স্বপন নাগ

 

হূবনাথ পান্ডের চারটি কবিতা



বার্ধক্য



বয়সের ক্লাসের শেষ পিরিয়ড বেশ দীর্ঘ,
বেশ শ্লথ, খানিক শান্ত আর সংযত কিছুটা।
শেষ প্রার্থনার আগে, মনিটর ছাড়াই
নিজেদের মূল্যায়ন করার পিরিয়ড,
ব্যাগপত্তর গুছিয়ে নিয়ে
সহপাঠীর দিকে একটু তাকিয়ে দেখার,
একটু হাসি-মজার, খানিক খুনসুটির পিরিয়ড।

ছবি আঁকার হাত ভালো যার
তার মুন্সিয়ানাকে নিজের করে দেখার পিরিয়ড,
অঙ্কে যারা তুখোড় ছিল
মুখে মুখে অনায়াস হিসেব করার বাহাদুরি,
সাহিত্যের অনুরাগী ছিল যারা
সেই অনুরাগে গুনগুনিয়ে ওঠা,
কী এক জরুরি কাজে
রিসেস আওয়ারেই চলে গেল যে
তার কথা ভাবতে ভাবতে,
খেলার মাঠে পাওয়া চোটে হাত বুলোতে বুলোতে
কেউ বা রঙিন পেন্সিলবাক্স দেখাতে দেখাতে...

এই পিরিয়ডে আসেন না কোনো টিচার
সবাই নিজেই শিক্ষক, নিজেই পরীক্ষক।
রেজাল্ট নিয়ে বেজায় ভয় সবারই --
কারোর কম, কারোর বা বেশি।
পেন্সিল কাটার দরকার নেই আর এখন,
দরকার নেই পেনের কালি ভরারও
সবার হাত পরিষ্কার
শেষ প্রার্থনার জন্য করজোড়ের প্রস্তুতি শুধু।

পৃথিবীর এই একমাত্র ক্লাশরুম --
যেখানে ছুটির ঘন্টার শেষেও
খুশি হয় না বাচ্চারা,
তাড়াতাড়ি বেরোবার জন্যে কোনো হুড়োহুড়ি নেই।
বড় শান্ত, বড় নম্রতায়
পেরিয়ে যেতে রাস্তা ছেড়ে দেয় অন্যকে।
তারপর, শেষ ঘন্টা বেজে যাবার পরেও
এক কোণে জড়সড় বসে থাকে প্রার্থনারত,
নিজের ব্যাগপত্তর সামলাতে সামলাতে
অপেক্ষা করে সে --
কখন সময় হবে তার !



মার্ক্স



ধর্ম আফিম নয় মার্ক্স !
ধর্ম আসলে ভ্যাকসিন --
বিবেকের ভাইরাসকে সে নিষ্ক্রিয় করে দেয়,
তর্কের কীটাণুকে গলিয়ে শেষ করে
তাকে আস্থায় পরিণত করতে চায়।
গল্প ইতিহাস হয়ে যায়
আর ইতিহাস হয়ে যায় ব্যঙ্গ, কৌতুক ;
জড়কে চেতনা দান করে
আর চেতনাকে পাষাণ বানায় এই ভ্যাকসিন।

বাজারও জন্মায়নি যখন
তখন থেকেই বাজারেরই দ্রুততায়
এই সব তৈরি হচ্ছে রাজনীতির পরীক্ষাগারে।

আফিমের নেশাও উবে যায় দেরিতে, একসময়
কিন্তু ভ্যাকসিন তো থেকেই যায় রক্তে মজ্জায়

ধর্ম নিয়ে যা আন্দাজ করেছিলেন
কোথাও বুঝি ফাঁক থেকে গেছে সে অনুমানের,
আপনার ভাবনাকেও তো কিছু লোক
ধর্ম বানিয়ে দিয়েছে আজ !

ধর্ম আসলে
বোধ-সমাপ্তিরই এক স্বাভাবিক প্রক্রিয়া মার্ক্স !


নতুন বিধান


সিংহ জঙ্গলের রাজা :
এই রাজবোধ জেগে উঠতেই
সে জারি করলো নতুন আইন।

জংলী কুকুরেরা বলেছিল --
আইন বানাতে পারে না যে,
সে কেমন রাজা !

অতএব আইন হলো
স্তন্যপায়ী গরুছাগলদের জন্য,
তাদের দুধের ওপর ;
আইন হলো, সব্বার আগে
সেই দুধে অধিকার থাকবে ভেড়াদের।
তার পর বেঁচে থাকবে যেটুকু --
মর্জিমত ব্যবহার করতে পারবে
গরুছাগলের দল।
কেননা, জঙ্গলে এখন ভরপুর গণতন্ত্র
স্বাধীনতা আছে সবার !

ভেড়ারও আগে
আপত্তি জানালো গরুছাগল --
ভেড়ারা শুধু দুধই খাবে না,
চিবিয়ে ছাড়বে তাদের দুধের বাঁটও !
তারা ধরনায় বসলো --
একটাই জেদ
একটাই দাবি
ফেরৎ নাও এই আইন !

ভেড়াদের নারাজ করা
সিংহের ক্ষমতারও বাইরে।
অবশেষে বানানো হলো কমিটি
শেয়াল, জংলী কুকুর, হায়না
আর নেকড়েকে নিয়ে এক কমিটি।

সিংহের নিরপেক্ষতা দেখে
অভিবাদন জানালো চিতা,
ভাল্লুক জানালো সম্মতি,
সহযোগিতার হাত বাড়ালো বাঘ।

জঙ্গলের বাকি পশুরাও সন্তুষ্ট ছিল এই ভেবে
আইন তো শুধু গরুছাগলদের জন্যে !
আর, তাদের এই সরলতা দেখে
শুধু মুচকি হাসলো সিংহ।


একটি অসভ্য সওয়াল



ওরা জানতে চায় --
কী করছে মেয়েরা কৃষক আন্দোলনে ?

মেয়েদের তো
ঘরের মধ্যে, লক্ষণরেখার ভিতরে দেখার
অনেক পুরনো অভ্যেস ওদের।
বিছানায়, মনোহরা পুতুলের মত
তারাই বরং বহু পরিশ্রমে জুতোর পাশে
মেয়েদেরও জায়গা বানিয়ে দিয়েছে।

ভিজে কাঠের মত
রান্নাঘরের ধোঁয়ায় ডুবে-থাকা মেয়েমানুষ,
মাথায় কাঁখে জলের কলসি বয়ে বেড়ানো মেয়েমানুষ
খানদানের জল বাঁচাতে,
ঘুঁটে দিতে, কাঠ কুড়োতে, আটার পাহাড় মাখতে
স্নানের ঘাটে মরার ঘাটে
দুনিয়ার সমস্ত কাপড় আছড়াতে আছড়াতে
পৌরুষের তর্জনীর নিচে ছটফট করতে করতে
নতজানু হয়ে পুড়ে খাক হতে হতে
মরতে মরতে বাঁচা
কিংবা জীবন্মৃত বেঁচে থাকা
ক্ষমতার চৌকাঠে নাক ঘষে, মাথা খুঁড়ে
পা টেনে টেনে চলা মেয়েমানুষ দেখার,
দেখতে থাকারই বহু পুরনো অভ্যেস ওদের।

লড়াই করা মেয়েমানুষ
প্রতিবাদ করা মেয়েমানুষ
অধিকার চাওয়া মেয়েমানুষ
প্রতিকার চাওয়া মেয়েমানুষ
নেচে ওঠা মেয়েমানুষ
শ্লোগান তোলা মেয়েমানুষ
পুরুষের কাঁধে কাঁধ মিলিয়েই নয়
সমগ্র ব্যবস্থাতেই কাঁধ দেওয়া মেয়েমানুষ
কোনো সভ্য সমাজের জন্যে একেবারেই ঠিক নয় !

তাদের বানানো ক্ষমতার বাইরে বেরোতেই
মেয়েমানুষরা আসলে মানুষ হয়ে ওঠে।
আর, মেয়েমানুষদের মানুষ হয়ে ওঠা
চরম অসভ্যতারই লক্ষণ !

এ জন্যেই ওরা জানতে চায়
নিতান্ত নিষ্পাপ অথচ অসভ্য সওয়াল --
কী করছে মেয়েরা কৃষক আন্দোলনে ?

ওরা ভুলে যায়
এ পৃথিবীতে ফসল ফলানোর কাজ
শুরু করেছিল মেয়েরাই,
ভুলে গেছে এও বোধহয়
ধরিত্রীকে মা বলা হয়।
আর, সব মা
প্রথমত একজন মেয়েমানুষই মাই লর্ড !



হূবনাথ পান্ডে
------------------
১৯৬৫ সালের ১৩ই এপ্রিল বেনারসে জন্ম কবি হূবনাথ পান্ডের। আধুনিক হিন্দি কবিতার জগতে এই সময়ের বহুচর্চিত তাঁর কবিতা। তাঁর কবিতায় পাওয়া যায় এই সময় এবং এই সময়ের যাবতীয় প্রসঙ্গ। সেই প্রসঙ্গে যেমন আছে বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতা, সমাজের বৈষম্য, তেমনই জাতপাতের নামে বিভাজনের দীর্ঘদিন ধরে লালিত অপচেষ্টাও। ভণিতাহীন, সহজ উচ্চারণে কবিতায় কথা বলা তাঁর বৈশিষ্ট্য। 'কৌয়ে', 'মিট্টী', 'লোয়ার পরেল', 'অকাল' প্রমুখ তাঁর উল্লেখযোগ্য কয়েকটি কাব্যগ্রন্থ। বর্তমানে কবি মুম্বাই বিশ্ববিদ্যালয়ের হিন্দি বিভাগের অধ্যাপক। অনূদিত কবিতা চারটি সদ্যলেখা, এখনও কোনো গ্রন্থভুক্ত হয়নি।