শ্রীশুভ্র


থ্রী ফার্ম লজ এণ্ড আওয়ার কনফার্মড স্টুপিডিটি

 

এটা খুব সত্যি কথা, আমরা যারা কৃষিকার্যের সাথে কোনভাবেই জড়িত নই। তাদের আর কেন্দ্র সরকারের আনা নতুন কৃষি আইন নিয়ে মাথাব্যাথার কি আছে? তাই আমরা এই নতুন কৃষি আইনের কোন ধারায় কি লেখা আছে। সেটা পড়ে দেখার দরকার বোধ করি নি। এমন নয় যে, আমরা ইংরেজি ভাষায় কিংবা হিন্দী ভাষায় দক্ষ নই। কারণ ভারতীয় আইন কানুন এই দুটি ভাষাতেই লেখা থাকে। এমনও নয় যে ইনটারনেট খুলে এই আইন তিনটি খুঁজে পাওয়া যায় কি করে, সে বিষয়ে আমরা কিছুই জানি না। না এই সব আসলেই কোন কারণ নয়। আমরা ইচ্ছে করলেই নতুন এই তিনটি কৃষি আইনে ঠিক কি কি লেখা রয়েছে জেনে নিতে পারতাম। কিন্তু আমরা সেটি করি নি। করার দরকারও বোধ করি নি। বরং আমরা চোখ রেখেছি আমাদের নিজস্ব পছন্দের এক একটি টিভি চ্যানেলে। পছন্দের খবরের কাগজের পছন্দের খবরে। যেখান থেকে আমরা জানতে পেরেছি, দেশদ্রোহী কৃষকদের কথা। খালিস্তানী কৃষকদের কথা। পাকিস্তানী কৃষকদের কথা। চীনপন্থী নকশাল কৃষকদের কথা। বিশ্বাস করে নিয়েছি প্রজাতন্ত্র দিবসে লালকেল্লা থেকে কৃষকরা জাতীয় পতাকা নামিয়ে দিয়েছিল। এবং লালকেল্লায় খালিস্তানী পতাকা তুলে দিয়েছিল। না, কোনটা খালিস্তানী পতাকা আর কোনটা নয়। সেটা আমাদের না জানলেও চলবে। দুই বেলা পছন্দের খবরের চ্যানেলের প্রচারিত গপ্প বিশ্বাস করে নিতে পারলেই আমরা দেশপ্রেমী।


তাই সেই দেশপ্রমের সংস্কার থেকেই আমরা বিশ্বাস করেছি রাষ্ট্র ও তার প্রচারযন্ত্রকে। যেমনটা আমরা নোটবাতিলের সময়ে করেছিলাম। যেমনটা আমরা নতুন ২০০০ টাকায় অত্যাধুনিক চীপ ঢোকানোর গল্প প্রচারের সময় করেছিলাম। যেমনটা আমরা জিএসটি চালু করার সময়ে করেছিলাম। যেমনটা আমরা কালোটাকা উদ্ধারের প্রতিশ্রুতি প্রচারের সময় করেছিলাম। যেমনটা আমরা পুলওয়ামার সংবাদ প্রচারে করেছিলাম। যেমনটা আমরা বালাকোট নিয়ে করেছিলাম। যেমনটা আমরা কাশ্মীরে ৩৭০ ধারা বিলোপের সময়ে করেছিলাম। এমনকি যেমনটা আমরা সিএএ ও এনআরসি নিয়ে সরকারী প্রচারের সময়েও করেছি। কেননা অধুনা দেশপ্রেমের একটিই সঙ্গা। সরকার ও তার প্রচারযন্ত্রকে কায়মনবাক্যে বিশ্বাস করার নামই দেশপ্রেম। সরকার প্রধানকে দেবতা জ্ঞানে আরাধনা করার নামই দেশপ্রেম। তাই রাষ্ট্র যখন আমাদের যে লাইনে দাঁড় করিয়ে দেবে। ঠিক সেই লাইনে সুবোধ সন্তানের মতো দাঁড়িয়ে পড়াই দেশপ্রেম।


