সাগর বিশ্বাস

 




 

এবং সইকথা-সাক্ষাৎকার  জুন’২০২১

 বং ক সইকথা-ঈবংসাক্ষাৎকার   এবং সইকথা-সাক্ষা

এবং সইকথা :এবং সইকথার পক্ষ থেকে আপনাকে স্বাগত। অর্ধ শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে আপনার যে লেখক জীবন তার শুরুর দিনগুলোর কথা একটু জানতে চাই।  

 

সাগর বিশ্বাস: ছেলেবেলায় গল্পের বই পড়ার নেশা জন্মেছিল। আমার পাঠতালিকায় তখন মূলত স্বপন কুমার,শশধর দত্তদের গোয়েন্দা-গল্প আর শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়-এর গল্প - উপন্যাস। পড়তে পড়তেই কবে যেন লেখার ইচ্ছে জেগেছিল। স্কুলের মাস্টারমশাইরাও জানতেন আমি লুকিয়ে লুকিয়ে কিছু লেখালেখি করি।একবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইউ.এস.আই.এস.থেকে সারা পূর্ব পাকিস্তানের হাইস্কুলগুলিতে ছাত্রদের মধ্যে প্রবন্ধ প্রতিযোগিতার আয়োজন হয়। আমার বাংলার দুই মাস্টারমশাই নলিনীরঞ্জন দাস ও শামসুল আলমের উৎসাহ ও প্ররোচনায় সেই প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে পুরস্কৃত হই। আমার তখন নবম শ্রেণি। প্রত্যন্ত এক গ্রাম্য বিদ্যালয়ের পক্ষে সে ছিল এক গৌরবের দিন। সেই থেকে আমার শিক্ষকেরা ক্রমাগত আমাকে লেখার কাজে উৎসাহ জোগাতে থাকেন।

 

এবং সইকথা:  আমার শৈশবের শ্যামল কাকুকে অনেক পরে বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক, নাট্য সমালোচক , কবি , গল্পকার ও 'একুশ শতাব্দী' পত্রিকার সম্পাদক সাগর বিশ্বাস রূপে আবিষ্কার করি। এই নাম বদলের গল্পটা যদি একটু বলেন কাকু ।  


 

সাগর বিশ্বাস: তোমার শৈশবে যখন তুমি আমাকে দেখেছ, তার আগেই লেখার জগতে আমার নাম বদল হয়ে গেছে। লেখকের ছদ্মনাম গ্রহণ করা একটা সাধারণ ও চিরাচরিত প্রথা। তবে এক্ষেত্রে তুমি একে ছদ্মনাম বলতেও পারো, নাও পারো। কেন বলছি, সেই একান্ত গোপন কথাটি আজ তোমাকে বলি। তুমি যাকে কাকিমা বলে জানো, রবীন্দ্রানুরাগী সেই মহিলা প্রাক্ বিবাহ পর্বে ওই নামে সম্বোধন করে আমায় চিঠি লিখতেন। নামটি তারই উদ্ভাবন। আমি সানন্দে গ্রহণ করেছি মাত্র। অমন একটা অনন্ত অসীম নাম কেন বেছেছিলেন তা অবশ্য জানা নেই আমার।

 

এবং সইকথা:  আপনার লেখকসত্ত্বার গড়ে ওঠার পেছনে কোনও বিশেষ মানুষ বা সেই সময়ের রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রভাব কতটা ক্রিয়াশীল ছিল বলে মনে করেন আপনি?

 

সাগর বিশ্বাস: একথা ঠিক, পশ্চিমবঙ্গে এক বিশেষ রাজনৈতিক ক্রান্তিকালে আমার লেখক হিসেবে আত্মপ্রকাশ। তখন ( ১৯৬৭ ) এই রাজ্যে সর্বপ্রথম কংগ্রেস বিরোধী যুক্তফ্রন্ট সরকার ভেঙে গেছে। জারি হয়েছে রাষ্ট্রপতির শাসন। রাজনৈতিক ঘূর্ণাবর্তের মধ্যেই প্রস্তুতি চলছে অন্তর্বর্তী নির্বাচনের। রাজ্যের প্রতিটি দিনই তখন আন্দোলনমুখর।

 

এরকম সময়ে ১৯৬৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আমার একটি সামাজিক - রাজনৈতিক নিবন্ধ প্রকাশিত হল তখনকার অত্যন্ত জনপ্রিয় পত্রিকা 'সাপ্তাহিক বসুমতী'তে। সেই প্রথম লেখা প্রকাশের পর পত্রিকা কর্তৃপক্ষ, বিশেষত অন্যতম নির্বাহী সম্পাদক দিলীপ চক্রবর্তী ক্রমাগত আমাকে অনুপ্রেরণা দিয়েছেন এবং প্রয়োজন অনুসারে লেখা আদায় করে নিয়েছেন। সময়ের দাবি অনুযায়ী অনেক সাংবাদিকতা ধর্মী লেখাও তখন লিখেছি। ক্রমে পত্রিকার লেখকগোষ্ঠির একজন হয়ে গিয়েছি। কাজেই আমার এই হয়ে ওঠার পিছনে ওই আপসহীন সাংবাদিক দিলীপ চক্রবর্তীর ভূমিকা আমি কোনোদিন ভুলে যেতে পারি না।

এবং সইকথা:   ভাষা শহিদের স্মরণে এ দেশে ২১ ফেব্রুয়ারি  যেভাবে পালন করা হয় সেভাবে উনিশে মে পালন করা হয় না। যে দুএকজন এই দিনটিতে বিশেষ স্মরণ অনুষ্ঠান করে আসছেন তাঁদের মধ্যে আপনি অন্যতম। ভাষা আন্দোলন এই  একবিংশ শতকের প্রথম পর্যায়ে দাঁড়িয়ে কতটা প্রাসঙ্গিক বলে আপনি মনে করেন এবং এই বিষয়ে আপনার মতামত জানতে আগ্রহী আমরা।

 

