সাম্প্রতিক

6/recent/ticker-posts

দেবযানী বসু





৯.৫ লক্ষ কি.মি. প্রিয়তার মানুষ 



উত্তরমেঘের সময়। সারা শরীরে ইমনকল‍্যান মাখা ওস্তাদজি। কাঠের সাঁকো। কাঠের বাড়ি। চাকরি সূত্রে বাবা মা ও  উচ্চমাধ‍্যমিক দেওয়া আমাকে নিয়ে  এসেছেন বসন্তবাহারের দেশে।
মেঘনৌকো আর সূর্যাস্ত শিকারি শিকারা। 

'
জ্বলতে হ‍্যাঁয় জিসকে লিয়ে তেরে আঁখোকে দিয়ে' কাঁপা কাঁপা আঙুলে ওস্তাদজির গায়ে বসা প্রজাপতি ওড়াই। ভাগ‍্যিস আমি রবিঠাকুরের দেশের লোক।দেশোয়ালি মেঘপ্রিয়া।হেঁটে যাচ্ছো খালিপায়ে। গোড়ালির দুধরক্তিম রঙ কাঠকাগজের মেঝেতে ছাপ ফেলছে। শ‍্যাওলারঙা বুশশার্টে ওল্ড স্পাইস বিশৃঙ্খলা।

দুচার শিশি লাইকোপোডিয়ামের বিবৃতি স্বচ্ছ জলরঙের স্মৃতিতে। কিশোরি চোখে ঘি-সাদা পাঞ্জাবির দেবনাগরী হরফ। হাউসবোটের দোতালায় সংসার আঁকিবুঁকি কাটছে পাম্পিং স্টোভে। মোবাইলের আগের যুগ। খাঁটি প্রেমের যুগ। ফ্রেডারিক। সাদা দাঁড়ি কাঁচা পাকা চুল। কটা চোখ আর ফ‍্যাটফেটে ত্বক। বিস্ময়। বিস্ময়তর। বিস্ময়তম।
 
জাফরানি গন্ধের প্রেমালিকা রান্না বান্না। বেবি! বেবি! ডাক । আমার চান্দেরি ফুজি শিফন ভাঁজ করে গুছিয়ে দিলে। গুটেন মর্গেন।নিকট মরগেন। এরকম দুয়েকটা ছাড়া কিছুই মনে নেই।
তোমার কাঁচা পাকা গোঁফে খুব দুষ্টুমি। ভেড়ার মাংসের  স্ট‍্যু তুমি রাঁধবে আমরা খাবো। পাতি ভেতো ও ভিতু বাঙালি আমি তোমার সেতারের পাশে বিড়ালের মতো বসে থাকি। ভাঙা ইংরেজির সাঁকো দুলে ওঠে। ক‍্যাপসিকামের লাল সবুজ গঙ্গাযমুনা সুবাস। স্যালাড তৈরিটা তোমার হাতেই ছেড়ে দিয়েছি আমরা। আপেল সিদ্ধ আর ভোদকা মিশ্রিত লাল চেরির  আদুরে চেয়ে থাকা স্যালাড !! আমার অনভিজ্ঞ আঙুলে ছুরি বসে যায়। সেদিন সারাদিন শুধু ব‍্যান্ডেজ আর নটস বাঁধার পালা। শেখাতে শেখাতে মেঘ পাতলা করে দিয়েছো যাতে বৃষ্টি পশলা পশলা...

লেট মি নো ইয়োর স্পাইসেজ। মশলার উদারতা খুন্তি ও আগুনের সম্পর্ক নিয়ে খেলা  করে।আঙ্কেল ফ্রেডারিক। আমাদের মধ্যে রয়ে যায় একটা অসম্ভবের আকাশ। শুধু বর্ষা ধোওয়া লিলি ফোটাতে থাকে। লিলি ফুটে ওঠে তোমার ফর্সা ঢ্যাঙা আঙুলে।

নিলোফার তোমাকে খাবার দিতে আসত মাঝে মাঝে। মাত্র একশ টাকা কেজির ভেড়ার মাংস। পোরসিলিনের বাটিতে কাশ্মীরি ফুল আঁকা। বলেছিলে এইসব ফুলের পায়ে তুমি দরবারি কানাড়ার ঘুঙুর বেঁধে দেবে। নীলোফারকে আমি হিংসে করতাম। ও তোমার সঙ্গে অনেক গল্প করতো যার মানে আমি বুঝতাম না। পরে বাবা বলেছিল ওটা নাকি পুস্ত ভাষা। আমি নীলোফার হয়ে যেতে চাইতাম।
প্রথম দিন যে লম্বা সাত ফিটের চেহারা নিয়ে কাঠের সাঁকোটা পার করতে কোলে তুলে নিয়েছিলে, তখন থেকেই আমি ছোট্ট নদীটি পটে আঁকা ছবিটি।

সেই যে দুপুরে তোমার বুড়ো হাড়ে  তালবেতাল ভর করলো আর আমরা হৈ হৈ করে ডাল লেকে নৌকো নিয়ে নেমে পড়লাম সব্জি কেনার উদ্দেশ্যে। তোমার হাতে দাঁড়টা গ্ৰিকবীরের বর্শা লাগছিল। ডাললেকের লাল সাদা লিলির শীতল মালা আমার গলায়। নীলোফারের বরং তোমাকে হাশিশ যোগান দিত। আমি জানতাম সাধারণ চুরুট। পরে বাবা আমাকে বলেছিল। 

নৌকোর মালিকের দুই ছেলে ইউসুফ আর ইসমাইল লাইট হাউস চালায়। ওদের কাছে আমরা দেবলোকের মানুষ। আসলে দেবতার মতো সুন্দর দেখতে ওরা নিরক্ষর। জৌলুস হীন। ওদের কাজ ছিল হাউসবোটের খদ্দের জোগাড় করা। রোজ সকালে উঠে শ্রীনগর বাসস্ট্যান্ডে চলে যাওয়া। আর ওদের বৌরা আবাসিকদের জন্য খাবার রান্না করে।

আমার দরজায় রোজ বিনম্র অনুরোধ লাগে ক‍্যান আই হ‍্যাভ আ কাপ অব কফি। আঠারোর উড়নচণ্ডী। এক স্বর্গ থেকে ছুটি অন‍্য স্বর্গে। উড়ে যাই সাদা ফেনা সাদা বালি খয়েরি ছোপের সাদা ঘোড়ার দেশে। মা তাড়া দেয়। ভ্রূকুটি করে। আড়াল থেকে দেখে।আমুদে ফ্রেডারিক মাকে ইশারায় আশ্বাস দেয় আর চওড়া হাসি ঝরে পড়ে। মা পুরোদস্তুর ঘোমটা টানা মহিলা। যদিও হিন্দি ভালো বলতে পারে। একটি হিন্দি বিদ্যালয়ে দিদিমনি ছিল বিয়ের আগে। 

অনন্তনাগে এক হিন্দু ব্রাহ্মণ গুরুজির কাছে সেতার শিখতে যায় শনিরবিবার।নৌকো বাড়িতে এখানকার চেনা গুরুভাইরা আসে মাঝে মাঝে। সন্ধ্যায় হুয়িস্কি রোজ। বাবাও সঙ্গ দেয়।

তোমার দেওয়া চকোলেটে চকোলেটে স্নোহোয়াইট হয়ে যাই। গ্ৰিমভাইদের দেশের লোক।দশ বছর হল বৌ মারা গেছে। বৌ কোলকাতার অ‍্যাংলো।বাংলা জানতো। ছেলে আছে একটা বছর ত্রিশের।
জলজ চাঁদ নামে স্বপ্ন ফোটানো কাঠতক্তার বাড়িতে। মরাল মরালী সাক্ষী রেখে জৌনপুরী আসে। আসে মারুবেহাগ। রাসায়নিক বিক্রিয়া চলে। চুম্বনের সাক্ষীরা সি শার্প এর পঞ্চম ধরে চেঁচায়।আর ঘুমিয়ে পড়ে। 
যব দীপ জ্বলে আনা
যব শাম ঢলে আনা
লতাকন্ঠী আমি। মজে থাকি অবকে না শাওন বরষের রাখিপ্রিয়তায়। বেবি! এখানে চারমাস ধরে শোলে চলছে। দেখতে যাবে? না এসো তোমাকে সাউন্ড অব মিউজিকের গল্প বলব। ম্যান্ডেভিলা গার্ডেন এর গল্প বলব।

