অভিষেক ঘোষ

 

৬৯ ঙ

 

(১)

লোকটার মুখটা ভারী অদ্ভুত রকমের । এমনটা মনে হওয়ার কারণ হয়তো এই যে, লোকটার মুখে এমন কিছু আশ্চর্য অনুভূতি খেলা করছে, যা ভালো করে ঠাহর করলেও যেন বোধগম্য হতে চায় না ! সম্ভবত এমন কিছু বিরল অভিজ্ঞতা লোকটার হয়েছে, যা এই পার্থিব জগতে আমরা আমাদের প্রাত্যহিক অভিজ্ঞতা দিয়ে বুঝে উঠতে পারব না ! হপ্তা দুয়েক হলো লোকটাকে দেখা যাচ্ছে আমাদের এই মফস্বলের যত্রতত্র । কে লোকটা, কোত্থেকে উদয় হল, এ প্রশ্ন অনেকের মনেই জেগেছে । আমি আর মিত্র দা, একই স্কুলে শিক্ষকতা করার সুবাদে ইদানিং বেশ ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়েছি । সেই সূত্রে প্রায়ই আমরা সাহিত্য সভা, চলচ্চিত্র উৎসব ইত্যাদিতে একসঙ্গে গিয়ে থাকি । সেদিন হঠাৎ নন্দনে লোকটাকে দেখতে পেয়ে, আমরা দুজনে মিলে তাকে পাকড়াও করলাম ।

 

- দাদা কী করা হয় কী ?

 

- আমায় বলছেন !

 

- হ্যাঁ হ্যাঁ আপনাকেই বলছি । আপনাকে তো নানা জায়গায় দেখতে পাওয়া যায় আজকাল ! তাই ভাবছিলাম কে আপনি ? কী করেন ?

 

- আমি কিছু করি না । মানে আমার আসলে কিছু করা বারণ ।

 

- মানেটা কি ! কে আপনাকে বারণ করল ?

 

- দেখুন আমি আসলে একজন অবজার্ভার । সবকিছু অবজার্ভ করাটাই আমার একমাত্র কাজ । এর বাইরে কিছুই করতে পারবো না ।

 

- অবজার্ভার মানে ? আপনি কী অবজার্ভ করেন ?

 

- ইয়ে... মানে অনেক কিছুই আসলে অবজার্ভ করতে হয় । এই ধরুন, মানুষের বংশগতি, অভিযোজন, বাস্তু তন্ত্র.. এইসব আর কি !

 

- কে দিলে আপনাকে এর দায়িত্ব ?

 

লোকটা উত্তর দেওয়ার পরিবর্তে ব্যস্ততা দেখায় । যেন পালাতে পারলেই বাঁচে । এরপরে মিত্র দা না বলে পারেন না, "তা মশাই, পয়সা পান এসব করে ?"

 

একথায় লোকটা যেন একটু সংকুচিত বোধ করল । হয়তো বিরক্তও হল কিছুটা । কিন্তু তা প্রকাশ করল না ।

 

এবার আমাকেই বলতে হয়, "তা মশাই, আপনার নামটাই তো জানা হলো না ।"

 

- দেখুন আমি আমার নাম বললেও আপনারা বিশ্বাস করবেন না ! উলটে হয়তো ঠাট্টা-তামাশা করবেন !

 

- আরে বলেই ফেলুন নাহ্ ! এত ভাবেন কেন ?

 

- আমার নাম, ৬৯ ঙ !

 

মিত্র দার মুখটা একথা শুনে হাঁ হয়ে গেলেও, আমি সাহিত্যের ছাত্র, এখন ইস্কুলে পড়াই - এ সব বলে আমাকে বোকা বানানো সহজ নয় । আমি সঙ্গে সঙ্গে বললাম, "ফাজলামি হচ্ছে ? আপনার নাম ৬৯ ঙ ? মশাই কি গতকাল রাতেই 'রক্তকরবী' পড়েছেন নাকি ?"

