অজানা বাড়ি
অজানা প্রেমিকের মতোই এক অজানা বাড়ির ছবি চোখের তারায় ভাসে l সে বাড়ি শিশুবেলার যাপনের সেই কোম্পানির বাগানের পাশের জোনাকগলির বাড়িখানা নয়, অথবা সেই মস্ত তিনমহলা মামার বাড়ির কোনো ঘরও নয় l এ বাড়ি খুব অন্যরকম l শুধু মনে মনে ওই বাড়িতে বসবাস করি l
কত শীতের দুপুরবেলাতে রোদের ওমে পিঠ দিয়ে বসে "ভাবা প্র্যাক্টিস" করি, কত বৃষ্টি দিনে ‘শিশু’র কবিতা পড়ি বাইরের ঝুপঝুপ শুনতে শুনতে l এমন করে সেই বাড়িখানা কখন দোসর হয়ে ওঠে l এক চিলতে বারান্দা আর তার কোলে একখানি ঘর l সঙ্গে কলঘর আর রান্নাঘর, ব্যাস এইটুকুই
বাড়ির পরিধি l তবু কি এক আবেগমথিত ভালোবাসা বাড়িটির প্রতি l এ বাড়ি তোমার নিজের, এই বাড়িতে কেউ বলে উঠবে না, যাও বেরিয়ে যাও, আর কোনোদিন এখানে এস না, এক্ষনি দূর হয়ে যাও l এ বাড়ি তোমার নয় l
কারণ, এ বাড়ি তোমার মনসিজ l
আসলে মেয়েদের যদি একটা নিজস্ব বাড়ি বা ঘর থাকে আর রোজগার থাকে, তাহলে সে ভয়ঙ্কর রকমের শক্তিময়ী হয়ে ওঠে, এ আমি বিশ্বাস করি l মেয়েবেলা থেকে সে তার বাপ্ ভাইয়ের আশ্রয়ে লালিত ঘরখানি ছেড়ে যেদিন শ্বশুরঘরে এসে ওঠে, সে মনে করে, ওই রে, এইবার বুঝি একটা মনের মতো বাড়ি পেলুম l এ ঘর, এ উঠোন, এ চৌহদ্দি, এ আঙিনা,
এ রান্নাঘর, এ ভাঁড়ার ঘর - এ সব আমার আমার আমার l বড়ো ভুল ভাবে সে l মেয়েকে এক ফোঁটা জায়গা ছেড়ে দিতে কেউ রাজি নয় l সে বাড়ির মেয়েরাও নয় l তাই বোকা মেয়েটা আমার ঠাক্মার মতো ভাঁড়ার ঘরটিকেই নিজেরটুকু ভেবে নিয়ে, কোনও মেঘ করে আসা শ্রাবণী দুপুরে গুনগুনিয়ে এক-বুকআছাড়ি কান্না কাঁদতে বসে l ওই একটুকু একচিলতে অবসর তাঁর কাঁদার, হাসার, লেখার, গুনগুন করার শ্রয়ণ l এইটুকু পরিসর তার অনেক পরিশ্রমে, রক্তক্ষরণে, হাসিকান্নার বিনিময়ে অর্জিত l ঠিক যেমন তার মায়ের বাড়িতেও সেই "ছাদের পাশের তুলসীগাছের টব আছে যেইখানে" সেখানে অস্থায়ী এক ঘর গেরস্থালি পেতে সে বসেছিল l ধুলিখেলা সে সব, ধুলিখেলা এও, এই সত্যিকারের
ঘর সংসার খেলা l কবে খেলুড়িরা বিদায় নেয়, কবে পাততাড়ি গুটিয়ে সেও চলে যায় সব ছেড়ে!
তা হোক l তবু কিছু কথা বলতেই হয় l
ভার্জিনিয়া উল্ফ খুব প্রিয় লেখক আমার l কারণ, স্পষ্ট উচ্চারণে তিনি বড়ো স্পর্ধার কথা বলেন সতত l ফিক্শন লিখতে হলে একটি ঘর আর কিছু টাকাকড়ি থাকতেই হবে l এ কথা আমি বিশ্বাস করি l খালি পেটে যেমন ধর্ম হয় না, এও তো তাই l তাই মনে মনে স্বপ্নের বাড়িকে সাজাতে বসি l
কখনও দোর জানালায় ঝিলিমিলি একটু পর্দা লাগাই, কখনও বেলি জুঁইয়ের চারা লাগাই ওই এক চিলতে ঝুলন্ত বারান্দায় l ঠাকুর, মায়ের আসন করা হয়েছে আগেই, হুঁ, তারই নিচে একটু তিলক মাটি দিয়ে এঁকে দিয়েছি ফোক আর্টের আল্পনা l পোষ্য
সারমেয়টির মতোই আর এক লক্ষ্মী ছেলে, সুদর্শন পেচক বসে আছে এইখানেই কোথাও l মাঝে মধ্যে রাতের প্রহর জানান দিয়ে ডেকে ওঠে হুট্ হুট্ হুট্ হুট্ হুট্ l কাল ভোর ভোর পুত্র ও বধূমাতার দুই আনন্দমূরতি এসে দাঁড়াবে দরজায়, রাগ বিলাহারি- অহির ভৈরোঁর যুগল বন্দিশে, সেই পরম পাওয়া l আনন্দ আয়োজন l বিছানায় মধুবনী চাদর, দু একটি
বসবার মোড়া, শীতলপাটি ইতস্তত l
ওই শীতলপাটি বিছিয়ে গ্রীষ্মের দিনে শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঐতিহাসিক সমগ্র পড়তে যে সুখ …. সমস্ত বাড়িটাতে আড়ম্বরহীন টেরাকোটা, আর বেতের সামগ্রী, কিছু পুরোনো কাঁসা পেতলের তৈজসপত্র, কিছু কড়ির পর্দা, ঠুনঠুন করে বাতাসে বেজে ওঠা l এই বাড়িতে গরম ধোয়াঁ ওঠা ফ্যান
ভাত আর সব্জী সেদ্ধ মিলতে পারে, যখন তখন এলেও l শেষ পাতে একটু ঘরে পাতা দই আর মুখ ধুয়ে বাটা ভরা পান গাল পুরে খেতে পাওয়ার যে তার, তার তুলনা নেই l বাবার পুরোনো গ্রামোফোনে ধীরলয়ে বাজছে, "মম মধুর মিনতি শোনো ঘনশ্যাম গিরিধারী, কৃষ্ণ মুরারী, আনন্দ ব্রজে তবে সাথে মুরারী ..." গায়ক শ্রী অনুপ ঘোষাল, ৪৫ আর পি এম l
রাত বাড়ে l খুব তন্নিষ্ঠ, তদ্গত হয়ে থাকলে শোনা যাবে অনাহত ধ্বনি, প্রণব মন্ত্র l এই বাড়ির প্রতিটি শিরায় উপশিরায়, কোষে কোষে, ধ্বক ধ্বক করে প্রকট হয়ে উঠেছে যে বাণী, আনন্দই তার প্রধানতম অনুরণন l
অপর্ণা গাঙ্গুলী

.jpg)

0 মন্তব্যসমূহ