার শক্তি রাখেন | তার কবিতার স্বরটি আত্মজৈবনিক কিন্তু তার বৃত্তের ক্রমবর্ধমান পরিধিতে আছে বৃহৎ পৃথিবীর গভীর প্রকৃতির সঙ্গে সমকালীন সময়ের নারীর অনন্য আখ্যান | যেখানে নারী সংস্কারের শেকলে বাঁধা নয় | মহাপ্রকৃতির একাঙ্গতার সঙ্গে যে সামগ্রিক গহন এবং ইচ্ছাময়ী | গভীর নিসর্গ চেতনা |যার কবিতায় পদে পদে সমাজ বাস্তবতা , সময়কে চেনার সুনিপুন প্রয়াসের সঙ্গে মিশে গেছে জন্ম ও মৃত্যুর আটপৌরে ভঙ্গি এবং পুরাতত্ত্ব , ইতিহাস ও সমাজ বিজ্ঞানের নিরবধি , অবিচ্ছিন্ন ধারা ۔۔۔ তিনি লেখেন , " চপার খেলার শেষে উড়ছে করোটি / মাটি জল সব নাচনী পিঙ্গলা " বা , " পত্রমোচনের দিকে ছুটে যায় সাপ / খোলসে খোলসে তার ব্যথা লেগে আছে ..." এই নৈসর্গিক চেতনার নিবিড়  আত্মগহন অনুভবের স্তরান্তর  ভেদ করে কোথাও যেন আমরা দেখি অবিচ্ছিন্ন একাকার প্রাণী ও নিসর্গ | যেখানে প্রাচীন সৃষ্টির রসদ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা গাছ আর খোলস বদলে বদলে নিজেকে পুনরাবিষ্কারের মতো সাপ একই বৃত্তে নিজেকে পরিক্রমণের মধ্যে দিয়ে এক অনন্ত সংসার পৃথিবীর মধ্যে একাকার হয়ে যাচ্ছে একই গ্রহের অণুতে অণুতে অভেদ মন্ত্রে | 

অবিস্মরণীয় একটি কবিতা এখানে আছে | তার কয়েকটি পংক্তি ۔۔۔" পাথর মাছের বমি , স্থির বিষ , ঝলসে উঠছে কঙ্কালে / আমিষ লোকগল্পের থেকে দৌড়ে আসছে একটি ঘোড়া / সওযার বসেছে পিঠে , মিশ্রমাধ্যমের ছবি , / হাতে তার স্নায়ুর ককটেল " ( জল - তলোয়ার ) 

 

কবি দেবযানী বসু স্বতন্ত্র ও অপর নিরীক্ষামূলক ঘরানার অত্যন্ত শক্তিশালী একজন কবি | এজরা পাউন্ড যে গ্রানাইট কবিতার দৃঢ় ভাস্কর্য্য প্রার্থনা করেছেন আধুনিক কবিদের কাছে , তার একটা বৈশিষ্ট আমরা দেখি দেবযানীর কবিতায় | তিনি নাগরিক চেতনার সমাজ বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে  তীক্ষ্ণ মেধাবী বিশ্লেষণে আমাদের অসঙ্গতিগুলোকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেন  | অবিমিশ্র কোলাজ ও গতি , ভাষা ও শব্দ চয়নে সুদক্ষ এই কবির মেধাবী আয়নায় আমরা দেখি সম্ভাবনার অনেক দিক খুলে দিচ্ছেন কবি | স্থাবরে - জঙ্গমে মোহ বিযুক্ত জীবনের অবিমিশ্র ফিউশন নানান নিরাবরণ অনুষঙ্গে , চাতুরীহীন শিল্পের সদাত্মা যেন গভীর থেকে অকৃত্রিম তীক্ষ্ণতা ও কঠিন সজীবতায় ভরিয়ে তোলে | কবি লিখছেন , " তেল মাখানো যন্ত্রপাতিদের তোল্লাই দেওয়া আমাদের স্বভাব | অবরোহন ও আরোহনের ছবি বাজারে বিখ্যাত তখন হাতটি অদৃশ্য | " ( পচা চোখ ) 

 

বাংলাকবিতার পৌরুষ - প্রতাপ - দখলদারিতে , কবিসত্তা - ব্যবহারিক সত্তা - কবি সত্তা মিলিয়ে যিনি দুমুখো ভন্ড মোড়কের জ্যোৎস্নাভুক গজদন্তমিনারবাসী কবিদের ন্যাকামিকে ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়ে , নিজস্ব ও স্বাধীন ডিকশনে সম্পর্ক , ও সম্পর্কের বাস্তবতাকে সরাসরি সত্যের স্পর্ধায় অনায়াসে নিজস্ব ভাষায় লিখে রীতিমতো সাড়া ফেলে দিয়েছেন , তিনি হলেন , রত্নদীপা দে ঘোষ | যৌনতার মসলা পেয়ে যারা উস্কিত আনন্দে মাতোয়ারা , তাদের স্বাভাবিক সাবালকত্ব কবে আসবে সেই নিয়ে সংশয় বেড়েই যায় ! রত্নদীপা জীবন ও যাপনের বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ সত্যের মধ্যে দিয়ে পরিণত বাস্তবতায় দেখান আমাদের যে , শরীরের নিগড় ভেঙে কীভাবে যৌনসংবেদন কেন্দ্রের উৎসে আছে মন - বিশ্বাস এবং সেই প্রেমের অপেক্ষা যেখানে দেহ - মনের উর্ধে , ইন্দ্রিয় আকাঙ্খার উর্ধে আছে দুফোঁটা অশ্রু মাখানো মাথুর | পৃথিবীর পা কে স্পর্শ করে সেই অনাবিল মাতৃত্ব যা আমাদের শান্তির দুদণ্ড ছায়া | এতো ব্যাকুল গহন নাড়িছেঁড়া মনের টান , যেখানে দুজন দুজনকে আঁকড়েও , সঙ্গম শেষে কেঁদে ওঠে চূড়ান্ত বিচ্ছেদে | সেই নিঃসঙ্গ যাত্রায় গভীরস্তরে ভালোবাসা ও বিচ্ছেদ যেন লিঙ্গভেদহীন | শরীরের যাবতীয় উপকরণের আঁচে নিজেকে পুড়িয়ে যোগিনী রাধার মতো যে অপেক্ষা করে সেই অন্তহীন চাপা কান্নায় মেশা বাঁশির সুর টুকুর জন্য | 

এখানে একটি কবিতায় লিখছেন , " প্রসন্ন নদী হংসিনী ভোর কোমর দুলানো বৃষ্টিকুলা / মঞ্জুরিত আলোয় ঘন ঘন উথলায় গেরস্থের আসন / যেদিকে তাকাই সবুজ আর মেওয়া -বন (যেদিকে তাকাই ) 

 

চার .

 শব্দভেদী বানের মতো নিকষ রাতের গভীর থেকে যেভাবে পাথর ফাঁটানো জলের কলস্বরা শব্দে সচকিত হয়ে ওঠে বনের শ্বাপদ , যেভাবে সাদা সায়ার গিঁট খুলতে খুলতে নগ্ন বিভাজিকায় অল্প নীল স্নানঘরে নদী' র অষ্টাদশী শরীর বেলাভূমি ছুঁয়ে ছুঁয়ে ভেসে যায় নিষিদ্ধ টিলায় ... ঠিক সেভাবেই নানান রূপে নানান বর্ণে ধরা দেয় এই শূন্য ও তৎপরবর্তী কবিতা | তিরিশ দশক থেকে নব্বই দশক , এই ষাট - সত্তর বছর ধরে , আবহমান বাংলা কবিতা কখনো আত্মজৈবনিক , কখনো সমাজ দর্শী , কখনো কাহিনীর আলেখ্যে বিষয়মুখী | রাজনৈতিক ও সামাজিক সচেতনতা , বহু স্তরীয় যৌনতা ও বিপণন , বাজার চালু পণ্য সংহিতা , বিশ্বায়ন ও আর্থসামাজিক প্রেক্ষা | কখনো সে ক্ষুধার্ত  , কখনো শ্রুতিময় বা শাস্ত্রবিরোধী | কেউ চির ছন্দে স্বাচ্ছন্দ বোধ করলেন , কেউ বদলে দিতে চাইলেন ভাষার চালু কাঠামো | ধ্বনিময় , বিস্তৃত দৃশ্য শ্রাব্য গুণে কেবল কবিতার চেতনায় নতুনের হাওয়া আনলেন না , কবিতার দেহ ও মনের স্পষ্ট অবয়ব ফুটিয়ে তুললেন | কেউ লিখলেন কবিতার ক্যালকুলাস আবার কোনও কোনও কবি মহাজাগতিক ব্রহ্মবোধে , আংকিক গঠনশৈলীতে তৈরী করলেন নিভৃত অপর কবিতা | আসলে বিজ্ঞানের অনেক মান্য গবেষক , কবির দ্বিতীয় ভুবনের মতো , জার্নি থ্রু দ্য প্যারালাল ইউনিভার্স - এর কথাকে মান্যতা দেন | এই মহাজাগতিক বিশ্ব বা ইউনিভার্স একটা নয় অনেক | যেটাকে অনেকেই

 ' মাল্টিভার্স থিওরি ' বলে থাকেন | সেই থিওরি অনুযায়ী একই মহাবিশ্বে , পৃথিবীতে অনেক রকম একই স্তর আছে | এবং কবি তার দ্বিতীয় ভুবনে সেই বহুস্তরীয় বিশ্বের কাল্পনিক অভিজ্ঞতা অর্জন করেন চেতনাশ্রয়ী পথে | কবির নিজস্ব অভিজ্ঞতাই তার লেখার পৃথিবী | সেই পৃথিবীর ভাষ্য সে নিজের মতো করে তৈরী করে | পাঠকের মধ্যে সমঅনুভূতির তরঙ্গ থেকে যদি সেই জগৎ তার মধ্যে সাড়া ফেলে তখনই তার অভিজ্ঞতা , কবির অভিজ্ঞতার সঙ্গে একাকার হয় | কবিতার কাজ এই বোধের

 মিলন | শূন্য ও তৎপরবর্তী কবিতার ভুবনে , গত শতাব্দীর সাতটা দশকের পরিক্রমা নানা ভাবে ফুটে উঠতে দেখা যায় | এর ফলে এখনো কেউ পুরোনো প্রথাসর্বস্ব ছন্দে কবিতা লেখেন তো পাশাপাশি নতুন চেতনাকে কাল্টিভেট করে , ভাষা ও ভাবনাকে এক্সপ্লোর করেন অনেকেই | যেহেতু পুরোনো উদাহরণ অনেকরকম , কবিও রকমভেদে সেই সমস্ত পুরোনো ও নতুন কিছুর খোঁজে একই সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছেন | এরফলে বহুস্তরীয় কবিতার স্বাদ আমরা পাই এই দশকে | এখন সেটা পাঁচ পা এগিয়ে সাত পা পেছনে কিনা সময় তার প্রমাণ  রাখবে | কিন্তু কী নয় কেন ? কীভাবে এটাই উচিৎ কবিতার অগ্রগতির ক্ষেত্রে | যদিও আরও অনেক নয়া দিক ও সম্ভাবনাকে তুলে ধরবেন পরবর্তী সময়ের কবিরা | কারণ নতুন তেজ ও রক্ত কবিতার জ্যান্ত সত্তাকে সক্রিয় করে | ক্লিশে ও পুরোনো জঞ্জাল একসময় হারিয়েই  যায় কালের নিয়মে  | 

এরপরের যে যে কবি' র কবিতাকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরবো , তারা প্রায় সবাই চালু কবিতা কাঠামোয় , নিজস্ব ভাবনাকে তুলে ধরার ব্যাপারে সক্রিয় এবং একে অন্যের চেয়ে পৃথক | অরণ্যা সরকার যেমন অভিজ্ঞতাপ্রসূত ভাবনা কল্পের সঙ্গে যেমন মিলিয়ে নেন নিসর্গ ও নদীর আত্মকথা , ঠিক তেমনি মানসী কবিরাজ পার্বতী ধ্যানে বোনেন কোমল গান্ধারে কাশ্মীরি ফোঁড় , যাবতীয় ঘাতক সময়কে উপেক্ষা করে | সোনালী ঘোষ , শরীর ভাঙা শূন্যতায় দাঁড়িয়ে ভুলে যেতে চান দিনযাপনের ডৌল সম্পূর্ণ বদলে যাওয়ার প্রান্তে যে ছিল মনের অনুরাগে , সে কী সত্যিই ছিল , মুছে দেবার কাঙ্খায় ? সম্পর্ক নিভে গেলে যে যাতনা , সেই যাতনার অভিমান ও নিস্ফলতা আমরা পাই , মনোনীতা চক্রবর্তীর লেখায় | প্রাগৈতিহাসিক চিলের ডানাভাঙা শব্দের ক্লান্তি আমাদের নজরে পড়ে , মন্দিরা ঘোষের কবিতায় | আবার দুই ভ্রুর মাঝখানে চিড়ে আমরা পাই উদ্বাস্তু নদীকে পলাশ দে র কবিতায় | মানুষের না হয়ে ওঠার আর্তি খুঁজে পাই অরুণ পাঠকের কবিতায় | 

