সাম্প্রতিক

6/recent/ticker-posts

রাজদীপ ভট্টাচার্য



বাঁধন 



    তীব্র ধাতব শব্দে ইলেক্ট্রিক চুল্লীর শাটার খুলে গেছে আবার। আগ্নেয়গিরির মুখ থেকে ছিটকে আসা লাভার মতো একটি পাত্রে পড়ে আছে ছাই ভস্ম। চোখের জলে ভাসতে ভাসতে সমীর বাবু জল ঢেলে ঠান্ডা করছেন আগুনকে। ডোম নিস্পৃহ ভাবে তার মধ্যে থেকেই অভিরূপের নাভিকুণ্ডলী খুঁজে নিয়ে গেঁথে দিয়েছে নরম কাদার তালে। এবার শুধু ভাসিয়ে দেবার পালা।

     সেই এত্তটুকু ছেলেটা। কাঁধের ওপর ছোট্ট অভিরূপকে চাপিয়ে ঘোরাটা একসময় ভারি পছন্দ করতেন সমীর বাবু। কত বয়স তখন আর, বছর তিনেক হবে। বিপাশা আর অভিকে নিয়ে উত্তর কোলকাতায় ঠাকুর দেখতে বেরিয়েছেন। গোটা রাস্তা বাবার মাথা জড়িয়ে দিব্যি ঘাড়ের ওপর দুদিকে দুই পা ঝুলিয়ে বসে রইল অভি। ওখানে বসেই হাজার প্রশ্ন। "বাবা, অসুরের রং সবুজ কেন? কার্তিককে পিঠে নিয়ে ময়ূর ওড়ে কি করে?" -- এই সব।

    ছেলেকে ঘাড়ে নিয়ে পথ চলা এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা। মুখ দেখা যায় না।  অঙ্গ-ভঙ্গী দেখা যায় না। শুধু ওজন টের পাওয়া যায়। অস্তিত্ব বোঝা যায়। কথাবার্তা চালানো যায় দিব্যি। ছেলে তার নরম আঙুল দিয়ে আঁকড়ে ধরে রাখে পড়ে যাওয়ার ভয়ে। সেই বাঁধন, সেই উষ্ণতা উপভোগ করা যায় বেশ।

    গঙ্গায় অস্থি বিসর্জন দিয়ে ফিরছিলেন সমীর বাবু। একমাত্র ছেলে অভিরূপের অবশেষ। তীব্র গতির বাইক। আছড়ে পড়েছিলো উড়ালপুলের রেলিঙে। সেখান থেকে ছিটকে তিরিশ ফুট নিচের খালে। হসপিটালে পৌঁছনোর আগেই সব শেষ। 

    ওদিকে বিপাশা নদী হয়ে ভাসছে বাড়িতে। ধরে রাখা যাচ্ছে না। আর এদিকে, চশমার কাচ পরিষ্কার তবু সব কিছু বড় অস্বচ্ছ সমীর বাবুর চোখে। শ্মশানঘাট থেকে কাজকর্ম মিটিয়ে এবার ঘরে ফেরার পালা। চারপাশে শুভাকাঙ্খী মানুষজন। কেউ হাত ধরছে। কেউ স্বান্তনা দিচ্ছে। কেউ সাবধান করছে রাস্তার খানাখন্দ থেকে। কাউকে কিছু বলতে পারছেন না তিনি। এসব কোনো কথাই তাঁর পর্দায় আঁচড় কাটছে না। মৃত মানুষের হৃদয়রেখার মতো তাঁর মন। নিস্তরঙ্গ। যেন সেই ছোট্ট অভি এখনো দিব্যি বসে আছে ঘাড়ের ওপর। দুদিকে পা ঝুলিয়ে। 

    সেই ওজন অনুভব করতে করতে হেঁটে চলেছেন সমীর দাশগুপ্ত। এক পা এক পা করে চলেছেন আর খোলা আকাশের নিচে যেন ক্রমশ মাটির নিচে ঢুকে যাচ্ছে তাঁর শরীর। প্রতিবার অনেক মাটি-বালি সরিয়ে তুলে আনতে হচ্ছে পরবর্তী পদক্ষেপ। তবে সন্তানকে ঘাড়ে চাপিয়ে ঘোরার এই এক সুবিধে। মুখ দেখা যায় না, শুধু অস্তিত্ব অনুভব করা যায়। শুধু উষ্ণতা বিনিময় করা যায়। ছোটো ছোটো নরম দুটো হাত আঁকড়ে ধরে থাকে সারাক্ষণ, পড়ে যাওয়ার ভয়ে!





রাজদীপ ভট্টাচার্য