সাগর বিশ্বাস: কলকাতায় ঋষিণ মিত্রের আগে কেউ ওই দিনটি উদযাপন করেছেন বলে জানিনা। আমরা ওখান থেকেই অনুপ্রাণিত হয়ে ১৯৯৭ সাল থেকে উনিশে মে উদযাপন শুরু করি। ' একুশ শতাব্দী ' আয়োজিত সেই প্রাথমিক অনুষ্ঠানে নীতিশ বিশ্বাস আমন্ত্রিত হয়ে মাতৃভাষার উপর মনোজ্ঞ বক্তব্য রাখেন এবং অনতিবিলম্বে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে উনিশের অনুষ্ঠান প্রচলন করেন। বন্ধু নীতিশ মাতৃভাষা আন্দোলনের নিরলস কর্মী। আজ যখন হিন্দি আগ্রাসনে মাতৃভাষা রাজ্যে রাজ্যে বিপন্ন, তখন ভাষা আন্দোলন আরও বেশি প্রাসঙ্গিক মনে করি ।

এত বছরে আমাদের আয়োজিত উনিশে মে-র অনুষ্ঠান অনেক বিশিষ্টজন এসে সমৃদ্ধ করেছেন; যেমন শিলচর থেকে এসেছেন স্বয়ং পরিতোষ পালচৌধুরী, হাইলাকান্দি থেকে নিশীথরঞ্জন দাস, শান্তিনিকেতন থেকে সোমেন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায়, বাংলাদেশ থেকে বেনজিন খান,স্বরোচিষ সরকার, আন্দামান থেকে জোতির্ময় রায়চৌধুরী, কলকাতা থেকে অনিমেষকান্তি পাল, কৃষ্ণা বসু,তরুণ সান্যাল, পবিত্র সরকার, প্রতুল মুখোপাধ্যায়, যশোধরা রায়চৌধুরী, স্বপ্নময় চক্রবর্তী, পার্থ ঘোষ, গৌরী ঘোষ, জগন্নাথ বসু, কপিলকৃষ্ণ ঠাকুর, শ্রীজাত, তিলোত্তমা মজুমদার, তারাপদ আচার্য, বাঁধন সেনগুপ্ত, শিলচরের শ্যামাদাস ভট্টাচার্য, সমরবিজয় চক্রবর্তী প্রমুখ। পাশাপাশি থেকেছেন বহুসংখ্যক মাতৃভাষা অনুরক্ত গুণিজন ও সাধারণ মানুষ। তাঁদের প্রতি আমরা সততই কৃতজ্ঞ।

 

এবং সইকথা:  নাটক ও থিয়েটার বিষয়ক আপনার প্রচুর কাজ রয়েছে। আপনার প্রবন্ধের বই ‘সময়ের শব্দ’তে এই বিষয়ে অনেক লেখা আমাদের সমৃদ্ধ করেছে। এ ছাড়াও  সম্প্রতি প্রকাশিত ‘শুধু থিয়েটার ‘ বইটিও খুব পাঠক সমাদৃত হয়েছে। থিয়েটারের সঙ্গে কীভাবে জড়িয়ে পড়লেন ?

 

 সাগর বিশ্বাস: কিশোর বয়সে গ্রামের বড়োদের নাট্যকর্মে সামিল হতে হতো। একথা আমার ' শুধু থিয়েটার ' এবং ' পাঁচ দশকের ৫০টি নির্বাচিত বাঙলা মঞ্চ নাটকের আলোচনা ' গ্রন্থ দুটি'র ভুমিকাংশে কিছুটা বলার চেষ্টা করেছি। স্বাভাবিক প্রবণতা থেকেই উচ্চশিক্ষায় বিশেষপত্র হিসাবে নাটককেই বেছে নিয়েছিলাম। তাতে কিছু পুঁথিগত বিদ্যা অর্জিত হয়েছিল। থিয়েটার কর্মী কিংবা অভিনেতা হিসেবে আমি কোনোদিন থিয়েটার এর সঙ্গে জড়িত হইনি। কিন্তু থিয়েটার দেখার নেশা ছিল প্রবল। বলতে গেলে অপ্রতিরোধ্য। লেখক ও আলোচক হিসেবে থিয়েটার ও নাট্যদলের অলিন্দে বিচরণ করেছি মাত্র।

ঘটনা হল, বসুমতী বন্ধ হওয়ার পর ১৯৭১ সালে সাপ্তাহিক ' বাঙলাদেশ ' নামে একটি ট্যাবলয়েড পত্রিকা বেরোয়। তার দায়িত্বে আসেন বসুমতীর  বিবেকানন্দ মুখোপাধ্যায়, জীবনলাল বন্দ্যোপাধ্যায় , দিলীপ চক্রবর্তী, দুর্গাদাস সরকার প্রমুখ। এখানে দিলীপবাবুর আহ্বানে পত্রিকার সংস্কৃতি বিভাগের আংশিক দায়িত্ব গ্রহণ করতে হয়। সেসময় বৃহৎ সংবাদপত্র গোষ্ঠী আমাদের সমান্তরাল থিয়েটার বা গ্রুপথিয়েটারগুলিকে বড়ো একটা আমল দিত না। তোমরা জানবে , ছয়ের দশকে বাংলার সর্বাধিক প্রচারিত সংবাদপত্র উৎপল দত্ত’র ' কল্লোল ' নাটকের বিজ্ঞাপন পর্যন্ত ছাপতে রাজি হয়নি। এই পরিস্থিতিতে থিয়েটার দলগুলির নির্ভরস্থল হয়ে ওঠে 'বাঙলাদেশ', ' দর্পণ ' প্রভৃতি ছোট ছোট সংবাদ মাধ্যম। ফলে দপ্তরে তাদের অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণ আসে। এই সূত্রেই নাট্যদলগুলির সঙ্গে আমার পরিচয় গড়ে ওঠে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আমাকেই যেতে হত অনুষ্ঠান দেখতে। ঘনিষ্ঠতার কারণে কখনো মহড়া কক্ষেও। এভাবেই জড়িয়ে পড়া আর কি। তোমার প্রশ্ন, কিভাবে জড়িয়ে পড়লাম , আশা করি কিছুটা বোঝাতে পারলাম।

 

এবং সইকথা:  লেখক ও পাঠকের মধ্যে যোগসূত্র হিসাবে সাহিত্য সমালোচকদের ভুমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ আপনার কাছে? একই ভাবে নাট্য সমালোচকদের ভূমিকাও কীভাবে দেখেন?

 

সাগর বিশ্বাস: অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রকৃত সমালোচক অপরিসীম উপকার করতে পারেন সাহিত্যের এবং সেই সূত্রে পাঠকেরও। তবে ভাসাভাসা আলোচনা বিশেষ উপকারে আসেনা। আক্রমণাত্মক সমালোচনা আরও ভয়ঙ্কর যা জীবনানন্দ দাশের মতো নির্বিরোধী লেখককেও সহ্য করতে হয়েছে। চলচ্চিত্রে সত্যজিৎ রায় বনাম অশোক রুদ্রর দ্বৈরথ তো ইতিহাস হয়ে আছে। নাট্য বা থিয়েটার আলোচনার ক্ষেত্রেও একই কথা। একটা নির্মোহ, অনুপুঙ্খ আলোচনা প্রযোজনাকে ( এবং দর্শককেও ) যতটা উপকৃত করে , আক্রমণাত্মক আলোচনা ততটাই ক্ষতিসাধন করে। আমি নিজে মনে করি, আক্রমণাত্মক সমালোচনা গুপ্ত ঘাতকের মতো চারিত্রিক দুর্বলতায় আচ্ছন্ন থাকে। সে নির্মাণের মহত্বকে অস্বীকার করে।

 

এবং সইকথা:  লেখকদের সামাজিক দায়বদ্ধতা সম্বন্ধে আপনার অভিমত কী? আপনি কি  সামাজিক দায়বদ্ধতায় বিশ্বাস করেন?

 

সাগর বিশ্বাস: লেখকদের প্রতি বঙ্কিমচন্দ্রের আবেদন ছিল, ' যদি মনে এমন বুঝিতে পারেন যে লিখিয়া দেশের বা মনুষ্যজাতির কিছু মঙ্গলসাধন করিতে পারেন... তবে অবশ্যই লিখিবেন '। আমি আমার লেখক জীবনে সাহিত্য সম্রাটের এই নির্দেশ সতত মনে রাখার চেষ্টা করেছি। আমাদের এই ' তেলা মাথায় তেল ' - প্রবণ সারস্বত প্রাঙ্গণে অখ্যাত / অল্প খ্যাতদের কোনও মূল্যায়ন সচরাচর হয় না। আমার বইগুলির যতটুকু আলোচনা ইতস্তত হয়েছে, তাতে সমালোচকরা যখন লেখককে 'সমাজ সচেতন ' বলে চিহ্নিত করেন তখন মনে হয় দায়বদ্ধতার প্রশ্নে ফাঁকিবাজি করিনি, সেটা তাঁরা উপলব্ধি করেন।

 

এবং সইকথা:  আমরা জানি আপনি একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাসী। তা আপনার লেখনির সাহিত্যমূল্যের পক্ষে কতটা প্রতিবন্ধক বলে মনে করেন আপনি। নাকি রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিত্তি থেকেও মহত্তর সাহিত্য সৃষ্টি সম্ভব?

 

সাগর বিশ্বাস: প্রশ্নটা পরিষ্কার নয়। দেখ , রাজনৈতিক সহ যেকোনও মতাদর্শই মানুষের ব্যক্তিগত বিষয়। একজন লেখক বা শিল্পীর সৃষ্টির মূল্যায়নে তা প্রতিবন্ধক হওয়ার কথা নয়। হলে সেটা অন্যায় ও অনভিপ্রেত। তবে পৃথিবীতে অন্যায় তো কম হয় না! অনেক মহৎ স্রষ্টা মতাদর্শগত কারণে নানা ভাবে নির্যাতিত হয়েছেন। শেলি থেকে নেরুদা, ব্রেখট থেকে বোআল, তালিকা অনেক  দীর্ঘ। নির্দিষ্ট মতাদর্শের ভিত্তিতে যে মহৎ সৃষ্টি সম্ভব তা তো আমাদের চোখের সামনে উৎপল দত্ত হাতে কলমে প্রমাণ করে গেছেন।

 

এবং সইকথা:    আপনাকে প্রচার বিমুখ হিসাবে জানি। প্রচারসর্বস্ব যুগে এতটা নিরাসক্ত হয়ে লেখা বা নিজের কাজটুকু করে যাওয়া আমাকে আশ্চর্য করে। আপনার লেখনী, ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে আপনার অভিভাবকত্ব বা নতুন লেখকদের প্রতি আপনার ব্যবহার এবং প্রেরণা সব মিলিয়ে একটা দারুণ ব্যক্তিত্ব  যা এই সময়ে বিরল। যাপন থেকে শুরু করে সাহিত্য সব কিছুই এখন স্মার্ট। এই কালখণ্ডে  দাঁড়িয়ে একজন নতুন লেখক ও সম্পাদকদের প্রতি আপনার কী  বার্তা ?

 

সাগর বিশ্বাস: নতুন লেখকদের সর্বাগ্রে নিজের সঙ্গে বোঝাপড়াটা পরিষ্কার করে নেওয়া উচিত - কেন লিখবেন , লিখতে হলে কি লিখবেন। আজকাল উঠতি কবিরা দেখি তিরিশ / চল্লিশটা কবিতা লিখেই বই প্রকাশ করে ফেলেন। অথচ আমরা জানি প্রেমেন্দ্র মিত্রের আদর্শ ছিলেন নলিনী মোহন শাস্ত্রী, যিনি চল্লিশ বছর বয়সের আগে কোনও লেখা প্রকাশ করার পক্ষপাতি ছিলেন না। আজকের এই গতি আর সহজলভ্যতার যুগে তেমনটা আর হয়ত সম্ভব নয়। তবে পরিণত হওয়ার জন্য যে সময়টা প্রয়োজন , তা খেয়ালে রাখা অবশ্যই উচিত।

 বাংলা ভাষায় যত পত্র পত্রিকা বিশেষত লিটল ম্যাগাজিন বের হয় তা অন্য ভাষায় হয় না। এটা আমাদের একটা গর্বের জায়গা। আবার এখানেই লজ্জার জায়গা রয়েছে যখন দেখি অনেক ম্যাগাজিন নিতান্ত অবহেলায় ছাপা হয়ে বেরিয়ে আসে। পাঠক সেগুলিকে অপাঠ্য বিবেচনায় বর্জন করতে বাধ্য হন। কী বানান , কী বাক্য গঠন , কী বিষয় নির্বাচন , সর্বত্র সম্পাদনার ব্যর্থতা প্রকট হয়ে দেখা দেয়। অনেক সম্পাদক আছেন যাঁরা সম্পাদনার মূল নীতি অনুসরণ না করে গাজোয়ারি মনোভঙ্গিতে চালিত হন। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকেই একটা দৃষ্টান্ত দিই। বছর পাঁচ - ছয় আগে ' বরাক উপত্যকার বাংলা ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস ' নামে একটি সংকলন গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। প্রকাশক ঢাকার ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ। সম্পাদনায় ঢাকার ইসহাক কাজল আর শিলচরের মুজিব স্বদেশি। এখানে আমার লেখা ' বাংলা ভাষা , উনিশে মে এবং আমরা ' আমার সম্পূর্ণ অগোচরে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। একটা সৌজন্য কপিও তাঁরা আমায় দেননি। অন্য সূত্রে যখন দেখতে পাই, দেখি আমার লেখার মধ্যে যত্র তত্র তাঁরা নিজেদের কথা ঢুকিয়ে দিয়েছেন। উনিশে মে আন্দোলনের নেতা প্রয়াত পরিতোষ পাল চৌধুরীর প্রতি বিষোদগার তাঁরা নিজেদের কলমে না করে আমার কলমে ঢুকিয়ে পাল চৌধুরীর চরিত্র হননের সঙ্গে আমারও চরিত্র হনন করলেন। এটা যে আদালত - গ্রাহ্য অপরাধ সে ধারণাও তাঁদের নেই। টেলিফোনে মুজিব স্বদেশিকে পেয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছিলাম। তিনি আমতা আমতা করে একটি সৌজন্য কপি পাঠাবেন বলেও পাঠান নি। যেটা বলার কথা তা হলো, এজাতীয় সম্পাদনা গুপ্ত ঘাতকের মতো আমাদের সাহিত্য ও সংস্কৃতির পক্ষে বিপজ্জনক। তাই সম্পাদকদের প্রতি আবেদন , দয়া করে সম্পাদনার মূল নীতিগুলি সম্পর্কে অবহিত হন। তারপর সম্পাদনার কাজে নিজেকে প্রস্তুত করুন। কাজটা খুব সহজ বলে উড়িয়ে দেওয়ার নয়।

 

 এবং সইকথা:  আমরা জানি আপনি বহু গুণীজনের সান্নিধ্য পেয়েছেন । তাঁদের মধ্যে দু’একজনের কথা যদি বলেন ?

 

 সাগর বিশ্বাস: সান্নিধ্য আর পারস্পরিক সম্পর্ক কোনো না কোনোভাবে  মানুষকে মানুষের  প্রতি ঋণী করে রাখে । সেদিক থেকে যাঁদের সান্নিধ্য পেয়েছি তাঁদের কাছে ঋণ তো থাকবেই। তাঁদের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। তবে গুণীজনদের  কাছে আমার বিশেষ কোনও ঋণ নেই যা নিয়ে বড় মুখ করে কিছু বলা যায়। কেবল দু'জন মানুষের কথা বলব,এঁরা তোমাদের গুণীজন তালিকায় পড়বেন কিনা জানিনা। দু'জনেই সাংবাদিক। একজনের কথা  তৃতীয় প্রশ্নে বলেছি। তিনি দিলীপ চক্রবর্তী, যখন যে কাগজে দায়িত্ব নিয়েছেন , আমাকে ডেকে নিয়েছেন নির্ভরযোগ্য লেখক হিসাবে। অন্যজন প্রীতেন রায় ' ANDAMAN WAVE ' পত্রিকার সম্পাদক এবং ' দ্বীপবাণী 'র নির্বাহী সম্পাদক। আমার মতো তুচ্ছ লেখকের এমন গুণগ্রাহী ছিলেন যে নতুন লেখা দিতে না পারলে পুরোনো লেখা পুনর্মুদ্রণ করতেন। জীবনে এঁরা তাঁদের যোগ্য সম্মান পাননি।

 

এবং সইকথা:   একজন প্রকৃত কবির কাছে প্রাতিষ্ঠানিক পুরষ্কার কতটা মূল্যবান?

 

 সাগর বিশ্বাস: যেসব কবিরা পুরষ্কার পান , এ প্রশ্নের উত্তর তাঁরাই দিতে পারেন। আমি সেই দলে পড়ি না । তাছাড়া আমি মূলত গদ্য লেখক , কবি নই। কবিতা যেহেতু সাহিত্যের ধাত্রীমা , তাকে এড়ানো অসম্ভব। তাই জানালার ফাঁকে চিলতে আলোর মতো কখনো কখনো কবিতা এসে পড়ে। তোমার প্রশ্নের উত্তর আমি এড়িয়ে যাচ্ছিনা। ব্যক্তিগত ভাবে আমার মনে হয়, পুরষ্কার টুরষ্কার তাৎক্ষণিক ভাবে কোনো কবিকে প্রেরণা জোগাতে পারে কিন্তু দিনের শেষে কবির কৃতিটুকুই থেকে যায়। তোমাকে কে কী দিলো তাতে মানুষের কিছু যায় আসে না , কিন্তু তুমি মানুষকে কী দিলে সেটাই তার সম্পদ। সেটাই আসল বিচার্য।

 

এবং সইকথা:  সাহিত্যের অনেক শাখাতেই আপনার কলম ক্রিয়াশীল থেকেছে। কিন্তু যতদূর জানি আপনি কোনও উপন্যাস লেখেননি। কেন?

 

সাগর বিশ্বাস: ঠিক কথা। কিছু ছোট গল্প লিখলেও সাহিত্যের ওই জনপ্রিয় শাখায় প্রবেশ করতে পারিনি। আসলে যে সময় কালে আমার লেখার জগতে প্রবেশ সে সময়টা ছিল অভূতপূর্ব এক গণজাগরণের কালপর্ব। খাদ্যের অভাবে সাধারণ মানুষ অখাদ্য কুখাদ্য খেয়ে কোনোমতে জীবন ধারণ করতে বাধ্য হচ্ছেন।চারদিকে শুধু আন্দোলন আর বিদ্রোহ। আন্দোলনের অভিঘাতে '৬৭ সালের নির্বাচনে কংগ্রেসের একচেটিয়া রাজ্যপাট ভেঙে পড়েছে। '৬৯ সালে মার্কসবাদী কমিউনিস্ট পার্টি ভেঙে নকশালপন্থী রাজনীতির অভ্যুদয়। রাজ্যের আইন শৃঙ্খলার ঘোরতর বিপর্যয়। '৭২ সালে সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়ের নেতৃত্বে পুনরায় কংগ্রেসের ক্ষমতা দখল। আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি। চতুর্দিকে খুনোখুনি আর সন্ত্রাসের আবহ। এইরকম এক অস্থির কালপর্বে দাঁড়িয়ে লেখক হিসেবে গল্প উপন্যাস রচনার কথা মনে আসেনি। তুমি বলতে পারো পরবর্তীকালে কেন লিখলাম না। হ্যাঁ উপন্যাসের উপাদান কম ছিল না। কিন্তু বাস্তবের কঠিন মাটিতে দাঁড়িয়ে কলমনবিশি করতে করতে কল্পনা প্রবণতাটাই হারিয়ে ফেলেছিলাম। কথা সাহিত্য রচনায় যার প্রয়োজন অনস্বীকার্য। তাই পরবর্তী সময়ে কিছু গল্প রচিত হলেও উপন্যাস রচনার অবকাশ ছিল না। 

 

এবং সইকথা:  আপনার ভ্রমণকথা ‘সর্ষে পায়ে আরশিনগর’ প্রকাশের পথে। এ বিষয়ে যদি কিছু বলেন -

 

সাগর বিশ্বাস: আমার এই বইটার বড্ড কপাল খারাপ। কলকাতার এক নামী প্রকাশক ছাপবেন বলে প্রায় দু'বছর আটকে রেখেছিলেন। শেষে অপেক্ষাকৃত কম নামী প্রকাশক দায়িত্ব নেওয়ার পর শুরু হয় করোনার উপদ্রব। যতদূর জানি কাজ অনেকটাই এগিয়ে আছে। কবে ছাপাখানায় যাবে তা অবশ্য বলতে পারি না। বইটা আসলে আমার বেশকিছু ভ্রমণ বৃত্তান্তের সংকলন। বিভিন্ন সময়ে পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত। যেহেতু বাংলার বাইরে ভ্রমণগুলি সংকলনে নেওয়া হয়েছে নামকরণে তাই আরশিনগর প্রতিবেশী অর্থে গৃহীত।

 

এবং সইকথা:  আজকাল তো বিদেশ ভ্রমণ অনেক সহজ হয়ে গেছে, ইচ্ছে হয় না বিদেশ দেখার? 

 

সাগর বিশ্বাস: না।এত সৌন্দর্য আর বৈচিত্র্যপূর্ণ নিজের দেশটাই ভালো করে দেখা হল না! যতটুকু দেখেছি ততটুকু লিখতেও পারিনি। লিখেছি অতি সামান্যই। লেখা পড়ে অধ্যাপক তরুণ সান্যাল লেখেন ‘তাঁর ভ্রমণকথাগুলিতেও দেখতে পাই মেরি উলস্টোন ক্রাফটের বস্তুমুখীনতা ও ডরোথি ওয়ার্ডসওয়ার্থের প্রকৃতি মুগ্ধতা’। এর চেয়ে আনন্দের কী আছে। এইতো পুরস্কার।

খুব ইচ্ছে ছিল এই উপমহাদেশ যা একদিন অখন্ড ভারতবর্ষই ছিল সবটা ঘুরে দেখব। হল না। এক জীবনে এত কিছু হয় না। তাই তারাশঙ্করের নেতাই কবিয়ালের মতো বলতে চাই -'হায় জীবন এত ছোট কেনে'।  বাস্তুচ্যুত জীবনে বেঁচে থাকার সংগ্রাম, সংসার জীবনে হাজারো দায়,জীবিকা অর্জনের বন্দিত্ব ,সবকিছু সামলে কতটুকু সময় আর হাতে পাওয়া যায় বলো।

 

এবং সইকথা: সীমাবদ্ধ জীবনেও সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় আপনার বিচরণ আমাদের বিস্মিত করে। এতসব গদ্য রচনার মধ্যেও আপানার দু’খানা ছড়ার বই বেরিয়েছে । সময় বের করেন কীভাবে?  

