শ্রীশুভ্র ~ শঙ্খভুবনের দিগন্তে




শঙ্খ ঘোষ চলে গেলেন। রেখে গেলেন বাংলাসাহিত্যে এক নতুন ধারা। অনুসন্ধানমূলক গবেষণাধর্মী সাহিত্যধারা। না, এই কথা বলার উদ্দেশ্য এই নয়। এই ধারা শঙ্খ ঘোষই প্রচলন করেছেন সর্বপ্রথম। কিন্তু শঙ্খ এই ধারাকে প্রায় একক কৃতিত্বে সাবালক করে দিয়ে গেলেন। বাংলা সাহিত্যে সমালোচনা সাহিত্যধারা এমনিতেই বেশ দুর্বল। মূলত পাঠকের আগ্রহের অভাব। এবং প্রকাশকের অনীহা। ফলে যাঁরা তেমন যোগ্যতাও ধরেন। তাঁরা লেখার প্রেরণাও পান না ঠিকমত। পেলেও তার বাজারদর নেই তেমন। ফলে সব মিলিয়ে একটা অন্ধকার রয়েই গিয়েছে। না, সেই অন্ধকার শঙ্খও যে দূর করে দিয়ে যেতে পেরেছেন। সেকথা জোর দিয়ে বলার সময় আসেনি এখনো। কিন্তু তিনি অনুসন্ধানমূলক গবেষণাধর্মী সাহিত্যধারাকে সরাসরি সাধারণ পাঠক সমাজের হাতের কাছে নিয়ে আসতে সফল হয়েছেন অবশ্যই। অন্তত শঙ্খ ঘোষের পাঠক মাত্রেই জানেন, টিকা সর্বস্ব একাডেমিক গবেষণা গ্রন্থের থেকে শঙ্খের সাহিত্যের আলোচনা সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী। একাডেমিক পরিসরের বাইরে সাহিত্যের সাধারণ পাঠককে নিয়ে এসে তিনি সাহিত্য নিয়ে ভাবনা চিন্তা করার এক অমোঘ শক্তি ও স্বাধীনতা তাঁদের হাতে তুলে দিতে পেরেছেন। এখানেই শঙ্খ ঘোষের অন্যনতা। বাংলাসাহিত্যের পাঠক হয়তো বলতেই পারেন। কেন, স্বয়ং রবীন্দ্রনাথই কি সকলের আগে এই একই কাজ শুরু করে দিয়ে যাননি? অবশ্যই গিয়েছেন। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের তিরোধানের পর এই ধারায় শঙ্খ ঘোষের মতো একজনের অভাব ছিল বহুদিনই। শঙ্খ যে শুধু সেই শূন্যস্থান পূরণ করেছেন তাই নয়। রেখে গিয়েছেন আপন নিজস্বতার এক অনন্য স্বাক্ষর।


শঙ্খ ঘোষের কবিতার পাশাপাশি এক বৃহৎ সাম্রাজ্য শঙ্খ ঘোষের গদ্য। বাংলা সাহিত্যের গভীরে ঢুকতে হলে। শঙ্খের গদ্যকে আর কোনভাবে অস্বীকার করা সম্ভব হবে না। এবং বিশেষ করে পরবর্তীতে রবীন্দ্র গবেষণার সকল ধারাতেই শঙ্খ ঘোষ এক বড়ো রেফারেন্স হয়ে আলো দিতে থাকবেন। এই একটি বিশেষ দিগন্ত। যেখানে শঙ্খ প্রতিভার বিস্ময়কর প্রভাবে রবীন্দ্রনাথকে নতুন করে প্রত্যক্ষ করতে আমাদের সামনে একটা মস্ত বড়ো পরিসর খুলে গিয়েছে। এবং সবচেয়ে বড়ো কথা সেই পরিসর খুলে দিয়ে গিয়েছেন তিনি একাডেমিক পরিসরের একদম বাইরে বেড়িয়ে এসে। আমি বলতে চাইছি, এইখানেই বাংলাসাহিত্যে তাঁর অবিস্মরণীয় অবদান আগামী বেশ কয়েক শতক আমাদের বিশেষ উত্তরাধিকার হয়ে রয়ে যাবে। একজন মানুষের পক্ষে এ বড়ো কম কথা নয়। রবীন্দ্র প্রতিভা এবং ব্যক্তিত্বের সমুদ্রে শঙ্খ যেন এক রত্নাকর। শুধু রত্নাকরই নন। রবীন্দ্রমানসের এবং রবীন্দ্রসত্তার মহা সমুদ্রে শঙ্খের আজীবন অভিযান। সেই অভিযানে তিনি একা নন। তিনি আমাদেরকেও সাথী করে নেন। আমাদেরকে সাথী করে নেওয়ার সেই জাদুদণ্ডই শঙ্খের অর্জিত প্রতিভা। যে সাধনায় সিদ্ধিলাভ করেই বাংলাসাহিত্যে তাঁর অবিস্মরণী কীর্তি রেখে গেলেন কবি শঙ্খ ঘোষ। আমাদের জন্য এবং পরবর্তী বহু প্রজন্মের বাঙালির জন্য যা এক অনন্য উত্তরাধিকার স্বরূপ। শঙ্খের কবিতা নিয়ে বহু আলোচনা হয়ে থাকে। সেই তুলনায় তাঁর গদ্য বিষয়ে আমরা হয়তো কথাবার্তা কম বলি। তার একটি কারণ এই হতে পারে। কবিখ্যাতির বেদীতেই আমরা তাঁকে দেখতে বেশি অভ্যস্ত। কিন্তু শঙ্খ ঘোষের গদ্য, বাংলাসাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ। শঙ্খ ঘোষের সাহিত্যপ্রতিভার আলোয় উদ্ভাসিত ও সমৃদ্ধ।


শঙ্খ ঘোষের গদ্যের একজন পাঠক বিস্ময়ের সাথে আবিষ্কার করেন। শঙ্খ কখনোই সরাসরি তাঁর আপন মত বা বক্তব্য জোর করে পাঠকের উপরে চাপিয়ে দেন না। আমরা আমাদের অধিকাংশ আলোচনায় ঠিক যে ভুলটাই করে থাকি অহরহ। শঙ্খ প্রথমেই তাঁর অননুকরণীয় শৈলীতে পাঠকের সামনে ধীরে ধীরে বিষয়টির নানান দিক মেলে ধরতে থাকেন। পাঠক আস্তে আস্তে বিষয়ের গভীরে ঢুকতে থাকে। তারপর শঙ্খ বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টিকে নাড়াচাড়া করতে থাকেন। যত রকম বিপরীত ভাষ্য থেকে একটি বিষয়কে অনুধাবনের চেষ্টা করা যায়, সেই চেষ্টাই করতে থাকেন তিনি। তার জন্যেই একটি পর একটি যুক্তির উপস্থানা করে চলেন শঙ্খ। এবং প্রত্যেক যুক্তির যুক্তিযুক্ত বিশ্লেষণ করতে করতেই একসময় তিনি মূল বিষয় সম্বন্ধে উপলব্ধির একটি শক্ত ভুমিতে দাঁড় করিয়ে দেন তাঁর পাঠককে। সেই মুহুর্তে পাঠক নিজেই উপলব্ধি করতে সক্ষম হয় শঙ্খ ঘোষের দৃষ্টিভঙ্গীর দিগন্ত। এবং আশ্চর্য্যের বিষয় পাঠকও শঙ্খের দৃষ্টিভঙ্গীর সাথেই একাত্মতা অনুভব করতে শুরু করে দেন। আর এইখানেই শঙ্খের অনন্যতা। যে কোন বিষয়ের বিভিন্ন ইন্টারপ্রেটেশনকে তিনি পরতের পর পরতে এমন ভাবে তুলে ধরতে থাকেন যে পাঠকের সামনে প্রায় চলচিত্রের মতো সমগ্র বিষয়টি নানান ভাবে উন্মোচিত হতে থাকে। এই যে ক্রমিক উন্মোচন। এর ভিতর দিয়েই শঙ্খ প্রায় একজন আন্তরিক গাইডের মতো তাঁর পাঠককে নিয়ে এগিয়ে চলতে থাকেন। পাঠকও অনুভব করতে থাকেন শঙ্খের সংবেদনশীল মননের বন্ধুত্বের হাতটি যেন পাঠকের হাতেই ধরে রাখা। ফলে লেখক গবেষক এবং সত্যান্বেষী সাহিত্যের পথিক শঙ্খ ঘোষের সাথে তাঁর লেখার ভিতর দিয়েই পাঠকের একটা অন্বয় তৈরী হতে থাকে। তৈরী হতে থাকে একটা সংবেদী সংযোগ। আর এই সংযোগের সূত্র ধরেই লেখক ও পাঠকের ভিতরে কখন যে একটা আন্তরিক সম্পর্ক দাঁড়িয়ে যায়। পাঠক খেয়াল রাখতে পারে না। কিন্তু খেয়াল যখন হয়। তখন দেখা যায়, শুধু শঙ্খই নন। শঙ্খের তুলে ধরা বিষয়ের সাথেও পাঠকের একটা গভীর সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। এইভাবে শঙ্খ ঘোষের অননুকরনীয় লিখন শৈলী তাঁর লেখার চলনের ভিতর দিয়ে পাঠককে, পাঠকের নিজস্ব চেতনার ভুবন থেকে টেনে নিয়ে আসে শঙ্খ ঘোষের চেতনার ভুবনে। এ যেন কাউকে নিজ গৃহে অভ্যর্থনা করে নিয়ে আসার মতোনই।


শঙ্খ ঘোষের গদ্য ঠিক সেই রকমই এক অভর্থ্যনার দিগন্ত। তিনি চলে গিয়েছেন। কিন্তু রয়ে গিয়েছে একান্ত অভ্যর্থ্যনার সেই ভুবন। সেই ভুবনে অনাগত দিনের জন্য তিনি রেখে গিয়েছেন শাশ্বত আমন্ত্রণ। শঙ্খ ঘোষের লেখার সূত্র ধরে আমরা আরও একটি জগতে পৌঁছিয়ে যেতে পারি। আমাদের প্রতিদিনের যে জীবন যাপন, দৈনন্দিন সেই জীবনযাপনের পরতে পরতে আমাদের সময় ও আমাদের সমাজের যে প্রভাব নিত্য ছায়াপাত ঘটায়। সেই ছায়ায় কিভাবে গড়ে উঠতে থাকে আমাদের নিজস্ব এক একটি মুখোশ। যে মুখোশের আড়ালে ধীরে ধীরে তলিয়ে যেতে থাকি আমরা। অথচ টের পাই না। শঙ্খ আমাদের সেই অসাড় চেতনায় সাড় ফিরিয়ে নিয়ে আসেন। তাঁর সাহিত্যের আলোচনার ভিতর দিয়ে। কারণ সাহিত্য সমাজেরই দর্পণ। সমাজ সেই আমাদেরকে নিয়েই। তাই সাহিত্যের পরতে পরতে আমাদের জীবনযাপনের নানাবিধ অসংগতিগুলি কিভাবে উঠে আসতে থাকে, কিভাবে উঠে আসতে পারে। এবং কেন এই উঠে আসা একান্তই দরকার। শঙ্খ সেই বিষয়গুলির উপরেই আলোকপাত করে যেতে থাকেন নিরন্তর। ক্লান্তিহীন ভাবে। তাই শঙ্খ ঘোষের লেখা পাঠ করা মানে আমাদের প্রতিদিনের জীবনের সাথে খুব স্পষ্ট করে মুখোমুখি হওয়ারও একটা অবসর পাওয়া। শঙ্খের লেখা সম্বন্ধে এই একটি অন্যতম সত্য কথা। তাঁর লেখার ভিতর দিয়ে যতই ভ্রমণ করা যেতে থাকে ততই আমাদের চারপাশ আমাদের বোধের কাছে অনেক বেশি স্পষ্টতর হয়ে দেখা দিতে থাকে। এক অবিসংবাদী আলোকিত চেতনায় ঋদ্ধ হওয়ার সুযোগ ঘটিয়ে দেন শঙ্খ। না, আগেই বলেছি। পাঠকের মগজের দখল নেওয়ার অভিপ্রায় নিয়ে তিনি লেখন না। লেখেন নি কোনদিন। বরং পাঠককেও তিনি তাঁর নিজের এগিয়ে চলার ছন্দের সাথে সামিল করে নিতে পারেন। এইভাবে লেখক পাঠক সম্পর্কের ভিতরে যে আত্মীয়তার সাঁকোটা দাঁড়িয়ে যায়। তাতে শুধুই যে পাঠক লেখকের কাছে পৌঁছানোর পথ খুঁজে পায়, তাই নয়। সেই সাঁকোতেই আমাদের শঙ্খ ঘোষ তাঁর পাঠকের হাতটুকুও ধরে রাখতে চান। শঙ্খ সাহিত্য তাই একটা সাঁকোর মতোন বিরাজ করতে থাকে। পাঠকের চেতনায় আলো ছড়িয়েই ক্ষান্ত হন না লেখক। নিজেকেও সেই একই আলোতে বার বার পরিশুদ্ধ করে নিতে চান। সেই আলোতেই মুখোমুখি দেখা করে নেন তাঁর পাঠকের সাথেও। এই অনির্বচনীয় অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ শঙ্খ ঘোষের সাহিত্য। যে সাহিত্য বাংলাসাহিত্যের জগতকে আগামী কয়েক শতক পেরিয়েও আলো দিতে থাকবে। নিরন্তর।

 

১৪ই জুন’ ২০২১


ছবি ঋণ: গুগল


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন