
রূপকথা,
সংস্কৃতি ও ইতিহাসের মেলবন্ধন 'হ্যানয়' শহর
ভিয়েতনামের রাজধানী হ্যানয় হলো রূপকথা
সংস্কৃতি এবং ইতিহাসের এক অপূর্ব মিশ্রণ যার নিদর্শন দেখলে সত্যিই মুগ্ধ হতে হয়।
ভিয়েতনামের মানুষেরা রূপকথার গল্প খুব ভালবাসে।
তাদের প্রত্যেকে স্থানের সঙ্গে তাই রূপকথার গল্প জড়িয়ে আছে।
ভিয়েতনামি রূপকথা অনুযায়ী ড্রাগনই হল সৃষ্টির উৎস এবং ভিয়েতনামের অধিবাসীরা ড্রাগনের বংশধর।তার কারণ মানচিত্রে ভিয়েতনামকে দেখতে অনেকটা ইংরেজি ‘এস’ অক্ষরের মতো, যেন অনেকটা ড্রাগনের আকৃতি। হ্যানয় শব্দের অর্থ হল নদী বেষ্টিত শহর।এই শহরের উত্তরে লাল নদী,এছাড়া দায়,ডুয়ং ,কৌ নদী ও হোয়ান কিম লেক দিয়ে শহরটি বেষ্টিত তাই নামটি সার্থক।
ভিয়েতনামের রাজধানী হ্যানয়ের প্রাণকেন্দ্রেই
রয়েছে হোয়ান লেক বা 'রিটার্নড
সোর্ড লেক' (ফেরত দেওয়া তরবারির হ্রদ)-এর পেছনে একটি চমৎকার
রূপকথার কাহিনী রয়েছে। এই গল্পটি ভিয়েতনামের স্বাধীনতা এবং কচ্ছপ দেবতার
কিংবদন্তির সাথে মিশে আছে।
ভিয়েতনামের রূপকথায় বলা হয়েছে, একদিন সাহসী ভিয়েতনামি নেতা লে লোই যখন মাছ ধরছিলেন, তখন তিনি একটি জাদুকরী তরবারি খুঁজে পান। তরবারিতে লেখা ছিল থুয়ান থিয়েন অর্থাৎ "স্বর্গের ইচ্ছা"।এই শক্তিশালী তরবারির সাহায্যেই তিনি চীনা দস্যুদের পরাজিত করে ভিয়েতনামে শান্তি প্রতিষ্ঠা করেন।যুদ্ধের পর, লে লোই রাজা হন। এরপর তিনি যখন একদিন 'লুক থুই' নামক হ্রদে নৌকা ভ্রমণ করছিলেন, তখন জলের নিচ থেকে একটি বিশাল সোনালী কচ্ছপ ভেসে ওঠে। কচ্ছপটি মানুষের কণ্ঠে রাজাকে বলে যে, যেহেতু যুদ্ধ শেষ হয়েছে এবং দেশে শান্তি ফিরে এসেছে, তাই তরবারিটি যেন এর আসল মালিক 'ড্রাগন কিং'-এর কাছে ফেরত দেওয়া হয়।রাজা লে লোই তার কোমর থেকে তরবারিটি খুলে কচ্ছপটির হাতে তুলে দেন। কচ্ছপটি তরবারিটি মুখে নিয়ে জলের গভীরে অদৃশ্য হয়ে যায়। এই ঘটনার পর, রাজা লে লোই হ্রদটির নাম পরিবর্তন করে রাখেন হোয়ান কিয়েম যার অর্থ "ফেরত দেওয়া তরবারির হ্রদ"।এই কিংবদন্তিকে সম্মান জানিয়ে লেকটির মাঝখানে একটি ছোট দ্বীপে "Turtle Tower" বা কচ্ছপ মিনার নির্মাণ করা হয়েছে। এই হোয়ান লেক ও কচ্ছপ মিনার তাই ভিয়েতনামবাসিদের কাছে এত গুরুত্বপূর্ণ।
ওল্ড কোয়ার্টারে বুটিক হোটেলে যখন পৌঁছলাম তখন বেলা গড়িয়ে গেছে।লাঞ্চ ও বিশ্রাম সেরে আমরা প্রথমেই গেলাম হোয়ান কিয়েম লেক।লেকের ধারে পুরো বিকেলটা বসে খুব সুন্দর প্রাকৃতিক শোভা উপভোগ করলাম আর দূর থেকে কচ্ছপ মিনার দেখে মনে মনে ভাবলাম রূপকথার গল্প সত্যি ও তো হতে পারে!
