তমোঘ্ন মুখোপাধ্যায়

 



ঐহিক


 

ঈশ্বর-ব্যাপারে আমাদের মাথা গাঢ়, সাদা। যেই শিরা তুলে ছুরি কাটতে যাচ্ছি, বক্র সহচর এসে ছুরি বদলে ফল রেখে যাচ্ছে! ফল অসীম পর্যন্ত গড়াবে। নৃত্য বুঝতে পারবে না কিংবা পারবে। আবার বিন্দুতে ফিরে এসে দেখবে হাত কিন্তু তেমনই পেলব। দপদপ করে দিন কাঁপছে। আমাদের বিল্বপত্র মুখে তুলে ইঁদুর ছুটে পালিয়ে গেল। ও মুরারি! রোষ নেভাও। রোষ নেভাও। দিন কোলে নিয়ে এই আমি তোমার শ্রীচরণকমল জড়িয়ে বসলাম। মাথা ফেনার মতো লঘু হয়ে যাচ্ছে। একেই দহন ব’লে গুণিন আমাদের নরম নরম মা-দের মাথা খেল। ফেনা সরানোর দক্ষিণায় সেই শিরাই ফিরে এল কিন্তু। অতএব কেন্দ্রাতিগ ভেবে যে উদ্‌গীথ থেকে আমরা গ্রীবা সরিয়ে নিয়েছি, তা আদপে কেন্দ্রের দিকে পুরাকাল থেকে গড়িয়ে আসছে। আমাদের মাথা গাঢ়, সাদা। মূর্তি যত কালো হয়ে এল, স্নায়ু তত ধর্মাধর্মে জ্বলে গেল ধীরে।

 

ঈশ্বর-ব্যাপারে আমাদের চোখ বর্তুল, নীল। আপাতত সমুদ্রে আমাদের আহুতি অবগাহন বুঝতে বুঝতে কাঠ হয়ে যাচ্ছে। কাঠ আনো, উনুনের হাঁ-মুখে ঠুসে দাও; যেন ডাইনির পদযুগল জ্বলছে ভাতের দেমাকে! এমন দৃশ্যে চোখ অভ্যস্ত নয়। ফলত অক্ষিগোলকের মুহুর্মুহু আয়ু ফুরানোর ঘটনায় আমাদের সিদ্ধাই খসে যায়। বাকল খসে মারা গিয়েছিল যে বিপুল অশ্বত্থ, তারই তো হেঁটমুণ্ড হওয়ার সত্য শেষ। এই কালো জাদুর গ্রামে আমরা পতনের শব্দ পেলাম বহুবার! ‘ন হন্যতে হন্যমানে শরীরে’ উল্কিমাখা অজের বলি দেখতে দেখতে এই এতদূর এসে সমুদ্র পেয়েছি। অথচ সাঁতারের ভেতর এত বালি, এত মাছ, এত খঞ্জ ঢেউ মুখের কোটরে ডিম রেখে উড়ে যাচ্ছে, মনে হচ্ছে প্রণাম শুধুমাত্র দু-হাতের রমণ, নিমিত্তমাত্র হতে হতে আমাদের বাথানেই ভোগ সাজাতে আসবে সন্তের পুঞ্জ। দুই চোখ একই বিগ্রহ দু-রকম ভ্রমে দেখছে। আমাকেই সব্যসাচী বলো। আমার ধনুক খসে না।

 

ঈশ্বর-ব্যাপারে আমাদের মাংস উদ্বায়ী, লাল। এক কমিউন থেকে অন্য কমিউনে কীর্তন পাঠিয়ে আমরা রাষ্ট্র বজায় রেখেছি। আমাদের রক্তিম মাংসে চেরি ফলের মতো প্রতিমার মণ্ড পড়ে আছে। অথচ ঈশ্বর আমিষ ও নিরামিষ উভয় থেকেই বহু দূরে অবস্থিত— এই প্রবাদ জন্তুর রতির মতো বাড়ে। সুতরাং গোপন রাখা শ্রেয়। কষাই রোজ মণ্ড সরিয়ে রেখে ঘরে ফিরে থরথর ক’রে কাঁপছে, যেন মুহূর্তে একটি বিশাল নখ ফালাফালা করে দেবে পেটের কুম্ভ, অথচ বৃত্তিই প্রকৃত অর্চনা বুঝে সন্ন্যাসের দিকে এগোতে পারছে না। মাংস উদ্বায়ী— একে যতই আপ্তবাক্য বুঝে সরে আসি অরণ্যের তটে, ভিতরে হরিণ ছেঁড়ার দৃশ্য কিন্তু বিপরীত সত্যই দ্যাখায়। তবে কি দ্যাখার আড়ালে আমাদের বোধ পৌঁছায় না বলেই এত সীমিত হয়ে গেল করোটির আয়তন? আমাদের প্রবোধ দাও, প্রাণগোপাল! বলো, যা দেখি ও দেখি না, সমস্ত জলের পাঁচিল; ওপারে যা ঘটে ও ঘটে না, সমস্তই পঞ্চভূত অচ্ছুৎ মেনেছে। নচেৎ হত্যাই ব্রহ্ম মেনে আমাদের স্থিতি, প্রমা অণ্ড মোচড়ানোর মতো বিনির্মাণ হবে। নির্মাণ পেরোতে গিয়ে হাঁটুর চাকতি তুবড়ে যাচ্ছে, আমরা বিনির্মাণ ছুঁতে পারব কখনও?

 

ঈশ্বর-ব্যাপারে আমাদের জিভ লঘু, কালো। আঁধার চেটে বসে আছি আমরা চুল্লির গণ্ডিতে। গনগনে মড়ার স্বাদ পাব, পোড়া ধমনীর স্বাদ চিনব— গুরু-আজ্ঞা এমনই। জিভে ফুল জাগানোর বিদ্যা থেকে আমাদের সযত্নে দূরে সরিয়ে রেখে পূর্ণ কিন্নর হতে দেননি যে পরম পিতা, তাঁকে প্রণাম। খাদ্যবোধ সর্বনাশা হয়ে যেত এই সামান্য দোষে, আমরা জানতেও পারতাম না! প্রতিটি লেহন সাত্ত্বিক নয়, প্রতিটি স্তম্ভন সফল হয় না, অথচ এই গূঢ় তৃপ্তি ছেড়ে আসতেও পারছি না কত শতক! চুল্লির ভেতরের খবর আমরা পাই না, শুধু বাইরে বরফ নামার সমান্তরাল উল্লম্ব দৃশ্য জেগে উঠলেই আমাদের খিদের লাগাম ফসকে যায়। জিভ পন্নগের মাথার মতো শব্দ করতে করতে এগিয়ে আসে। আঁধার এই খসখসে বস্তুর স্পর্শ সহ্য করতে পারে না আর; আগে ভিজে-ভিজে মৃদু যাতায়াত ছিল, এখন ত্বক উপড়ে নেওয়ার যাচ্ঞা লেহনে প্রকট যেন। ত্রাহিমাম ত্রাহিমাম শুনতে শুনতে আমরা তুরীয় আনন্দে গর্ভগৃহের মেঝে চাটছি। ও ঈশ্বর, এত স্বচ্ছ পাথরে যেন পিছলে যেও না!

 

ঈশ্বর-ব্যাপারে আমাদের হাড় ঠুনকো, সবুজ। এইখান থেকেই চাষের সূত্রপাত। ভূমি সংস্কারে এসে মন্ত্রসিদ্ধ রমণী একটি বৃহৎ বৃষের জঙ্ঘার হাড় বুলিয়ে দিয়ে গেছে মাঠে। বছর ঘুরতে না ঘুরতেই শস্যের মুকুর পেয়ে ঝকঝক করছে মাঠ। ইহ তিষ্ঠ লক্ষ্মীমাতা, ইহ তিষ্ঠ শস্যসুন্দরী! হাড় সাবধানে রাখতে হয়, ঝাল দেওয়ার আগে ও পরে বীজমন্ত্র পড়তে হয় অলক্ষ্যে। আমাদের পুত্র-পৌত্রের অক্ষরজ্ঞান হল না, ওরা বুঝবে কী করে মন্ত্রের কোথায় থামলে ফল বিপরীত হয়? এ গল্প প্রাচীন; মন্ত্রের ঊরুতে থেমে বিঘে-বিঘে জমি বন্ধ্যা করে ফেলেছিল পাশের গাঁয়ের কেউ। হাড় ওঠেনি হাতে। ছোঁয়া মাত্র গুঁড়ো হয়ে হাওয়ায় মিশে গিয়েছিল লহমায়। আমরা মাঝরাতে উপরে তাকাতেই চোখে পড়ে সবুজ হাড়ের গুঁড়ো আকাশ ফুটো করে ছড়িয়ে রয়েছে। এভাবেই রাশিসমূহের সূত্রপাত। হাড় থেকে ধাতু খসে পড়ছে, আমরা নুয়ে পড়ছি ভয়ে। একে প্রণাম ভেবে মন্দিরগুলি উৎসাহে দুলে উঠছে। অথচ এত ঠুনকো কাঠামো নিয়ে আমরা শ্রদ্ধা জাগাতে পারি। হাড় জাগানোর চেষ্টায় বউগুলো ক্রমে শাপ দিতে দিতে নিভে গেল শেষরাতে। ইহ তিষ্ঠ লক্ষ্মীমাতা! উহাদের জরায়ু ভরাও।

 

ঈশ্বর-ব্যাপারে আমাদের পা তরল, হলুদ। অক্ষৌহিনী সূর্যমুখী জঙ্গম যেন জগৎ বরাবর! অথচ তরল; যেখানেই রাখছি, কী অদ্ভুতভাবে সে-স্থানে একাত্ম হয়ে যাচ্ছে। চলন পেরিয়ে আমরা গমন অবধি এলাম। এ খেলা ঐশ্বরিক। এরপর সরণ। শুরুতে তার মান থাকবে, ক্রমশ সমস্ত গমন বৃত্ত বরাবর সঞ্চালিত হতে থাকলে সরণ শূন্য হয়ে যাবে। অতঃপর আবর্তনে ঢুকে পরিক্রমা শেষ কিংবা শুরু। লোকভেদে মাহাত্ম্য বদলে যায়। এতে সংযম ছাড়া অন্য কিছু কাম্য নয়। অথচ তরল; কক্ষপথ বরাবর ছিটকে যাচ্ছে দূর্বা, ঘটের কদলী, আম্রপত্রে সিঁদুরের রিপু, বাতাসা... এভাবে পুজো শেষ হয়ে যাবে। আমরা বরাহ অবতারের থকথকে শরীর শিকারে জঙ্গলের গভীরে যাব। বাঁশির শব্দ না কি ভয়ের গর্জন? খোকারা দোরের ওপাশে রমণী দোলাচ্ছে না কি স্বেচ্ছায় রমণী দুলছে খোকাদের শলাকায়, আমরা আর ভ্রূক্ষেপ করি না। শিকারে বেরিয়ে আর মায়া নেই। শুধু পা তরল ব’লে গতি গড়িয়ে গড়িয়ে চলে গেল বরাহের রোষ অবধি। সূর্যমুখীর আর্তব ভেবে চেটে নিল অবতার তরল। আমাদের গতি খেয়ে সে এখন স্থবির, বিশ্বাস...

 

ঈশ্বর-ব্যাপারে আমাদের আয়ু স্থাণু, গোলাপি। ছায়া চওড়া হতে হতে পথ কমে এল। স্থির হ্রদ কত তাণ্ডব ধরে রাখে অর্বুদ তৈজসে, তার কোনো চিহ্নই আমরা ঘুণাক্ষরে দেখিনি। ক্ষেত ছাপিয়ে, আকাশ ছাপিয়ে, করোটি পুঁতে জন্ম নিল ত্রিপাদ ভূমি, যেন তামস ভূমির ঊর্ধ্বে ভ্রমের কুণ্ডলী ছেয়ে ফেলছে সিদ্ধি, আত্মরতি। আমরা এই কুম্ভীপাকে অভ্যস্ত হয়ে হাতে করাত চালিয়ে রেখা গাঢ় করতে করতে মাংস অবধি পৌঁছালাম। চিদানন্দ লাল রসে এতটুকু নেই। রেখা গাঢ় করতে করতে ক্রমে হাড় বেরিয়ে গেল। গান বেরিয়ে গেল। গলায় শকুন নেমে ছিঁড়ে দিচ্ছে ঋষভ, নিষাদ। আয়ু স্থাণু; শ্মশান সরে আসছে অন্য শ্মশানের দিকে, চাপে চিতা ফাটার আওয়াজ উঠছে। তৈজস উলটে যাচ্ছে তাপে, অথচ লৌকিক ভূমিতে তাণ্ডবের গতর গড়িয়ে পড়তেই অরণ্যের মাথা জেগে গেল। বনবিবির বর্তুল স্তনের ধার বরাবর ছুটে যাচ্ছি আমরা হরিণ-শিকারিরা। দৌড় যত পেশির অবয়ব টপকে যাচ্ছে, আমরা শিকারের প্রতি দয়া-দাক্ষিণ্য তত কুপিয়ে কুপিয়ে ভোঁতা হয়ে যাচ্ছি। রেখাও ভোঁতা হয়ে এল, হাড় চাপা পড়ে মাংসের বাথান ঘন হতে হতে আমরা সৃষ্টির আদি অবধি বেড়ে উঠলাম। ছায়া জ্বলে যাচ্ছে, অনঙ্গমোহন! গোলাপি বহ্নির ভেতর তোমার শৃঙ্গার দেখছি সারারাত...

 



 

৪টি মন্তব্য: