সুবল দত্ত

   


নির্বান পথ (ধারাবাহিক গদ্য)

[প্রথমেই বলে রাখি এই লেখাটি পরম্পরাগত অধ্যাত্মিক, দর্শন, বিজ্ঞান,যুক্তি,বিচার এইসব দৃষ্টিকোণ দিয়ে পাঠক যেন না পড়েন একটি অজানা অচেনা পথ দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে যেমন পুলক ও বিস্ময় হয়,তেমনি অনুভুতি নিয়ে পড়তে অনুরোধ জানাই মৃত্যুর সময় হৃদয় শ্বাস মস্তিষ্ক ইত্যাদি দেহের বিপাকীয় অংশগুলি বন্ধ হয়ে যাবার সাত সেকেন্ড পর মন ও প্রাণের ক্রিয়া নিয়ে কাউন্ট ডাউন কাল্পনিক গদ্য নির্বাণ পথ মন ও প্রাণশক্তি মৃত্যুর পর কিছুক্ষন শরীরে থাকে, এই বিজ্ঞানপ্রসূত থিয়োরীর প্রেক্ষিতে এই কল্পনা প্রথম অধ্যায়টি বিচ্যুতি সাতটি স্তরে প্রাণশক্তি ও মনোশক্তির দেহের উপস্থ(নিম্নাংশ) থেকে উর্দ্ধমুখ দিয়ে পৃথিবীচ্যুত হয়ে মহাশূন্যে লীন দ্বিতীয় অধ্যায়টি ষুষুপ্তি নিদ্রা বা dormant এই অংশে পার্থিব প্রাণশক্তির মহাপ্রাণের অথৈ সাগরে বিলীন এবং আবার অভিযোজনের জন্যে পার্থিব জৈব আধারের খোঁজ (ন্যাচারাল সিলেকশন) তৃতীয় অধ্যায়টি সংযুক্তি বা fusion সেই প্রাণশক্তির দুই অংশের খোঁজ শুক্রানু ও ডিম্বাণুতে নিষেক,মিলন ও গর্ভে স্থিত হওয়া প্রথম অধ্যায় বিচ্যুতির এটি পঞ্চম পর্ব]

                                          

The supreme intuition/অনুশাসন/দু সেকেন্ড

   এবার সে নিরাকার প্রভাহীন তেজবিন্দু। কিন্তু বোধ হলো সে নিজেই অসীম এবং মহা অসীমে পরিব্যাপ্ত। পরিব্যাপ্তির পরিমণ্ডল মাত্র দুই দিশায়। দুই অনন্ত দিশায় ছড়িয়ে রয়েছে বেগুনী ও ঘন নীলপদ্মের পাপড়ির মত তার তেজ নীলিমা। আত্ম বিশুদ্ধিকরনের ও শূন্যতা প্রাপ্তির পর এখন আবার কিছুকিছু মানবিক বোধগুলি অনন্তময় হয়ে তার উজ্জ্বল তেজপ্রভাতে ফিরে এলো।  চিনতে পারল যে এই দুই নীল শক্তির সাথে সে পূর্বপরিচিত। বস্তুতঃ পার্থিব জগতে সে জানতো বিশ্ব ব্রহ্মান্ড ধনাত্মক ও ঋণাত্মক এই দুই বিচারহীন পরিকল্পনাহীন স্বপ্নহীন ও সমাধানহীন প্রাকচেতনা ও পার্থিবঅস্তিত্বের সমন্বয়। পার্থিব জীবন ছিল বহমান উচ্চ ও নিম্ন মনোবৃত্তির এক গাণিতিক ছন্দবদ্ধ সমন্বয়। 

     জীবিতকালে প্রাকচেতনা তার অস্তিত্বজুড়ে কখনো কেমনো আসতো। কিন্তু তা ছিল সীমিত ও ক্ষণিক। তা ছিল কেবল ছলনা। পরে ঘটনার সত্যতায় নিজেকে গর্বিত কিংবা দোষারোপ করা ছাড়া আর কিছুই সেটার মূল্যায়ন ছিল না। এবার অনুভবে এলো যে সে ছিল এক অন্তঃস্থিত কণ্ঠস্বর।  দুই ধন ও ঋণ শক্তির সমন্বয়ে তার বহমান জীবন স্বতঃস্ফুর্ত ছিল ঠিকই কিন্তু জীবিতকালে আত্ম অভ্যন্তরে যে এক মহাজাগতিক গাণিতিক নিয়ামকের দ্বারা সে পরিচালিত হচ্ছিল সেই স্বয়ংটিকে এবার সে চিনতে পারল। এই সেই তেজবিন্দু সে স্বয়ং, যার আদেশে তার জৈবিক জীবনের ঘটনাগুলি পূর্বনির্ধারিত হিসেবে সময়ের স্রোতে প্রবহমান ছিল। 

      সময় তারকাছে যুক্তিহীন। অসীমে সে পরিব্যাপ্ত রয়েছে ঠিকই তবু সে নিজেই নিজের কেন্দ্রাতিগ হয়ে পরত পরত কয়েকটি অস্থায়ী পরিবর্তনশীল ভেদ্য স্তরবৃত্তের ভিতরে কম্পমান। স্তরগুলি হোলো নিখিল জগতের জৈব চেতনার ভাব। স্বপ্ন মন গুরুত্ব ও মৃত্যু। এই ভাবগুলিতে তার নিজস্বতা মোটেই বাছা যায় না। এমনকি এক একটি স্তরবৃত্তে অনন্ত ভাব। একটি স্বপ্নবৃত্তে অনন্ত ভিন্নতা। আবার যেমন একটি স্বপ্ন থেকে অসংখ্য স্বপ্নে যাওয়ার সম্ভাবনা তেমনি মন থেকে মননে যাবার অসংখ্য সম্ভাবনা। আর নিয়ন্ত্রক সেইই। ভাবগুলি এত বিশাল যে অনন্ত বললে কম বলা হয়। তবু সেগুলি একান্তই তার নিজের বলে বোধ হল। প্রতিটি স্তরবৃত্ত ভাবে তারই স্বজ্ঞা। তার বোধহল, যে একক জীববিশেষ জীবনধারাটি সে এইমাত্র ছেড়ে এল, সেটি শূন্যপ্রায়,অতি নগণ্য। নিখিলজগতের অনু থেকে বৃহত্তর সমস্ত জীবনীর ওই স্তরবৃত্ত ভাবগুলি সেইই তো পরিচালিত করেছে। কিন্তু এই পরিব্যাপ্তি ও বিশালতার বোধ কখনোই ছিল না,এখন হয়েছে। প্রকৃতি ও পুরুষ দুইই তার তেজবিন্দু স্বজ্ঞা। তার আরও বোধ হল, এই অভিজ্ঞানটি দেহ ছাড়ার পরই এসেছে। সেটি ছিল তার জীবনের সাথে ওতপ্রোতে। দেহ ছাড়ার পর ভূবন ছাড়ার পর অনেকবার অনেকরকম পবিত্রতায় ধুতে ধুতে শেষে এবার তার কাছে উন্মেষিত হল তার এই স্বজ্ঞা।

  অদৃশ্য শূন্যপ্রায় বিন্দু সে। সে স্বয়ং সম্ভাবনার নিয়ামক। যখনই এই ভাবের পূর্ণতা তার বোধে এল তখনই এও তার অনুভবে এল যে এই অদৃশ্য শূন্য থেকে নির্গত আকারহীন সংখ্যাহীন সজল ভাব স্রাবিত হচ্ছে। তারই সেই জলজ অমৃতাশ্রু ধারা যে প্রেমাবেগ এবং নিখিল জগতকে প্রাণময় সরস ও সজল করে রেখেছে এই প্রেম,এই পূর্ণতায় সে উদ্বেল হয়ে উঠলো। ক্রমে ক্রমে সে বিন্দু থেকে ছড়িয়ে পড়তে চাইল। তার এই চাওয়াটি যে স্বতঃই তাও তার জানা। সে যে প্রাণীজগতের নিয়ামক এবং সেই পার্থিব জলজ প্রাণপ্রকৃতির প্রেম বিধাতা এই অনুভবে সে বুঝতে পারলো স্বপ্ন মন গুরুত্ব ও মৃত্যু এইগুলি এখন তার কাছে সরস সাবলীল ও বাধাহীন। এইগুলি প্রেমেরই অঙ্গ এবং প্রেম বিনিময়ে বা প্রেমের তাগিদে পার্থিব প্রাণ জীবনযাত্রায় পেয়ে থাকে। এইসব ভাব অনন্ত। যদিও সময় বলে কিছুই নেই তবু এই আপাত অনন্ত পরম প্রেম ভাব বাধা অতিক্রম করে নিজেকে ছড়িয়ে পড়তে হবে। এইলগ্নে তার কি স্থিতি কি ব্যাপ্তি সেটা সম্ভাবনা ঠিক করে দেবে। এখন শুধু নিস্ক্রমন।   

      সে ছড়িয়ে পড়তে চাইল। নিজে নিজেই সৃষ্টি করল উচ্চচেতনাময় অমৃতধারা। সেই ধারায় প্রবাহিত হতে চাইল। নিখিলে পরিব্যাপ্ত সে নিজেই একমাত্র স্বজ্ঞা তবু সে নিজেকেই আদেশ দিল অনন্ত প্রেমধারায় অসীম থেকে অসীমতায় ছড়িয়ে পড়তে।এই সজল আবেগ ধারা দিয়েই নতুন প্রানের সৃজন করতে হবে। তার নিজেরই শুদ্ধাত্মার অনুকৃতি।


The final detachment/মহারন্ধ্র/এক সেকেন্ড

এই অস্তিত্ববিহীন অনন্ত প্রেম প্রস্রবনের না আছে কোনো ব্যাপ্তি না আয়াম। শুধুমাত্র প্রশান্ত অধিচেতনা। অনন্ত পরিধিহীন প্রশান্ত চেতনা। সৃজনশীল মায়াপ্রকৃতি থেকে ক্রিয়াহীন দিব্য পুরুষভাব আড়াল করে রেখেছে এই চেতন পর্দা। এই নিশ্ছিদ্র আবরনের অপরপারে অবিরাম ক্রিয়াশীল মায়াপ্রকৃতি আসলে অনন্ত সৃষ্টির গর্ভাশয়। সে এই অবিরাম অনন্ত মাত্রার প্রশান্ত আবরনে সংখ্যাহীন সাময়িক রন্ধ্র সৃষ্টি করল। রন্ধ্রপথে প্রবাহনালী যুক্ত করল। সেগুলোর কোনো আয়াম নেই। না আছে বিস্তার না শূন্যতা। সে নিজেকে অন্তর্দৃষ্টিরূপে সৃষ্টি করে প্রতিটি রন্ধ্রপথে বসিয়ে নিলো। এই অন্তর্দৃষ্টি তিন স্তরের। বহির্ভাগে শুধু প্রশান্তি ও আনন্দ। একটু ভিতরের স্তরটি তার কল্পবিস্তার ও তার ভিতরের স্তরটি দিব্যচেতনা। এক একটি রন্ধ্রপথ দিয়ে প্রবাহনালী অনন্ত সৃষ্টির গর্ভাশয়ে মিশেছে। ভিন্ন ভিন্ন রন্ধ্রপথে ভিন্ন সৃষ্টি ও লয়ের এক সাথে প্রবেশ ও বিলয় হচ্ছে। সে কল্পস্তরটি ভেদ করে গর্ভাশয়ে প্রবেশ করতে চাইল। গর্ভাশয়গুলির অনেকগুলি নিষ্ক্রিয় নির্বাপিত। আর অনেকগুলি নির্বাণের মুখে। যে গর্ভাশয় সৃষ্টির আনন্দে উদ্দীপিত, তার রন্ধ্রপথে ক্রিয়াশীল মহাশূন্যতারূপী অন্ধকার। কিন্তু যেগুলি নির্বাপিত তাদের রন্ধ্রপথ মহাপ্রশান্তিতে শ্বেতদীপ্ত।         

    তার অনন্ত আনন্দময় বিস্তৃতি। কিন্তু এই মূহুর্তে সে নিজেকে অসংখ্য অন্তর্দৃষ্টির ভিন্ন স্রোতে ছড়িয়ে দিয়ে নিজেরই সৃষ্ট অগণিত শূন্য আকারের রন্ধ্রগুলিতে প্রবেশ করল। প্রবেশ করা মাত্র সে মহাব্রহ্মান্ডের আদি স্ফোটশক্তির সৃষ্টি সম্ভাবনার মতো খুঁজতে লাগলো তেমনই এক সম্ভাবনা। সে সম্ভাবিত প্রাণশক্তির পুনরায় আহরণের জন্য উন্মুখ হয়ে রইল। এই সম্ভাবনা তো নিজেরই প্রক্ষেপন। সে নিজেই নিজেকে অন্তর্দৃষ্টিতে প্রক্ষেপ করে ও নিজেকে মহাশক্তি সম্ভবা করে অনন্ত সৃষ্টির গর্ভাশয়ে প্রবেশ করল এবং মুহুর্তেই নিজের সামনে নিজেকে সম্ভাবনায় পরিবেশিত করে সম্ভাবিত প্রাণশক্তির আহরণ শুরু করে দিল। সেই মূহুর্তে রন্ধ্রপথগুলি অদৃশ্য হয়ে গেল।

       কুম্ভের মত সৃষ্টির গর্ভাশয়ে নিয়তিগুলি প্রাণশক্তি রসে ভাসমান ক্রিয়াহীন সুসুপ্ত হয়ে রয়েছে। কখনো বহুমাত্রিক সৃজনশক্তির বুদবুদ ব্রহ্মান্ডের অসীমতা জুড়ে ফাটছে। কিছু অনন্তে বিলীন হওয়ার জন্য উন্মুখ। গর্ভাশয়ের ভিতরে ভিন্ন মাত্রার আনন্দময় জগত সৃষ্টির জন্য পরিণত হচ্ছে মহাজাগতিক ভ্রূণ। প্রাণশক্তি রসে ডুবে রয়েছে অতিচেতনার কল্প আধার তৈরির পূর্বাভাস।

     বুদ্বুদের বিস্ফোট থেকে একটি অতিমাত্রিক প্রাণশক্তিপুঞ্জ সে আহরণ করল। সে এখন নিজেই সম্ভাবনা তাই সেখান থেকে একটি সৃজনশক্তির অঙ্কুর বেছে তাতে নিজেকে লয় করে দিল। এই অভিযোজন ক্রিয়া হতে না হতেই সে অকল্পনীয় বেগে ফোয়ারার মতো ছিটকে বেরিয়ে মহাপ্রশান্তির অসীম আবরনে চিপকে গেল এবং সেখানেই সে প্রাণশক্তির বীজ হয়ে প্রাণের অংকুরোদ্গমের প্রতীক্ষায় রইল। শূন্যপথে শুরু হলো তার বিজারণ ঘুম। (ক্রমশঃ)