মৌরিমঙ্গল হাওয়া। ভ‍্যানহুসেন থেকে বেরিয়ে আসছে স্বপ্নের রাজকুমার পাড়াতুতো প্রেমিকটি তাকে ফিরিয়ে দিচ্ছি। মাত্র পনের দিন স্মৃতির জন্য কমব্যাট বুকে ঢুকে আছে।
পাতাঝরা কম্বল গায়ে শ্রীনগর। মজে যাচ্ছি মেয়েদের ডট ভালোবাসা কাপ্তানে। পাঠানকোট পোশাকে।গুলবাগের জোহরাজাবি। গল্ফমাঠের শান্তশ্রী তোমার কপালে। বিকেলের চিনারকলি রোদ। 
পহেলগাও ঘুরে এসে মুচকিহাসির ঠোঁটে শুনলাম আই মিস ইউ। বিকট মুখ ভেঙালাম। আমার লাল শালোয়ার কামিজ পরা কাশ্মীরি নারী সাজা ফোটো এক কপি চেয়ে নিল।কে আছে জানো তো এই খামের মধ্যে? কে আবার আমি! না না, আছে একটা ম্যাকাভিটি। সেটা কে? আগে আমার সেতার আর গিটার দুটোই পরিস্কার করে বক্সে ঢুকিয়ে দাও তারপর বলছি। বাধ্য মেয়ের মতো তা করতে গিয়ে যেই উঠে দাঁড়িয়েছি চেয়ার থেকে চোখে পড়ল চেয়ারে রক্তের দাগ!! আমার হিসেবমতো তিনদিন দেরি ছিল তো। খুব অপ্রস্তুত আমি। 

ওয়েট আই অ্যাম কামিং বলে দৌড়ে নিজের ঘরে এলাম। নিজেকে সেবা দিলাম। মাকে  বলতেই মা হাউমাউ করে গাল দিল কয়েকটি। ফ্রেডরিকের ঘরে এসে দেখি ও পরিষ্কার করে নিয়েছে। তাই দেখে আবার আমি দৌড়ে নিজের ঘরে চলে এলাম।

ঘরে ফেরার দিন আসে। সিনেমা ডিস্ট্রিবিউটর বাবাকে করমর্দন করতে করতে বলে আই লাভ ইন্ডিয়ানস।আর আমার লতাকন্ঠ সিডিতে রেকর্ড করে নেয়।গাও রবীন্দসঙ্গীত গাও।অতএব গলার শিরা ফুলিয়ে গাইলাম যে ধ্রুবপদ দিয়েছ বাঁধি আর মন মোর মেঘের সঙ্গী। নেশারু মজলিসি নীলোফার আর ওর বর রফিক এসে জুটত গানের সময়। একটা মাটির কলসি বাজিয়ে গান করত। একবার নেশার ঝোঁকে বাজাতে বাজাতে ওর আঙুল ফেটে রক্ত বের হয়ে গেছিল।

দেওদার গাছে নীল পাইনের আকুলতায় জ্বর নামার আগে ঘরে নদী ঢোকে। আমার ফ‍্যাদমহীন জমিতে লেগে থাকে ৯.৫ আলোকবর্ষ অতীত। শীত জমিয়ে পড়ার আগে তুমিও ভিসা পাখা মেলবে ওগো জাস্ট প্রিয় মানুষ।তুমিই আমার ঘরে ওয়ান বেলো জার্মান রিড এর হারমোনিয়াম।


দেবযানী বসু