 

সাগর বিশ্বাস : ছড়া লেখার জন্য আলাদা করে সময় বের করতে হয়নি। ট্রেনে কিংবা ট্রামে বসে যাতায়াতের মধ্যে অধিকাংশ ছড়ার জন্ম। ছড়া লেখার কোনও ভাবনা আমার ছিলনা। একদিন কথায় কথায় অমিতাভ চৌধুরী বললেন -ছড়া লিখতে পারো? '  বললাম -না । অমিতদা বললেন -চেষ্টা করলে সব পারা যায়। আমাকে ছড়া দিয়ে যেও ৪/৬ লাইনের মধ্যে। যুগান্তরের প্রথম পাতায় 'রোজনামতা' বলে একটি ছড়ার জায়গা করেছেন অমিত দা। সেখানে রোজ ছড়া ছাপা হয়। বুঝলাম এই তাগিদেই আমায় তাগাদা। সেসময় দার্জিলিঙে আগুন জ্বলছে। জিএনএল এফের নেতৃত্বে হিংসাশ্রয়ী আন্দোলন। আমি লিখে দিলাম –‘দার্জিলিঙের পাহাড়ে /আগুন জ্বলে আহা রে /ঝলসানো হয় সে আগুনে / গণতন্ত্র বাহা রে।" অমিতাভদা বললেন,খাসা হয়েছে। আরও বানাও।' এভাবেই শুরু । ছড়া অনেক সময় পদ্যের রূপ নেয়। আমার দুটো বইয়ে ছোটদের ছড়া আর বড়দের ছড়া একাকার হয়ে গেছে। একমাত্র ছোটদের জন্য বেশ কিছু ছড়া ও গল্প তৈরি আছে ।প্রকাশক পেলে একটা বই হতে পারে। কিশোর গল্প সংকলন "সাত আকাশের তারা" ও পুনর্মুদ্রণের অপেক্ষায়।এই বইটা লিখেছিলাম উত্তর-পূর্ব ভারতের সাত রাজ্যের আদিবাসীদের উপকথা দিয়ে। বইটির উত্তরভাষ লিখেছিলেন অধ্যাপক পবিত্র সরকার।

 

এবং সইকথা: আপনার কবিতার বই' চুরি হয়ে গেছে তার রজত শরীর'প্রসঙ্গে শ্রীজাত বলেছেন ''তিনি লিখে গেছেন এক আশ্চর্য বিশ্বাস থেকে'। জীবনের প্রতি,ভালবাসার প্রতি,অনাগতের প্রতি। সেই সব লেখার পরতে পরতে যুক্ত হয়েছে তাঁর অভিজ্ঞতার জটিলতা আশ্বাসের সারল্য '' কী বলবেন?

 

সাগর বিশ্বাসঃ শ্রীজাতর এই পর্যবেক্ষণ যথার্থ। দ্বিমত হওয়ার অবকাশ নেই। যে জীবনবাদ আমার গদ্য চেতনার উৎসমূলে রয়েছে তা কবিতাতেও প্রতিফলিত। যে কথা গদ্যে বলার চেয়ে কবিতাতেই বলা সহজ তা আমি কবিতায় বলতে চেয়েছি। কবিতার শাস্ত্র অনুসারে তারা বিশুদ্ধতার ছাড়পত্র পাবে কিনা তা নিয়ে মাথা ঘামাইনি। শ্রীজাতর কথা দিয়েই বলা যায়----- আমার কবিতারা 'বহুস্বরের মিছিলে হয়ে উঠতে চেয়েছে একটিই কণ্ঠ'।

 

এবং সইকথা:  প্রথম লেখা কবিতার কথা মনে আছে কাকু?

 

সাগর বিশ্বাস :  শুরু হয়েছিল লেনিনকে নিয়ে। সেবার লেনিনের জন্মশতবর্ষ। হাবড়া রূপকথা সিনেমা হলে বড় অনুষ্ঠান। সিপিআই নেতা ডাক্তার সাধন সেনের আমন্ত্রণে উপস্থিত ছিলাম সেখানে। যাবার আগে লেনিনকে নিয়ে একটা কবিতা লিখে নিয়ে গিয়েছিলাম। সম্ভবত সেই আমার লেখা প্রথম কবিতা। কাঁচা হাতে লেখা। সেই কবিতা "লেনিন বিশ্বের নিপীড়িত মানুষের নাম" মঞ্চে দাঁড়িয়ে পাঠ করার পর সভায় উপস্থিত কলকাতাস্থ সেভিয়েত কনস্যুলেট জেনারেল ভি ই গুর্গনভ একটা কপি চেয়ে নিয়েছিলেন। আশ্চর্যের কথা, 'সেভিয়েত দেশ' পত্রিকায় অনুষ্ঠান প্রতিবেদনে সে কবিতার অংশবিশেষ ছাপা হয়েছিল।

 

এবং সইকথা: সময়ের শব্দ ' আপনার উচ্চ প্রশংসিত গদ্য সংকলন। তিনটি খণ্ডই স্বয়ং সম্পূর্ণ । এখনো আপনার কলম সচল আর কোনও খন্ড হতে পারে না?

সাগর বিশ্বাস :  পারে বৈকি। জীবন হয়তো খুব বেশি সময় দেবে না। তাই আর একটিই খণ্ড করার প্রবল ইচ্ছে। চতুর্থ খন্ড। প্রস্তুতি চলছে দেখা যাক।

 

এবং সইকথা: আপনার লেখায় দেশভাগ এবং উত্তরকালে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ বারবার উঠে আসে, এ সম্পর্কে আপনার মনোভঙ্গী যদি বলেন

 

সাগর বিশ্বাস : অবিভক্ত ভারতবর্ষে আমার জন্ম। ধর্মের হিংস্রতা একদিন সেই দেশটাকে টুকরো টুকরো করে কোটি কোটি মানুষকে ভিটেছাড়া করে দিল। বিনা অপরাধে কত মানুষ অকালে নিশ্চিহ্ন হল তার হিসেব রইল না। ছিন্নমূল মানুষের সীমাহীন সে দুর্দশা আমি দেখেছি। পরবর্তীকালে পূর্ব পাকিস্তানের বাংলাদেশ হয়ে ওঠার মধ্যেও লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন সম্পদ ঘরবাড়ি নিশ্চিহ্ন হয়েছে, মুক্তিযুদ্ধের সেই উত্তাপ বাঙালি হয়ে খুব কাছে থেকেই গায়ে মেখেছি। এইসব ঐতিহাসিক ঘটনার অভিঘাত আমার কলম খুলতে বাধ্য করেছে। তবুও আমি মনে করি যতটা লিখতে চেয়েছি, ততটা লেখা হয়নি, আমি সামান্যই লিখতে পেরেছি। তাই এখনো লিখতে চাই । ফুল পাখি নদীর গান লেখার চেয়ে বেশি জরুরি।

 

 এবং সইকথা: আপনার সম্পাদনায় ‘একুশ শতাব্দী’ লিটল ম্যাগাজিন জগতে রীতিমতো সমীহ আদায় করেছে সম্পাদনায় এলেন কীভাবে?

