তন্ময় ধর


 

পাখি এল নীড়ে

         

পাখির নীড় নির্মাণকৌশলে, উপাদানের বৈচিত্র্যে আকর্ষণীয়। পৃথিবীর ৮৬০০ প্রজাতির পাখির মধ্যে বেশিরভাগই স্বকীয় অনন্যতায় নীড় বাঁধে। সেই নীড়-নির্মাণ, নীড়-পরিচর্যা ইত্যাদি নিয়ে এই প্রবন্ধে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হল।

 

‘পাখির নীড়ের মতো চোখ তুলে নাটোরের বনলতা সেন’- কবি জীবনানন্দ থেকে শুরু করে দেশ-বিদেশের অনেক কবিই পাখির নীড়ের মধ্যে যুগে যুগে সৌন্দর্য্য-স্নেহ-দাম্পত্যের আদর্শ ছবি খুঁজে পেয়েছেন। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ মানবাত্মার গহন রহস্যের যাতায়াত দেখেছেন পাখির নীড়ে- ‘এল আঁধার ঘিরে/পাখি এল নীড়ে/ তরী এলো ফিরে’। কিন্তু বিহঙ্গবিজ্ঞানীদের নিরুত্তাপ বিশ্লেষণে নীড় আদতে পাখির চিরকালীন গৃহ নয়- ডিম পাড়া, ফোটানো এবং শাবক-পালনের ‘ সাময়িক আশ্রয়’ মাত্র। পক্ষীশাবকেরা উড়তে শিখলেই নীড়ের প্রয়োজনীয়তা ফুরোয়, নীড় পরিত্যক্ত হয় চিরতরে।

       পাখীদের নীড়-নির্মাণের রীতি, শৈলী, স্থাপত্য ইত্যাদি এতই বিচিত্র ও বৈশিষ্ট্যময় যে, সে বিষয়ে পাতার পর পাতা লিখেও শেষ করা যাবে না। ক্ষুদ্র হামিং বার্ডের মাত্র ২ সেন্টিমিটার লম্বা-চওড়া বাসা থেকে শুরু করে বৃহৎ স্ক্রাবফাউল পাখির ১১ মিটার (৩৬ ফুট) লম্বা এবং ৫ মিটার (১৬ ফুট) চওড়া বাসা আমাদের বিস্ময়ের উদ্রেক করে। প্রায় সব পাখিই স্থলে বাসা নির্মাণ করে ডিম পাড়ে। একমাত্র সম্রাট-পেঙ্গুইনদের দেখা যায় ভাসমান হিমানীখন্ডের ওপর বরফ জড়ো করে ডিম পাড়তে। 

       পাখিরা সরীসৃপের বংশধর। ওদের সেই সরীসৃপ-পূর্বসূরীরা বাসা বাঁধত না। ঘাস অথবা মাটির উপর ডিম পাড়ত। পৃথিবীর প্রায় দুশো গোষ্ঠীর কোকিল, কাউবার্ড, দক্ষিণ আমেরিকার কৃষ্ণশীর্ষ হাঁস প্রভৃতি কয়েক জাতের পাখির মধ্যে তাদের সরীসৃপ-পূর্বজের অভ্যাস অপরিবর্তিত রয়ে গেল; তারা নীড়-রচনার কৌশল আয়ত্ত করতে পারল না। তবে যুগ-যুগ ধরে বিবর্তনের সময় ঐসব জাতের পাখিরা এখানে-সেখানে ডিম পাড়তে পাড়তে ক্রমশ লক্ষ্য করল যে, নিরাপত্তাহীন খোলা জায়গায় ডিম না পেড়ে যদি অন্য পাখির বাসায় ডিম পাড়া যায়, তবে ডিম থেকে বাচ্চা ফোটার সম্ভাবনা অনেক বেশি। সেই থেকে পরের বাসায় ডিম পাড়াটা তাদের স্বভাবে দাঁড়িয়ে গেল। তবে পৃথিবীর দুশো জাতের কোকিলের মধ্যে আমেরিকান কোকিল কিন্তু বাসা তৈরি করে। তবে সে বাসা একক বাসা নয়। কোকিলের সমগোত্রীয় পশ্চিম-ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জের কালো অ্যানি এবং আমেরিকান কোকিলদের যৌথ-নীড় রচনা করতে দেখা যায়। অর্থাৎ সকলে মিলে একটি বাসা নির্মাণ করে তার মধ্যে সমবেতভাবে ডিম পাড়ে।

       বক, হেরন, শকুন, সমুদ্রচারী গাল, টার্ন, প্লাভার, গিলমট, পানকৌড়ি, পাফিন, গ্যানেট প্রভৃতি বড় পাখিদের মধ্যে দল বেঁধে বাসা তৈরির প্রবণতা দেখা যায়। তাদের ওই নীড়-উপনিবেশ কোনো সুবিধাজনক স্থানে বছরের পর বছর (কয়েক শতাব্দী ধরেও বাসা নির্মাণ করতে দেখা গেছে) ধরে স্থাপিত হয়। অনেক সময়ই দেখা যায়, অনেকগুলি বিভিন্ন জাতের পাখি মিলে একটি বিশাল এবং ঘিঞ্জি কলোনি তৈরি করে বেশ শান্তিতে বাস করছে। সমুদ্রতীরে পাহাড়ের খাঁজে, নদীতীরে ঘন গাছে এই ধরনের জল-বিহঙ্গের উপনিবেশ সহজেই চোখে পড়ে। উত্তরবঙ্গে কুলিক পাখিরালয়ে, বর্ধমানে ভাগিরথীতীরে কাষ্ঠশালী-চুপীতে, হুগলীর সপ্তগ্রামে সরস্বতীতীরে অমন অনেক পক্ষী-উপনিবেশ দেখা যায়। জলবিহঙ্গ ছাড়াও স্থলচরদের মধ্যে টিয়া, চড়ুই, স্যান্ড মার্টিন, ভুড়ুই, জ্যাক-ড্র প্রভৃতি পাখি দল বেঁধে একই স্থানে বাসা বাঁধে।

 

       পাখির বাসার আকৃতি, গঠনশৈলী, উপাদান-বৈচিত্র্যও বিস্ময়কর। ইংল্যন্ডের বিখ্যাত গাইয়ে-পাখি থ্রাস বাটির আকারে বাসা নির্মাণ করে। লম্বা লেজওয়ালা টিট পাখির বাসা গম্বুজের মতো দেখতে। গাং-শালিখ, সোয়ালো, রিভার-মার্টিনের বাসা মাটির তৈরি। ভারতসহ দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার বাবুইয়ের বাসানির্মাণের নৈপুণ্য বিহঙ্গবিজ্ঞানীদের কাছে বিস্ময়ের। অস্ট্রেলিয়ার বাওলার পাখি বাসায় নানারকম রঙের কাজ করে। অদ্ভুত ঠোঁটওয়ালা ধনেশ বা হর্নবিলের সঙ্গিনী যখন গাছের কোঠরের বাসায় ডিমে তা দেয়, তখন পুরুষ ধনেশ বাসার মুখ মাটি দিয়ে প্রায় বন্ধ করে দেয়; কেবল একটি ক্ষুদ্র গবাক্ষ দিয়ে মাঝে মাঝে সে গৃহিণীকে আহার করিয়ে যায়। নাটহ্যাচ বা চোরপাখিরা গাছের কোঠরে বা দেওয়ালের গর্তে যে বাসা বাঁধে তার মুখ কাঠকুটো দিয়ে ঢাকতে তাকে প্রায় ৬০০০ উপাদান সংগ্রহ করতে হয়। দীর্ঘপুচ্ছ টিটেদেরও গম্বুজাকৃতি বাসা তৈরি করতে প্রায় ২০০০ পালক সংগ্রহ করতে হয়। আর্হেন্তিনা-চিলির ঝুঁটিওয়ালা কূট পাখি হ্রদের ধারে প্রায় ৩০০০ পাথরখন্ড সাজিয়ে বাসা তৈরি করে। ঐ বাসা অবশ্য তারা বহু বছর ব্যবহার করে।

বাসা নির্মাণের উপযুক্ত স্থান নির্বাচন পাখি কিভাবে করে তা বোঝা শক্ত। সীমিত বুদ্ধি-বিবেচনার সাথে প্রবৃত্তির তাড়নার তাল মিলিয়ে ঠিক কিভাবে এটা হয় তা নিয়ে বিহঙ্গবিজ্ঞানীরা ধন্দে। একদল বিজ্ঞানীর মতে, এই নির্বাচন কতগুলি স্বয়ংসিদ্ধ প্রতিক্রিয়ার ফল, যাকে বলা হয় ‘হ্যাবিচুয়াল সিলেকশন’ বা ‘স্বাভাবিক নির্বাচন’। অর্থাৎ পাখিরা যে-স্থানে জন্মেছিল এবং প্রতিপালিত হয়েছিল, সেখানেই তারা ফিরে আসে নীড় বাঁধার সময় হলে। তার পূর্বসূরীরা যে স্থান নীড়-নির্মাণের পক্ষে উপযুক্ত মনে করেছিল, তাকেই তারা নিরাপদ মনে করে। কিন্তু এই যুক্তির মধ্যে একটি চক্রায়ত প্রশ্ন লুকিয়ে থাকছে; পূর্ববর্তী পাখিরা কিভাবে স্থান নির্বাচন করেছিল? সুতরাং মৌলিক উত্তর অবশ্যই খাদ্যের সুলভ্যতা এবং নিরাপত্তা। গাংশালিখ দম্পতিকে বাচ্চার খাবার জোগান দিতে একদিনে প্রায় ৫৫০ বার বাসার বাইরে যেতে হয়। সুতরাং, খাবারের উৎস বাসার কাছে হলেই সুবিধাজনক। নিরাপত্তার কথা ভেবে অনেক পাখি বোলতার চাকের কাছে বা ফণিমনসার কাঁটাঝোপের মধ্যে বাসা নির্মাণ করে। এছাড়া রোদ এবং আবহাওয়াও বাসা নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। সাধারণত বাসার মুখগুলি হয় পুবদিকে; ফলে সারাদিনের চড়া রোদের হাত থেকে পক্ষীশাবকেরা নিস্তার পায়।

বিহঙ্গবিজ্ঞানে পক্ষীশাবকদের সাধারণত দুটি শ্রেণীতে ভাগ করা হয়- ‘নিডিফিউগাস’ বা জন্মগত সাবালক এবং ‘নিডিকোলাস’ বা জন্মের পর কিছুকাল নাবালক। প্রথম শেণীর শাবকেরা জন্মের পরই চক্ষুষ্মান, দৌড়াতে সক্ষম; দ্বিতীয় শ্রেণী ডিমের খোলস থেকে মুক্তি পাবার পর কিছুকাল অন্ধ ও অসহায়। তাই প্রথম দলের বাসা নামমাত্র, অগোছালো এবং দায়সারা। সেগুলি পাতা হয় সমুদ্রতীরে পাথরে খাঁজে বা ঝোপে-ঝাড়ে। এদের ডিম আকারে বড় এবং দীর্ঘকাল তা দেওয়ার প্রয়োজন হয়। দ্বিতীয় দলের বাসা সযত্ননির্মিত এবং দীর্ঘকাল ব্যবহারের উপযুক্ত। গাছের ডালে, কোটরে সুন্দরভাবে সেগুলি বাঁধা হয়। এদের ডিম আকারে ছোট এবং তুলনামূলকভাবে স্বল্পকাল তা দিতে হয়। প্রথম দলের মধ্যে পড়ে ময়ূর, হাঁস, মুরগী এবং নানা জাতের ছোট জলচর পাখিরা। দ্বিতীয় দলের মধ্যে পড়ে বক, কাক, শামুকখোল,হেরন, পেঁচা, পায়রা, কাঠঠোকরা এবং বিভিন্ন জাতের গায়ক পাখি।

বাসার পরিচ্ছন্নতা রক্ষা করা কিন্তু একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পরিত্যক্ত খাদ্য এবং শাবকের বিষ্ঠার বাসা সহজেই অপরিচ্ছন্ন হয়ে ওঠার সম্ভাবনা থাকে। কেননা, পক্ষীশাবকদের প্রধান খাদ্য কীটপতঙ্গ বেশিরভাগ সময়েই তাদের বদহজম হয়। মাছরাঙা জাতীয় পাখিরা মাছ খেয়ে বমি করে বাচ্চাদের খাওয়ায় বলে ওদের বাসায় বমিতে, মাছের কাঁটায় পচা-গন্ধে দুর্বিষহ পরিবেশ তৈরি হয়। আবার ঈওগল, পেঁচা প্রভৃতি শিকারী পাখির ডিম ফুটে বাচ্চা বেরোনোয় অনেক ক্ষেত্রে এত অস্বাভাবিক বিলম্ব হয় যে, একটি বাচ্চা যথেষ্ট বড় হয়ে যাওয়ার পর অন্য বাচ্চা ডিম ফুটে বেরোয়; এবং অনেক ক্ষেত্রেই বড়টির পায়ের চাপে ছোটটি মারা যায়।

পাখির বাসা পাখির জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক প্রজাতির পাখির ক্ষেত্রেই নীড় ও শাবক সম্পর্কটা একান্ত অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। নীড় থেকে কোন শাবক যদি একটু দূরে সরে যায়, এমন কি একপাশে চলে যায়, তাহলে তার পিতা-মাতা কোন মনোযোগই দেয় না আর; অনাহারে শাবকটি শুকিয়ে মরলেও না। 

পাখিরা তাদের সন্তানকে জীবনের এই গুরুত্বপূর্ণ জিনিসটি অর্থাৎ নীড়-নির্মাণ কৌশল কিন্তু শেখায় না। যৌবনে উত্তীর্ণ হয়ে পাখি যখন বাসা তৈরি করে তখন তার সঙ্গে তার পিতা-মাতার কোন সম্পর্ক থাকে না। অন্য কোন বয়োবৃদ্ধ পাখির কাছেও তরুণ পাখিরা বাসা তৈরির কৌশল শেখে না। তা একান্তই তাদের জন্মগত। ফিনল্যান্ডের কয়েকজন প্রাণীবিজ্ঞানী কয়েকটি টার্নস্টোনের ডিম নিয়ে গিয়ে রেড-স্যাঙ্কের বাসায় রেখে আসেন। দেখা গেল, নবজাতকেরা তাদের পালক পিতা-মাতার ভাষা ও গানই শিখেছে। কিন্তু বাসা নির্মাণের সময় তারা ফিরে গেছে টার্নস্টোনের স্বধর্মে।

 

 

 

তথ্যসূত্রঃ-

 

১। পাখির পৃথিবী- বিশ্বনাথ মুখোপাধ্যায়

২। Book of home study course in Ornithology- Vol 1- IBSNH

৩। en.wikipedia.org