তাই আমরা আন্দোলনরত কৃষকদের কথায় বিশ্বাসও করি নি। তাদের কথা ঠিক না বেঠিক, সেটি জানতে নতুন তিন কৃষি আইন পড়ে দেখতেও যাই নি। আমরা আমাদের দেশপ্রেমের নতুন নিয়মে বিশ্বাস করে নিয়েছি, সরকার দয়াপরবশত হয়েই দেশের কৃষকদের ধনী করে তোলার পরিকল্পনা হাতে নিয়েই নতুন এই আইন নিয়ে এসেছে। এবার ভারতের কৃষকদের কপাল খুলে যাবে। সরকার নিজেই দাবি করেছে, এই কৃষি আইন স্বাধীন ভারতের অন্যতম ঐতিহাসিক ঘটনা। আর আমরা দেশপ্রেমী। তাই আমাদের নিশিরাতের ঘুমের কোন ব্যাঘাত ঘটেনি। দেশপ্রেমের দায় নেই আন্দোলনরত কৃষকদের কথায় কান দেওয়া। বিশ্বাস করা তো দূরের কথা। এই কারণেই আমরা নিশ্চিন্তে রয়েছি।


কিন্তু সত্যিই কি আমরা ভবিষ্যতেও এমন নিশ্চিন্তে থাকতে পারবো? প্রতিদিন যাদের দোকান বাজার করতে হয়, তাঁরা জানেন অত্যাবশ্যকীয় খাদ্যশস্য থেকে শুরু করে নিত্য প্রয়োজনীয় সবজী বাজারে দ্রব্যমূল্যের উর্ধগতি কেমন হাতের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে দিনকে দিন। মনে রাখা দরকার ১৯৫৫ সালের খাদ্যশস্য আইন অনুযায়ী অত্যাবশ্যকীয় খাদ্যশস্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকার কিন্তু এযাবৎ দায়বদ্ধ ছিল। তবুও বাজারে আগুন। সাধারণ মানুষ দিশাহারা। এবং এই পরিস্থিতিতে বর্তমান সরকারের আনা নতুন তিন কৃষি আইনের তৃতীয়টির দিকে একটু নজর দেওয়া যাক। জানি, অনেকেরই বিরক্তিকর মনে হবে এই সব আইন নিয়ে আলোচনার ভিতরে ঢোকা। তবু নাহয় একবার কষ্ট করে হলেও দেখা নেওয়া যাক। সামনে কি হতে চলেছে। না, কোন অনুমানের বিষয় হিসাবে নয়। সরকার প্রযুক্ত আইনের ধারা উপধারা অনুসারেই।


গালভরা এই আইনটির নাম দ্য এশেনসিয়াল কমোডিটি এক্ট ২০২০। এই আইনের বলে ভারতবর্ষে আর কোন খাদ্যশস্যই অত্যাবশ্যকীয় পণ্য তালিকায় রইল না। অর্থাৎ এতদিন যে খাদ্যশস্যগুলিকে এই অত্যাবশ্যকীয় খাদ্যশস্যের তালিকায় রাখা হয়েছিল, সেই শস্যগুলির সব কয়টিকেই এই তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হলো। নতুন এই তিন কৃষি আইনকে যাঁরা কৃষকদের বিষয় বলে বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করতে চাইছেন না। ঠিক তাঁদের জন্যেই এই তৃতীয় আইনটি। আমি আপনি কেউ কৃষক না হলেও, প্রতিদিনের রান্নার জন্যে আমাদের দোকান বাজার যেতে হয়, হবে। এই বিশেষ আইনটি কিন্তু তখন আমাদের পিছু ধাওয়া করতেই থাকবে। যতদিন না আন্দোলনরত কৃষকদের দাবি মতো এই আইনটি রদ করছে সরকার। আলু পেঁয়াজ থেকে চাল ডাল চিনি তেল ইত্যাদি নিত্য প্রয়োজনীয় খাদ্যশস্যের দাম যতই বাড়তে থাকুক, আমাদের আশা থাকে, সরকার সেই দাম নিয়ন্ত্রণে এগিয়ে এসে আমাদের উপকার করবে। কিন্তু নতুন এই আইনে কোন খাদ্যশস্যই আর সরকারের মূল্য নিয়ন্ত্রণের এখতিয়ারে রাখা হয় নি। ফলে বাজারে খাদ্যশস্যের মূল্য যতই বাড়ুক না কেন। মূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকারের আর দায় থাকবে না। এমনকি আইনত কোন অধিকারও থাকবে না। অর্থাৎ সরকার চাল ডাল চিনি তেলের দাম বেঁধে দিলে, ব্যবসায়ীরা আদালতে সরকারের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করলে সরকারই ফেঁসে যাবে। আদালত সরকারের বিরুদ্ধে রায় দিতে বাধ্য থাকবে। কেননা সরকারী আইনেই আর কোন অত্যাবশ্যকীয় খাদ্যশস্য নাই।


যদিও এই আইনে খাদ্যশস্যের মৃল্যবৃদ্ধির উপরে সরকারের কোন নিয়ন্ত্রণ রাখা হয় নি, তবে শুধু মাত্র প্রকৃতিক বিপর্যয়, দুর্ভিক্ষ, যুদ্ধ, মহামারী এবং অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ইত্যাদির ক্ষেত্রে সরকার দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের অধিকারী থাকবে। পচনশীল খাদ্যশস্যের ক্ষেত্রে গত একবছরের মূল্যের তুলনায় কিংবা গত পাঁচ বছরের গড় মূল্যের তুলনায়, যেটি কম হবে, তার থেকে পঞ্চাশ শতাংশের বেশি মূল্যবৃদ্ধি ঘটলে সরকার প্রয়োজন বুঝলে তবেই মূল্য নিয়ন্ত্রণে অগ্রসর হতে পারে। কিন্তু মূল্যবৃদ্ধির পরিমাণ যদি ভিত্তি মূল্যের থেকে ৪৯% অব্দি বেশিও হয়, সরকারের মূল্য নিয়ন্ত্রণের কোন আইনি অধিকার থাকবে না। অন্যান্য খাদ্যশস্যের ক্ষেত্রে ৯৯% অব্দি মূল্যবৃদ্ধি ঘটলেও সরকারের করার কিছু থাকবে না। এবং এই আইন অনুসারে যে কোন ব্যবসায়ী যতখুশি পরিমাণে খাদ্যশস্য যতদিন খুশি মজুত করেও রাখতে পারবে। ফলে খাদ্যশস্য মজুতদারী ব্যাবসায় যতখুশি মুনাফা অর্জন আইনসিদ্ধ হয়ে গেল। এবং বাজারে কৃত্রিম অভাব সৃষ্টি করে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির বিষয়ে আর কোন সরকারী বিধিনিষেধ থাকল না। আসুন বরং এবার সমস্বরে এই আইনের স্বপক্ষে দুহাত তুলে জয়ধ্বনি দিই। দেশপ্রেমের মহান দায়িত্বে।


এবারে নজর দেওয়া যাক দ্বিতীয় কৃষি আইনের দিকে। দ্য ফার্মারস (এম্পাওয়ারমেন্ট এণ্ড প্রোটেকশন) এগ্রিমেন্ট অন প্রাইস এস্যুরেন্স এণ্ড সার্ভিস এক্ট ২০২০। হ্যাঁ এই সেই চুক্তি চাষ আইন। যার বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছে কৃষক সমাজ। অনেকেরই স্মরণে আছে। ব্রিটিশ আমলের নীল চাষের ইতিহাস। সেই চুক্তি চাষই আবার নতুন কলেবরে ফিরিয়ে নিয়ে আসার তোড়জোড় করেছে কেন্দ্র সরকার। নতুন এই আইনে যে কোন কৃষকের সাথে কোন ব্যবসায়িক সংস্থা অগ্রিম চুক্তি করতে পারবে। কোন জমিতে কোন মরশুমে কোন চাষ হবে। উৎপন্ন ফসলের আগ্রিম মূল্যের উপরে চুক্তি হবে। এই চুক্তি ফসল উৎপাদনের এক মরশুম থেকে পাঁচ বছর অব্দি সময়সীমায় হতে পারে। চুক্তি হবে লিখিত শর্তাবলীর উপরে। এবং সেই চুক্তির বিষয়ে দুই পক্ষের ভিতর কোন বাদানুবাদ সৃষ্টি হলে। তার নিষ্পত্তি হবে সেই অঞ্চলের সাবডিভিশানাল ম্যাজিস্ট্রেটের অধীনে। এবং এই বিষয়ে নির্বাহী কর্তৃপক্ষের রায়ের বিরুদ্ধে কোন আদালতে মামলা করা যাবে না। এবং সেই রায় আদালতের রায়েরই সমতুল্য হিসাবে গণ্য করা হবে। কৃষকদের তখন আর করার কিছুই থাকবে না। চুক্তি চাষের ভিত্তি কিন্তু বিশেষ কতগুলি শর্তাবলীর উপরেই নির্ভর করবে। স্বভাবতঃই যে শর্তগুলি বৃহৎ ব্যাবসায়িক সংস্থাগুলিই নির্ধারণ করবে। কৃষক যে, কোন শর্ত চাপিয়ে দেবে ব্যবাসায়িক প্রতিষ্ঠানের উপরে। এমনটা ভাবার কোন কারণ নাই। স্বভাবতঃই যে কোন বিচক্ষণ কৃষক এই বিষয়ে যথেষ্ঠ সন্দিহান হবেন। তাঁর স্বাধীনতা হরণের বিষয়ে তিনি ভীত হলে তাঁকে দোষ দেওয়াও যায় না। বর্তমান কৃষক আন্দোলনে ঠিক সেটাই ঘটছে। কৃষকরা আসল খেলাটুকু ধরে ফেলেছেন। তাঁরা বুঝতে পেরে গিয়েছেন, এই চুক্তিচাষ আসলেই ধীরে ধীরে তাদেরকে তাদের নিজের জমিতে জন মজুরে পরিণত করার আইনী প্রক্রিয়া। তাঁরা এটাও অনুধাবন করতে পারছেন, সময়ের সাথে দেনার দায়ে তাঁদের জমি সংশ্লিষ্ট ব্যাবসায়িক প্রতিষ্ঠানের মালিকানায় চলে যেতে বাধ্য। তার বড়ো কারণ, প্রকৃতিক কারণে ফসলের ক্ষতি হলে সেই দায় ব্যবাসয়িক প্রতিষ্ঠানগুলি নেবে না। বরং ফসল উৎপাদনে তাদের লগ্নী করা টাকা কৃষকের ভিটে মাটি জমি সম্পত্তি থেকেই উশুল করে নেবে। এবং এই আইনে এই বিষয়ে সরকার কৃষকের পাশে থাকবে না। এবং আইন থাকবে ব্যাবসায়িক সংস্থাগুলির পাশেই। কারণ খুব সহজবোধ্য। কৃষকের সাথে প্রতিষ্ঠানগুলির যে চুক্তিই হোক, তার শর্তাবলী ঠিক করবে কৃষক নয়। ব্যবাসয়িক সংস্থা। আর আইন সেই সকল শর্তাবলীরই সুরক্ষা দিতে দায়বদ্ধ। আইন কৃষকের স্বার্থ দেখবে না। আইন দেখবে শর্তাবলী কতটা কি পূরণ হয়েছে আর হয়নি। সেটাই। কিন্তু সেই বিষয়টিও আবার কোন আইনী আদালত দেখবে না। দেখবে সরকারী মাস মাহিনায় কাজ করা সাব ডিভিশানাল ম্যাজিস্ট্রেট। আর এইকানেই আসল খেলাটুকু ধরতে পেরে গিয়েছে ভারতীয় কৃষক সমাজের একটা বড়ো অংশ। বর্তমান কৃষক আন্দোলনের মূল শক্তির সেটাই উৎপত্তিস্থল।


কৃষক এটাও বুঝতে পেরে গিয়েছে, সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষতর শর্তাবলীর সামান্য এদিক থেকে ওদিক হলেই বৃহৎ ব্যাবসায়িক সংস্থাগুলি তাদের দায়িত্ব ঝেরে ফেলে দিতে দেরি করবে না। উৎপন্ন ফসলের ন্যায্য মূল্যের বদলে হয় তখন শস্তাদরে ফসল বিক্রী করতে হবে। নাহলে শস্য নিয়ে সারা ভারত ছুটে বেড়াতে হবে ভালো দামের আশায়। তাতে ঢাকের দায় মনসা বিদায় হয়ে যেতে পারে। যেহেতু শস্য উৎপাদনে বীজ, সার ইত্যাদি থেকে শুরু করে অন্যান্য প্রায় সকল বিষয়েই বৃহৎ ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলিই অর্থ লগ্নী করবে, তাই উৎপন্ন ফসলের গুণমান ও মূল্যের বিষয়টিও তাদেরই অধীনস্ত থেকে যাবে। কৃষকের উৎপন্ন ফসলের মূল্য নির্ধারণে কৃষকেরই ভুমিকা হবে শূন্য। চুক্তি চাষের নিয়ম অনুসারে যেহেতু ফসলের গুণমান ও মূল্য আগে থেকেই চুক্তি অনুসারে ঠিক হয়ে যাবে, তাই কৃষিপণ্যের উপরে বর্তমানে প্রচলিত ন্যূনতম সয়াহক মূল্যের আর কোন ভুমিকাও থাকবে না। যদিও এটা ঘটনা, সারাভারতে মোট কৃষি উৎপাদনের মাত্র ছয় শতাংশই সরকার নির্ধারিত ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের সুবিধা পেয়ে থাকে। আর বাকি ৯৪% কৃষিপণ্যই এই সুযোগ থেকে বঞ্চিত। কিন্তু নতুন কৃষি আইনে সেই মাত্র ছয় শতাংশ পণ্যের সুবিধারও সলিল সমাধি ঘটে যাবে। কৃষকরা সেটা মেনে নিতে রাজি নয় বলেই পাঞ্জাব ও হরিয়ানার কৃষকদের কেউই এই আইন মেনে নিতে রাজি হচ্ছে না। ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের সরকার নির্ধারিত সুবিধা এই দুই অঞ্চলের কৃষকরাই মূলত পেয়ে আসছে। তাই কৃষি আইনের বিরুদ্ধে এই অঞ্চলের কৃষকরা একসাথে জোট বেঁধেছে।


সব শেষে দেখা যাক, প্রথম কৃষি আইনের বিষয়ে। দ্য ফার্মারস প্রডিউস ট্রেড অণ্ড কমার্স (প্রোমশান এণ্ড ফেসিলিশেসন) এক্ট ২০২০। এই সেই আইন, যে আইনের বলে সরকারী মাণ্ডি ব্যবস্থার বাইরে বেসরকারী মাণ্ডি ব্যবস্থা গড়ে উঠবে। এখন সারাভারতে সরকারী মাণ্ডি প্রয়োজনের তুলনায় প্রায় নগণ্য। সরকারী মাণ্ডিতে কৃষিপণ্য বিক্রী করতে সরকারকে ট্যাক্স দিতে হয়। কিন্তু বেসরকারী মাণ্ডিতে কোন কর দিতে হবে না। সরকারী মাণ্ডিতে সরকার নির্ধারিত ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের একটা সুবিধা থাকে। বেসরকারী মাণ্ডিতে সেটি থাকবে না। ফলে প্রথম দিকে কিছু সরকারী মাণ্ডি চলতে থাকলেও, দিনে দিনে সেগুলি বন্ধ হয়ে যাবে। সেগুলি বন্ধ হওয়ার সাথেই কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি কৃষিপণ্য কেনার সরকারী পথও বন্ধ হয়ে যাবে। সাথে চুক্তি চাষের ব্যাপক প্রসারে, সারা দেশের সব কৃষিজমিই চুক্তি চাষের অধীনে চলে গেলে সরকার আর কোন কৃষিপণ্যই কোনভাবেই কিনতে পারবে না। সরকার কৃষিপণ্য কেনা বন্ধ করে দিলে সব রেশন দোকান বন্ধ। সরকারী গুদাম শূন্য। সরকারের খাদ্য দপ্তরে তালা। হাজার হাজার কর্মচারীর চাকরি শেষ। হ্যাঁ এটাই প্রথম কৃষি আইনের অভিমুখ। এখানে আরও একটি বিষয় স্পষ্ট। বেসরকারী মাণ্ডি ব্যবস্থা গড়ে তোলার মুখ্য উদ্দেশ্যই হলো সরকারী মাণ্ডি ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দেওয়া। আর সেটি করে দিতে পারলেই দুটি উদ্দেশ্য সফল। প্রথম উদ্দেশ্য দেশব্যাপী খাদ্যসুক্ষার দায়িত্ব থেকে সরকারের অব্যাহতি লাভ। ফলে রেশন ব্যবস্থার পঞ্চত্ব প্রাপ্তি। কৃষিপণ্যের বেচাকেনার পরিসর থেকে সরকার সরে গেলে, বৃহৎ ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলি তাদের মুনাফার স্বার্থে গোটা দেশের কৃষি ও খাদ্য সরবরাহ এবং বেচাকেনাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। ফলে আমার আপনার জীবনধারণ হাতে গোনা কয়েকটি সংস্থার নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে। আবার প্রতিটি ফসলই চুক্তি চাষের শর্তে আগাম মূল্যে নির্ধারিত হয়ে থাকবে বলে খোলা বাজার অর্থনীতির কোন সুযোগও নিতে পারবে না কোন কৃষক। এই ভাবে কৃষক চুক্তি চাষের দাসে পরিণত হয়ে পড়বে। ফলে কৃষক এবং সাধারণ উপভোক্তা। দুই পক্ষই হাতে গোনা কয়েকটি বৃহৎ সংস্থার অধীনস্ত হয়ে পড়বে। তারা কৃষককে যেভাবে খাটাবে। কৃষক সেই ভাবেই খাটবে। তারা আমাদের যতটুকু খেতে দেবে। আমরাও ততটুকু খাবো। যারা বিশ্বায়নের গল্পে উর্ধবাহু হয়ে নৃত্য করতে করতে খোলা বাজার অর্থনীতির পক্ষে ওকালতি করে এসেছেন। তাদের জন্যেও নতুন এই কৃষি আইন এক নতুন শিক্ষা দিতে এগিয়ে আসছে।


এখন প্রশ্ন একটাই। কৃষক সমাজ তো গোটা বিষয়টি ধরে ফেলেছে। কিন্তু আমার আপনার মতো ডিগ্রীধারী ইনটেলেকচ্যুয়ালরা বৃহৎ পুঁজির স্বার্থে নিজেদের গোষ্ঠী স্বার্থ অনুযায়ী আরও কতদিন ওকালতি করে যাবো। সেটাই আসল কথা। কিংবা আরও কতদিন টিভির পর্দায় চোখ রেখে চোখকান বুঁজে দেশপ্রেমের পাঠ নিতে থাকবো সুবোধ বালকের মতো। ভারতবর্ষের ইতিহাস এক মহা বাঁকের মুখোমুখি আজকে। একদিন পরাধীন ভারতের জনমানসে স্বাধীনতার চেতনা জাগিয়ে তুলেছিল বাঙালিরা। আজ বৃহৎ পুঁজির অধীনস্ত সাম্প্রদায়িক কোলাহলপূর্ণ ভারতের জনমানসে আজাদির চেতনা জাগিয়ে তুলতে এগিয়ে এসেছে পাঞ্জাব হরিয়ানা পশ্চিম উত্তরপ্রদেশের কৃষকসমাজ। আমি কিংবা আপনি কিন্তু প্রস্তুত নই একদমই। আমাদের চেতনায় কৃষক এক প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। এই শহর বন্দর নাগরিক সমাজের বহুদূরবর্তী। কোন আইনে তাদের কত ক্ষতি হলো, হবে তাই নিয়ে আমাদের কি এসে যায়। সেই কথা আমাদের উপলব্ধিতে আজও ধরা পড়ছে না। দিল্লীর সীমান্তে আন্দোলনরত কৃষকদের অবস্থানের ১১০ দিনেও। কিন্তু আন্দোলনরত কৃষকসমাজ আমাদের সেই অবরুদ্ধ চেতনায় আলো জ্বেলে দিতেই আজ আমাদের দূয়ারে দূয়ারে কড়া নাড়তে এসে দাঁড়িয়েছে।


এই আইনের বিরোধীতা করা শুধু মাত্র কৃষির কোন বিষয় নয় আর। এই আইনের বিরোধীতা করা আসলেই দেশরক্ষার কর্মে অংশগ্রহণ করা। আজকে যারা সেই কাজে অগ্রসর হচ্ছে না। আগামীর ইতিহাস কি পারবে তাদের ক্ষমা করতে আদৌ? কৃষির উপরে নির্ভরশীল একটি দেশে এই আইন নিয়ে আসার একটাই অর্থ। দেশের সামূহিক সর্বনাশ ডেকে নিয়ে আসা। আর সেই কাজে যারা হাত লাগিয়ে বসে আছে, তাদেরকেই দেশের হিতাকাঙ্খী বলে বিশ্বাস করা কার্যত দেশের সাথেই বিশ্বাসঘাতকতার নামান্তর নয় কি? প্রশ্নটা কিন্তু ঝুলতেই থাকবে। আমার আপনার নাকের ডগায়।

১৬ই মার্চ’ ২০২১


কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত