অলোক বিশ্বাস

 


একবিংশের প্রথম দুই দশকের কবিতা বিষয়ে কিছু প্রতিক্রিয়া  


প্রচলিত হিসাব অনুসারে ২০১০ থেকে বা এর ২/৩ বছর আগুপিছু ধরে নিয়ে, প্রথম দশকের কবিদের শুরুয়াত। একবিংশ শতকের প্রথম দশকের শুরু থেকে কবিতা লেখা শুরু করেছেন এরকম ১০০ জন কবির কবিতার সঙ্গে কম বেশি আমার পরিচয় ঘটেছে শূন্যের কবিদের পাশাপাশি। বিশ্বায়নের সামগ্রিক রূপ শূন্যের কবিদের অবস্থান পূর্ববর্তী শতকের সমস্ত বাদ(ism)প্রতি-বাদ থেকে এক ঝটকায় আরো মুক্তচিন্তার পৃথিবীতে এনে দিয়েছিলো। প্রথম দশক আর কোনো বাছবিচার করলো না আর। কোমর বেঁধে নেমে পড়েছেন তাঁরা, প্রচুর কবিতা লিখতে হবে এই প্রতিজ্ঞায়। সোশ্যাল নেটওয়ার্কস তাঁদের কাছে এনে দিয়েছে কবিতা প্রকাশের চরম স্বাধীনতা এবং সেই স্বাধীনতায় বেশ কিছুটা দিশেহারাও প্রথম দশকের কবিরা। প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে, পূর্ববর্তী চারটি দশকের এস্থেটিক্সকে এই দশকের কবিরা কতোটা অতিক্রম করে যেতে পেরেছে, বা আদৌ পারছে কিনা ? প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে, এই দশকের কবিরা কবিতার কোনো তাৎপর্যপূর্ণ চিহ্ন বহন করছেন কিনা ? এঁদের মধ্যে কারা পাঠকের নজরে এসে পড়েছেন ? প্রথম দশকের কবিরা কি পূর্ববর্তী দশকের কবিদের কবিতা থেকে অন্যতর ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ার বিক্রিয়া ঘটাতে পারছেন বা পেরেছেন ইতিমধ্যে ? তেমন কোনো ইঙ্গিত কি পাওয়া যাচ্ছে, যা দিয়ে নিশ্চিতভাবে বলা যায় পূর্ববর্তী দশকগুলোর মতোই প্রথম দশকের কবিরা বাংলা কবিতার সংবেদনায় ঝাঁকি লাগার মতো কিছু ব্যাপার ঘটিয়ে দিতে পারলেন ?এই সংক্রান্ত ব্যাপারে কোনো স্পষ্ট প্রতিক্রিয়া সমালোচকদের কাছ থেকে সম্ভবত এখনো পর্যন্ত পাওয়া যায়নি কংক্রিট আকারে।

এখন আর সত্তর আশি নব্বই দশকের কবিদের মতো নতুন শতকের গোড়ায় প্রথাবিরুদ্ধতা বা প্রথাসাপেক্ষতা নিয়ে বেশি কথা হয় না। ধারাকবিতা, আবহমান কবিতা, নতুন কবিতা, প্রথাবদ্ধ কবিতা, প্রাতিষ্ঠানিক কবিতা, অপ্রাতিষ্ঠানিক কবিতা, অতিচেতনার কবিতা, মহাচেতনার কবিতা, পরিবিষয়ক কবিতা, মেটাফিজিকাল কবিতা, পরাবাস্তববাদী কবিতা, বিষয়বদ্ধ কবিতা, না-বিষয়ের কবিতা, ভাষাকবিতা, প্রকল্পনা সাহিত্য, পোস্টমডার্ন কবিতা--- এরকম যতো টার্ম বা টার্মিনোলজি আছে, অভিধা আছে, তা নিয়ে প্রথম দশকের কবিরা আদৌ উদ্বিগ্ন নন, আদৌ তাঁরা এরকম কোনো অভিধা নিজেরাও এখনো পর্যন্ত প্রচার করেননি। ব্যবহারও করেননি। তাঁরা এসব ব্যাপারে আদৌ ভাবছেন কিনা, তারও প্রমাণ বিশেষ কোনো আড্ডায় দেখা যাচ্ছে না। কবিতার নামের আগে বিশেষ কোনো পরিচয় জ্ঞাপক বিশেষণ চলে না--- কবিতা, কবিতার নামেই স্বতন্ত্র, এরকম কথা আগে শোনা গেলেও, প্রথম দশকের কবিরা, এরকমটাতেই জোর দিয়েছেন। তবে, প্রথম দশকের কবিরা, কতোটা কবিতা বিষয়ক আড্ডাপ্রবণ, এ বিষয়ে আমার সন্দেহ আছে। আমি দেখেছি, প্রকাশ পরবর্তী বিশ্লেষণের চেয়ে, উপুর্যপরি প্রকাশকেই তাঁরা বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। এটা সম্ভব করেছে সোশ্যাল মিডিয়া। তাঁরা কবিতা লিখে এ্যাতো বেশি টেনশনহীন আনন্দ পান এবং অবিরাম সর্বত্র কবিতা প্রকাশ করে শ্লাঘা বোধ করেন, যা পূর্ববর্তী দশকগুলোতে দ্যাখা যায়নি। সারা বিশ্বে বিশ্বায়নের পথ ধরে যে রূপান্তরিত মুক্ত দুনিয়ার ভাবনা ছড়িয়ে পড়ছে, যার কোনো ইজম নেই, দর্শন নেই, অভ্যন্তরীণ কনফ্লিক্টস নেই, হয়তো বিশেষ প্রশ্নও নেই--- এভাবে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ছেন প্রথম দশকের কবিরা, যা শূন্য দশক থেকে শুরু হয়েছিলো। বিশিষ্ট, উল্লেখযোগ্য, শ্রেষ্ঠ, আধুনিক, অধুনান্তিক, অতিচেতনা, অবচেতনা, পরাচেতনা--- এইসব কয়েনেজগুলোর ভিত্তিতে কবিতাকে আর আইডেন্টিফাই করতে চাইছেন না নতুন শতকের প্রথম দুই দশকের কবিরা। কোনটা দুর্বোধ্য কবিতা, কোনটা সরল কবিতা, কোনটা বহুরৈখিক কবিতা, কবিতার কোথাও লজিকাল ক্লেফট আছে কিনা, অবজেকটিভ কোরিলেটিভ আছে কিনা, এসব নতুন প্রজন্মের কবিদের মাথায় আসে না, অন্তত বর্তমান পশ্চিমবঙ্গে, কিছু ব্যতিক্রমকে মাথায় রেখেই বলছি।

এসব চিন্তার মধ্যেই প্রথম দশকের কবি বিশ্বজিৎ-এর দ্বিতীয় কবিতার বই জন্মদাগ পড়ছিলাম। বিশ্বজিৎ-এর 'পাগল সিরিজ' প্রথম কবিতা পুস্তিকা, যেখানে টেক্সট ছিলো খুব সামান্য। 'জন্মদাগ'-এও মাত্র স্বল্প পরিসরে মাত্র ২০টি কবিতা। বিশ্বজিৎ-এর কবিতাগুলোর মধ্যে উর্দু শায়রির মর্জিমেজাজ ও অবয়ব ঝংকার আছে। প্রতিটি কবিতার গঠন পরিসর অতিস্বল্প এলাকায় বাঁধা। এ যেন সেই আর্বানাইজেশন প্রসূত নিউক্লিয়ার ফ্যামিলির গঠনিকা। তার ভেতরেই আছে চাপা ক্রোধ, চাপা রোমান্স, ভার্চুয়ালি চেপে রাখা জীবনের ভিস্তাস। জীবনকে সমস্তরকম বস্তুজগতের সৌকর্যে ধরতে চেয়েছেন বিশ্বজিৎ 'জন্মদাগ' বইয়ে। প্রতিদিনকার সাদামাটা কথাবার্তার ধরণ, সম্পর্কের পূর্ব-পশ্চিম উত্তর-দক্ষিণ বাইনারি, মাঝেমাঝে মন্ত্রের মতো, কিছু নীতিকথা রৈখিক উচ্চারণ এবং নিজেকে আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে চিন্তামুক্ত এবং চিন্তাসক্ত প্রতিফলন এসবই একাকার বিশ্বজিৎ-এর কবিতায়। মনে হয়, প্রথম দশকের কবিদের কবিতায় হৃদয়ের অন্তর্লীন রোমান্স ছড়ানো থাকে কোনো ইনহিবিশন ছাড়াই। রোমান্সের কোথায় সীমা, কোথায় অসীমা, এসবের ক্রুর কুটিল উদ্বেগ নেই তাঁদের কবিতায়। সম্ভব, অসম্ভব উভয়ই ধরা থাকে সেখানে। নিজেদের জগৎকে স্বার্থনিবিড় করে   দ্যাখা আর সেই জগৎকে স্বার্থপরতায় নিবিড় করে পাওয়া--- এমনটাই চলতে থাকে সর্বদা।

নতুন প্রজন্মের কবি বিশ্বজিৎ-এর আগের দশক--- শূন্য দশকের কবি হিসেবে পরিচিত সৌম্যজিৎ আচার্য। বিশ্বজিৎ-এর কবিতা যেখানে এ্যাবসার্ডিটির ধরতাই খোঁজে না, সৌম্যজিৎ ঠিক বিপরীতটাই করেন অদ্ভুত সব চিত্রকল্পের প্রয়োগে। সৌমজিৎ-এর কবিতায় চিত্রকল্প ছড়ানো। বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত হয়েছিলো সৌম্যজিৎ-এর e-book এর হার্ড কপি 'বিন্দুছাড়া বিসর্গ'। খুব স্মার্ট নাম। মিশে আছে এক এক্সকুইজিট ব্যাপার এই নামে। শূন্য দশকের কবিদের কবিতায় দ্যাখা যাবে পংক্তিতে পংক্তিতে এক্সকুইজিটনেস। কসমোপলিটন নাগরিক জীবনের ভাষা পাওয়া যায় শূন্য দশকের কবিদের কবিতায়। সৌম্যজিৎ ব্যতিক্রম নয়। এ্যাকশন প্যাকড ফিল্মের মতো সৌম্যজিৎ-এর কবিতা কখনো সংলাপে ভরা। কবির নিজের সঙ্গে আলাপ। জীবনের কতগুলো নির্দিষ্ট অনির্দিষ্ট চিহ্নের অভিব্যক্তি ধারাবাহিকভাবে বুদবুদ সৃষ্টি করে ওঁর কবিতায়। জীবনের তীব্র ভার ও যন্ত্রণার মুখোমুখি হতে হয়নি যেখানে তরুণ নাগরিক কবিদের, সেসব জায়গায় কবিতার অধিকাংশ খেলা একাধারে ম্যাজিকাল, হিউমারাস এবং আত্মনিবেদনিক। আত্মধ্বংসের বা আত্মহননের কবিতা একবিংশের প্রথম দুই দশকের কবিদের কাছ থেকে পাওয়া যায়নি। কারণ সেই প্রকার দশার স্বীকার হয়তো ব্যক্তিজীবনে কারো অভিজ্ঞতায় আসেনি। সৌম্যজিৎ-এর কবিতার এমন মানসিক দ্বন্দ্বহীন পংক্তি আমাদের আচ্ছন্নতা মুক্ত করে--- 'তরমুজের খোলায় ঢুকিয়ে রেখেছি অ্যাপস আর যতো বাতেলাবাজের সফটওয়্যার'। মনে হচ্ছে না কি এই পংক্তির মধ্যে হিউমার ভরা আছে ? আরো একটা পংক্তি দেখুন কিভাবে প্রতিদিনকার নাগরিক জীবনের কথোপকথনের আনন্দে জড়িয়ে আছে--- 'আমাকে লাইক করেছে ফেসবুকের দুটো মাছি, ছ'টা টিকটিকির খোসা লেজ'।

শূন্য দশকের কবি দেবযানী বসুর কবিতা প্রাকৃতিক ও মানবিক সম্পর্কের নতুন অবস্থাসাম্য, নতুন অবস্থাদ্বন্দ্ব ঘটিয়েছে। অবস্থাসাম্য এবং অবস্থাদ্বন্দ্ব সেইসব কবিতার উৎস। জীবনের জটিলতা সেখানে ছিন্নবিচ্ছিন্ন মনোজগৎ নির্মাণ করে। প্রকৃতি তাঁর কবিতায় খণ্ড খণ্ড, আপাত বিরোধী। কবি জটিলতা দিয়ে ঢুকে সরলতা থেকে বেরিয়ে আসেন, আবার সরলতা দিয়ে ঢুকে জটিলতা থেকে বেরিয়ে আসেন। ইন্ট্রিকেসি আর সিম্পলিসিটির অদ্ভুত খেলা। শব্দের অভূতপূর্ব ব্যবহার দেবযানীর কবিতায় নন্দনতত্ত্বের বিভিন্নতার নির্ধারক। জীবনের অনেকরকম ক্রুরতাকে সিগ্নিফাই করে শব্দের পরমার্থিক ব্যবহার। শব্দ নিজেকে অন্যের সঙ্গে নতুনভাবে গড়ে, নতুনভাবে ভেঙে দেখায়। আজকের কবিতায় শব্দ কোনো শর্ত মানে না। শব্দের উৎসব বাক্যের উৎসবে পরিণত হয়েছে সেখানে। শব্দ নৈর্ব্যক্তিক স্বভাবে বিষয়ের ভেতরে ঢুকে বিষয়ের চরিত্র বদলায়। বিষয়কে কিভাবে কতোটা কবি এক্সপ্লয়েট  করবেন, সেটাও দেখিয়ে দেয় শব্দ। দেবযানী বসু তাঁর কবিতায় শব্দকে স্বাধীনভাবে মুক্তদর্শনে ক্যাটালিস্টের ভূমিকা পালন করতে দেন। মুক্তদর্শনে কোনো ডকট্রিন কাজ করে না। দেবযানী  বসু নিজের মতো করে সেমান্টিক্সের আজব প্যাথলজি চালাচ্ছেন। কবিতার ভাষায় অন্য ডায়ালেক্ট তৈরি করেছেন, যাকে ভার্সিফিকেশনের ডায়াস্পরা বলা যায়। একপ্রকার কর্কশতাও কাজ করে তাঁর কবিতায়।

রাজনৈতিক ভাষণের প্রভাব, রাজনৈতিক শ্লোগানের ইমপ্রেশন, কোনো ইজমভিত্তিক তাড়না নেই শূন্য দশক এবং পরবর্তী তৎপরবর্তী প্রথম দশকের কবিদের কবিতায়। ভারি কোনো দর্শন তাঁদের কবিতায় অবস্থান করে না। দুটো দশকের সহাবস্থান আমি লক্ষ্য করেছি উভয়ের ভাবনায় এবং কবিতার ভাষায়। যদিও প্রথম দশকের কবিরা ভাষার কূটত্বে ততোটা আস্থাশীল নন। প্রথম দশকের কবিরা অনেক খোলামেলা হয়েই থাকতে চান। প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার প্রশ্নটি বাংলা কবিতায় এখন পুরনো কনসেপ্ট। একবিংশের প্রথম দুই দশকের কবিদের প্রাতিষ্ঠানিকতার কোনো সংস্কার আর নেই। যদিও প্রাতিষ্ঠানিক সাহিত্য পত্রিকাগুলোর সেই দমাদ্দমের জায়গাটি এখন প্রায় বিলুপ্ত। নতুন প্রজন্মের কবিরা এখন মূলত কবিতা উৎসবপ্রবণ হয়ে অভিযান ও অভিযোজনের স্থানটি ভরাট করে চলেছেন। লিটল ম্যাগাজিন মেলার সংখ্যা গত দুই দশকে সমস্ত জেলায় প্রসারিত হয়েছে। ফলে নতুন প্রজন্মের কবিরাও প্রতিষ্ঠান কেন্দ্রিকতার বাইরে ও শহর কলকাতা কেন্দ্রিকতার বাইরে পেয়ে গেছেন কবিতার সম্পর্কে সম্পর্কিত হবার নতুন নতুন পরিসর। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য যে, কবিতা প্রকাশের জন্য এখন আর তাঁদেরকে কোনো পত্রিকার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে না। প্রায় প্রতিদিন কবিতা লেখার প্রবণতা এবং সেই লেখা সোশ্যাল সাইটে চটজলদি পোস্ট করে কিংবা হোয়াটস এ্যাপ গ্রুপে ও চেনা পরিচিত পাঠক ও সম্পাদকদের মেসেঞ্জারে পাঠিয়ে, অপার আত্মসন্তুষ্টি লাভ করছেন নতুন প্রজন্মের কবিরা। ভাষানিরীক্ষা প্রবণ, অবয়ব নিরীক্ষা প্রবণ ইমপ্লিসিট ও এক্সপ্লিসিট কবিতার নতুন ভাবনায় আস্থাশীল অনেক পাঠক পাওয়া যাচ্ছে বাংলা কবিতার, অন্তত এই মুহূর্তে। কবিতার নিরীক্ষাকে অতিমাত্রায় সন্দেহ করার প্রবণতা প্রকৃতই কমে আসছে। নিরীক্ষার সঙ্গে সহাবস্থানে রাজি হচ্ছেন প্রচুর পাঠক, যা সত্তর আশির দশকে সহজলভ্য ছিলো না।

এবং সইকথা প্রকাশ করছে বর্তমান সংকলনটি একবিংশে দুই দশকের কিছু কবির কবিতা নিয়ে। এরমধ্যে দু'চারজন বাদে প্রায় সকলের কবিতার সঙ্গে আমি কম বেশি পরিচিত। যেমন শূন্যের পলাশ দে, সৌমনা দাশগুপ্ত, অরুণ পাঠক, বাপ্পাদিত্য রায়বিশ্বাস, মাহফুজ রিপন, পার্থজিৎ চন্দ, সব্যসাচী হাজরা প্রমুখ। অন্যদিকে শূন্যের মধ্যবর্তী ও পরবর্তীর রত্নদীপা দে ঘোষ, সুদীপ বিশ্বাস, অরণ্যা সরকার, মানসী কবিরাজ, মৌমিতা পাল, রণি অধিকারী, রিতা মিত্র, সৌরভ বর্ধন, বঙ্গ রাখাল, মনোনীতা চক্রবর্তী, রবিন বণিক, চয়ন ভৌমিক, মন্দিরা ঘোষ, শীলা বিশ্বাস প্রমুখের কবিতার সঙ্গে আমি পরিচিত। এছাড়া, নিমাই জানা, কুশল মৈত্র, সোনালী ঘোষ, শান্তনু পাত্র, প্রবীররঞ্জন মণ্ডল, রাহুল প্রামাণিক, সঞ্জয় আচার্য, সব্যসাচী মজুমদার প্রমুখের কবিতার সঙ্গে রচিত হচ্ছে পরিচয় পর্ব। যদিও প্রথম দশকের কবিদের মধ্যে ইতিমধ্যে নিয়মিত বিভিন্ন পত্রিকায় ধারাবাহিক লিখে স্বাতন্ত্র্যের পরিচয় দিয়েছেন এমন কয়েকজনের নাম উল্লেখ করতেই হয়। যেমন, সৈকত ঘোষ, বুদ্ধদেব হালদার, গৌরব চক্রবর্তী, মণিদীপা বিশ্বাস কীর্তনিয়া, শূদ্রক উপাধ্যায়, অভিনন্দন মুখোপাধ্যায়, নিবেদিতা আচার্য, অমল বসু, গোলাম রসুল, ছন্দম মুখোপাধ্যায়, মানিক সাহা, সুমন মল্লিক, রোশনি ইসলাম, উল্কা, ঋষি সৌরক, রাজশ্রী ষড় ংগী, সমরেশেন্দু বৈদ্য, অর্ণব চট্টোপাধ্যায়, শান্তনু দাস প্রমুখ।

ফেমিনিজম এমন একটা ব্যাপার, যা অধিকাংশ নারী কবির কবিতায় সমাসক্ত হতে দেখা যায়। এটাই স্বাভাবিক। ফেমিনিজমের অভিব্যক্তি বাংলা কবিতায় বাক্যায়িত না হলে একটা বিশাল ভ্যাকুয়াম থেকে যেতো। প্রথম দশকের কবি মৌমিতা পালের 'সৈরিন্ধ্রি' কবিতায় ভালোবাসার এক প্রান্তে কবি নিজে, অন্য প্রান্তে অপরজন। নিজেকে ভালোবাসায় কবি আনকম্প্রমাইজাল। কবির নিজের ভেতরে অনেক সত্তা। সেই সত্তার মধ্যে রয়েছে অপরজনের সত্তা। কিছুটা কনফেশনাল কবিতার প্রবণতায় মৌমিতার বাচনিক ডিসকোর্স--- 'আহা ভালোবাসি বলে নেপচুনে যাবো/বিয়ন্ত মেয়েমানুষের মতো জনম এয়তি হব।' সাম্প্রতিক কবিতায় মিথ-পুরাণের উল্লেখ কি কবিতার আপডেটেডনেসের পক্ষে বাধা সৃষ্টি করবে ? আজকের কবিতায় মিথের প্রয়োগ কি অকাম্য, অপ্রত্যাশিত ? মৌমিতা পালের 'বীতংস' কবিতায় মিথের ব্যবহার সহ ফেমিনিজমের প্রকাশ মানানসই হয়ে রইলো--- 'অবাধ্য হলেও মেয়েটিকে হত্যা না করেই/স্ব স্ব স্থানে ফিরে যাবে বরুণ-অগ্নি-যম/দশগ্রাম কলমি শাকসমেত ভাত/বেড়ে দেবে মথুরা নারী...।' কবিতা জন্মের আগের মুহূর্তগুলোতে কবির মনে প্রতীপ বিপ্রতীপ ঘূর্ণিবাত্যার বলয় চলতে থাকে। প্রথম দশকের কবি সৈকত ঘোষের 'জরাসন্ধের বিছানা' কবিতা গ্রন্থের শুরুতে সেই বাত্যাকে চিহ্নিত করেছেন এভাবে--- 'একটা বিন্দু। একটা বুদবুদ। হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ বিন্দু থেকে আলফা বিটা গামা পর্টিকলস ছিটকে পড়ছে ডিমের কুসুমের মতো ফ্রায়িংপ্যানে। সেই বুদবুদ থেকে একটা বিস্ফোরণ। তীব্র মেটালিক। মস্তিষ্কের প্রতিটি গ্রন্থিকে প্রবল ভাবে নাড়িয়ে দিল...' এই বাচিনকতার মধ্যে কি ব্লাস্টিং ফার্নেসের মতো ক্যাপিটালাইজড হয়ে আছে একবিংশের কবিতার অন্যতম ধ্বনি প্রতিধ্বনি ? সৈকত ঘোষের কবিতায় প্রযুক্তি, প্রকৃতি, বিল এ্যানাটমি আর প্রেমের মেলবন্ধন লক্ষ্য করা যায়। শরীর বিজ্ঞানের পর্যালোচনায় উইথড্রয়াল সিমটম সিস্টেমের যেমন অনেকগুলো দিক আছে, সব্যসাচীর কবিতায় তেমন শব্দের শরীরবৃত্তীয় ব্যবস্থায় প্রতীপ বিপ্রতীপের অনেকগুলো স্তর উপস্থাপিত করে। মনোবিকার এবং ম্যালিগন্যান্ট ম্যালেরিয়ার কাঁপুনিকে যদি সেমান্টিকস-এর যুক্ত করে ভাবা যায়, তাহলে সব্যসাচীর কবিতায় প্রবেশ ও প্রস্থানের কাজটি সাবলীল হতে পারে। ২০১৪ সালে 'বৈখরী ভাষ্য' পত্রিকার একটি সংখ্যায় প্রকাশিত 'ক্রিংটোন' কবিতাটি আমার পাঠ পদ্ধতিতে চমকে দিয়েছিল। সেখানে সব্যসাচী লিখেছিলো---
'স্বাস্থ্য-দা আর শিল্প-দির ডুয়েট গান টিক-ট্যাক-টো/যাদের অটোমেটিক ছেলে হয়/ তারাই অটোম্যান/মেয়েদের টমেটান করে.../তারাই রেকর্ড কেনে/ট্যাক-টিক-টো।'  অন্তর্গঠন এবং বহির্গঠনে সব্যসাচীর কবিতা শূন্য দশকের একেবারেই ব্যতিক্রম। কবিতাকে ফিলোসফিহীন করে মানবিক আচরণের বৈকল্য অবৈকল্যের কতো চূড়ান্ত পৌঁছে দেওয়া যায়, কবি সব্যসাচী কবিতা পাঠে তা উপলব্ধ হতে পারে। 

 

 

কলকাতা শহর থেকে বহুদূরে থেকেও শহর কলকাতার নাগরিক আঁচ কবি অরুণ পাঠকের কবিতায় বহমান। শূন্য দশকের শুরু থেকে ধারাবাহিক লিখে অরুণের কবিতার বইয়ের সংখ্যা প্রায় দশ। অরুণের কবিতা সৌন্দর্যের কাছে নিবেদনের কবিতা। সাধন সঙ্গীতের নিবিড় আত্মনিবেদনের অনুভূতি থাকে ওঁর কবিতায়। ক্রূরতার স্থানে সাবলীলতা, ইন্ট্রিকেসির জায়গায় স্বতস্ফূর্ততা অরুণের কবিতার বৈশিষ্ট। তাঁর ঐকান্তিকতায় কৃত্রিমতার দ্রবণ থাকে না কখনো--- 'আজ থেকে বাতাসকেই বন্ধু বলে ডাকব যাকে তুমি সর্বনাশ বলে ডাক/ আজ থেকে আলোকে আত্মীয় বলে ডাকব যাকে তুমি মনে কর চরম লজ্জার'(বন্ধু, হাসি হাসি কান্নার বরফ)। কোনো হেঁয়ালি নেই, কোনো ফ্যালাসি নেই, সেই অর্থে কোনো হতাশ্বাস নেই আর ব্যাকরণের সঙ্গে যুদ্ধ নেই। প্রধানত আনন্দ আর প্রশ্নের ভেতর থেকে উঠে আসা অরুণের কবিতা--- 'আমি ভাবছি চাঁদ তুমি একাধিক জল হয়ে এত স্বচ্ছ হাঁটছ কিভাবে ?'( সংশয় জাগানো বনপথে)। কবি অরণ্যা সরকারের কবিতা নিশ্চিতভাবে নিরীক্ষার অন্য পৃথিবী চিনিয়ে দিচ্ছে পাঠকদের। ওঁর কবিতায় ভাষার অদ্ভুত খেলা, যে খেলা মাটি থেকে অস্তিত্বের অবস্থানটিকে বিচ্ছিন্ন বা বিমূর্ত করে নয়। চটজলদি কোনো বার্তা দেওয়ার পরিবর্তে ভাষাকে খেলাতে থাকে অরণ্যা সর্বত্র আনন্দের সঙ্গে তাকে মিশিয়ে উপভোগ করতে করতে। অরণ্যা অন্ধকারকে গুনগুন করতে দেখে। ধৈর্যকে বাজায়। ওঁর দেখার মধ্যে ছড়িয়ে থাকে মায়া। মরমিয়া চেতনা। পেরোনোর কথা থেকে কবিতায় অরণ্যা লিখছেন--- 'পরিগল্প রেখে যায় যে তাগিদ/স্বরবর্ণ মেঘ তারা।' অরণ্যা লিখছেন--- 'স্বপ্নে প্রচুর ফুলপচা বাজার, ফুস মন্তর অছিলার।'

বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মের কবি রণি অধিকারী, বঙ্গ রাখাল। রণি অধিকারী লক্ষ্য করছেন আধিপত্যবাদ আর মার্কেট পুঁজির সাপ্রেশনে বিপন্ন জীবন, বিপন্ন প্রকৃতি। কর্পোরেট বাণিজ্য বোধবোধি সম্পন্ন মানুষের স্বপ্নময় মানুষের জীবনকে, এমনকি কপোতাক্ষ নদীর জলকে ঘোলাজলে পরিণত করেছে। স্বপ্নের ভেলা বাজার অর্থনীতির আর সাম্প্রদায়িক সময়ে আর ভাসতে চায় না বা পারে না স্বাধীনভাবে। কবির ইচ্ছা সাপ্রেসড হয়, কবির বহতা সাপ্রেসড। রণির পর্যবেক্ষণে রয়েছে বাস্তবের ট্রান্সপারেন্সি। খুব দুঃখের সঙ্গে তাঁকে লিখতে হচ্ছে--- 'রোদ্দুরগুলোও একে একে বিদায় নেয়...'। রণিকে লিখতে হচ্ছে--- 'এ ক্ষুধার্ত পরাজয়ের সময়। ট্রেনে জঙ ধরে,/জঙ ধরে মন্দিরার শরীরে,/জঙ ধরে স্বপ্নে, মূলত ভাসে না স্বপ্নের ভেলা/অন্ধকার অক্টোপাসে।' প্রথম দশকের কবি অরণ্যা সরকার অন্ধকারকে গুনগুন করতে দেখছে আর একই সময়ের কবি রণি অধিকারী অন্ধকারকে ভাবছে অক্টোপাস। বঙ্গ রাখালের কবিতায় (খান সাহেব) একটি পরিচিত পদবী ঐতিহাসিক ধ্বংসাত্মক ছবিকে স্মরণ করিয়ে দেয়। ফলত কবির মর্মবেদনা এখানে তীব্রতায় জর্জরিত--- 'এই পরিচিত পদবীও আজ বলতে লজ্জা পাই/একাত্তর তার প্রমাণ...।' খান সাহেব কবিতায় বাংলাদেশের ভয়ঙ্কর ঐতিহাসিক সময়ের অধ্যায় মাত্র কয়েকটি পংক্তিতে প্রকট হয়ে উঠেছে। ওই বিশেষ পদবীকে যখন কঠিন ঐতিহাসিক মুহূর্তের সঙ্গে সম্পর্কিত করা হয়, তখন কবির হৃদয় ভরে ওঠে বেদনায়। বিশেষ খান সাহেব ও তার খান সেনা বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ মানুষকে চরমতম দুর্দশার গভীরে ফেলে দিয়েছিল যা বাংলাদেশের সংবেদনশীল মানুষেরা কখনো ভুলতে পারেন না। 'জেনটল পার্ক' কবিতায় কবির মনন সাবজেক্টিভ অবস্থা থেকে অবজেক্টিভ অবস্থায় চলে গেছে। ব্যক্তিমানুষের নিজস্ব স্বার্থের গণ্ডি ছাড়িয়ে কবির স্বপ্ন যেন অনেকের স্বপ্নের কথা বলছে। এভাবে কবির নিঃসঙ্গতা নিজস্ব বায়বিয়তায় আটকে থাকে না। কবি নিজেকে লুকিয়ে রাখতে পারেন না। বঙ্গ রাখালের কবিতায় সম্পর্কের স্থানগুলো সংবেদনশীলতায় চিহ্নিত হয়। শূন্য দশকের কবি মাহফুজ রিপন প্রকৃতির ব্যঞ্জনায় প্রাণময়। মৃত্যুর বিপরীতে তাঁর কবিতা। কবি চলন বিলের কাছে প্রত্যাশা করছেন, চলন বিল যেন তার দীর্ঘ সবুজকে বাঁচিয়ে রাখে।

একবিংশের প্রথম দুই দশকের কবিদের কবিতা নিয়ে এবং সইকথার এই সংকলন তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে রইলো। দুই দশকের এইসব কবিদের কবিতায় প্রধানত মুক্তচিন্তার পরিসরকেই হাইলাইট দেওয়া হয়েছে। তাঁদের কবিতায় রয়েছে ছড়িয়ে পড়া জীবনের বৈচিত্র্যময় অনুভব আর সংবেদনশীলতা। রিতা মিত্র লিখছেন--- 'নোঙরের উপর বিশ্বাস করে টানটান মেরুদন্ড।' মনোনীতা চক্রবর্তী লিখছেন--- 'সমস্ত চিত্রনাট্য থেকে খুলে পড়ি/জখম পায়ে ঠোঁট রাখি বেমালুম।' মানসী কবিরাজ লিখছেন--- 'অজস্র বোবা হাতে/খুঁজে ফিরি বেহালার ছড়/কোথায় রাখবো নিজেকে/কী করে ঢেকে দেব, নক্ষত্র জ্বালা!' অস্তিত্বের ভেতর বিষাদ দেখছেন প্রথম দশকের কবিরা, দেখছেন গভীর অন্ধকার। অবশ্য সেখানে অপেক্ষা করে আছে একজন। মানসী কবিরাজের মতো প্রথম দশকের হয়তো সকল কবির প্রবণতা ঘাতক  ক্যালেন্ডারকে উপেক্ষা করে চলে যাওয়া। এই যাওয়ার ধরণ এক একজনের আলাদা আলাদা। যখন শীলা বিশ্বাসের 'ট্রেকার্স হাট' কবিতাগুচ্ছ পাঠ করি, সেইসব ব্যঞ্জনার ভাষা মেলে না মন্দিরা ঘোষের কবিতার সঙ্গে, মেলে না অরণ্যা সরকার বা দেবযানী বসুর কবিতার সঙ্গে। কিন্তু কোথাও একটা জীবন ও তার যাপনের এবং সংকটের মূল সুরের ঐক্য অনুভব করা যায় তাঁদের কবিতায়।


 

 


২টি মন্তব্য:

  1. অলোক বিশ্বাসের এই প্রবন্ধটি সামগ্ৰিকতাকে ছুঁয়ে আছে। অনেক কবির কবিতার সামান্য দুয়েকটা পংক্তি উল্লেখ করলে মাংস রন্ধনের প্রক্রিয়া নয় শুধু পক্ক মাংসের ঘ্রাণ কিঞ্চিত নেওয়া যেতে পারতো।

    উত্তরমুছুন
  2. প্রবন্ধটি সুন্দর। তবে আরও কিছু কথা আরও কিছু বিশ্লেষণ যোগ করলে আরও সুন্দর হতো।

    উত্তরমুছুন