সাম্প্রতিক

6/recent/ticker-posts

প্রদীপ চক্রবর্তী : প্রবন্ধ:" হেনরি চার্লস বুকোওস্কি ' র লেখালিখি ও আমাদের অন্ধকারের মুখোশ "

 



" হেনরি চার্লস বুকোওস্কি ' র লেখালিখি ও আমাদের অন্ধকারের মুখোশ "


 

এক.

 

এই ভরাশ্রাবণের সন্ধ্যায়, যখন কালো নিবিড় পাথুরে স্লেটের ওপরে মেঘের চঞ্চল ভ্রমণশীল বিদ্যুৎগুলো আঁচড়ে পড়ছে আর তার লীলাবাসনায় মত্ত নখরের দাগ কেটে দিচ্ছে যৌনআনন্দে অনাবিল ক্রিয়াশীল নারীর দেহের প্রতিটি বিভঙ্গ। এই নারী যেন রমণীয় বৃষ্টি। অথৈ এর ভোগের প্রাচুর্য। অশেষ এর বাসনা - বিলাস! এই দাগ এই আনন্দ এই বাসনা এই দেহের সামগ্রিক সুখের অন্তহীন শীত্কার ছড়িয়ে পড়ছে অদূরবর্তী এক নিষিদ্ধ পানশালায়। পানশালায় বসে এক অতৃপ্ত উদাসী মাঝবয়সী বদরাগী চঞ্চল মানুষ। গ্লাসে থিতিয়ে আছে  স্প্যাটবুর্গান্ডার (Spätburgunder) (পিনোট নোয়ার) জাতীয় রেড ওয়াইন। মানুষটির দৃষ্টি সামনে প্রসারিত , কিছুটা সুদূরপরাহত - তীক্ষ্ণ। বেপরোয়া এই মানুষটি ভালবাসেন শ্রমজীবী মানুষ আর বেশ্যার সঙ্গ। ভাণ ভণিতাহীন। স্পষ্ট বক্তা। আপোষহীন এবং অনেকের কাছে বস্তুত অসহনীয়। তবুও তাঁর কলম জ্বলে ওঠে প্রতিবাদী সত্যে। যখন তিনি লেখেন এরকম কবিতা ---

 

"এক আহত নীলাভ পাখি আছে আমার বুকের ভেতরে/সে প্রকাশ্যে আসতে চায়/অথচ, অতটাও নরম নই আমি/তাকে শাসাই- খবরদার, কেউ যেন কখনও তোমার কথা জানতে না পারে/এক আহত নীলাভ পাখি/ছটফট করে/আমার বুকের ভেতর থেকে বের হতে চায়/আমি তাকে চুবিয়ে রাখি মদের ভেতর/ধূমপান করে দমবন্ধ করে রাখি/বেশ্যারা, বারটেন্ডাররা, মুদি দোকানের লোকগুলো/তার কথা কিছুই জানে না/পাখিটিকে শাসাই আমি/অহেতুক ঝামেলা কোরো না/কাজগুলো তুমি নষ্ট করতে চাও?/তুমি কি চাও ইউরোপে আমার একটিও বই আর বিক্রি না হোক?/এক আহত নীলাভ পাখি/শুধুই বের হয়ে আসতে চায়/আমি ধূর্ত , মাঝে মাঝে রাতের বেলায় তাকে বের করে আনি/যখন ঘুমিয়ে পড়ে সকলে/তাকে সান্ত্বনা দিই/বলি- জানি তুমি আছো, তাই আমি আছি/তারপর বুকের খাঁচার ভেতর তাকে ঢুকিয়ে নিই আবারও/ঘুমের ভেতর তাকে অল্প অল্প গান গাইতে শুনি/তাকে পুরোপুরি মেরে ফেলতে চাইনি কখনওই/ঘুমোই, পরস্পরকে বিশ্বাস করে, গভীরতর ঘুম/বিশ্বাস, মাঝে মাঝে মানুষকে কাঁদাতে পারে/অথচ/কান্নার কেউ নই আমি?/তুমি? "

( আহত নীলাভ পাখি)

 

আসলে, হেনরি চার্লস বুকোওস্কি ' র সঙ্গে আমার সরাসরি পরিচয় খুব বেশি দিনের নয়।বছর তিনেকের। যদিও আমার অগ্রজ  সাহিত্য শিক্ষাগুরু প্রণম্য বারীন ঘোষাল, প্রিয় বারীন দার মাধ্যমে ওনার কিছু কবিতা পড়ি। এবং বারীন দা দীর্ঘ আলোচনা ক'রে এক নীরব ইন্ধন জুগিয়েছিলেন আমার মনে। এরপর বছরের পর বছর কেটে যায়। কয়েক বছর আগে কিছু বাংলায় লেখা বুকোওস্কির ওপর প্রবন্ধ আমার সেই বহু বছর আগের নিহিত আগুনকে ফের দপ করে জাগিয়ে দেয়। বাংলা ও ইংরেজিতে বেশ কিছু কবিতা,কয়েকটি ছোট ছোট গল্প। শেষে ইংরেজিতে একটি উপন্যাস। পড়তে পড়তে ধীরে ধীরে মানুষটার বিষয়ে কৌতূহলী হই।  যেখান থেকে যতটুকু পাই সেখান থেকেই ওনার সম্পর্কে তথ্য অনুসন্ধান করতে থাকি। আমি চিরকালই এমন একজন কবি গল্পকার ঔপন্যাসিক বা চলচ্চিত্রের পরিচালক, শিল্পী, গায়ক,যার কোনোও কাজ আমার একান্ত বোধ ও অনুভূতিকে সমার্থবোধক সঙ্গ দিয়েছে বা বলা চলে যেখানে আমি আমার ভাললাগা বা নিজস্ব অনুভূতির রসদ খুঁজে পেয়েছি , বিশেষ করে এমন কোনোও মানুষ, যার আত্মায় একান্ত  আমি ' র একটি নিজস্ব কুটির আছে। একজন গোপন স্রষ্টার দ্বিতীয় জগৎ, যার খোঁজ কখনো সে কাউকে দিতে চায় না। যে আত্মপ্রেমী এবং নিজের সঙ্গে প্রতি মুহূর্তে কথা বলে। প্রয়োজনে যে নিজেকে শাসায়, ধমকায়, গালিগালাজ করে, আবার ভালবাসে, যখন গোটা পৃথিবী তার বিরুদ্ধে এককাট্টা হয়ে যায়, তখন আলতো হাতে নিজের পিঠ নিজেই চাপড়ে দিয়ে, সম্পূর্ণভাবে নিজের সত্যের পাশে যে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে দাঁড়ায়। এমন গোপন স্রষ্টা, যে জানে যতই গল্প উপন্যাস প্রবন্ধ কবিতা ডায়রি লিখি না কেন, সারাজীবন যতোই কথা উগরে দিই অন্যের কাছে,তারপরেও নিজেকে প্রতিমুহূর্তে এক্সপ্লোর করতে করতে যে আমি ' র মুখোমুখি হই, সেই আমিকে ধারাবাহিক ভাবে বলা বা তুলে ধরা সম্ভব নয়। যে স্রষ্টা বিশ্বাস করেন, যা লিখি, তার কিছুটা আপাত সত্য, কিছুটা গভীর কল্পনা ও বোধের মিথস্ক্রিয়া, আর কিছুটা বানানো।  সব মিলিয়ে যাবতীয় সৃষ্টি নান্দনিক এবং ভাষার দিক দিয়ে বুদ্ধিদীপ্ত অভিনব স্বয়ংক্রিয় সূক্ষ্ম সংবেদীএবংপ্রয়োগগুণে অব্যর্থ। কিন্তু তার পরেও সেই লেখা পাঠকপ্রিয়তা অর্জন করার পরেও, পুরস্কৃত হবার পরেও এমনকি কালোত্তীর্ণ হলেও, যে আমির দ্বিতীয় পৃথিবীতে সৃষ্টিশীল মানুষটার বসত, তার কথা কিছুই বলা যায় না। সে ক্ষতবিক্ষত সর্বত্র, সভ্যতার ভন্ডামিতে বীতশ্রদ্ধ এবং নির্জনে যে তীব্র চিৎকার করে, নিজের ব্যর্থ জীবনকে নিয়ে নিজের কাছেই প্রতিবাদী।ভাবুক ও সৃষ্টিশীল মানুষ তাই শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একা। কেবল একা একা আর একা। নিঃসঙ্গ, নির্বিকার নির্জনতাপ্রিয়, দুরূহ দুর্বোধ্য, এবং সবার কাছেই শেষ পর্যন্ত বিরক্তিকর একঘেয়ে পরিত্যক্ত এক যৎসামান্য অবহেলিত অপ্রিয় সাধারণের চেয়েও অতিসাধারণ একজন জনৈক মানুষ মাত্র। এই আমির ভেতরেই তিমিরঘন অন্ধকারে যাত্রা শুরু করে, এভাবেই নিজের মতো নিজেকে আবিষ্কার করতে করতে যাওয়া এই মানুষটিই  আমার প্রিয়। কবি সাহিত্যিক প্রাবন্ধিক কখনোই সেলেব নন। তিনি কখনোই আবৃত্তিকার অভিনেতা রাজনৈতিক নেতা বা ফিল্ম ডিরেক্টর নন। জনারণ্যের অসংখ্য ঢেউয়ের ভেতর আত্মঘাত মূলক বুদ্বুদ হয়ে প্রদোষের মায়াবী মুকুরে বিক্ষত গলিত নোংরা পচা অবক্ষয়িত জমে থাকা থিকথিকে পোকাদের রাজত্বে তিনি স্পষ্ট করেন মুখোশের বিনির্মিত মুখের অসংখ্য কাটাকুটিগুলোকে। তাই তিনি হাইড করেন নিজেকে,আপাত  অন্তঃসারশূন্য ক্লান্ত শুকরের বাহ্যিক অহংকৃত চিৎকারগুলো থেকে। তাঁর কাজগুলো কেবল তাদের জন্য, যারা সমূহভাবে আগামী দিনের অচলায়তনিক বিষাক্ত মেধাগুলোকে চিহ্নিত