  

"সবুজ হারাতে হারাতে পাতারা প্রাজ্ঞ হলো / তছনছ গুটিয়ে নিলো কত নদীমুখী কথা / পাখি বলে দেখেছি তাদের " -- অরণ্যা সরকার 

( পেরোনোর কথা থেকে )

 " আমি ঘাতক ক্যালেন্ডার উপেক্ষা ক'রে / টানটান ফ্রেমে , কোমল গান্ধারে কাশ্মীরি /  ফোঁড় তুলে গেছি / পার্বতী ধ্যানে " -- মানসী কবিরাজ  ( সাধন মার্গ )

 " এ শরীর ভাঙো | ভাবো শূন্যতা ছাড়া নিভৃতে পুড়িয়েছো কাকে | যাকে লিখেছ ভেবে মুছে চলেছো | আদৌ কতটুকু ছিল সে | -- সোনালী ঘোষ ( শ্রী ) 

 " চোখের রং একই লয়ে ভাঙছে , / হাওয়া উড়ছে | / বৃষ্টি ভিজছে | / রোদ পুড়ছে | / সারারাত পাতা ছেঁড়া খিদে / সম্পর্ক নিভে গেলে " -- মনোনীতা চক্রবর্তী ( বিদ্যুৎলতা - ২ ) 

 " ১০০ মিটার দূরত্বে একটি প্রাগৈতিহাসিক চিলের / ডানা ভাঙার শব্দ ক্লান্ত করছে / হাওয়ার উচ্চতাকে "  -- মন্দিরা ঘোষ ( নিরক্ষীয় হৃদ্যতা ) বা , " একটা সমান্তরাল ছলনায় ঝুঁকে আছে / যত্ন সাজানো সাইড টেবিল / আন্টিগ্লেয়ারে অনুশোচনার জাগলিং " -- মন্দিরা ঘোষ ( ত্বকের যত্ন নিন ) 

 " মরশুম উল্টে পাল্টে তদন্ত করতে যেয়ো না / তাকিয়ে থাকায় আমন ধান লেগে ছিল / নাকি দুই ভ্রুর মাঝখান চিরে কোনো উদ্বাস্তু নদী  " -- পলাশ দে ( মা )

 " আমি রেওয়াজ করি অপেক্ষা / একা , ধোঁকা দিচ্ছে আবার " -- পলাশ দে ( অপরাধী ) 

 " বিষণ্ণ দুপুর রাত / ক্ষমতা নীরব / পশুপাখি থাকে থাক / মানুষ ? হবে না " -- অরুণ পাঠক

 ( হত্যা )

 আসলে কবিতার পোলারাইজেশন বা মেরুকরণ আগেও ছিল , পরেও থাকবে | এর মধ্যে দিয়েই কবি হেঁটে যান একা | শূন্য দশক ও তৎপরবর্তী কবিতায় আমরা পাই অনেক সম্ভাবনার প্রাচুর্য |

উপরের আলোচিত প্রতিটি কবি' ই সেই সম্ভাবনার চূড়ান্ত জায়গায় দাঁড়িয়ে নিজস্ব ভাষা ও ভাবনা কল্পে বহু অনুভূতির অনাবিষ্কৃত দিকগুলোকে নিয়ে আমাদের বিস্মিত করেছেন |  ফিলিং অফ স্পন্টেনিটি , একটা চার্জ বা স্পার্কিং জোন টাটকা  ব্লেন্ডেড ফ্লেভারে  পারিপার্শ্বিক অস্থিরতার উর্ধে নিয়ে গেছেন জীবনের ক্রমাগত রূপান্তরিত সত্যের নিরীক্ষায় , দেখায় , মাধুর্যে ,  নির্ভারে | বাংলা কবিতার আশাতীত এই উত্তরণের জন্য পাঠক হিসেবে আমরা ঋণী হয়ে থাকবো এদের কাছে | 

  

ছবি ঋণ:সুবল দত্ত


 

 

২টি মন্তব্য: