সাম্প্রতিক

6/recent/ticker-posts

সোমা দত্ত: কবিতা

 


দীর্ঘ কবিতা



মরা গাঙে বান এসেছে


 

এক ভৌতিক গল্পে নদীটি এগিয়ে চলে নৌকার তালে

 

গাঢ় অমানিশি রং জলে ছলাৎছল

দুই পাড়ে গাছপালা যেন অচেতন

সুন্দরীর দেহ যত পাতলা হয়েছে,শালসেগুনশিশু, —শিমুলগামার এসেছে

মধ্যে মধ্যে জেগে ঘন বাঁশ ঝাড়ে-বুনোলতা যেন সাপ জড়িয়ে-মড়িয়ে বাড়ে

ভুতের শরীর যেন জেগে আছে ওতেজ্বলজ্বলে চক্ষুদুটি শ্বাপদের ক্রোধে

ঝিঁঝিঁ ডাকা রাত ভেঙে নদী-বুক কাঁপে,নৌকা এগিয়ে চলে ধীরে,সরুপথে

দাঁড় বাইছে যেতার ঘুম নেই চোখে, শহর কেড়েছে ঘুম কোনো অপরাধে

ছমছমে ভেজা হাওয়া ঘেঁটে দেয় চুল,উড়ন্ত ঘূর্ণিতার অবাধ্য আকুল

রং ওঠা পুরনো সেই সাদাকালো জামাহাওয়ায় উড়ছে যেন রাতচরা ডানা

উপরের বোতাম যত সেলাইবিহীন,ঢিমে তালে এলোমেলো নজরবিহীন

শরীরের দুই পায়ে কালো পাতলুন অন্ধকারে মিশে তার বহর দ্বিগুণ

জলের ধাক্কা যেন বিদ্রূপ করেএতবার মরে গেছ তবু আছো বেঁচে?...আজও?...কী আশ্চর্য জেদ

 

নিজেকে আঘাত করে নিজেকেই মারেহিন্দু ঘরে মন্দ ছেলে বেড়া ভেঙে ফেলে

ভালোবেসে জাতধর্ম ধুয়ে খাব তালেছাড় পাবে চাকরিতে মোছলমান হলে?

 

কী নির্লিপ্ত মৃত্যুভয়ে প্রশ্ন করে নদী

ভালোবাসা থাকে যদি বদলা পদবী

 

সে বলেছে কেন তাকে কেড়ে নেব,তারনামথেকে?

 

সেথা কহিন্দু তবে আমি ছাড়ি ঘরনাম ধাম বদলে হব তারকেশ্বর

নামাজ পড়ব তবে মন্দিরে গিয়েসেনে বেরা মনাম হিজাবের বেড়ে

প্রবল বিরোধ যত ঝাঁপিয়ে পড়েছে,সংখ্যালঘু নাম তার সামনে এসেছে

বাপ মায়ে বলে তারে ওরে নির্বোধপাঠাবে বাংলাদেশে হিন্দুবাদী জোট

সে সব হয়নি তবে একদিন ট্রেনে,কাটা পড়ে গেল লাশ দেখল সকলে

ছেঁড়া সালোয়ার আর অন্তর্বাসে,উন্মুক্ত শরীর যেনভয়ে কেঁপে ওঠে

কতজন মিলে তাকে আছড়ে ফেলেছেসে কথা কি ঢেকে যাবে ভয়ে আর ত্রাসে?

 

ছেলেটি

 

দরজায় দরজায় ঘুরেছে উন্মাদ প্রায়অপরাধী কোনো ভাবে যাতে সাজা পায়

অপরাধ সাজা পাবেআছো কোন দেশেশাস্তি পাবে বড় জোর অন্য কেউ এসে

শোনো ছেলে পুরুষ হয়েছ তাই বেঁচে গেছ প্রাণে

ফের যদি তরপাওঘরে যাওছোট বোন ঘরে আছেভয় পাও

সংখ্যালঘু হয়ে তুমি ছাড় পেলে ভাবোহিন্দুদের দোষ তবু তোমরাই দেখো

দাঁতে দাঁত, বুকে দাগ, মনে রক্ত ঝরেছেলেটি গুমরে কাঁদে বোনকে জড়িয়ে

তারপর ছেড়ে দেয় শহরের ঘরস্থির চোখে রক্ত ঝরে যেন অগ্নীশ্বর!

তারপর সে ছেলেটি ঘর ছেড়ে দেয়, শহরের মাটি থেকে রক্ত ধুয়ে যায়

মানুষ ডিঙিয়ে চোখ যত দূরে গেছেসে ছেলেটি সেই পথে নদীটির কাছে

নদীটি জেনেছে তার ব্যথা আছে যত, রেখেছে হৃদয়ে হাত ঠিকতাঁর মতো

সেও যেন এই ভাবেস্রোত অনুকূলে, সঙ্গে ডেকে নিয়েছিল স্বপ্নের ছলে

সেও যেন এমনই শান্তমৃদুধারানীরবের বীন্দ্রগীতি কানেছুঁয়ে থাকা

না থাকাই নিয়মিত অনিত্য প্রবাহেআকাশের নির্জনে তারাটি একাকী হাসে

ছায়াপথে তারা খসা জলের উপরিতলেএঁকেবেঁকে সরে যায়; সহজ জ্যামিতি ভুলে

কত কি সামগ্রী কার অতীতের ঘর থেকে, ভাসতে ভাসতে চলে জোয়ারের গতিপথে

ঠিকানা বদলকরে, কোন অচেনার দোরেএসে ঠেকে আজনবীদৃশ্যের অনুসারে

এগিয়ে চলেছে ছেলে অতল জলের ডাকেনৌকাটি জয়ীনুল

আবেদিন-আঁকা-স্ট্রোকে

শরীরের গলিতে যত নির্জন ঘাটস্রোতেরপ্রবাহ যেনএকটি গোপন রাত

ছলকে পড়েছে যত ঢেউ থেকে অভিগতপ্রশ্রয় পায় লোভ অতীতের সহজাত

নাবাল উর্বরতা বৈঠা চালিয়ে যায়,ক্রমশ গভীরে যেতে যন্ত্রণা বেড়ে যায়

পিঠের পিছনে ভার জমেছে বরফ যেনবুকের উপরে ফালা নদীখাত ক্রমাগত

সে যেন নিজের নাম ভুল করে ভুলে গেছে,অদৃশ্য গর্ভ শুধু ডেকেছে বেনামে তাকে

 

 

ধরে নিই ফারুক

ধরে নিই দীর্ঘদিন ফারুক নদীর বুকে, ছবির আবহ জুড়ে প্রেমটুকু বাঁচিয়ে রাখে

বছরের উপর বছর রোদে-জলে-শীতে,সুখ-দুঃখে-পোড়া-মন কোনো মতে বাঁচে

আঙুলের কর থেকে ডিজিটাল দেশ,ততদিনে জারি করে দিয়েছে আদেশ

জীবন এগোবে পাখির চোখে চোখ রেখে, ধর্ম ঠিক রেখে যাবে প্রাণের বিকাশে

ফারুক এফোঁড় ওফোঁড়চিরন্তন ক্ষত

শূন্য মাধ্যমে তাঁর যন্ত্রণাযত

সে যন্ত্রণা গোপনে জেহাদ জাগায়

শাখা লীন ধারাপাতে সন্ত্রাস ছড়ায়

ফারুক ভুলেছে তাঁর অবিদ্যা যত, ছিঁড়ে ফেলে সিলেবাস যত প্রথাগত

সকলই কল্পনা তবু ছবির সমীপে এমন একটি দৃশ্যে সুখ জেগে থাকে

ফারুক জন্মবিদ্ধ এক অন্বেষণের নাম, সে কথার সমর্থনপৃথিবীপ্রমাণ

এ কথার সূত্র ধরে যত বিজ্ঞান,ডিঙিয়েছে ধর্মনিষ্ঠ কঠোর অভিযান

কথার সূত্র ধরে যত অণু-পরমাণু, সবটুকু বিঁধে গেছে সংবেদ সমান

 

তারপর

 

তরুণ সমাধি ঘিরে জমা যত  শোকের পালক সবই উড়ে যায়

শহরের প্রতিটি ভালোবাসার নামে রাজনৈতিক প্রয়াস জুড়ে যায়

ব্যাভিচারঘিরেভিড়করাউত্তপ্তমানুষভুলেযায়নদীরবলাৎকার

নতুন সভ্য প্রাণের আভাসে গাছেরা মৃতসভ্যতার ধ্বংসস্তূপ

আসলে মিথ্যে যা কিছু আনাচেকানাচে,সেসব জীবনকে টানে সুকঠিন রাশে

সেই সব ধ্বনি থেকে যত জীবাণুর উন্নতিসুগঠিত দেহ আরনাগরিক বিধি

অসুখের কাঁধ ছুঁয়ে কেঁপে ওঠে আয়ুরেখাবুধশুক্র একঘরে কেতুযোনীদশা

হাতগুনে সংখ্যা মেনে ভাগ্য হয় যারশহরের কেন্দ্র থেকে ব্যাসার্ধতার

এককোণে পড়ে যত অনুপুঙ্খ যতিবিদ্রোহে কেঁপে ওঠে ধর্ম ভীরুমতি

 

এদিকে

 

শহর ছাড়িয়ে দূরে নদীটির চরে, জেগেছে সভ্যতা এক নতুন আধারে

পুরুষ সেখানে যত নামটি ফারুকবিশাখা মেয়ের নাম চিরজাগরূক

ধর্ম সেখানে শুধু নদী আর জলমন্দির মসজিদ আকাশ উপরিতল

সে গ্রামের মেয়েরা সব পুরুষের পাশে বেড়ে ওঠে নিরাপদে মাটি আর ঘাসে

ফারুক প্রপিতামহ, নদীটি মাতৃসমভালোবাসা ঘিরে বাঁচে চিরসখা টানে



 সোমা দত্ত

 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