 

লোকটা একথায় তার হতাশা একটুও গোপন না করে, দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, "আমি জানতাম আপনারা এরমই কিছু বলবেন । ওই জন্যেই বলতে চাই নি । আপনারাই জোর করলেন ।

 

যাই হোক্ । এরপর সেদিন দীর্ঘক্ষণ আমরা কথা বলেছিলাম । মিত্র দারও হাতে তেমন কাজ ছিল না । আমিও ফাঁকা ছিলাম । তাই কথায় কথায় সন্ধ্যা হয়ে গেল । বহুক্ষণ জেরা করেছি বলে লোকটাকে আমরা দুজনে মিলে একাডেমির ওদিকে নিয়ে গিয়ে, ফিস্ কবিরাজি খাইয়ে দিলাম । বিনিময়ে আমরা লোকটার কাছ থেকে যা যা শুনলাম, সেগুলো বিশ্বাস করব নাকি স্রেফ গুল-গল্প বলে উড়িয়ে দেবো... সে বিষয়ে আমি বা মিত্র দা কেউই আজ পর্যন্ত কিছু স্থির করে উঠতে পারিনি । তবে হ্যাঁ লোকটার মধ্যে একটা ব্যাপার আছে ! 'বললে কথা থামায় কে ?'

 

 

(২)

সাল ২২২১ । দেখলে মালুম হয় না, গ্রীষ্ম কাল । আকাশটা কেমন ঘোলাটে, অস্বচ্ছ বিরক্তিকর বিভ্রমে পরিণত হয়েছে ! প্রথাগত ধারণায় যে জ্যোতিষ্কটিকে আদি-অনন্তকাল ধরে শাশ্বত বলে মনে করা হয়েছিল, আজ সেই সূর্যদেব চিরতরে অস্তমিত । আসলে এই মহাবিশ্বে প্রতিটি প্রাণেরই মৃত্যু আছে, এই নিয়মের ব্যতিক্রম কেউ নয় । তার উপর তাকে যদি যুগ যুগ ধরে আলো-উষ্ণতা বিলিয়ে যেতে হয়, তার দ্রুত ফুরিয়ে আসা নিশ্চিত । স্বাভাবিকভাবেই সূর্যের জ্যোতি ক্রমশ ফুরিয়ে আসে । ফল হয় মারাত্মক । সূর্য নিভে আসছে, নির্ভুলভাবে এই সত্য উপলব্ধি করা মাত্রই আমেরিকা ও তার সহায়ক কয়েকটি প্রথম সারির দেশ যুদ্ধকালীন তৎপরতায় বানিয়ে ফেলে সূর্য-যান ‘প্রমিথিউস্’ ! তার একমাত্র কাজ এই শেষ বেলায় যতটুকু পারা যায়, সূর্য থেকে আগুন চুরি করা । সেটা নাকি বানানোই হয়েছিল, মর্ত্যবাসীর প্রাণ-ধারণের উপযোগী উত্তাপ সরবরাহ করার জন্য । কিন্তু সমস্যাটা তৈরি হয়, ওই দেশগুলির অহেতুক গোপনীয়তায় । কীভাবে এই গুরুত্বপূর্ণ কাজটি সমাধা হবে, স্বাভাবিকভাবেই তা জানার অধিকার ছিল সকলের । কিন্তু মুখ ফিরিয়ে নেয় ওদের সংযুক্ত প্রশাসন, উফাওকা (ইউনাইটেড ফার্স্ট ওয়ার্ল্ড কান্ট্রিজ্) । ২১৯৯ সালে সংস্থাটি গঠিত হওয়ার পর থেকেই বারবার ঠকতে হয়েছে পিছিয়ে পড়া দেশগুলিকে । ফলস্বরূপ ২২০০ সালে গঠিত হয় উবকা (ইউনাইটেড ব্যাকওয়ার্ড কান্ট্রিজ্) । 

 

