স্বপন নাগ


  


ভূপেনের দিনরাত্তির


সে এক দিন ছিল। ভূপেনের তখন শরীরস্বাস্থ্যও দেখার মত। ভূপেনে মজেছিল মালতী। পরিচিতদের নজর এড়িয়ে মালতীকে সঙ্গে নিয়ে "শোলে"ও দেখে এসেছে ভূপেন। তারপর থেকেই শোলে নকল করে ডায়ালগও ঝাড়ত সে, "ইয়ে হাথ মুঝে দে দে মাল্ তী ।" মালতী কপট ভয় দেখাত তার বাপের। চওড়া হাত দেখিয়ে ভূপেনও বলতে ছাড়ত না, " আরে দেখ্ দেখ্, ইয়ে হাথ নহী, ফাঁসি কা ফান্দা।"

     সেই তেজও নেই ভূপেনের, সেই শরীরও। সব নিভে এসে পঞ্চাশ পেরোনো ভূপেনের জীবনটা বড্ড এলেবেলে হয়ে গেছে। সে সার বুঝেছে, আপনা হাতই জগন্নাথ। হাত আছে তো ভাত আছে। হাত নেই তো খালি পেট।

     হাতের বড় মহিমা। প্রহারেও হাত, আবার প্রণামেও। হাত না থাকলে হস্তশিল্পটাই মাঠে মারা যায়। হাতপাখা আর হাতপাম্পও অকেজো হয়ে পড়ে থাকে।

     ভেবেছিল বাড়ির কাজে হাত লাগাবে, হয়নি। ভূপেনের বাবা ভেবেছিল পড়াশুনো করবে, তাও হয়নি। অথচ ভূপেনেরও একদিন 'হাতেখড়ি' হয়েছিল। কিছুদিন গ্রামের স্কুলে যাওয়াও। কিন্তু এই খ্যাঁচাকলে আটকে থাকার ছেলে সে নয় । ভূপেনের মতিগতি দেখে বনবিহারীবাবুই তার বাবাকে পরামর্শ দিয়েছিল, " কোনো একটা হাতের কাজে লাগিয়ে দাও ছেলেকে।"

     যেই না বলা, কদিন পরেই কোলকাতার একটা কারখানায় ওকে জুতে দিল ওর বাবা। কারখানায় যায়, কাজ করে, হাতে কাঁচা পয়সাও আসতে শুরু করে। দিনে দিনে ভূপেনও পাকা মিস্ত্রি হয়ে ওঠে। তার হাতযশের কথা কারখানা ছাড়িয়ে আশপাশের লোকজনও জেনে যায়। কয়েক বছরে সবাই জেনে যায়, যে-কাজে হাত দেবে ভূপেন মিস্ত্রি, সে একেবারে পাক্কা। আর যে-কাজ থেকে হাত উঠিয়ে নেবে সে, কার সাধ্যি আর সে কাজ করে ! এটাও সবাই জানে, ভূপেন মিস্ত্রি অহেতুক কোনো কাজ হাতে রাখে না। হলে হবে, না হলে তার সটান দাওয়াই, হবে না।

     রোজ ভিড় ট্রেনে শেয়ালদা। সারাটা দিন কাবাড় করে আটটা পাঁচের শান্তিপুরে বাড়িফেরা। আর ভাল্লাগে না ভূপেনের।

     সেদিন শান্তিপুর লোকালে ধরা পড়ল এক পকেটমার। একেবারে হাতেনাতে। তারপর শুরু হলো গণধোলাই। হাতজোড় করে কাকুতি মিনতি করেও রেহাই জুটল না বেচারার। এমন সময়ে কিছু মানুষের হাত নিশপিশ করে। হাতের সুখ মেটাতে চায়। তারাও মওকায় বসিয়ে দেয় কয়েক ঘা। নিরীহ একজনকে পেয়ে তাকে মারা এবং না-মারা নিয়ে বচসা বাঁধল দু'দলের। এক দলের সোজা দাওয়াই, "মার খাওয়াই উচিত।" আর এক দলের মতে, "আইন আছে কিসের জন্যে ? পুলিশে দিলেই হয়!"

     দু'দলের বচসাও চলল ছ'সাত কিলোমিটার। বচসা এতই জোরালো যে, প্রায় হাতাহাতি হবার জোগাড়।ভিড় থেকেই ফুট কাটল একজন, "ও দাদা, হাত থাকতে মুখে কেন ?"

     ইদানিং এই সব ঘটনাও ভূপেনের কোনো ভাবান্তর ঘটায় না। পুরনো দিনের সব তেজ মরে গিয়ে সে এখন ক্ষীণ, গোবেচারা, নরম মনের মানুষ। রোগাভোগা। ভিড়ের মধ্যে অল্প একটু জায়গা নিয়ে চেপ্টে দাঁড়িয়ে আছে সে। তাকে যেতে হবে শান্তিপুর অব্দি। সাইকেল স্ট্যান্ড থেকে সাইকেল নিয়ে আরও আড়াই কিলোমিটার। মধুবেড়িয়া। চারপাশের চেঁচামেচি আর হুড়োহুড়ির মধ্যে দাঁড়িয়ে থেকে সীটেবসা লোকগুলোকে দেবদূতের মত মনে হচ্ছিল তার। এই ভিড়ে সীট পাওয়া আর হাতে চাঁদ পাওয়া ভূপেনের কাছে সমার্থক।

     ঠিক এমনি সময়ে তার মনে দার্শনিকের মত চিন্তাভাবনা হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ে। গুনগুন করে গেয়ে উঠতে চায় গানের দু'চার করি। বাড়ির কথা, মালতীর কথা ভাবতে ভাবতে স্টেশনের পর স্টেশন পেরিয়ে যায়।

     বনবিহারীর কথা মনে পড়তেই তার রাগ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। মত নষ্টের গোড়া ও শালাই। রাগ মনেই পুষে রাখে ; জানে যত রাগই হোক, আশি ছুঁই ছুঁই বনবিহারীও তার চেয়ে শক্তিশালী। আসলে বনবিহারী একজন জাঁদরেল হস্তবিশারদ। যার মাথাতেই হাত রাখবে সে, কোনো না কোনো দিন সে সফল হবেই। হাত দেখে ভূতভবিষ্যৎ বলার ব্যাপারে মধুবেড়ে জুড়ে বিশাল তল্লাটে তার কোনো জুড়ি নেই। তার সাফল্যে নগেনের ভূমিকাও নগণ্য নয়। নগেনই বনবিহারীর ডানহাত। আর আছে গণা, মানে গণেশ নস্কর। মালতীর বাপ। হাতবোমা বানানোয় যে সিদ্ধহস্ত। দু'চারটে লাশ পাশ ফেলে দেওয়া যার বাঁয়ে হাত কা খেল।

     প্রচারপত্র হাতবিলি করার কাজ সামাল দেয় নগেন আর উটকো সব ঝুটঝামেলাকে সামাল দিতে ব্যস্ত থাকে গণা। লোকে বলে, নিজের হাতেগড়া এ ব্যবসায়ে হাত আছে খোদ থানার বড়বাবুরও। সেদিন অবশ্য শেতলাতলার পরেশ বলছিল, "ও সব বড়বাবু টাবু নয়, বনবিহারীর লম্বা হাত। শালা এম এল এ-কেও হাত করে রেখেছে। নেতা যেদিন হাত উঠিয়ে নেবে, সেদিনই সব শেষ ; একদম হাতে হেরিকেন হয়ে যাবে, দেখে নিস্ ।"

     একটু ঝুঁকে জানলা দিয়ে বাইরে দেখে নিল ভূপেন। চাকদা ছাড়িয়েছে। 

     মালতীর কথা ভাবল। মালতী তখনও তার বৌ হয়নি। বিয়ের আগে মালতীর হাতটা ধরবার জন্য কী আকুলিবিকুলিই না করত সে। শুধু ভয় করত ওর ডাকাবুকো বাপটাকে। মালতীর কাছে ইঙ্গিতে কাঁপাস্বরে গেয়েও উঠেছিল, "আমার হাত ধরে তুমি নিয়ে চলো সখা...."! মালতীর বাপ কী বেটি। ভূপেনের আবেদনের ধার না ধেরে শুধু বলেছিল, "মাইরি বলছি, আমার একদম হাতখালি, কিছু ছাড়ো দিকিনি..." এই সব ভাবতে ভাবতে হাসি পাচ্ছিল ভূপেনের। মালতী সেই একই রকম রয়ে গেছে। এখন আর চাওয়াচায়ির ধার ধারে না। নিঃশব্দে ঝেড়ে দেয়, যাকে বলে হাতসাফাই।

     তা হোক। তবু তো তার বৌ। একটু হাতটান আছে। থাক। আগের চকচকে ভাবটা সরে গিয়ে চামড়া একটু খসখসে হয়েছে। পাতলা চেহারাটা মুটিয়েছে অনেকটাই। হোক মোটা, হোক দজ্জাল। ভূপেনের সঙ্গেই তো আছে একমাত্র এই একজনই !

     একটু এদিক ওদিক করে প্রায় একই ভাবে দিন গুজরান করছে ভূপেন। মনে মনে ভাবে, জীবনটা একেবারে হেদিয়ে গেল। কত লোক কতভাবে তো বেঁচে আছে ! শুধু তারই কিছু হল না। তার হাত বাঁধা আছে জীবনবাবুর কাছে। কারখানার মালিক জীবনবাবু আর বাড়ির মালকিন মালতীর জোড়া চাপে তার পিতৃদত্ত জীবনটা দিনে দিনে চ্যাপ্টা হয়ে যাচ্ছে।

     হঠাৎই তার পৌরুষ জেগে উঠল। নাহ্, এভাবে চলতে দেওয়া যায় না। বাড়ির অ্যাসবেস্টাস বদলাতে কিছু টাকা চাই। ভাবল, জীবনবাবুর কাছেই চাইবে। হাতেগরম একটা চরম সিদ্ধান্ত সে সেদিনই নিয়ে বসল।


     পরের দিন সোজা মালিকের কাছে হাত কচলে, "কিছু টাকা লাগবে, ব্যবস্থা করুন।"
     "এখন নয়। কদিন পরে।" মালিকের ঘোষণা।
     ভূপেনও একবগ্গা , "আমি চললুম। আর কাজ করব না।"

     সোজা ট্রেন ধরে দুপুর দুপুর বাড়ি।

     ও দিকে মালিকের তো মাথায় হাত ! অনেককে দিয়ে খবর পাঠায়। ভূপেন আর যায় না।
     শেষে একদিন মালিকই খোঁজ করে মধুবেড়ে ভূপেনের বাড়ি চলে গেল। ভূপেন মালিককে দেখে অবাক ! হাত মিলিয়ে বসতে ব'লে একটা কাঠের টুল এগিয়ে দিল।
     মালিক হাতজোড় করে অনুরোধ করল, "চল ভূপেন, বিশ্বাস কর , এই বুকে হাত রেখে বলছি, আর কোনদিন এমনটা হবে না।"
     ভূপেন এতখানির জন্যে একেবারেই প্রস্তুত ছিল না। কী বলবে,  কিছুই ভেবে পাচ্ছে না। এমন সময় জীবনবাবু কয়েকটা পাঁচ শ' টাকার নোট ভূপেনের হাতে গুঁজে দেয়। ভূপেন মনে মনে ভাবে, হাতে আসা লক্ষ্মীকে কি ঠেলে দেওয়া উচিত ! না ! তবুও রাগ দেখিয়ে বলে, " দেখুন খুব বিপদে পড়েছিলুম বলেই আপনার কাছে হাত পেতেছি শুভ।"
     ভূপেনের কথা শেষ করতে না দিয়েই মালিক বলে ওঠে, "বিশ্বাস কর, সেসময় আমার হাত একদম খালি ছিল। নইলে কি আর এই সামান্য টাকা তোকে দিতাম না ?"
     ভূপেন নিজেও জানে, দশ বিশ হাজার টাকা তার মালিকের কাছে নেহাতই হাতের ময়লা। আবার এও জানে, সে কাজে না গেলে, সময়ে কাস্টমারকে সাপ্লাই দিতে না পারলে, মালিকের অনেক অর্ডারই হাতছাড়া হয়ে যাবে। ভূপেন ভেতরে ভেতরে একটু নরম হয়ে, মনে মনে ভাবে, এই মালিক জীবনবাবুই তো একদিন তাকে নিজে হাতে ধরে কাজ শিখিয়েছে, একেবারে হাতেকলমে ; এমন বিপদের দিনে না গেলে বড় পাপ হবে।
     মালিকের বাড়িয়ে দেওয়া টাকাটা হস্তগত করে ভূপেন বলে, "চিন্তা করবেন না। কাল থেকে কাজে যাব।"


     মালিক চলে যাবার পর মালতী জানতে চাইল, "কত?"
     চকিতে ভূপেন বুঝে যায়, এক্ষুনি চাইবে।ভূপেনের সংক্ষিপ্ত জবাব, "দশ।"


     জীবনকে নিয়ে এত ঘেন্নাধরা ভাবনা, মালিকের প্রতি রাগ.... এই সব একটেরে ভাবনা থেকে সরে এসে ভূপেন ভাবল, সবকিছু খারাপ নয়। বিপদের দিনে হাত বাড়িয়ে দেবার মত মানুষ এখনো আছে।


     রাত হয়েছে। কাল কাজে যাবে। একটু তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়া দরকার। কিন্তু ঘুম আসছে না। মনটা বেশ খুশি খুশি লাগছে।
     রাতের খাওয়া সেরে বারান্দায় বসে একটা বিড়ি ধরাল। একা একাই বসে থাকল অনেকক্ষন। মালতী শুয়ে পড়েছে। ভূপেন দেখল আকাশে চাঁদ উঠেছে। বেশ বড়সড়। জানলার পাশে বাতাবি লেবুর গাছের আড়াল দিয়ে দেখা যাচ্ছে। চাঁদের আলো এসে পড়েছে মালতীর মুখের ওপর। বড় মায়াবী লাগছে চারপাশ। মালতীকে সেই আগের মতই সুন্দর লাগছে।

     কিছুতেই ঘুম আসছে না তার। হাতের কাছেই রেডিও। লো ভল্যুমে এফ এম চালু করল ভূপেন। মান্না দে-র গান বাজছে : " ওই দুটি হাত যেমন আমায় টেনে নিয়ে যায় মরণে, তেমনি আবার ও হাত ধরেই ফিরে আসি আমি জীবনে...."