তারপর আমরা গেলাম এই লেকের কাছেই লোটাস ওয়াটার
পাপেট থিয়েটার হলে এখানকার বিখ্যাত জল পুতুল নাচ বা ওয়াটার পাপেট শো দেখার জন্য।
প্রথমে টিকিট কাটলাম ,জন
প্রতি টিকিটের মূল্য সাড়ে চারশো টাকা।এটি এখানকার হাজার বছরের পুরনো একটি অনন্য
সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, যা মূলত উত্তর ভিয়েতনামের লোহিত নদী
বদ্বীপের ধান ক্ষেত থেকে উদ্ভূত। একাদশ শতাব্দীতে, যখন
ভিয়েতনামের গ্রামগুলিতে বৃষ্টিতে ধান ক্ষেত ভেসে যেত, কৃষকরা
বিনোদনের জন্য এই শিল্পকলা শুরু করেছিলেন।
আমরা হলে ঢুকে নির্দিষ্ট চেয়ারে বসলাম , জল পুতুল নাচ দেখা জীবনে প্রথম বার তাই দারুণ রোমাঞ্চ হচ্ছিল কারণ
ছোটবেলা থেকে গ্রামীন মেলায় অনেক পুতুল নাচ দেখেছি কিন্তু এটা একদম অন্যরকম।পর্দা
সরে গেল, স্টেজ আলোকিত হয়ে উঠল। মঞ্চের মাঝখানে জল, দুপাশে গান বাজনার দল। প্রথমে মঞ্চের নিচে আমাদের সামনে তিনটি খুব
সুন্দরী ভিয়েতনামি মেয়ে এসে ওদের ভাষায় লোকগীতি গাইলো। মধুর সেই সঙ্গীত।তারপর শুরু হল দু পাশের বাজনা ও
গান। ছোট ছোট কাহিনি বলে গানের মাধ্যমে জলের মধ্যে খুব সুন্দর পুতুল নাচ হচ্ছিল।।
একজন কথক গল্পটি বলে দিচ্ছিলেন মঞ্চের এক পাশে বোর্ডে ইংরেজভাষায় তার তর্জমা লেখা
দেখা যাচ্ছিল। তাই বুঝতে কোন অসুবিধা হয় নি।শিল্পীরা জলের নিচে আড়ালে থেকে বাঁশের
লাঠি ও সুতোর মাধ্যমে পুতুল পরিচালনা করছিলেন দেখে মনে হচ্ছিল পুতুলগুলো জলের ওপর
নিজে থেকেই নাচছে। এই রঙিন কাঠের পুতুল দিয়ে গ্রামীণ জীবনের নানা কাজ যেমন- মাছ ধরা, ধান
চাষ এছাড়া ড্রাগন নৃত্য, পৌরাণিক ও রূপকথার কাহিনী দেখানো
হচ্ছিল।এর সাথে ড্রাম, বাঁশি, এবং
ঘণ্টার সাথে ভিয়েতনামি সঙ্গীত চলছিল। আমরা খুবই উপভোগ করছিলাম। শিশু দর্শকরা
আনন্দে তালি দিচ্ছিল। সব শেষে মূল কুশীলবেরা হাতে পদ্মফুল নিয়ে নৃত্য করতে করতে
এসে নমস্কার করল। এক ঘন্টায় শো শেষ হল,দারুণ অভিজ্ঞতা নিয়ে
আমরা হল থেকে বের হলাম।
এবার আমরা দেখব আর একটি নতুন জিনিস ট্রেন
স্ট্রিট। একটা
ট্যাক্সি বুক করে চললাম ট্রেন স্ট্রিট।ওল্ড কোয়ার্টারের লে ডুয়ান এবং ফুং হুং
স্ট্রিটের মাঝে একটা
রেল লাইন চলে গেছে যার দুধারে অসংখ্য দোকান। দোকান গুলো রেল লাইনের এত কাছে যে
সেখানে কিছু কিনতে গেলে লাইনের উপর দাঁড়িয়ে কিনতে হয়। কিন্তু আসল ব্যাপার হল
যখনই ট্রেন আসার সময় হচ্ছে তখনই খুব নিপুণ ভাবে সব গুটিয়ে নিয়ে দোকানদারেরা
লাইন ফাঁকা করে দিচ্ছে ট্রেন যাওয়ার জন্য। সারাদিনে বেশ কয়েকবার ট্রেন যাতায়াত
করে এবং এইভাবেই সামঞ্জস্য রেখে সব চলে।একটা রেলপথ ও তার দুধারের দোকান এত সুন্দর
ভাবে আলো দিয়ে সাজানো আমরা দেখে আশ্চর্য হয়ে গেলাম। আমরা টেবিল বুক করলাম,ওই কাফেতে সফট ড্রিংকস আর চিপস খেলাম, মেয়ে নিল এগ কফি, তাড়াতাড়ি খাওয়া শেষ করলাম। সঙ্গে সঙ্গে টেবিল তুলে নিল।আমরা
দাঁড়িয়ে দেখলাম পাশ দিয়ে হুইসেল বাজিয়ে ট্রেন চলে গেল। ট্রেন যাবার আগে ও পরে
নানা দেশের পর্যটকদের
ও ইনস্ট্রাগ্রামারদের ফটো তোলার জন্য এত ভিড় সত্যি বিস্ময়কর। আমরাও ছবি তুলে
হোটেলে ফিরলাম। হোটেলে
ফিরে গ্র্যাব থেকে ডিনার আনিয়ে নিলাম ।
পরদিন সকালে ঐতিহ্যবাহী তিন চাকার রিকশায় চড়ে
সাইক্লো সিটি ট্যুরের মাধ্যমে হ্যানয়ের দর্শনীয় স্থানের সংস্কৃতি ও ইতিহাস অন্বেষণের জন্য বের হলাম।
প্রথমেই গেলাম টেম্পল অফ লিটারেচার,এটি
হ্যানয়ের অন্যতম প্রধান ঐতিহাসিক এবং সাংস্কৃতিক নিদর্শন, যা
কনফুসিয়ানিজমের শিক্ষা ও জ্ঞানের প্রতীক হিসেবে পরিচিত। এটি ভিয়েতনামের প্রথম
এবং প্রাচীনতম জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, যা ১০৭০ সালে রাজা লি
থান টং-এর আমলে কনফুসিয়াসের উদ্দেশ্যে নিবেদিত মন্দির হিসেবে নির্মিত
হয়েছিল।১০৭৬ সালে, মন্দির প্রাঙ্গণে ভিয়েতনামের প্রথম
বিশ্ববিদ্যালয়, 'কুক তু গিয়াম' প্রতিষ্ঠিত
হয়, যা রাজপরিবার এবং মেধাবী সাধারণ শিক্ষার্থীদের শিক্ষা
প্রদান করত।জন প্রতি ২৫০টাকা দিয়ে টিকিট কেটে একটি সুন্দর তোরণ ও বাগান পার হয়ে
ভিতরে গিয়ে দেখলাম এখানে ৮২টি পাথরের ফলক রয়েছে, এগুলি
সাদা পাথরের কচ্ছপের পিঠে বসানো। ১৪৪২ থেকে ১৭৭৯ সালের মধ্যে রাজকীয় পরীক্ষায়
উত্তীর্ণ স্কলারদের নাম এই ফলকগুলোতে খোদাই করা আছে, এগুলি
ভিয়েতনামের প্রাচীন শিক্ষাব্যবস্থারই সাক্ষ্য বহন করছে। বেশ বড় এই
বিশ্ববিদ্যালয়, ভিতরের অনেকগুলি ঘর প্রদর্শন কক্ষ হিসেবে
রাখা হয়েছে, সেখানে কনফুসিয়াসের স্মৃতিতে তাঁর ব্যবহৃত পোশাক ,টুপি তাঁর
লেখা খাতা ও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক বস্তু রাখা আছে। ওখান থেকে আমরা
গেলাম মন্দিরের মূল গর্ভগৃহে, সেখানে কনফুসিয়াসের একটি
প্রধান মূর্তি রয়েছে আর কনফুসিয়াসের দুই পাশে তাঁর চার প্রধান শিষ্যের (যাদেরকে
"ফোর সেজেস" বা চার জ্ঞানী বলা হয়) মূর্তি স্থাপন করা হয়েছে। কনফুসিয়াসের
মূর্তির সামনে স্কুল কলেজের ছাত্র ছাত্রীরা সমবেত হয়ে প্রার্থনা করছে দেখে উৎসুক
হয়ে কারণ জানতে চাইলাম, প্রবীণ চালক যেহেতু নিজেই ট্যুর
গাইড তাই তিনি জানালেন এখানকার মানুষ বিশ্বাস করে এখানে প্রার্থনা করে পরীক্ষা
দিতে গেলে ফল ভালো হবেই।
এই স্থাপত্যটির সাংস্কৃতিক গুরুত্বও রয়েছে। আমাদের চালক দেখালেন, এর গুরুত্ব ভিয়েতনামের
মানুষের কাছে এত বেশি যে ১০০,০০০ ভিয়েতনামী ডং নোটের উল্টো
পিঠে এই মন্দিরের ছবি মুদ্রিত রয়েছে।প্রসঙ্গত জানিয়ে রাখি প্রতিদিন সকাল ৮:০০ টা
থেকে বিকাল ৫:০০ টা পর্যন্ত এই মন্দির খোলা থাকে।
এবারে আমাদের গন্তব্য হো চি মিন সমাধিসৌধ
কমপ্লেক্স।এটি হ্যানয়ের শ্রেষ্ঠ শ্রদ্ধেয় স্থান এবং অন্যতম আকর্ষণীয় ঐতিহাসিক
স্থানগুলোর মধ্যে একটি। এটি একটি বিশাল কমপ্লেক্স যা রাষ্ট্রপতি হো চি মিনের
স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য উৎসর্গীকৃত। আমাদের রিক্সার চালক বেশ আবেগমথিত সুরে একথাও জানালেন যে
ভিয়েতনামের মানুষেরা প্রতিটি মুহূর্তে ঔপনিবেশিক শাসনমুক্ত ভিয়েতনাম গঠনের জন্য ও সমাজতান্ত্রিক ভিয়েতনাম নির্মাণের জন্য হো চি
মিনের অবদান শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন।
এই কমপ্লেক্সে স্থানীয়দের জন্য প্রবেশমূল্য নেই কিন্তু আমাদের ৯০টাকা জনপ্রতি মূল্য দিয়ে টিকিট কেটে প্রায় দেড় ঘণ্টা কিউ তে দাঁড়িয়েছিলাম, অবাক হয়ে দেখছিলাম সমাধি সৌধের শীর্ষে কাও বাং থেকে আনা গাঢ় লাল জেড পাথরে "প্রেসিডেন্ট হো চি মিন" লেখাটি খোদাই করা আছে। সমাধিসৌধের দরজাটি সেন্ট্রাল হাইল্যান্ডসের মূল্যবান কাঠ দিয়ে তৈরি।সামনের হলঘরটি গোলাপী মার্বেল দিয়ে সাজানো, সেখানে লেখা আছে "স্বাধীনতা ও মুক্তির চেয়ে মূল্যবান আর কিছুই নেই" এবং সোনায় খচিত হো চি মিনের স্বাক্ষরের জন্য একটি সুন্দর পটভূমি তৈরি করেছে। অবশেষে পৌঁছালাম সমাধি সৌধের তোরণে। সামনে যা দেখি আরো বিস্ময়ে মুগ্ধ হতে থাকি। চালক সঙ্গে ছিলেন, আমাদের নানা প্রশ্নের উত্তরে বলে যাচ্ছিলেন সমাধিসৌধের বিষয়ে, জানতে পারলাম মৃতদেহ রাখা কক্ষের প্রবেশদ্বারটি গিয়া হোয়া গ্রামের দুজন কারিগর তৈরি করেছিলেন। দেখলাম মূল দরজার দুই পাশে দুটি ফ্র্যাঞ্জিপানি গাছ । সমাধিসৌধের সামনে ও পেছনে ৭৯টি সাইকাড গাছ লাগানো হয়েছে,এটি হো চি মিনের ৭৯ বছর বয়সের প্রতীক। সমাধিসৌধের দক্ষিণ ও উত্তর দিকে ভিয়েতনামের প্রতীক বাঁশের দুটি সারি রয়েছে । প্রবেশদ্বারে দুজন সৈন্য সর্বদা পাহারায় থাকেন এবং প্রতি ঘণ্টায় তাদের পরিবর্তন করা হয়।
সমাধিসৌধের কেন্দ্রে রয়েছে হা তাই থেকে আনা
মার্বেল পাথরে মোড়া একটি কক্ষ, দেয়ালে টাঙানো আছে দুটি বিশাল জাতীয় ও দলীয় পতাকা, যা থান হোয়া থেকে আনা ৪,০০০টি রুবি পাথর দিয়ে তৈরি
এবং এতে উজ্জ্বল হলুদ মার্বেল দিয়ে হাতুড়ি, কাস্তে ও
সোনালি তারা খচিত রয়েছে। সেই কক্ষে রাষ্ট্রপতি হো চি মিনের মরদেহ একটি কাঁচের
বাক্সে রাখা আছে। স্বচ্ছ কাঁচের ভেতর দিয়ে হো চি মিনের মরদেহ দেখলাম একটু দূর থেকেই কড়া পাহারায় মধ্যে দিয়ে, দেখলাম তিনি
একটি খাকি
পোশাক পরে আছেন এবং তাঁর পায়ে একজোড়া রাবারের স্যান্ডেল।মরদেহ রাখার কাঁচের বাক্সটি
ভিয়েতনাম ও সোভিয়েত ইউনিয়ন উভয় দেশের দক্ষ কারিগরদের দ্বারা নির্মিত একটি
কারিগরি ও শৈল্পিক নিদর্শন। বিছানাটি ব্রোঞ্জের তৈরি, যা
শৈল্পিক পদ্মফুলের নকশা দিয়ে সজ্জিত এবং বিছানার তিন পাশে উচ্চ-প্রভাব প্রতিরোধী
কাচ লাগানো আছে। বিছানার চাঁদোয়াটি ধাতুর তৈরি এবং এতে স্বয়ংক্রিয় আলো ও শীতাতপ
নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা রয়েছে। বিছানাটি একটি পাথরের বেদীর উপর স্থাপন করা হয়েছে,
যেখানে একটি স্বয়ংক্রিয় লিফট ব্যবস্থা আছে। ওখানে বেশিক্ষণ থাকার
নিয়ম নেই তাই শ্রদ্ধা জানিয়ে তাড়াতাড়ি সমাধিসৌধের কক্ষের বাইরে বেরিয়ে এলাম।
প্রসঙ্গত জানিয়ে রাখি এটি সোমবার ও শুক্রবার ছাড়া বাকি পাঁচ দিন সকালে ও দুপুরে খোলা থাকে।
সৌধের সামনে রয়েছে বা দিন স্কয়ার, যেখানে একটি প্যারেড পথ এবং ৩৮০ মিটার দীর্ঘ একটি
লন রয়েছে, লনের ঘাস সারা বছর সতেজ থাকে। সমাধিসৌধের সামনে
রয়েছে পতাকা দণ্ড, যেখানে প্রতিদিন সকাল ৬টায় (গরমকালে)
এবং সকাল ৬:৩০টায় (শীতকালে) পতাকা উত্তোলন অনুষ্ঠান শুরু হয় এবং রাত ৯টায় পতাকা
নামানোর অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। স্কয়ারের পশ্চিমে একটু হেঁটে চোখে পড়ল এক স্তম্ভ
প্যাগোডা, এই প্যাগোডার কাঠের উপর ঐতিহ্যবাহী ভিয়েতনামী নকশার
জটিল খোদাইকর্ম কাঠামোটির সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে তুলেছে। এটি শুধু একটি উপাসনালয়ই
নয়, যে কোনো ফটোগ্রাফারের জন্যও একটি আকর্ষণীয় জায়গা
।চারপাশের জলে এই
প্যাগোডার পদ্ম আকৃতির স্থাপত্যের সুন্দর প্রতিবিম্ব দেখা যায়। সত্যি এত সুন্দর
দেখে আর আশ মেটে না।
কাছেই রাষ্ট্রপতি প্রাসাদ,এটি একটি চিত্তাকর্ষক ভবন, যেখানে
একসময় ভিয়েতনামের রাষ্ট্রপতির বাসভবন ছিল। এটি ফরাসি ঔপনিবেশিকতা এবং ভিয়েতনামী
রুচির এক চমৎকার মিশ্রণ। চালক জানালেন এর ভেতরে প্রবেশ করলেই এই দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক সমৃদ্ধ
চিত্র আমাদের চোখের সামনে উন্মোচিত হবে। কিন্তু কোন বিশেষ কারণে ভবনটি বন্ধ থাকায়
আমাদের মন খারাপ হয়ে গেল। কিছু করার নেই তাই এরপর চললাম গুরুত্বপূর্ণ অন্য একটি ভবন দেখতে। সেটি হল হো চি মিন মিউজিয়াম,
হো চি মিন জাদুঘরটি ভিয়েতনামের এই প্রিয় নেতার জীবন ও সময়ের এক
মর্মস্পর্শী চিত্রায়ন। জনপ্রতি ১৪৫টাকার টিকিট কেটে আমরা ভিতরে ঢুকলাম।অনেক সময়
ধরে আমরা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলাম যে কত সুন্দর ভাবে হো চি মিনের একজন বিপ্লবী
মানুষ হয়ে ওঠার প্রক্রিয়াকে, তাঁর সূচনা থেকে শুরু করে দেশ
গঠন পর্যন্ত সামগ্রিক
জীবনকে পরম্পরা বজায় রেখে এই মিউজিয়ামে তুলে ধরা হয়েছে,এক
কথায় অসাধারণ।তাঁর দৈনন্দিন জীবনের দুর্লভ ছবি, নথিপত্র এবং
সাধারণ ব্যক্তিগত জিনিসপত্র দেখার সুযোগ পেয়ে নিজেকে ধন্য মনে হল।
এর পর আমরা ৫৪ নম্বর বাড়িটি পরিদর্শন করলাম। এই
বাড়িটি হো চি মিন তাঁর জীবনের শেষ বছরগুলোতে বাস করতেন, এই অনাড়ম্বর বাসস্থানটি দেখে তাঁর জীবন যাপন যে
কতখানি সাধারণ ও সরল ছিল তা বুঝতে পারলাম।
এরপর দেখলাম হো চি মিনের মাচার উপর বাড়ি,এটি ঐতিহ্যবাহী ভিয়েতনামী শৈলীতে নির্মিত এবং মহান
বিপ্লবীর শান্তিপূর্ণ আশ্রয়স্থল।বাড়িটি খুব ভালোভাবে সংরক্ষিত করা হয়েছে। বাড়িটির
চারপাশে রয়েছে একটি চমৎকার বাগান, বাগানের মনোরম পরিবেশ ও
ফুলের বাহার দেখে মন ভরে গেল।
আমাদের সাইক্লো রিক্সা সিটি ট্যুরের শেষ
পর্যায়ে ওল্ড কোয়ার্টারে
একটি বিশেষ রাস্তায় নিয়ে এলেন আমাদের চালক। তাঁর কাছে শুনলাম সন্ধ্যা বেলায সব
কাজ সেরে এখানকার মানুষজন ফুটপাতের কোণায় নিয়মিত খেতে ও পান করতে খুব পছন্দ করেন
শুধু তাই নয় সেখানে গভীর রাত পর্যন্ত দীর্ঘক্ষণ ধরে খাওয়া-দাওয়া আর অসংখ্যবার
বিয়ার পান চলতে থাকে। এটি এখানে স্থানীয় ঐতিহ্য এর নাম 'বিয়া
হোই' তাঁরা মনে করেন জীবন উপভোগ করার এবং নতুন বন্ধু তৈরি করার এটি
একটি মজার উপায়। ওল্ড কোয়ার্টারের সবচেয়ে বিখ্যাত বিয়ারের আড্ডা হলো এই বিয়া
হোই জাংশন।
কাছেই ওল্ড কোয়ার্টারের জনবহুল বাজারে আমাদের
ট্যুর শেষ হল, সেখানে
মিলেমিশে রয়েছে দোকানপাট এবং টাটকা স্ট্রিট ফুডের দোকান,এই
অঞ্চলে সবকিছুই পায়ে হেঁটে সহজেই ঘুরে দেখা যায়। এখানে মোট ছত্রিশটি গিল্ড স্ট্রিট, এগুলির
নামকরণ করা হয়েছিল ছত্রিশটি ব্যবসা বা কারুশিল্পের নামে। আজ মাত্র কয়েকটি
রাস্তায় সেই একই পণ্য বিক্রি হয় কিন্তু এখানে সবসময়ই ভিড় থাকে।
আমরা পথের পাশে একটি ক্যাফেতে বসে কফি আর স্যান্ড উইচ খেতে খেতে এই
ব্যস্ত জনজীবন ও তাদের সংস্কৃতি দেখতে থাকলাম। পথের ধারে সাইকেলে করে বিক্রেতারা তাজা ফুল
ও পাকা ফল বিক্রি করছে ও ক্রেতাদের সঙ্গে দরদাম নিয়ে কথোপকথন করছে, চা কফির দোকানে
পুরোনো বন্ধুরা দাবা খেলার জন্য জড়ো হয়েছে, এবং রাঁধুনিরা
গরম গরম ফোঁ ও বুন
চা বানিয়ে ক্রেতাদের পরিবেশন করছে। একদল কিশোর কিশোরী বেঞ্চ ও টেবিলে
বসে খাচ্ছে মশলা মাখানো মাছ ও বাদাম দিয়ে চালের নুডলস,তারা
নিজেদের ভাষায় গান গাইছে আনন্দে হৈচৈ করছে।ফুলের মিষ্টি সুবাস আর তার সঙ্গে গরম নুডুলস এর গন্ধ মিশে বেশ সুন্দর
একটা পরিবেশ তৈরি হয়েছে যা আগে কোনদিন পাই নি।আমরা খানিকক্ষণ শপিং করলাম ,ছবি তুললাম।তারপর পায়ে হেঁটে হোটেলে ফিরলাম। এরপর কিছুটা সময় বিশ্রাম নিয়ে
পরবর্তী যাত্রার জন্য প্যাকিং করলাম, তারপর ডিনার ও ঘুম।
পরের দিন আমরা হোটেল থেকে বেরিয়ে পড়লাম হ্যালং
বের উদ্দেশ্যে। বিষন্ন মন নিয়ে বিদায় জানালাম হ্যানয় শহরকে।স্মৃতির ঝুলিতে সযত্নে রাখলাম হোয়ান কিম লেকের কচ্ছপের জাদু তরবারি, জল পুতুলের রূপকথা আর
ভিয়েতনামের প্রিয় বিপ্লবী হো চি মিন সমাধি সৌধের শ্রদ্ধা স্মারক।
ইন্দ্রাণী বন্দ্যোপাধ্যায়


0 মন্তব্যসমূহ