উবকা প্রথম পদক্ষেপেই প্রমিথিউসের গোপন মিশনের সমস্ত তথ্য দাবী করে । অথচ তখন তাদের কতই বা সামর্থ্য ! বড়োজোর হাজার দুয়েক স্বেচ্ছাসেবী প্রতিনিধি তখন উবকার হয়ে কাজ করছে বিমর্ষ বিশ্বজুড়ে । কিন্তু তাতেই উফাওকা এতই ভয় পেয়ে গেল যে, সংস্থাটিকে একেবারে ব্যান করে দিল । এদিকে সূর্য তখন নিভন্ত । হতাশা ছড়িয়ে পড়ছে সর্বত্র নির্যাতিত মানুষের মধ্যে । সেই কবে একশো আশি বছর আগে এক অতিমারী ধ্বসিয়ে দিয়েছিল দুনিয়ার অর্থনীতি । পাঁজর ভেঙে দিয়েছিল সমস্ত শৌখিন একনায়কতন্ত্রের । আর উঠে দাঁড়াতে পারে নি কোনো দেশ । এরপর মূল সমস্যাটাই হয়ে দাঁড়ায়, মানুষের হাতে টাকা নেই, তো রাষ্ট্রনেতাদের হাতেও ভোটার নেই, রাষ্ট্রের হাতে নেই কনজিউমার ! যুদ্ধ এরপর একরকম অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়ে । কারণ বিপর্যয়ের আশঙ্কা ও জীবনধারণের অনিশ্চয়তা না থাকলে, মানুষেরও রাষ্ট্রকে প্রয়োজন নেই । রাষ্ট্র ও ব্যক্তির সম্পর্কের এই যে আপেক্ষিকতা, এটি অনুভব করেই ক্রমশ তীব্র হয়ে ওঠে অন্ধ জাতীয়তাবাদ । বলা যেতে পারে, সূর্য নিভে যাওয়ার অনেক আগেই নিভে আসে মানুষের বোধ-বুদ্ধি, চেতনা-চৈতন্য । পৃথিবীটা যেন একচক্ষু দানবদের বিচরণক্ষেত্রে পরিণত হল । তারা কিছু খতিয়ে দেখে না, সত্যাসত্য যাচাই করে না, কানে শোনা ও অনুভব করার প্রয়োজন মনে করে না । কেবল জন্তুর মতো বাঁচে, খাবারের আর ভোগ্যপণ্যের জন্য লড়াই করে । পৃথিবীর প্রায় সমস্ত শহরে ক্রমাগত পুঞ্জীভূত হয় রাগ । গোষ্ঠী সন্ত্রাস শুরু হয় ছোটো ছোটো ঘটনাকে কেন্দ্র করে । যেমন কোথাও শপিং মল ভাঙচুর করে একদল মানুষ, কেবলমাত্র মালিকপক্ষের একটি অ্যাড ক্যাম্পেইন পছন্দ হয় নি বলে । একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সামান্য একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে দাঙ্গা বেঁধে যায় । যত সময় যায় বিক্ষিপ্ত ঘটনাগুলি কেন্দ্রীভূত হয় । কয়েকটি দল গড়ে ওঠে যারা ছিনিয়ে নেওয়ার চরমপন্থী নীতিতেই বিশ্বাসী । সেই সব দল নিজেরাই নানা মতপার্থক্যে জর্জরিত ছিল । কিন্তু তা সত্ত্বেও যা তাদের সম্পর্ক অটুট রেখেছিল তা হল, অদূরদর্শী স্বেচ্ছাচারিতার সুযোগ । দল থেকে আলাদা হয়ে গেলেই যে মরতে হবে, তা তারা বুঝে গিয়েছিল । রাষ্ট্রগুলি ২২১০ অবধি এই হানাহানি নিয়ন্ত্রণে সক্ষম হলেও, এরপর মানুষ রাষ্ট্রের ক্ষমতায়নে আস্থা হারায় । রাষ্ট্রের অবিরাম নজরদারি আর যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলা অতিষ্ঠ করে তোলে মানুষকে । সভ্যতা শিকেয় ওঠে এরপর ! ২১৯০ সাল নাগাদ ‘বাঙালি ব্রিগেড‘ নামে একটি গোষ্ঠীর উদ্ভব হয়, যারা মূলত বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও সাংস্কৃতিক পরিমন্ডল রক্ষার যুগপৎ দায়ভার তুলে নিয়েছিল কাঁধে । এরা ছিল বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বাঙালি । তারা পাঁচ বছরের মধ্যেই একটি স্বয়ংচালিত সংস্কৃতি-যান নির্মাণ করে, নতুন প্রজন্মের মধ্যে বঙ্গ সংস্কৃতির বিস্মৃতপ্রায়  স্বর্ণরেণুগুলি ছড়িয়ে দিতে । মহাকাশযান ‘রবীন্দ্রনাথ’ পরবর্তী পাঁচ বছরের মধ্যেই বেরিয়ে যায় পৃথিবীর আবহমণ্ডল ছেড়ে, মহাকাশে নিজেদের আশ্রয় খুঁজে নেয় তারা, নির্মাণ করে নতুন একটি স্পেস-স্টেশন । কারণ পৃথিবীটা আর সুস্থ চৈতন্যের মানুষের বাসযোগ্য ছিল না । অবশ্য নিন্দুকেরা রটিয়েছিল ‘রবীন্দ্রনাথ’-এর নিষ্ক্রমণের মূল কারণ ছিল অন্য ।

 

আসলে ‘বাঙালি ব্রিগেড‘ ২২২০ সাল নাগাদ একটি অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র-মডেল নির্মাণ করে ও সন্ত্রাসের উৎস স্থানগুলিকে চিরতরে নিশ্চিহ্ন করে দিতে বদ্ধপরিকর হয় । সেই মডেলে তারা অন্তত দশটি হামলার প্রস্তুতি নেয়, প্রজেক্টটির নাম রাখা হয় ‘কাদম্বরী’ ! কিন্তু ঠিক তখন ‘রবীন্দ্রনাথ’-প্রজেক্টেরই কেউ কেউ অভিযোগের আঙুল তোলে ‘বাঙালি ব্রিগেড‘-এর প্রতি । ‘রবীন্দ্রনাথ’-এর আভ্যন্তরীণ কর্তৃপক্ষ জানায়, এই প্রজেক্ট স্ববিরোধী । সন্ত্রাসের জবাব কখনও সন্ত্রাস হতে পারে না । তাছাড়া এমন হামলায় অসংখ্য নিরপরাধ মানুষের প্রাণ যাবে । জোর করে মানবমুক্তি হয় না । আর তাই ‘রবীন্দ্রনাথ’ এই মডেল প্রজেক্টকে কোনোভাবেই সমর্থন করে না । এর ফলে আভ্যন্তরীণ স্তরে পারস্পরিক সম্পর্ক তিক্ত হয় । ক্রমাগত সন্দেহে একের পর এক কর্মী ও প্রশাসনিক কর্তাদের মধ্যে বিশ্বাসযোগ্যতা ঠেকে তলানিতে । এরপরই ‘বাঙালি ব্রিগেড‘ অস্বীকার করে ‘রবীন্দ্রনাথ’-কে । ‘রবীন্দ্রনাথ’ প্রোফেসর রঞ্জন আবদুল্লার নেতৃত্বে পাড়ি দেয় মহাকাশে, ঘুরপাক খেতে থাকে পৃথিবীর চারপাশে জননীপরিত্যক্ত নাছোড় মানবশিশুর মতো ।

 

সকলেই অনুভব করেছিল, এই বেলা বাঁচতে হলে ঐক্যবদ্ধ হওয়া প্রয়োজন । সুতরাং উফাওকা ও উবকা - উভয় শক্তিপুঞ্জেরই কিছু কিছু বিশিষ্ট মানুষ একজোট হন এবং তৈরি করেন 'অবজার্ভার' নামের একটি গুপ্ত সমিতি । কিন্তু ওই যে, স্বভাব যায় না ম’লে । তাই সেই তুলকালাম বিপদেও উফাওকা গলা টিপে ধরতে চায় উবকা-র । আর তারপরেই শুরু হয় সত্যিকারের যুদ্ধ !

 

... হ্যাঁ '৬৯ ঙ' সেদিন ফিস্ কবিরাজি খেতে খেতে এই গল্পটাই আমাদের শুনিয়েছিলেন । বারবার বলেছেন অবশ্য, বিশ্বাস-অবিশ্বাস আপনাদের উপরে । এই সত্যিকারের যুদ্ধ ঠেকানোর দায়িত্ব নিয়েই ভদ্রলোক নাকি টাইম ট্র্যাভেল করে এই ২০২১ সালে অবতীর্ণ হয়েছেন, সুদূর ২২২১ সাল থেকে ! এবং উনি প্রায়ই এরকম সময় যাত্রা করে থাকেন । নন্দন চত্বর ছেড়ে বাসে ওঠার আগে ভদ্রলোককে দুজনে চেপে ধরেছিলাম, বলেছিলাম মশাই যে সময়-যান-টিতে চেপে সময়ের নিয়ম ভেঙে 'অবজার্ভ' করে বেড়ান, একদিন দেখান না সেটি আমাদের ! উনি শুধু আমার দিকে চেয়ে গম্ভীর হয়ে বলেছিলেন, "দেখাবো !" কেমন জানি মনে হয়েছিল, ভদ্রলোকের আমাকে বেশ পছন্দ হয়েছে । সেদিন বাসে বাড়ি ফেরার সময় আমি সত্যিই রোমাঞ্চিত হয়ে ভাবছিলাম, কি গল্পই না শুনলাম আমাদের ভবিষ্যতের ! 'রবীন্দ্রনাথ' স্পেস স্টেশন-এ তৈরি হয়েছিল গুপ্ত সমিতির বিশেষ থিম সং - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা 'দুঃসময়' কবিতাটি অবলম্বনে । সেই গান নাকি ওদের কাছে প্রার্থনা সংগীতের মতো । ৬৯ ঙ যখন উচ্চারণ করছিল সেই মন্ত্রের মতো সংগীতের অনবদ্য পঙক্তিগুলি, আমার সত্যিই গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠছিল -

 

"যদিও সন্ধ্যা আসিছে মন্দ মন্থরে,

 

      সব সংগীত গেছে ইঙ্গিতে থামিয়া,

 

যদিও সঙ্গী নাহি অনন্ত অম্বরে,

 

      যদিও ক্লান্তি আসিছে অঙ্গে নামিয়া,

 

মহা আশঙ্কা জপিছে মৌন মন্তরে,

 

      দিক্‌-দিগন্ত অবগুণ্ঠনে ঢাকা--

 

           তবু বিহঙ্গ, ওরে বিহঙ্গ মোর,

 

                এখনি, অন্ধ, বন্ধ কোরো না পাখা।"

 

 

(৩)

লোকটা আমাদের যেমন বলেছিল, সেই অনুযায়ী আমরা সকালের দিকে পৌঁছে গিয়েছিলাম নাকতলার একটা গলিতে । সেখান থেকে আরেকটা তস্য গলিতে ঢুকে, হঠাৎ যেখানে মনে হচ্ছে ডেড এন্ড, সেখান থেকে বাঁয়ে ঘুরে একটা সরু একতলা ক্লাবঘরের ছাদে একটা স্টোর রুমে আমাদের নিয়ে গেল লোকটা । মিত্র দা সায়েন্সের লোক । তাঁর একটা অন্যরকম উত্তেজনা ছিল, যেন চোর ধরতে এসেছেন । কিন্তু ৬৯ ঙ ছিল ভারি নিরুত্তাপ !

 

৬৯ ঙ একটা তিন পায়া ভাঙা টুলের নীচে থেকে সাদা কাপড় জড়ানো একটা গোল মতন, উজ্জ্বল গোলক জাতীয় কিছু বার করল । কেমন একটা অদ্ভুত অপার্থিব গন্ধে ঘর পড়ে গেছিল । আমার তো বুক ঢিপঢিপ করতে লাগল ! মিত্র দার দিকে তাকিয়ে দেখি, ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ।

 

লোকটা সাদা কাপড়টা সরানোর সময় হঠাৎ আমার কাঁধ ঘেঁষে এসে বাঁ কানে মৃদু স্বরে বলল, "এবারে কপাল পুড়বে !"

 

আমি সবে বলতে যাবো, "মানে ?" - তার আগেই মিত্র দা উত্তেজিত হয়ে লোকটার হাত থেকে বিরাটাকার গোলকটি টেনে নিয়ে দেখতে গেল । আর ঠিক তখনই সশব্দে সেটি মাটিতে পড়ে চুরমার ! কপাল আর কাকে বলে ! 

 

কিন্তু লোকটা কি করে আন্দাজ করল ? তখন কিছুই মাথায় আসেনি, কিন্তু পরে সব জেনেছি । হ্যাঁ লোকটার কাছে এই ঘটনার ব্যাখ্যা শুনেই এসেছি ।

 

ওই গোলকটি যে ধাতু দিয়ে তৈরি, তা এই পৃথিবীতে নাকি পাওয়া যায় না ! গোলকটি ভেঙে যেতে একগাদা অদ্ভুত নকশার যন্ত্রপাতি ও থকথকে জেলির মতো একরকম স্বচ্ছ, সাদা তরল তার ভিতর থেকে ছিটকে মেঝেতে পড়েছিল । আর তা থেকে মিনিট পাঁচেক ধরে মৃদু ধোঁয়া ও বেরোতে থাকে ! দুঃখিত মুখে ৬৯ ঙ -র দিকে তাকিয়ে মনে হল, সে যেন কেমন উদাসীন ! কিছুই মাথায় ঢুকছিল না । এরপর সে-ই জানালো, আমরাই নাকি ওর ভবিতব্য । এসবই নাকি লুপ ! 'অবজার্ভার' নামে গুপ্ত সোসাইটির সবচেয়ে অকর্মণ্য অবজার্ভার নাকি সেই - এমনকি সে নাকি বারবার তা প্রমাণও করে ছেড়েছে !  লোকটা এই একই অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে বারবার গিয়েছে, কিন্তু ফলাফল কম-বেশি একই ঘটেছে । অর্থাৎ ঐ লোকটা আর আমরা এখন একই লুপ-এ বন্দী । মিত্র দা-র হাতেই ওই গোলকটির পঞ্চত্বপ্রাপ্তি ঘটেছে বারংবার । কপাল আর কাকে বলে ! সেদিন বড়ো লজ্জার সাথে বিদায় নিয়েছিলাম, ৬৯ ঙ -র কাছ থেকে, যদিও জানতাম আবার দেখা হবে । কিন্তু দেখা হলেও সেই আবার সন্দেহ করবো অথচ, চিনতে পারবো না ।

 

 

(৪)

ফেরার পথে মিত্র দা-কে জিজ্ঞেস করলাম, "কিছুই কি বিশ্বাস করেন নি ?"

 

উনি হতাশ সুরে বললেন, "কি করে বিশ্বাস করি বলো তো ? সূর্যের বয়স চারশো ষাট কোটি বছর । এখন এই নক্ষত্র বাবাজীবনের মধ্যবয়স চলছে বলতে পারো । এখনও মেনোপজ  ও হয় নি । এর পরও উনি আরও পাঁচশো কোটি বছর বহাল তবিয়তে থাকবেন । গোটা সৌর জগতের আটানব্বই শতাংশ শক্তি সূর্যের একার কবলে । মাত্র দুশো বছরের মধ্যে তার ফুরিয়ে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না ! একটা নক্ষত্রের মধ্যে মোট গ্যাসীয় পদার্থের শতকরা তিয়াত্তর ভাগ হাইড্রোজেন আর শতকরা পঁচিশ ভাগ হিলিয়াম গ্যাস কি মুখের কথা ভায়া ? অতই সহজ ফুরিয়ে যাওয়া ? কীসব উবকা ফুবকার গল্প শুনিয়ে আর একটা গোল বল দেখিয়ে বুজরুকি । শোনো ভায়া ওসব বিশ্বাস কোরো না । সূর্য যতদিনে শেষ হবে, ততদিনে মানুষ জাতটাই ইলোপ হয়ে যাবে । হোয়াইট ডোয়ার্ফ, রেড ডোয়ার্ফ - এখনও কত কি দেখতে হবে আমাদের !  তোমার চিন্তার কোনো কারণ নেই । জীবনটা মার্ভেল বা, ডিসি-র সিনেমা নয় । আমার কথা বিশ্বাস না হলে ইউটিউবে কতকগুলো ভিডিও আছে এর উপরে, দেখে নিও ।"

 

মিত্র দা বললো বটে । তাও মনের ভিতরে কেমন যেন খচখচ করতে লাগলো । খালি মনে হচ্ছে, হতেও তো পারে ! ইচ্ছে আছে, লোকটাকে আরেকবার চেপে ধরবো । সূ্র্য যাক্ আর থাকুক, একটা গল্পের প্লট তো অন্তত জুটে যাবে এ পোড়া কপালে ।