 

সাগর বিশ্বাস :  আমার সম্পাদক হওয়াটা ঠিক নিজের ইচ্ছেয় হয়নি। নয়-এর দশকে আমাদের এক পাঠচক্রে কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়, নারায়ণ মুখোপাধ্যায়, অজয় নন্দী, শ্যামল ভট্টাচার্য প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। সেখানে শক্তিদাই একটা ম্যাগাজিন করার প্রস্তাব দেন। নামকরণ করেন আমাদের পাঠচক্রের নামে ‘একুশ শতক’ রেজিস্ট্রেশনের সময় এ নামটা গ্রাহ্য হল না। হয়ে গেল ‘একুশ শতাব্দী’। সম্পাদক হিসেবে আমি চেয়েছিলাম তরুণদের মধ্যে কেউ দায়িত্ব নিক।

কিন্তু কেউ সম্মত নয় যেহেতু লেখালেখি এবং সাংবাদিকতায় আমার কিছু অভিজ্ঞতা রয়েছে। অতএব আমি বধ্য। ২৫-২৬ বছরে কতটা কী করতে পেরেছি তা পাঠকমহল বলতে পারবেন। একসময় 'আধুনিক বিশ্বকোষ' প্রকাশের এক বৃহৎ প্রকল্পে নাট্য ও মঞ্চ বিষয়ক সম্পাদক হিসেবে কাজ করার জন্য ধরে নিয়ে গিয়েছিলেন আমার প্রিয় অধ্যাপক ঊষাপ্রসন্ন মুখোপাধ্যায়। আন্দামানের উপর ডাক্তার রতন রায়ের দু'টি বই সম্পাদনা করতে হয় শ্রদ্ধেয় প্রীতেন রায়ের বিশেষ অনুরোধে। অনুরূপ সনির্বন্ধ অনুরোধে আফজল হোসেনের একটি বই। আমি যে মাসিক পত্রিকা ‘তথ্যকেন্দ্র’র বিভাগীয় সম্পাদক হিসেবে কিছুকাল কাজ করেছি সেও সম্পাদক সব্যসাচীর অনুরোধে। আমার শর্ত ছিল পত্রিকায় আমার নাম ছাপা হবে না। আর আমি কোনও টাকা পয়সা নেব না। সব্যসাচী, লোপামুদ্রা আমার স্নেহের পাত্র, অনুরোধে ওদের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলাম মাত্র। তাই বলছিলাম যে আমার সম্পাদক হিসেবে কাজ করা কখনো নিজের ইচ্ছা নির্ভর ছিল না। তবে দায়িত্ব পালনের বেলায় কোনও ক্ষেত্রে আমি শৈথিল্য দেখাইনি।

 

এবং সইকথা: আমরা অক্ষর কর্মীরা যাই করি না কেন, দিনের শেষে রবীন্দ্রনাথে সমর্পিত হই আপনার অনুভবে কীভাবে আসেন রবীন্দ্রনাথ?

 

সাগর বিশ্বাস : কতদিন ভেবেছি 'আমার রবীন্দ্রনাথ' নামে একটি বই লিখব। তাতে তাঁকে নিয়ে আমার অনুভূতির কথা অকপটে লেখা থাকবে । কিন্তু সে আর হলো কই! কতকিছুই এরকম মনে আসা-যাওয়া করে ,বাস্তবে রূপ পায় না। তাঁকে নিয়ে কয়েকটি বিচ্ছিন্ন লেখাই কেবল লিখতে পেরেছি। যেমন তাঁর গণসংগীত, সমবায় ভাবনা, মনুষ্য ধর্ম,উৎসর্গ পত্র ইত্যাদি। ‘রক্তকরবী’ আমার প্রিয় নাটক। তা নিয়েও আমার লেখা আছে। জীবনানন্দের অনুভবে তিনি কেবল প্রাণের আরাম,আত্মার শান্তি নন। তিনি আমার ফ্রেন্ড ফিলোসফার ও গাইড। আমার সংগ্রামের সাথি, কমরেড। জীবনভর কত প্রতিবাদ করেছেন। মানুষটি ভারত ছাড়ো আন্দোলন কিংবা তেতাল্লিশের মন্বন্তর দেখেননি, ৪৩/৪৪-এ জার্মান নাৎসীদের নগ্ন ভয়ঙ্কর চেহারা দেখেননি। দেখেননি স্বদেশের মাটিতে ছেচল্লিশের দাঙ্গা। সাতচল্লিশের দেশভাগ। কিন্তু যে অসাম্য ভ্রষ্টাচার ও রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস দেখেছেন তাতে প্রতিনিয়ত বিচলিত বিক্ষুব্ধ হয়েছেন। সৌভাগ্যবশত তাঁকে দেখতে হয়নি স্বাধীন দেশে নিষ্ঠুর দাঙ্গা, ১৯৯২ সালের অযোধ্যা কিংবা ২০০৩ সালের গুজরাট। যদি দেখতেন তবে মানুষের প্রতি আস্থাবান কবির বুকের পাঁজর জ্বলে যেতো। আজ দেশের এই ঘোর অন্ধকারে তাঁকেই আবার পেতে চাই। তিনি চলে গেছেন ৮০ বছর হয়ে গেল। এই দীর্ঘ সময়ে তাঁর মতো সর্বাঙ্গসুন্দর দ্বিতীয় কেউ এলেন না। এখনো যদি আমরা প্রাত্যহিক জীবনে তাঁকে ধারণ করতে না পারি,বা তাঁর প্রদর্শিত পথে চলতে না পারি তবে আত্মপরিচয় হারিয়ে আমরা ক্রমশঃ বিশ্বমাঝে নিঃস্ব হয়ে যাব।

 

এবং সইকথা:   এবং সইকথার পক্ষ থেকে আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ জানাই আমাদের এই মূল্যবান সময় দেওয়ার জন্য । খুব ভালো থাকবেন কাকু। আপানার আগামী জীবন সুস্থ ও সুন্দর হোক এবং সৃজন-এ থাকুন এই শুভকামনা করি।

 

 সাগর বিশ্বাস: সৃজনেই থাকতে চাই। জানিনা এই মহামারিকালে জীবন কতটা সময় দেবে। লেখক-জীবন ৫০ বছর পার হয়ে গেছি। এখন তোমাদের দিকে তাকিয়ে থাকার সময়। তোমাদের কাজে সাহিত্য সংস্কৃতি জগৎ সমৃদ্ধ হোক , এই আশা রাখি। ভালো থেকো।

 

 

লেখক পরিচিতিঃ   

সাগর বিশ্বাস:

বাংলা সাহিত্য ও সংবাদপত্র জগতে সাগর বিশ্বাস একটি সুপরিচিত নাম। মূলত প্রাবন্ধিক ও সমালোচক হলেও সাহিত্যের অন্য শাখায় যথা কবিতা গল্প ছড়া ভ্রমণকথাতেও তাঁর লেখনী বিশশতকের ছয় –সাত দশক থেকে সক্রিয়।

জন্ম ১৯৪৪ সালে। অবিভক্ত ভারতবর্ষের যশোর জেলার অন্তর্গত টোনা গ্রামে। পিতৃদত্ত পোশাকি নাম শ্যামলকান্তি। ছাত্র জীবন কেটেছে কিছু পূর্ববাংলায় বাকিটা পশ্চিমবাংলায়। লেখক হিসেবে আত্মপ্রকাশ সাপ্তাহিক বসুমতী পত্রিকায় সাগর বিশ্বাস নামে। সেই থেকে বসুমতী ছাড়াও লিখেছেন যুগান্তর, সত্যযুগ, আজকাল ,বাংলাদেশ, ভারত কথা, সংবাদ প্রতিদিন, সপ্তাহ ,প্রতিক্ষণ ,সাহিত্য রবিবাসর,তথ্যকেন্দ্র, চতুষ্কোণ ইত্যাদি পত্রপত্রিকায়। লিখেছেন অনেক লিটল ম্যাগাজিনে। বিভাগীয় সম্পাদক হিসেবে বিভিন্ন সময়ে পত্র-পত্রিকা এবং আধুনিক বিশ্বকোষ প্রকাশনায় যুক্ত থেকেছেন সাহিত্য পত্রিকা ‘একুশ শতাব্দী’ সম্পাদনা করছেন আড়াই দশক ধরে।

তাঁর বহুমুখী রচনার একটা বড় অংশ জুড়ে আছে নাটক ও থিয়েটার বিষয়ক লেখা। উচ্চশিক্ষায় নাট্য সাহিত্যে ছিল তাঁর বিশেষ অধ্যয়নের বিষয়। লেখক জীবনে বাংলা নাট্য পত্র-পত্রিকার সঙ্গে সম্পর্কের ফলে লিখেছেন অভিনয়,গ্রুপ থিয়েটার, গণনাট্য, নাট্যচিন্তা,শিল্পীসেনা, মুকাভিনয় ইত্যাদি পত্রিকায়। 'গ্রুপ থিয়েটার' পত্রিকায় বিগত তিন দশক ব্যাপী তিনি নিয়মিত নাট্য বিষয়ক প্রবন্ধ নিবন্ধ ও সমালোচনা লিখছেন। সমালোচক হিসেবে ২০১৮ সালে পেয়েছেন 'নাট্যকথা সম্মান ২০১৮’, এবং 'সারথি সম্মাননা'।

 

তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ

 

সময়ের শব্দ (৩ খন্ড) প্রবন্ধ-নিবন্ধ সংকলন

চুরি হয়ে গেছে তার রজত শরীর (কবিতা)

পাঁচ দশকের ৫০টি নির্বাচিত বাঙলা মঞ্চ নাটকের আলোচনা

সাত আকাশের তারা (কিশোর গল্প সংকলন)

ছড়ায় হাসি ছড়ায় ভাসি

ছড়াছড়ি কলকাতা

শুধু থিয়েটার

 

প্রকাশের পথে যন্ত্রস্থ

 

সর্ষে পায়ে আরশি নগর (ভ্রমণ কথা)

তসলিমা নাসরিন-প্রসঙ্গ আত্মজীবনী ও অন্যান্য

 

সম্পাদিত বই

শিলঙের বাঙলা থিয়েটার

আন্দামানের আদিম জনজাতি জারোয়া

The Jarawas of the Andamans

  





--------------------------------------

ছবি ঋণ: সাগর বিশ্বাস

 


২টি মন্তব্য:

  1. সাগর বিশ্বাস'দা আমার অন্যতম প্রিয় মানুষ, যদিও তার সাথে আমার আলাপ বা যোগাযোগ খুব বেশী দিনের না। এই সাক্ষাৎকারে সাগরদা'র বিষয়ে আরো কিছু তথ্য জানলাম। ভালো লাগলো। আশা করি, সাগরদা'র বিভিন্ন সক্রিয়তা ও সাহিত্যকর্ম ভবিষ্যতেও চলতে থাকবে। এই সাক্ষাৎকারটির জন্যে 'এবং সইকথা'কে ব্যক্তিগত ধন্যবাদ জানাই।

    উত্তরমুছুন
  2. ধন্যবাদ সমরেন্দ্র'দা। ভালো লাগছে পাঠকদের কাছে এই সাক্ষাৎকারটি পৌঁছাতে পেরে। পত্রিকার স্বল্প পরিসরে সাগর বিশ্বাসকে আমরা জানলাম । বিস্তারিত পড়ার বা জানার চাহিদা তৈরি করছে এই লেখা । বিশেষ করে সাংবাদিক জীবনের অভিজ্ঞতা ইত্যাদি নিয়ে যদি একটি আত্ম জৈবনিক লেখা লেখকের কাছ থেকে পাওয়া যায় তাহলে পাঠক সমাজ ঋদ্ধ হবে বলে আমার মনে হয় ।

    উত্তরমুছুন