কোরে মানবিক সভ্যতার গড়পড়তা মূল্যায়ন থেকে নিজেকে উত্তরিত করতে পারে, এমন প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে যে , সেই নিরেট অচলায়তনও পলকা হয়ে যায় প্রকৃত চেতনঋদ্ধ গণ বিপ্লবে।

 

 

তাই তাঁর যাবতীয় সৃষ্টি, পাঠের পরেও যিনি ধরাছোঁয়ার বাইরে, খুবই সাধারণ বলেই কোথাও অসাধারণ অনন্য ও একা। এরকমই ব্যক্তিত্বদের , আমি খুঁজতে থাকি নানারকম সাক্ষাৎকারে, জীবনীতে। আসলে আমি পৌঁছে যেতে চাই সেই মানুষটির একান্ত ' আমি ' ' রসায়নে। সুদূরপ্রসারীত সেই মানুষটাকে বোঝার চেষ্টা করি, তার ভাবনারউৎসে পৌঁছতে চাই এবং ছটফট করি যতক্ষণ না নিজের ভাবনার সহায়ক রসদ খুঁজে না পাই।

 

জীবন মহামূল্যবান। সময় দ্রুত ফুরোয়। জীবনের এই মাঝবয়সে এসে আমি পড়ার ব্যাপারে অত্যন্ত খুঁতখুঁতে ও আমার কাছে তাঁর প্রাসঙ্গিকতা যতক্ষণ না গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, ততক্ষণ তিনি যতই বিপুল পাঠকের কাছে গ্রহণযোগ্য হন বা তাঁর লেখা যতই ধ্রুপদী বা অসামান্য হোক, আমার তাতে কিছু যায় আসে না। এ ব্যাপারে আমার ভাবনার বিপ্রতীপ ভাবনা থাকবেই। সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু একসময়ে গোগ্রাসে বাচ্চা পাখির মতো যে কোনোও পাঠ আমাকে অতৃপ্ত রাখতো। খিদে ছিলো অস্বাভাবিক। তখন পড়েছি সাধ্যমতো, ভেবেছি কম, অনুভবের স্তর থেকে উপলব্ধির  স্তরে পৌঁছনো কাকে বলে তার মানসিক চর্চা ছিলো না। অভিজ্ঞতা এখনকার চেয়ে অনেক কম। কিন্তু দিনে দিনে বুঝেছি, এ বিপুলা পৃথিবীর ভাড়ার থেকে দু এক দানা শস্য কুড়ানোর জন্য একটি জন্মের বোধি যথেষ্ট নয়। এবং সেটা বুঝতেই চলে গ্যাছে জীবনের অনেকটা। কেউ বোঝানোর ছিলো না। খুঁটে খেয়েছি তাই। আসলে জ্ঞানের বিস্তার ও প্রকাশের পথ বহুস্তরীয়। কোনোও ব্যক্তিত্বের কোনোও একটি গ্রন্থ পাঠ করা মানেই তাঁর অভিজ্ঞতার সঙ্গে একাকার হয়ে যাওয়া। সেই অভিজ্ঞতা বা ভাবনা আসলে আমার যাপন এবং ভাবনার সঙ্গে সমধর্মী নাও হতে পারে, সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই ভাবনা যদি আমাকে আনন্দিত/ উদ্বুদ্ধ/ শান্তি/ উপভোগ/ তাড়িত/ স্বপ্নদর্শী/ সমধর্মী ভাবনার সাপেক্ষে বা ভাবনাকে চ্যালেঞ্জ করে আমাকে অন্য ভাবনায় ঐন্দ্রজালিক সম্মোহনে আবিষ্ট করে, উত্তরিত না করতে পারে, অর্থাৎ , আমাকে আমার মনের চাহিদা, ইচ্ছে, অভিজ্ঞতা বা ভাবনাকে আমার মতো করে বাহিত করতে না পারে, তাহলে তা পড়ে আমি সময় নষ্ট করতে চাই না।  এই যে আমি প্রদীপ চক্রবর্তী, প্রায় মধ্য পঞ্চাশে এসে আজও আমাকেই আমি  বারংবার প্রশ্ন করে করে অশান্তঘূর্ণীতে জর্জরিত করি। লিখি , ভাবি, যার বই কিছু থাকলেও, গদ্য/ কবিতার, তার পাঠক নিতান্তই অল্প। কারণ সে নিজেকে অনেকের কাছে পৌঁছে দিতে ব্যর্থ,অনেকের মতোই। যেখানে নিজেকে নিংড়ে, প্রতিদিন, বাহ্যিক কোনো প্রাপ্তি ছাড়াই কেবল মনের অনুধ্যানে নিজের ভাবনার অপর যাত্রপথকে চিহ্নিত করতে করতে যাওয়ার যে বিষাদিত আনন্দ, সেই সৎ আনন্দটুকুই বহন করে অসংখ্য অনেকের আমি'দের সমূহ সত্তা। একটা মাত্র জীবনে জীবনের কাছে এই মূল্যবান মানসিক প্রাপ্তি ও চলনকে আবিষ্কার করাই মনে হয়, মানুষের, বিশেষ করে ভাবুক মানুষের চূড়ান্ত প্রাপ্তি।

 

 

নয়ের দশকের মাঝামাঝি থেকে যে আমি কবিতা গদ্য ইত্যাদি লেখার প্রয়াসী, তার কাছে কিছু হবার স্টেক নেই। নেই আক্ষরিক অর্থেই নিজস্ব ভাবনাপ্রসূত শব্দগুলোকে নিয়ে কোনোও প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি পাওয়ার বাসনা। চূড়ান্ত অখ্যাত থাকার একটা শারীরিক মানসিক আনন্দ থাকে। থাকে দুদিনের পৃথিবীতে চলার মুসাফিরানা। অপ্রচারিত একজন, যদি সে কিছু লেখে, তার হয়তো দু পাঁচজন পাঠক থাকতেও পারে। সেটা মান্যতা দেওয়া যায়, কিন্তু প্রচুর মানুষ তার লেখা পড়ে অভিভূত হবে, তার লেখাকে মনের মণিকোঠায় স্থান দেবে, এই ভাবনাটা যেমন সন্দেহজনক তেমনই নিকৃষ্ট ভোগীর!

 

যাইহোক এতো কিছু বলার উদ্দেশ্যই হলো এই যে চার্লস বুকোওস্কি আমাকে মজিয়েছে।  আমার উপরে নির্বাচিত স্রষ্টার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে মানসিক ভাবে অনেক মিল। এক ভাবনার কৌণিক বিন্দুগুলো লাল নীল হলদে সবুজ হরেকরকম ট্র্যাফিক সিগন্যাল দিতে দিতে অন্তহীন এক পথের উত্তেজক দিশা দেখিয়েছে। এই শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব আমার মনের মতো বেড়ে পাগল। আপোষহীন ভন্ডামিহীন পৌরুষ ও কর্কশ আচরণ আমাকে টানে। কাজগুলিতে প্রায়শই দরিদ্র আমেরিকানদের জীবন, লেখার সংগ্রাম, মদ্যপান, নারীদের সাথে খুল্লামখুল্লা সম্পর্ক এবং কঠোর কাজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়েছে। বুকোওস্কির সাহিত্যকর্ম একটি স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর এবং গভীর মানবিক সংবেদনশীলতা দ্বারা চিহ্নিত । বিংশ শতকের আধুনিক সাহিত্যাকাশে চার্লস বুকোস্কি এক জীবন্ত প্রতিবাদের নাম। গদ্য-পদ্যের জগতে অবাধ বিচরণ তাঁর। প্রচলিত বুর্জোয়া বিশ্বাস, মধ্যবিত্ত ধ্যান ধারণা এমনকি সকল রকমের প্রথাকে ছুঁড়ে ফেলাই ছিলো তাঁর ব্রত। শুধু লেখা দিয়ে নয়, জীবনচর্চা দিয়েই বুকোওস্কি বারবার সমাজকে আঘাত হেনেছেন।যাবতীয় স্বীকৃতি এবং প্রাপ্তির ভাঁড়ারকে উদাসীনতায় গুঁড়িয়ে দিয়েও ভেঙে পড়েন না যেভাবে স্বাধীনস্রষ্টা জেমস জয়েস। নাছোড়বান্দা সিলভিয়া বিচ শেষপর্যন্ত  'ইউলিসিস'কে আলোর মুখ দেখান। আমাদের তুচ্ছতাগুলো গ্লানিমুক্ত হয়। স্রষ্টার এই স্বাধীনতা, নীরক্ত হৃদপিণ্ডহীন অবয়বশূন্য কৃত্রিম দৈন্য নিঃস্বতা তাবৎ দেউলিয়াপনার বিরুদ্ধে এক প্রতিবাদহীন প্রতিবাদ।   জ্যাঁ পল সার্ত্র    ফিরিয়ে দেন নোবেল, লরকাকে খুন করা হলেও থেকে যায় তাঁর চিরকালীন স্বর। এই বদ্ধ পৃথিবীর পাগলাগারদে বন্দী সংবেদনশীল ভাবুকের একাকিত্ব কখনও যায় না। জীবনের ক্রমাগত রূপান্তর, সামাজিক সম্পর্কে অবিরাম পরিবর্তন, চিরস্থায়ী মৌল অস্থিরতা অনিশ্চয়তা বা সিন্টাক্টিক, মিথষ্ক্রিয়া, instincts, auto-eroticism, Narcissism, ego-instincts of self-preservation, ভোগবাদ- এ সব কিছুর মধ্যেই  যেতে হয় সমকালীন মানুষের ট্র্যাজিক যাপনকে। মানুষ হিসাবে বিভিন্ন অভিজ্ঞতা হ্যামার করেন  বুকোওস্কিকেও। তিনি বারংবার আক্রান্ত ক্ষতবিক্ষত হন, একইভাবে প্রত্যাঘাত করেন। বুকোওস্কি সম্পর্কে গ্যারি স্টেলা লিখেছিলেন, ‘চার্লস বুকোওস্কি ছিলেন আমেরিকার রাস্তার কবি। এক অমার্জিত, এক গোবরগনেশ, এক মেজাজখারাপ মাতাল যে কিনা নোংরা কথা বলে, নোংরা কথা লেখে আর আস্বাদন করে তার নোংরা বুড়া বদ লোকের এই ভাবমূর্তিখানি।’ (গ্যারি স্টেলা, ২ জুন ১৯৯৬, লস এঞ্জেলস টাইমস) যে গ্যারি স্টেলা একগাদা আবর্জনার ভেতর থেকে একদিন চার্লস বুকোওস্কির কিছু কবিতা পেয়েছিলেন।  অবশ্যই চার্লস বুকোওস্কির নতুন কবিতা খুঁজে পাওয়া একটি ঘটনা, অবশ্যই সেই ঘটনা সংবাদে ছাপা হওয়ার উপযুক্ত। কিন্তু সেই সংবাদের ভাষাটিই অনেক কিছু বলে দেয়। চার্লস বুকোওস্কি, কেমন মানুষ তিনি- তা শুধু তার জীবনীতে খুঁজলে হবে না। তার কবিতায়, তার সাক্ষাৎকারে, তার চালচলনে এবং এমনকি তার সম্পর্কে প্রথাবদ্ধ মানুষের ধারণার মধ্যেও চার্লস বুকোওস্কিকে খুঁজতে হয়।

 

দুই.

 

কোনোও এক বিশেষ ব্যক্তিত্বের , যদি তিনি গড়পড়তা সাধারণ এমনকি  প্রচারিত অসাধারণ কোনোও সৃজনক্ষম  ব্যক্তিত্বের চেয়ে আলাদা হন , যিনি অমরত্বের লোভকে স্রষ্টার অপমৃত্যু বলে মনে করেন , যিনি  লেখেন নিজের ভেতর দিয়ে সমাজের সেই সমস্ত নরনারীদের জন্য যারা সৎ শ্রমজীবী কখনও শোষিত কখনও প্রতিবাদী, অন্তত অদৃষ্টের অঙ্গুলিহেলনে পাপেটের মতো নাচতে নাচতে অনেকসময় প্রবল চিৎকারে কাঁদতে পারে বা প্রতিবাদে ঝুর ঝুর করে ঝরিয়ে দিতে পারে বন্ধ কারখানার মরচে পড়া লোহার তালা।  সেই সমস্ত  গণিকা বা পতিতাদের  মধুশালায়  যেসমস্ত সফিস্টিকেটেড ভণ্ড মুখোশপ্রিয় এলিটেরা রাতের অন্ধকারে যায় , অনেকসময় তাদের ভন্ডামি চুরচুর হয়ে যায়, সমাজের নিষিদ্ধ পতিতালয়ের  পতিতাদের পায়ের কাছে। এই ভন্ডামি ও মুখোশের বিরুদ্ধে প্রায় বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন  চার্লস বুকোওস্কি ।  আসলে নিজেকে এক্সপ্লোর করতে করতে যিনি নিঃশেষিত হন সভ্যতার দূষিত কালিগুলোকে মাখতে মাখতে।  আসলে যে অবস্থায় আজ এসেছি, এই মধ্যবয়সে , এখন যে কোনোও কিছু পড়ার আগ্রহ তৈরি হয়, যখন দেখি সেই বিষয় আমার চলমান বস্তু জীবন বা প্রবহমান জীবনের পাশাপাশি আমার নিহিত আমি ' র গহন ভাবনার জগৎকে সমর্থন করছে বা সেই পড়া, আমার মনন আমার অভিজ্ঞতা আমার চেতনঋদ্ধ দৃঢ় অবস্থাকে মান্যতা দিচ্ছে। আসলে পাঠ্য এবং আমি যেন একে অন্যের পূরক হয়ে উঠি । পৃথিবীতে পড়াশুনার বিস্তর বিষয়। জন্ম জন্মান্তর চলে গেলেও এই জ্ঞানের যৎসামান্য নুড়িও সম্পূর্ণ কুড়ানো অসম্ভব। তাই সেই বিষয়বস্তুর মধ্যেই আকর্ষণ অনুভব করি, যার মধ্যে আমার সমধর্মী মননকে খুঁজে পাই।

 

দেখা যাক চার্লস বুকোওস্কি - র জীবন আর কাজ নিয়ে আমার কয়েকফোঁটা অনুভূতির রূপকার হিসেবে যৎসামান্য কিছু বলা যায় কিনা। এ লেখার মধ্যে আমি কবিতা গল্প উপন্যাসের অনেক উদাহরণ তুলে ধরবো তা নয়। বা এ নিয়ে আমার বিশাল পড়াশুনো বা পাণ্ডিত্য আছে তাও নয়। যখন অন্য কোনোও ভাষার লেখকের কিছু পড়ার চেষ্টা করি, বাংলা বা ইংরেজী ভাষার আশ্রয়ে তখন আমার কিছু অনুভূতি নিয়ে কথা বলতে পারি আমি।  পাঠক নিজের মতো করে, বুকোওস্কি - র  লেখা পড়ুন এবং নিজের মতো করে উপলব্ধি করুন । ব্যতিক্রমী মহৎ লেখার গুণই হলো বহুস্তরীয় ভাবনার অবকাশ। নানারকম ভাবে তাকে এক্সপ্লোর করা, আবিষ্কার করা। আমি আমার প্রয়োজনে ও আমার ভাবনার অভিঘাতগুলো নিয়ে দু একটা কথা বলতে পারি মাত্র।

 

চার্লস বুকোওস্কি, যাঁর পুরো নাম ছিল হেনরি চার্লস বুকোওস্কি জুনিয়র, ১ আগস্ট, ১৯২০ সালে জার্মানির অ্যান্ডারনাচ শহরে জন্মগ্রহণ করেন , কেউ কেউ বলেন ১৬ই আগস্ট ওনার জন্ম তারিখ। এবং ৯ মার্চ, ১৯৯৪ সালে মৃত্যুবরণ করেন। তিনি ছিলেন একজন আমেরিকান-জার্মান লেখক, যিনি কবিতা, উপন্যাস এবং ছোট গল্প লিখেছেন। তাঁর রচনাগুলি সাধারণত রাস্তার জীবন, দরিদ্রতা, মদ্যপান, এবং যৌনতা বিষয়ক সাধারণ বিষয়গুলির উপর আলোকপাত করে। বুকোওস্কি "দ্য ল্যাটিন কোয়ার্টার" এবং "ওয়েক আপ" সহ বেশ কয়েকটি সাহিত্য পত্রিকায় লিখেছেন এবং তাঁর কাজ "হার্স্ট ম্যাগাজিন" এবং "লস অ্যাঞ্জেলেস মিস্ট্রি ম্যাগাজিন" এও প্রকাশিত হয়েছে। জার্মানিতে জন্মগ্রহণকারী বুকোওস্কিকে দুই বছর বয়সে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আনা হয়েছিল। তার বাবা দৃঢ় শৃঙ্খলায় বিশ্বাস করতেন এবং প্রায়শই ছোটখাটো অপরাধের জন্য বুকোওস্কিকে মারধর করতেন, বুকোওস্কিকে। তাঁর আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস, হ্যাম অন রাই (১৯৮২) তে বর্ণনা করেছেন , যে একজন ছোট বাচ্চা, বুকোওস্কিকে তার সমবয়সী ছেলেরা তাকে নির্যাতন করত এবং তার খারাপ গায়ের রঙের কারণে প্রায়শই মেয়েরা তাকে প্রত্যাখ্যান করত। যখন বুকোওস্কির বয়স ১৩ বছর, সিওত্তি লিখেছিলেন, তার বন্ধুদের একজন তাকে তার বাবার ওয়াইন সেলারে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন এবং তাকে প্রথম মদের পানীয় পরিবেশন করেছিলেন: 'এটা জাদু ছিল,' বুকোওস্কি পরে লিখতেন। 'কেন কেউ আমাকে বলেনি?'১৯৩৯ সালে, বুকোওস্কি লস অ্যাঞ্জেলেস সিটি কলেজে পড়া শুরু করেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরুতে পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে নিউইয়র্কে লেখক হওয়ার জন্য চলে যান। পরবর্তী কয়েক বছর লেখালেখি, ভ্রমণ এবং অসংখ্য প্রত্যাখ্যান স্লিপ সংগ্রহ করে কেটেছে। ১৯৪৬ সাল নাগাদ বুকোওস্কি তার লেখার আকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নেন, দশ বছরের এক দীর্ঘ সময় ধরে দেশজুড়ে কাটান যা তাকে নিয়ে যায় লস অ্যাঞ্জেলেসে মৃত্যুর কাছাকাছি । সেই মৃত্যুসম অভিজ্ঞতায় পৌঁছে বুকোওস্কি আবার লেখা শুরু করেন। যদিও তিনি মদ্যপান চালিয়ে যেতে থাকেন নিয়মিত এবং একজন কঠোর পরিশ্রমী কবি হিসেবে তার খ্যাতি  বাড়তে থাকে। পঁয়ত্রিশ বছর বয়স পর্যন্ত তিনি তার পেশাদার লেখালেখির জীবন শুরু করেননি এবং অন্যান্য সমসাময়িকদের মতো, ভূগর্ভস্থ সংবাদপত্রে, বিশেষ করে ওপেন সিটি এবং এলএ ফ্রি প্রেসের মতো স্থানীয় সংবাদপত্রে প্রকাশনা দিয়ে শুরু করেছিলেন। "ছোট, ভূগর্ভস্থ প্রেস এবং ক্ষণস্থায়ী মিমিওগ্রাফ করা ছোট ম্যাগাজিন দ্বারা প্রকাশিত," জে ডগার্টি কনটেম্পোরারি নভেলিস্টস-এ বর্ণনা করেছেন, “বুকোওস্কি এক অর্থে মুখের কথার মাধ্যমে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন।” “তার কবিতা এবং ছোটগল্পের প্রধান চরিত্র, যা মূলত আত্মজীবনীমূলক, সাধারণত একজন নিচু মনের লেখক (হেনরি চিনাস্কি) যিনি তার সময় কাটান প্রান্তিক চাকরিতে (এবং সেখান থেকে বরখাস্ত হন), মাতাল হন এবং একের পর এক বিম্বো এবং পতিতাদের সাথে প্রেম করেন,” সিওত্তি বলেন- অন্যথায়, তিনি সহকর্মী পরাজিতদের সাথে আড্ডা দেন বেশ্যা, দালাল, মদ্যপ, ড্রিফ্টার এদের সঙ্গে। বুকোওস্কির প্রথম কবিতার বই ফ্লাওয়ার, ফিস্ট এবং বেস্টিয়াল ওয়েল (১৯৫৯) , তার অনেক রচনা দখল করে থাকা প্রধান আগ্রহ এবং থিমগুলিকে কভার করে, বিশেষ করে একটি নির্জন, পরিত্যক্ত বিশ্বের অনুভূতি,” আরআর কাসকাডেন আউটসাইডারে উল্লেখ করেছেন, নির্জনতার পাশাপাশি, বুকোওস্কির মুক্ত শ্লোক জীবনের অযৌক্তিকতাগুলিকে মোকাবেলা করে, বিশেষ করে মৃত্যুর সাথে সম্পর্কিত। "বুকোওস্কির জগৎ, বিংশ শতাব্দীর জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতার দ্বারা সভ্য শিল্প সমাজের নৈর্ব্যক্তিক যন্ত্র দ্বারা পরিপূর্ণ এবং খাঁজকাটা, মূলত এমন একটি জগৎ যেখানে ধ্যান এবং বিশ্লেষণের খুব কমই ভূমিকা রয়েছে," জন উইলিয়াম করিংটন নর্থওয়েস্ট রিভিউতে জোর দিয়ে বলেছেন,  এই জগতের বিষয়বস্তু হল মদ্যপান, যৌনতা, জুয়া এবং সঙ্গীত; তবে বুকোওস্কির শৈলী হল "একটি স্পষ্ট, কঠোর কণ্ঠস্বর; লাইনের দৈর্ঘ্য পরিমাপ করার জন্য একটি দুর্দান্ত কান এবং চোখ; এবং রূপককে এড়িয়ে চলা যেখানে একটি প্রাণবন্ত উপাখ্যান একই নাটকীয় কাজ করবে," ভিলেজ ভয়েস-এ কেন টাকার বজায় রেখেছিলেন। "ইট ক্যাচেস মাই হার্ট ইন ইটস হ্যান্ডস (১৯৬৩) , ১৯৫৫ থেকে ১৯৬৩ সালের মধ্যে লেখা কবিতা সংগ্রহ করে। "ব্যক্তিগত কবিতা একত্রিত হয়ে এমন একটি রচনা তৈরি করে যা ধরণের দিক থেকে অতুলনীয় এবং বুকোওস্কির সমসাময়িকদের দ্বারা মানের দিক থেকে প্রায় অতুলনীয়," করিংটন বলেন। ত্রিশ বছর ধরে, বুকোওস্কি কবিতা এবং গদ্যের আশ্চর্যজনক পরিমাণ সংগ্রহ, পাশাপাশি অনেক উপন্যাসও প্রকাশ করেছেন। নিউ ইয়র্ক টাইমস বুক রিভিউতে কেনেথ রেক্স্রোথ দাবি করেছেন যে বুকোওস্কি "সাহিত্যিক নয়, বরং বাস্তব বিচ্ছিন্নতার কবিদের ছোট ছোট সান্নিধ্যে আছেন।মূলত আমেরিকার ছোট ছোট প্রকাশক এবং লিটল ম্যাগগুলোকেই লেখালিখির জন্য তিনি বিশেষ প্রাধান্য দিতেন|"

 

যদিও বুকোওস্কি ১৯৯৪ সালে লিউকেমিয়ায় মারা যান, তার মরণোত্তর কর্মজীবনও ততটাই সমৃদ্ধ প্রমাণিত হয়েছে। তার প্রকাশক, ব্ল্যাক স্প্যারো বুকসের সম্পাদক জন মার্টিনের সাথে তার অনন্য সম্পর্কের কারণে, বুকোওস্কির বিশাল রচনা প্রতি বছর বা তারও বেশি সময় ধরে বই আকারে প্রকাশিত হয়েছে, ও হচ্ছে। মরণোত্তর রচনা, যেমন দ্য পিপল লুক লাইক ফ্লাওয়ারস অ্যাট লাস্ট: নিউ পোয়েমস (২০০৮), তার প্রথম সংগ্রহের মতো বিষয়গুলিকে সম্বোধন করে। নিউ ইয়র্কারের জন্য মরণোত্তর প্রকাশিত স্লুচিং টুওয়ার্ড নির্ভানা (২০০৫) পর্যালোচনা করেন , সমালোচক অ্যাডাম কির্শ|

 

সত্যি বলতে, লোকে কী বললো সেটাকে পাত্তা দেননি বুকোওস্কি। যখন যা মন চায়, তেমন জীবন ধারণ করেছেন তিনি। জীবনের মতোই লেখালেখিতেও অকপট ছিলেন তিনি। বদ মেজাজি কিন্তু রসিক, মাতাল কিন্তু সত্য কথা বলে- এমনি সব বৈপরীত্য মিলিয়ে চার্লস বুকোওস্কি সাক্ষাৎ এক রহস্যের নাম। তিনি একদিকে যেমন নন্দিত, অন্যদিকে প্রচুর নিন্দিত। লস এঞ্জেলসে বসবাস করা এই আজব লোকটা একই সঙ্গে যেমন দারুণ আদৃত, আলোচিত এবং ভয়াবহ বিশ্রীভাবে সমালোচিতও। তার লেখা এবং চালচলন- উভয়ই ছিলো ভীষণ বিতর্কের। বহু নারীর সঙ্গে সম্পর্ক, প্রকাশ্যে মদ্য ও ধূমপান, সাহসী রচনা শৈলী, খিস্তি-খেউড়ের ব্যবহার তাকে বরাবর আলোচনায় রেখেছে।

মার্কিন কবিতায় নায়ক নয়, চার্লস বুকোওস্কি যেন এক খলনায়ক। প্রকাশ্যে কবিতার অনুষ্ঠানে টিকেট কেটে আসা দর্শকদের নিয়ে তিনি ইয়ার্কি মারেন। দর্শককে বলে বসেন, অপেক্ষা করো, একটু মাল খেয়ে নেই। মদ, জুয়া, মেয়েমানুষ নিয়েই কেটেছে ছন্নছাড়া এই বুড়োর জীবন।

 

বেলজিয়াম টি ভি জিজ্ঞেস করছে কেনো আপনার কবিতার এক নিষ্ঠুর মনুষ্যত্ব প্রকাশ পায়? বুকোওস্কি বলেছেন – “আমার বাবা আমায় লিখতে শিখিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন এক অসাধারণ সাহিত্য শিক্ষক। তিনি আমায় শিখিয়েছিলেন যন্ত্রনার মানে।আমায় মারতেন বিনা কারনে। ৬ থেকে ১১ বছর বয়স অব্দি প্রতি সপ্তাহে বাবা আমায় মারতেন সপ্তাহে ৩ বার, একটা কাঁটা চামড়ার বেল্ট দিয়ে মারতেন। ৩ বার প্রতি সপ্তাহে ৬ থেকে ১১ কতগুলো মার হয় গুনে দেখুন তো!অবাক হলেন নাতো!…..কি?"

 

ছয়টি উপন্যাস, কয়েকশ গল্প এবং কয়েক হাজার কবিতার জনক বুকোওস্কির প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ৬০-এর অধিক। লস এঞ্জেলেসের আন্ডারগ্রাউন্ড নিউজপেপার ওপেন সিটিতে তিনি দীর্ঘদিন নোটস অফ আ ডার্টি ওল্ড ম্যাননামে কলাম লিখেছেন। সেই সব কলামে তিনি নিজেই নিজেকে নোংরা বুড়া ভাম বলতেন। নোটস অফ আ ডার্টি ওল্ড ম্যানলেখার কারণে এফবিআই-এর মতো সংস্থা তার উপর নজরদারি জারি রেখেছিলো। জনপ্রিয় এই কবি এলোমেলো জীবযাপন করতেন। এক অর্থে তিনি খুবই সাধারণ হয়ে থাকতেন। টাইম পত্রিকা তাকে মার্কিন সাধারণ জীবনের কবিবলে উল্লেখ করেছেন।  আর অর্থের বিনিময়ে কবিতা পাঠ করতেন। আগেই ইংগিত দিয়েছি, সেই কবিতা পাঠের অনুষ্ঠানও হতো তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতেই।

 

চার্লস বুকোস্কি (১৯২০-৯৪) জীবনে প্রথম সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন ১৯৬৩ সালের শিকাগো লিটারারি টাইমসে। আর্নল্ড এল কেইকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি স্পষ্ট বলেছিলেন, ‘শেকসপিয়ার, মিল্টন, দান্তে, র‌্যাবেলিয়াস, শোস্তাকোভিচ, লেনিন এবং/অথবা ভ্যান গঘের চেয়ে আমেরিকার মানুষের প্রতি মিকি মাউসের প্রভাব বেশি।তার এই মন্তব্যই বলে দেয়, তার হাত দিয়ে মার্কিন কবিতা ভিন্ন ভঙ্গি খুঁজে পাবে এবং পেয়েছিল। এ সাক্ষাৎকারেই তাকে যখন প্রশ্ন করা হয়েছিল, আপনি কেন লোকজন পছন্দ করেন না। সে পাল্টা প্রশ্ন করেছিল, ‘কে আদতে লোকজন পছন্দ করে? তুমি তেমন একজন দেখাও, আমি তোমাকে দেখিয়ে দেব কেন আমি লোকজনকে পছন্দ করি না।এই বলে সে আরও একটা বিয়ার আনতে চলে গিয়েছিল। বদমেজাজি কিন্তু রসিক, মাতাল কিন্তু সত্য কথা বলে- এমনই সব বৈপরীত্য মিলিয়ে চার্লস বুকোওস্কি সাক্ষাৎ এক রহস্যের নাম। কখন কি করে বসেন, সেটাই ছিল লাখ টাকার প্রশ্ন।

বুকোওয়স্কির মা জার্মান। বাবা অবশ্য আমেরিকান। বুকোওয়স্কির জন্ম জার্মানিতে। ৩ বছর বয়েসে অবশ্য পরিবারটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চলে আসে। প্রথমে বাল্টিমোর ম্যারিল্যান্ডে বসবাস করতে থাকে; পরে চলে আসে লস এঞ্জেলেস। বুকোওয়স্কির বাবার প্রায়শ চাকরি থাকত না। খুব মেজাজি ছিলেন ভদ্রলোক, ভীষণ রাগারাগি করতেন। বুকোওস্কির লেখা উপন্যাসে এসব তিক্ত অভিজ্ঞতা উঠে এসেছে। বুকোওস্কির শৈশব সুখকর ছিল না। পাড়ার ছেলেপুলেরা ওকে জার্মান’, ‘জার্মানবলে ক্ষেপাত। চর্মরোগ হয়েছিল হাইস্কুলে পড়ার সময়। ঘরে বন্দি থাকতে হত। এভাবেই স্কুল ও কলেজের গন্ডি পেরোয় কিশোর। তরুণ বয়েসে (১৯৪০/১৯৪৫) ২য় মহাযুদ্ধে ডামাডোল। তখনকার দিনে মার্কিন তরুণদের যুদ্ধে যাওয়ার জন্য সরকারি খাতায় নাম লেখাতে হত। বুকোওস্কির ব্যাপারটা পছন্দ না হওয়ায় সরকারি খাতায় নাম না লিখিয়ে লুকিয়ে থাকল। এফ বি আই তাকে ধরল। জিজ্ঞাসাবাদের পরে ছেড়ে দিল সতেরো দিন পর। এসব বিস্ময়কর বোধ ও ব্যাতিক্রমী উপলব্ধিই হয়তো যুদ্ধে না যাবার জন্য কারণ হিসেবে কাজ করেছে। কী এক অস্থির অসহ্য সময়! দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে। নিহত হচ্ছে লক্ষ লক্ষ নিরীহ মানুষ। আহ্, যদি সব ভুলে থাকা যেত! মদ ধরল তরুণ কবি। আমৃত্যু মদ হয়ে থাকল সঙ্গী। এবং একজন অসুখি তরুণ বেড়ে উঠতে লাগলো লস এঞ্জেলেস শহরে । ৫০ এর দশক। অ্যান্ড দ্য মুন অ্যান্ড দ্য স্টারস অ্যান্ড দ্য ওয়ার্ল্ড কবিতায় তিনি লিখেছেন:

 

"রাত্রিতে অনেকক্ষণ হাঁটা-

আত্মার জন্য ভালো:

জানালায় উঁকি দিয়ে দেখা

ক্লান্ত গৃহিনীদের

বিয়ারআসক্ত স্বামীদের বিরুদ্ধে

যুদ্ধ করছে ..."

 

জীবনে এল বারবারা নামের এক নারী। নারীটি কবি। দু-পক্ষের বিয়ে হল। তারপর ১৯৫৯ সালে ডিভোর্স। অর্থনৈতিক সঙ্কটে পড়ে ১৯৬০ সালে লস এঞ্জেলেস পোস্ট অফিসে চাকরি নিতে হল। এখানেই কেরানি হিসেবে কাজ করতে হয়েছে পরবর্তী ১২ বছর। তাই বুকোওস্কির প্রথম উপন্যাসের নাম: পোষ্ট অফিস।

১৯৬৬ সালে ক্যালিফোর্নিয়ায় জন মার্টিন নামে একজন সাহিত্যপ্রেমিক ব্ল্যাক স্প্যারো প্রেস নামে একটি প্রকাশনী প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন। সাহিত্য পত্রিকা ছেপে বের করত ব্ল্যাক স্প্যারো প্রেস । বুকোওস্কির কিছু লেখা চোখে পড়েছিল জন মার্টিনের। একদিন বুকোওস্কিকে ডেকে জন মার্টিন চাকরি ছাড়ার পরামর্শ দিলেন। বললেন, আপনি কেবল লিখতে থাকুন।

জন মার্টিন যে সময় বুকোওস্কির লেখা ছাপানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, সেসময় বুকোওস্কির তেমন নামডাক হয়নি- কৃতজ্ঞতা স্বরূপ ব্ল্যাক স্প্যারো প্রেসকে প্রচুর লেখা দিয়েছেন বুকোওস্কি। অন্য ছোট ছোট প্রকাশনীর স্বাধীনতায় বিশ্বাস করতেন, তাদেরও আমৃত্যু লেখা দিয়েছেন বুকোওস্কি। পোষ্টঅফিসের চাকরি ছেড়ে ডুবে রইলেন লেখায়। কবিতা আসলে ব্যতিক্রমী ভাষায় জীবনেরই ব্যাখ্যা। জীবনের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে জীবন হয়ে উঠল উদ্দাম যেমন, মহত্তম কোনও কিছুর খোঁজে নিরাপদ সোজা রাস্তা ছেড়ে অনিরাপদ অজায়গাতেও যেতে হয়, অনেকটা সেইরকমই।

তারপর অভিনেত্রী লিন্ডা লি-র সঙ্গে পরিচয় ১৯৭৬ সালে। ভিন্নধর্মী একটি রেস্তোঁরার মালিক লিন্ডা লি ছিল ভারতীয় গুরু মেহেরবাবার ভক্ত। দীর্ঘদিন টিকে থাকল তাদের ঘনিষ্ট সর্ম্পকটি । এরপর ১৯৮৫ সালে দুপক্ষের বিবাহপর্ব সম্পন্ন হল। ততদিনে সানপেড্রো ক্যালির্ফোনিয়ায় স্থায়ীভাবে বাস করছেন বুকোওস্কি। সমুদ্র তীর ঘেঁষে বাংলো। উত্তাল বাতাস। অফুরন্ত অবসর। লিখে যাচ্ছেন। কবিতা ছাড়াও ৬টি উপন্যাস ও অজস্র ছোট গল্প লিখেছেন।

 

যদিও চার্লস বুকোওস্কি আগাগোড়াই পূর্ণাঙ্গ কবি। তিনি কোনো মেকি জীবন যাপন করেননি। যা মনে চেয়েছে, তা-ই করেছেন। যা ভেবেছেন,তা-ই বলেছেন। আর শেষ পর্যন্ত লেখাটাই তার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকে। আপাতভাবে তাকে যতই খামখেয়ালি আর লাগামহীন মনে হোক না কেন, লেখালেখির ব্যাপারে তিনি ভীষণ দায়িত্বশীল। সবকিছুর পর লেখালেখিটাই তার কাছে টিকে থাকে। তার ভাষ্যমতেই-

 

অধিকাংশ সময় এটাই একমাত্র

জিনিস

তোমার আর

অসম্ভবের মধ্যবর্তী।

কোনো নেশা,

কোনো নারীর প্রেম,

কোনো সম্পদ

এটার সাথে তুল্য নয়।

 

(লেখা)

 

নেহাতই নামকাওয়াস্তে কবি ছিলেন না তিনি। আমাদের জীবনানন্দের মতো তিনিও বিশ্বাস করতেন, ‘সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি। বরং কবি হওয়ার চেয়েও তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলো কবিতা সৃষ্টি করতে পারা। সে বেশ্যার প্রতি যে আমার কবিতা নিয়ে গেছেকবিতায় তিনি ঈশ্বরের দোহাই দিয়ে বলেন-

 

কিন্তু ঈশ্বর বলেছেন,

পায়ের ওপর পা তুলে,

আমি দেখছি অনেক কবিই সৃষ্টি করেছি

কিন্তু খুব বেশি সৃষ্টি হয়নি

কবিতা।

(সে বেশ্যার প্রতি যে আমার কবিতা নিয়ে গেছে)

 

কবিতা সৃষ্টির জন্যই জীবনের সব আয়োজন তার। আপাতভাবে যে উদ্দাম, লাগামহীন জীবন তিনি যাপন করেছেন, তার অন্তর্গত কারণটি যেন কবিতাই। সে বেশ্যার প্রতি যে আমার কবিতা নিয়ে গেছেকবিতায় তাই তিনি মিনতি করেন-

 

পরেরবার আমার বাম হাত নিয়ে যেয়ো অথবা অর্ধেকটা

কিন্তু আমার কবিতা নিয়ো না :

(সে বেশ্যার প্রতি যে আমার কবিতা নিয়ে গেছে)

 

আদতে বুকোওস্কির হাত কিংবা তার যেকোনো কিছুই নিয়ে নেওয়া যায়। কিন্তু তার কবিতা নেওয়া যায় না। কবিতা আর বুকোওস্কি একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ।

 

তিন.

 

বুকোওস্কি ভেতরে ভেতরে একটি নীল পাখিকে গোপনে লালন করতেন। এটা যেন তার দ্বিতীয় আমির প্রতীকী রূপ। ভেতরে ভেতরে কোথাও যেন লালন ফকির। সেই লালন ফকির, লালন সাঁই, যিনি নিজের আত্মশিক্ষার বলে বলীয়ান হয়ে, এক মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গির প্রবক্তা। এই দৃষ্টিভঙ্গির অনেকটাই আমরা লক্ষ করি, মৃত্যুর পর প্রকাশিত তার অনেক লেখালিখিতে।

 

আর্তোও চেয়েছিলেন, কবি যদি স্রষ্টা হন, তাহলে নিশ্চয়ই কবিতায় বহুমাত্রিকতার বিচ্ছুরণ ঘটাতে চাইবেন বা অনুভব করতে চাইবেন। চেয়েছিলেন বলেই মস্তিষ্কের ভাঁড়ারে মহাবিশ্বশক্তির প্রবাহকে বইয়ে দিতে চেয়েছিলেন শরীরে। জীবনানন্দ চেয়েছিলেন সন্ধ্যার মেঘের আলোয় আত্মঘাতী হতে। এতো কবিতার স্বাভাবিক যাত্রা। ফ্রয়েডীয় স্বপ্ন বিশ্লেষণের ভাষায় বলা যায় নির্জ্ঞানের দিকে পশ্চাৎভ্রমণ সেই নির্জ্ঞান যা অপার নৈঃশব্দ্যে ঢাকা। যেখান থেকে শব্দ ও ভাষা উঠে আসে। বাস্তবিক কবিতার জগৎ অনন্ত আদিম নৈঃশব্দ্যের গহ্বর। অনন্ত অবিনশ্বর শূন্যতার জগৎ।অনন্ত অবিনশ্বর অব্যক্ত নৈঃশব্দ্যের জগৎ যেখান থেকে নশ্বর শব্দ উঠে আসে, নশ্বর ভাষা উঠে আসে যার উত্থান একমাত্র কবিই পারেন তাঁর নিজের গহ্বরে অনুভব করতে, নিজের অনন্ত মৃত্যুর শূন্যতায় পারেন তার কণ্ঠস্বর শুনতে। বুকওস্কির লেখার বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখি --

 

 

 

প্রথমত.

 

ডার্টি রিয়ালিজম এবং ট্রান্সগেসিভ ফিকশন আন্দোলনের অন্যতম প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হলেন বুকোওস্কি। সুসজ্জাহীন, রূপকহীন, ভাণ ভণিতাহীন , সোজাসাপ্টা বিস্ফোরক বাস্তবধর্মী ভাষায় চাবুকের মতো কবিতা রচনা, যা বর্তমান আমেরিকার তরুণ কবি ও পাঠকদের কাছে গিন্সবার্গ- এর চেয়ে, বা বলা চলে কেরুয়াকের মতো ঈর্ষণীয় জনপ্রিয়তায় এক উচ্চস্থানে অধিষ্ঠিত করেছে তাকে। সেই লেখা যা ঘেয়ো আত্মাকে নিয়ত নগ্ন করে। প্রায় অধিকাংশ কবি সাহিত্যিকেরই সেই ধ্বক থাকে না, গোটা পৃথিবীর সামনে ছাল ছাড়িয়ে নিজের আত্মাকে তুলে ধরার। সেই অমার্জিত সাহস ছিল

বুকোওস্কির, যা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন ভাষাকে প্রতিফলিত করত।

 

দ্বিতীয়ত.

 

তার লেখাগুলি প্রায়শই লস অ্যাঞ্জেলেসের জীবন, বিশেষ করে দরিদ্র এবং প্রান্তিক মানুষের জীবনকে চিত্রিত করে

 

তৃতীয়ত.

 

তার লেখায় অস্তিত্বের সংকট, অর্থহীনতা এবং জীবনের অন্বেষণ দেখা যায়, যা তাকে অস্তিত্ববাদী এবং অযৌক্তিক ধারার একজন গুরুত্বপূর্ণ লেখক করে তোলে

 

চতুর্থ.

 

তার লেখায় প্রায়শই আত্ম-বিদ্রূপ এবং নিজের দুর্বলতাগুলি তুলে ধরা হত, যা তার রচনাগুলিকে আরও মানবিক করে তোলে

 

 

পঞ্চম.

 

তার লেখায় বেশ্যা নারী ও মদ্যপানের চিত্র বারবার এসেছে, যা তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এবং সমাজের প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রতিফলিত করে

 

ষষ্ঠ.

 

বুকোওস্কি জীবনের কঠোর বাস্তবতা, বিশেষ করে নিম্নবিত্ত মানুষের সংগ্রাম এবং হতাশার দিকটি তুলে ধরেছেন

 

পাশাপশি বেলজিয়াম টিভিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারের আরও কিছুটা অংশ তুলে ধরছি -

 

বেলজিয়াম টিভিঃ আপনার গল্পে/উপন্যাসে প্রেমজিনিসটাকে আপনি তুমুলভাবে খাটো করেছেন। শারীরিকতা, যৌনতার বাইরে তাকে রাখতে দেন নি। এই অভিযোগ আপনার বিরুদ্ধে ওঠে।

 

বুকোওস্কিঃ কে বলছে এ কথা?

 

বেলজিয়াম টিভিঃ অনেকেই বলেন। আজ আমরা বলছি।

 

বুকোওস্কিঃ কিছুই বোঝেনি আমার লেখা, মগজের বাইরে দিয়ে সব

 

বেলজিয়াম টিভিঃ কি বলছেন আপনি? ‘প্রেমজিনিসটার  অস্তিত্ব আছে আপনার লেখায়? ঐ সেক্স আর রক্ত- মাংসের বাইরে সে আছে?

 

বুকোওস্কিঃ এই ছোঁড়া, তোমার ঐ গু মাখা ধারণা তোমার নিজের কাছে রাখো। শালা, মাদার চোদ, এই সব জিজ্ঞেস করতে এসেছো আমাকে? প্রেম কাকে বলে বোঝো? প্রেম প্রতিদিনকার। প্রতিদিন ভোরের। ভোরের ঐ এক ঘন্টা, যখন সূর্য উঠছে, নরম তার আলো, তার তাপ। কিন্তু আস্তে আস্তে উত্তপ্ত হয়ে উঠছে সব। গরম বাড়ছে ,আলো বাড়ছে, সেই প্রেমটা ফিকে হয়ে যায় তখন। মাত্র এক ঘন্টা তার আয়ু, সেই প্রেম, যা আমার সমস্ত লেখার সমস্ত কোণে রয়েছে, আর তোমরা শালা গাধার পোঁঙা, দেখতে পাও না শুয়োরের বাচ্চা….

 

বেলজিয়াম টিভিঃ আপনার কবিতায় আসা যাক এবার। আপনার কবিতা খুব ন্যাড়া কবিতা। কোন ইমেজেরি নাই। রূপকহীন, চিত্রকল্পহীন, উপামাহীন কবিতা...

 

বুকোওস্কিঃ রূপক/উপমা ,অতো সব লাক্সারি আমার পোষায় না শালা। অতো জায়গা নেই আমার মধ্যে, ভাই। সময় নেই। কেন না ঐ যে তোমায় বললাম, আমার বাবা ছিলো সাহিত্যিক ট্রেনার। সম্পূর্ণ অযৌক্তিক কারণে আমায় মারতো। পিটতো। রোজ। মারতে মারতে মারতে আমার মধ্যকার সমস্ত ভান-ভনিতার রস-মেদ সমস্ত বের করে দিয়েছিলো। স্রেফ আত্মাটা পড়েছিল। তাই আমার কবিতায় ঐসব স্নেহপদার্থ নেই। আত্মা তার কথা বলে সরাসরি। বলে যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে। যন্ত্রণার মানে অনেক লেখক জানে না। বেশির ভাগ লেখকই জানেন না। আমাকে আমার বাবা শিখিয়েছিলেন,আমি ঐ বুড়ো ভামটার প্রতি কৃতজ্ঞ।

 

বারংবার প্রতিবাদী এবং অসহিষ্ণু এই মানুষটির আচরণ মনে পড়িয়ে দেয় মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথা। একবার হাওড়া স্টেশনে কয়েকজন বিশিষ্ট কবি সাহিত্যিক জড়ো হয়েছেন। দিল্লিতে সবাই যাচ্ছেন। বাংলা সহ ভারতীয় বিভিন্ন ভাষায় লেখক সাহিত্যিকদের বিশাল কনফারেন্স। বিভিন্ন ভাষার দিকপাল সাহিত্যিকরা যাচ্ছেন সেখানে। বিশিষ্ট সাহিত্যিক বিমল মিত্রের কলমে, " আমরা হাওড়া স্টেশনে জড়ো হয়েছি। চারদিকে আলো করা সব তাবড় তাবড় লেখকেরা । একটা ভিড়, ছোটাছুটি, ব্যস্ততা, হইহই । আমরা প্রায় অরাজক এই পরিস্থিতিকে মানিয়ে নিয়েছি।অনেকে উপভোগ করছেন নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে।  ট্রেন প্রায় ছাড়বো ছাড়বো অবস্থা। এমন সময় দেখি, একটি টিনের ছোট বাক্সের সঙ্গে বিছানাপত্র দড়ি দিয়ে বেঁধে, টলতে টলতে মানিক বাবু আসছেন। দূর থেকে তাঁর ঋজু লম্বা দৃঢ় চেহারাটা চোখে পড়ল।  তিনি এসে এই হই হই ছোটাছুটি, অরাজকতা দেখে চমকে গেলেন। থমকে দাঁড়ালেন ।  যতগুলো টিকিট কাটার দরকার ছিল , সংগঠকরা ততটা টিকিট জোগাড় করতে পারেন নি।  সবাইকে তারা অনুরোধ করলেন, একটু ভুল হয়ে গেছে, আপনারা নিজ গুণে ক্ষমা করে একটু কষ্ট করে মানিয়ে নিয়ে ভিড়ে ঠাসা কামরায় জায়গা জোগাড় করে বসুন। ব্যাপারটা অন্যরা সহজ ভাবে মানিয়ে নিলেও মানিক বাবু পারলেন না।তাঁর দৃঢ় চোয়াল আরও শক্ত হলো। চোখদুটো নীরবে জ্বলে উঠলো। এ কি রকম অব্যবস্থা! এ ভাবে যাওয়া যায় নাকি? সব ব্যাপারে এভাবে আপোষ করা যায়? তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে, ধীরে ধীরে আবার ফিরে চলে গেলেন । এই  অব্যবস্থার বিরুদ্ধে কেউ কোনোও প্রতিবাদ না করলেও, মানিক বাবু সেদিন নীরব প্রতিবাদ করে, ফিরে চলে গেলেন।  কারণ তিনি জীবনে এবং লেখায় কোথাও কোনোও আপোষ করেন নি অন্যায়ের সঙ্গে। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, হৃদয়ের রক্ত দিয়ে অর্জিত সম্মান কারও কাছে বিক্রি করা যায় না। আমরা এক একটা পাপেট যেন। এই আধা সমাজতান্ত্রিক সমাজে আমরা এক একজন পুতুল মাত্র। যেভাবে উঁচু টিলায় দাঁড়িয়ে পুতুল নাচের ইতিকথায়, শশী ডাক্তার আর কোনোও দিন সূর্যাস্ত দেখতে পারে নি, যেভাবে পদ্মা নদীর মাঝিতে, হোসেন মিঞা, ময়না দ্বীপের নতুন সমাজ তৈরী করতে চেয়েছিলেন, যাবতীয় ক্লিশে সামাজিক অব্যবস্থাকে ভেঙে দিয়ে, নতুন স্বপ্ন দেখার বাসনায়, সেভাবেই সেদিন মানিক বাবু এই অব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। আমরা পারি নি, দৈনন্দিন সব ব্যাপারে আপোষ করতে করতে আমরা অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছি, কিন্তু কি জীবনে, কি যাপনে, কি লেখায় এই অভ্যাসকে আক্রমণ করেছেন বারংবার|"

 

কোথাও যেন এই আপোষহীন বিদ্রোহী ছিলেন বুকোওস্কি। এর ফলে মৃত্যুর পর যতো দিন যাচ্ছে , প্রমাণিত হচ্ছে তার গুরুত্ব। তিনি ছিলেন আমেরিকার প্রতিসংস্কৃতির ধারক। তখন ভিয়াতনাম যুদ্ধের প্রতিবাদ করে দেশের সেনাবাহিনী দেশের রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে মাইক তুলে নিয়েছে। বার্কলে বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররা প্রতিবাদ করেছে। এখনকার সমাজটা অনেক গোঁড়া, রক্ষণশীল হয়ে পড়েছে। ফলে আজ যে বুকোওস্কির মতো, তার লেখা কেউ পড়ে না। তো, বুকোওস্কি ছিল সেই প্রতিসংস্কৃতির লেখক। সমাজবিরোধীও বলা যায়। একটা ডাকঘরে সামান্য চাকরি করতেন।জীবনের অনেকটা সময়। যা পেতেন তাই দিয়ে মদ খেতেন ,সিগারেট খেতেননিরন্তর, যার-তার সঙ্গে শুয়ে বেড়াতেন আর বাকী সময় টাইপ-রাইটারে বসে লিখতেন। প্রচুর লিখতেন। ৫০ পেরোতে না পেরোতে বুকোওস্কির নাম ডাক বাড়তে থাকে। লরেন্স ফেরলিংগেটি ওকে ডাকেন সান ফ্রান্সিকোতে।  গিয়েছিলেন সিটি লাইটস বুকস্টোর আয়োজিত এক সন্ধ্যায় কবিতা পড়তে। সেই পাঠের আসরে তরুণ ছেলে-মেয়েদের দল উপচে পড়ে। ফিল্ম তোলা হয়। হাসি ঠাট্টায় গড়াগড়ি যাচ্ছে ছেলে-মেয়েরা। অবিরত বীয়র পান চলছে গল্পপাঠের সাথে। যেমন লেখক তেমন পাঠক পাঠিকা। সিগারেটের ধোঁয়া প্রায় মেঘের মতো। এবং বুকোওস্কি সুযোগ পেলেই তার প্রসিদ্ধ খিস্তি করছেন। অনেকটা আগুন খেঁকো ঋত্বিক ঘটকের মতো। তো এই লোকটাকেই বন্ধুরা ডাকতো হ্যাঙ্ক বলে। যে লোকটা বিদ্রোহী, নিষ্ঠুর, সাধারণ মানুষের চোখে খিস্তিবাজ, কর্কশ, সে কিন্তু তার কবিতার মতোই সৎ। অন্য কাউকে গালাগালি দেবার আগে, নিজেকে নিয়ে বারংবার খিল্লি করে। নিজেকে চাপকায়, নিজের কর্মকাণ্ড নিয়ে নিজেরই প্রধান সমালোচক।  নিজেকে বারংবার রক্তাক্ত, ক্ষতবিক্ষত করেই তাঁর আনন্দ।কিন্তু সে অকপট, সব ব্যাপারে স্বচ্ছ বিশেষ করে নিজের যাপন নিয়ে নিজেই নিজেকে বিক্ষত করেছেন বারংবার। এরফলে প্রথমে গল্প, উপন্যাস এসব লিখে, শেষের দিকে লিখতে এসেছেন কবিতা। যা কাহিনীর মতো কিন্তু জীবনের যাবতীয় ক্লেদ ও অঙ্গার নিয়ে সমান্তরাল এক পৃথিবীর স্রষ্টা।অন্তত লিউকোমিয়া রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর আগের মুহূর্ত পর্যন্ত নিজেকে নিয়ে সবচে বড়ো সমালোচক হলেন নিজেই। এরফলে সাম্প্রতিক আমেরিকান সাহিত্যে ধীরে ধীরে তরুণ সমাজের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে এই মানুষটির লেখালিখি । লেখাটি শেষ করার আগে তার দু একটি কবিতার অনুবাদ এখানে দিলাম-

 

 

"সবার সাথে একা একা

মাংস ঢেকে রাখে হাড়

আর তারা একটা মনকে রাখে

এর ভিতর আর

কখনও-সখনও একটা আত্মা,

আর মহিলাটি ফুলদানি

ভাঙ্গে দেয়ালে আছড়ে

আর লোকটা মাল টানে অতি

মাত্রায়

এবং কেউই কাউকে খুঁজে

পায় না

কিন্তু তারা তাকিয়ে

রয়

তাকিয়ে আছে

হামাগুড়িতে ঢুকছে ও বের হচ্ছে

বিছানায় ও বিছানা থেকে।

মাংস ঢেকে রাখে

হাড় আর সে

মাংস অনুসন্ধান করে

মাংসেরও অধিক

কিছু।

কোন সম্ভাবনাই নেই

একদম:

আমরা সকলে ধরা খাওয়া

এক অভিন্ন নিয়তির

ফাঁদে।

কেউ কাউকে খুঁজে পায়না

কখনও।

নগর আবর্জনার স্তূপে ভরে ওঠে

আস্তাকুড় ভরে ওঠে

পাগলাগারদ ভরে ওঠে

হাসপাতাল ভরে ওঠে

গোরস্থান ভরে ওঠে

আর কিছুই

ভরে না।" ( সবার সাথে একা একা)

 

"যে বেশ্যা মাগীটা আমার কবিতা নিয়ে ভাগলো

কেউ কেউ বলেন

ব্যক্তিগত মনস্তাপের জায়গা কবিতা নয়,

বিমূর্ততা চাই, এবং তাদের যুক্তিটা আমি বুঝি

কিন্তু ভগবান;

পুরো বারোটা কবিতা হাওয়া আর

আমি কার্বন কপি রাখিনা মাগী তুই জানতিস

 

ওর মধ্যে আমার আঁকা ছবিও ছিল,

সেরা ছবিগুলো;

দম বন্ধ করে দিয়েছিস তুই,

বাকীদের মতো আমাকেও কি

চুরমার করে দিতে চাস? টাকা নিলি না কেন?

 

ওরা তো সাধারণত ওটাই নিয়ে ভাগে,

ঘুমন্ত মাতাল প্যান্টের

নোংরা কোণ থেকে বের করে নেয়।

পরের বার আমার বাঁ হাতটা নিয়ে যাস

বা একটা পঞ্চাশ টাকার নোট,

আমার কবিতা নিস না মেয়ে;

মাইরি, আমার কবিতা নিস না

 

আমি শেক্সপিয়র নই রে,

কিন্তু আমি জানি

একদিন, একদিন আর কিছুই থাকবে না,

এমনকি বিমূর্তও নয়;

টাকা সব সময়ই কিছু না কিছু থাকবে

আর তোরা

বেশ্যা আর ঐ মাতালগুলোও থাকবে

শেষ বোমাটা পড়ার আগ পর্যন্ত থাকবে,

কিন্তু ওই যে ভগবান জুত করে

পা মুড়ে বসে বলেছিল -

আমি দেখলাম, সত্যি,

কত কবির জন্ম দিয়েছি

কিন্তু হায়! তত কবিতা হয়নি।" ( যে বেশ্যা

মাগীটা আমার কবিতা নিয়ে ভাগলো)

 

 

প্রেক্ষপট: মহাকাল। বেসমেন্ট: পরপারহীন কুয়াশার ভেতর বিভিন্ন বয়সী নরনারীর মোমেন্টাম। আধুনিক সময়ে উদ্বেলিত অপরাহ্ন কিংবা স্বেচ্ছায় নির্বাসিত সংসারপৃথিবীর এক টুকরো নাগরিক ছবি। যাদের গায়ে জরি বুলেনের নকশা। কিংবা একমেটে-দোমেটে কাঁচারঙের সদাবাহার। মনে বহু বর্ণের আদুর ঋতু। সময়-দেয়। অলক্ষ্যে নাটক জমায়। পরিপূর্ণতা থেকে ধীরে ধীরে পলেস্তারা খসে পড়ে অতি প্রাচুর্য থেকে ক্ষয়ের ধারাবাহিক যাত্রাপথ। সংঘটিত কুশিলবের নেপথ্যে মঞ্চসজ্জায় কবি। ধারাবাহিক সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্তের প্রখর খেলা। পটভূমিতে জলরঙ, কখনো অ্যাক্রেলিক; কখনো মিশ্রমাধ্যম- তেলরঙ কখনো বা কোলাজ। দৃশ্য থেকে দৃশ্যান্তরে বদলে যাওয়া। তাদের ছবি আঁকতে আঁকতে পটুয়ার সময় যায়। জল কাটে চোখে। অস্থির ছবির কেন্দ্রীভূত অতৃপ্ত পিপাসা বিন্দু বিন্দু পটভূমি তৈরি করে পুতুলনাচের। কেউ নেপথ্যে, ইশারায় চালায়। কলে দম দেওয়া মানুষ চলে অজানিত জন্মান্তরের পথ বেয়ে বিক্ষত হতে হতে। ধারা থেকে অবগাহন হয় কখনো, কখনো নয়। দ্বিধান্বিত, দ্বন্দ্বময়, মানুষের ভেতর বাইরে আরপার হয়ে যাওয়া, অনশ্বর বৈপরীত্যের খেলা। আত্মসমর্পণ করতে হয় বলেই অহংকার, হাসিকান্না মোহ মাৎসর্য, পরিতৃপ্তি অপূর্ণতা, বেদনা- কৌতুকময় অবস্থায় পিছলে পিছলে যাওয়া মানুষ এই আয়োজনে মুখর কামুক চোরাবালির হামুখ শূন্যতায় ভেসে ওঠে কেবল। প্রার্থনায়। কিছুটা অস্বস্তিদায়ক হলেও জন্মান্তরীন স্বস্তির জন্য।

 

 

 

( বিশেষ দ্রষ্টব্য -- এই লেখাটি হতই না, কয়েকজনের নেপথ্য প্রেরণা না থাকলে। পিছিয়ে যেতে হবে প্রথমেই, প্রায় পনেরো কুড়ি বছর আগে।  বিশিষ্ট কবি প্রাবন্ধিক এবং নতুন কবিতার অন্যতম প্রধান ভাবুক বারীন ঘোষালের কাছে আমার ঋণ যা কোনোও দিনও শোধ হবার নয়। প্রথমে তাঁর কাছেই শুনি চার্লস বুকোওস্কির নাম। সমান্তরাল বিপরীত স্রোতে বয়ে যাওয়া বর্তমানের আমেরিকান কবিতা ও গদ্য প্রসঙ্গে তিনি আমাকে বলেছিলেন একটি অন্তরঙ্গ আড্ডায় ওনার কথা। ডিটেলে আলোচনা করেন সেদিন বারীন দা, ওনার জামশেদপুরের বাড়িতে বসে।  ওনার কাছেই পাই বুকোওস্কির কিছু লেখা। কেন ও কি কারণে বুকোওস্কি বর্তমান সময়ে ধীরে ধীরে আমেরিকান কবিতায় সবচে তরুণ পাঠক ও কবিদের কাছে আলোচিত হয়ে উঠছেন, সেসব নিয়ে দীর্ঘ সব আলোচনার দিনগুলো আমার কাছে উজ্জ্বল অধ্যায়।  এরপর, বহু বছর পর, আমার অগ্রজ কবি বিশিষ্ঠ প্রাবন্ধিক ও কৌরব অন লাইন পত্রিকার অন্যতম কারিগর, বন্ধু আর্যনীল মুখোপাধ্যায়ের , চার্লস বুকোওস্কিকে নিয়ে দুটি লেখা একটি কৌরব অনলাইন এবং অন্যটি কবি সম্মেলন পত্রিকায় পড়ে আমি অভিভূত হই।  এই লেখা গঠনের নেপথ্যে ওই দুজনের ভূমিকা অনস্বীকার্য। আমি কৃতজ্ঞ এই দুজন প্রিয় মানুষের কাছে, এই দুটি লেখা হওয়ার পেছনে। পাশাপশি আমার যৎসামান্য পাঠ, বুকোওস্কিকে। আরও অনেকের কিছু কিছু লেখা। সব মিলিয়েই এই লেখার প্রস্তুতি। চার্লস বুকোওস্কি এই সাম্প্রতিকতম সময়ে এতো প্রাসঙ্গিক কবি গল্পকার ঔপন্যাসিক যে ওনার লেখালিখি নিয়ে আরও অনেক অনেক কিছু জানা বাকি আছে আমার। এই লেখাটি ওনার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আমার অতি সামান্য উদ্যোগ। বাংলাভাষায় চার্লস বুকোওস্কিকে নিয়ে কাজের পরিমাণ আরও আরও বাড়ুক, আরও চর্চা হোক চাই। এই ক্ষয়িষ্ণু সমাজের সামগ্রিকতায়, আবিশ্ব সাহিত্যজগতের পরিমন্ডলে বুকোওস্কির অবদান বর্তমান সময়ে কতটা তাৎপর্যপূর্ণ তা এই লেখকের পাঠকরাই জানেন। আমার নীরব শ্রদ্ধা রইলোই....)

 

 


প্রদীপ চক্রবর্তী

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