সাম্প্রতিক

6/recent/ticker-posts

শিপ্রা মালাকার : গল্প:মাদার্স ডে

 


মাদার্স ডে


১

 দুধ-কর্নফ্লেক্সের বাটির সঙ্গে মাঝপথেই আড়ি করে দৌড়ে নিজের ঘরে চলে এসেছে ছোট্ট মোহর। রবিবার হলেও যে মাম্মাকে অফিস যেতে হবে এ কথা কাল রাতেই জানা হয়ে গেছে। হাতে সময় খুবই কম। তাই ঝটপট ড্রয়িং খাতায় পেন্সিলের কাজ শুরু করে দিল মোহর। 

 তারপর ধরে ধরে সুন্দর করে রং শেষ করে ডাইনিংয়ে উঁকি। ওইতো খেতে বসেছে মাম্মা। তার মানে এখনও দশ মিনিট। ওহ দশ মিনিট অনেক সময়, মনে মনে ভাবে মোহর। এই ফাঁকে তুলতুলে পায়েসের সঙ্গে প্ল্যানিংটা সেরে ফেলে। অফিস ব্যাগে আঁকার কাগজটা ভরে নাহয় দেবে, কিন্তু মাম্মা যদি অফিসে নিজের ডেস্কে বসার আগেই ব্যাগ খুলে ফেলে তাহলে সারপ্রাইজটা পুরোই মাটি! 

 ভ্রমর চোখদুটো উড়তে উড়তে গিয়ে বসল চার্জে থাকা স্মার্টফোনটার উপর। অমনি দারুণ একটা আইডিয়া চলে এল মোহরের মাথায়। সেইমত কাজ সেরে পায়েসকে চাকুম চুকুম করে কয়েকটা হামি খেয়ে ধীর পায়ে নমিতা মাসির কাছে এসে দাঁড়াল। 

 ভেবেছিল বেরিয়ে যাওয়ার আগে আজ অন্তত মাম্মা একবার কোলে নেবে, একটু আদর করবে। কিন্তু সেসব কিছুই হল না। শাড়ি নষ্ট হলে নাহয় নমিতা মাসি আবার ঠিক করে দিত! এসব ভাবতে ভাবতে ছোট্ট মানুষটা একটা বড় দীর্ঘশ্বাস চেপে অগত্যা দুধ-কর্নফ্লেক্সের সঙ্গে ভাবটা সেরে ফেলল।

 

 ২

 ফেসবুক খুলতেই গুচ্ছের নোটিফিকেশন। বেশিরভাগই হা-হা রিঅ্যাক্ট। অজান্তেই ভ্রূ দুটো কুঁচকে ওঠে সহেলীর। কয়েকদিনের মধ্যে কিছু পোস্ট করেনি, তাহলে! হ্যাক হল কিনা কে জানে! দ্রুত আঙুল চালিয়ে নিজের ওয়ালে যেতেই থতমত খেয়ে যায়। মোহরের একটা ড্রয়িং। তিন ঘণ্টা আগের পোস্ট। এখন বাজছে বারোটা, তার মানে ন’টার দিক করেই যা হওয়ার হয়েছে। 

 হ্যাশট্যাগ “ Happy Mother's Day” 

Love you MAAMMA। 

 একটা প্রকান্ড ডিম্বাকৃতি মুখ, যার দু’দিকের কানের উপরে সামান্য কিছু চুল আছে। মাথার সামনের দিকটা ছবিতে দেখা যাচ্ছে, যেখানে একটাও চুল নেই। একটু ডানদিক ঘেঁষে মাঝারি মাপের একটা গোল। হাসিটা স্মাইলির মত করে আঁকা। আর কয়েকটা আকাশি রঙের তির্যক দাগে, শাড়ির আঁচল। খুব চেনা লাগে মুখটা। কিন্তু চট করে রিলেট করতে পারে না। 

 নোটিফিকেশনগুলো ভালো করে দেখে। লাভ আর কেয়ারও আছে, তবে হা-হা টাই বেশি। স্বাভাবিক। বম্বের হাই প্রোফাইল মডেলকে টেক্কা দিতে পারার মত সুন্দরীকে তার মেয়ে যদি এইরকম করে আঁকে, হা-হা তো আসবেই। অনেকগুলো কমেন্টও আছে। সেসবের দিকে আর গেল না সহেলী। 

 মোহরের খাওয়ার খোঁজ নিতে Namita Made ডায়াল করল। ভিডিও কলে মুখটা দেখা যেতেই সহেলীর গোটা পৃথিবীটা যেন টলে উঠল। এইতো সেই ছবি যেটা মোহর এঁকেছে! মোহরের অবচেতন মন কি তবে নমিতাকেই… আর ভাবতে পারল না। 

 নরম ‘হ্যাঁ বৌমণি’ চাপা পড়ে গেল কর্কশতার আড়ালে। 

মোহর কোথায়? 

দৌড়ে এসে নমিতা মাসির আঁচল টেনে মুখ মুছতে মুছতে মিষ্টি একটা ‘হাই-ইইই’ বলে মোহর। 

হাউ ডেয়ার য়্যু? তুমি কেন এরকম একটা পোস্ট করেছ আমার ফেসবুক ওয়ালে, তাও উইদাউট মাই পারমিশন? 

 মুহূর্তের মধ্যেই রোদ্দুর হাসিটুকু মেঘলায় পরিণত হয়। ফোঁপানো শব্দগুলো কোনোক্রমে বেরিয়ে আসে, আজ তো মাদার্স ডে, তাই তোমাকে সারপ্রাইজ দেব বলে এরকমটা করেছি মাম্মা। 

 চুপ! একদম মুখে মুখে তর্ক করবে না। 

 তুমি সারাদিন ওকে এইসব শেখাচ্ছ? এরকম সব ব্যাড ম্যানার্স? 

 নমিতা কী বলবে বুঝে উঠতে পারে না। 

 ঠিক আছে বাড়ি যাই। তারপর তোমার হচ্ছে। 

 

৩

 কেটে যাওয়া ফোনের এপারে পায়েসকে জড়িয়ে মোহর তখন কাঁদছে আর বলছে, তবে যে ড্রয়িং মিস বলল পৃথিবীতে মা সবচেয়ে সুন্দর, কারণ মায়েরা সবকিছু সুন্দর করে রাখে। ঠিক যেমন তুমি আমাদের ফ্ল্যাটটা এত সুন্দর করে সাজিয়ে রাখো, শপিংয়ের সময় আমাকে কত্ত সুন্দর সব জিনিস পছন্দ করে দাও, সুন্দর সাজিয়ে দাও, সুন্দর রান্না করো— তাই তুমিই আমার কাছে সবচেয়ে সুন্দর। তাইতো তোমাকেই এঁকে মাম্মাকে গিফ্ট করেছি আর মাম্মা আমাকে এত বকল! 

 বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে নমিতার। নানাভাবে ভোলাতে চেষ্টা করে। একটা রূপকথার গল্প আর ছড়ার গান শোনার পর অনেক কষ্টে, মাখন দিয়ে মাখানো তিন-গাল ‘ভাতু’ আর আধখানা ‘ডিমি’ খাওয়াতে পারে। তিনবার খেলে আড়ি হয়ে যায় এরকমটা বলে আরও এক-গাল। তাও সবটুকু খায় না মোহর। নিজে একটুখানি মুখে নিয়ে বাকিটা জোর করে নমিতার মুখে ঠেলে দেয়, ছোট ছোট হাত দিয়ে। 

 একটু আগে টিভিতে একটা বিজ্ঞাপন দেখছিল, এরকমভাবেই মাকে মিষ্টি খাইয়ে দিচ্ছে সন্তান। আজ কি যেন একটা বিশেষ দিন। আনমনে ভাবছিল, সংসারটা টিকলে কি ওরকম ভাবে তার সন্তানও… মনে মনে হেসে উঠল নমিতা। এমনিতেই তার রূপের যা ছিরি! সঙ্গে টিউমার, অপারেশন এতকিছুর ঝক্কি পেরিয়ে যৌবন নেভার বয়সে আরোই কিছু নেই। গলার কাছে কান্না দলা পাকিয়ে উঠে আসছে। 

 উহ তুমি খাবে কি না? কচি একটা ধমকের চোটে ভাতটুকু কান্নার দলাকে ঠেলে ভেতরে পাঠিয়ে দেয়। টিভিতে দেখা বিজ্ঞাপনের মিষ্টিটার চেয়েও বেশি মিষ্টি লাগে এই স্বাদ। 

 হাত মুখ ধুইয়ে মোহরের ঘরে এসে ঘুম পাড়ানোর তোড়জোড় করছে, এমন সময় নিজে থেকেই ড্রয়িং খাতার ছবিটা মেলে ধরল মোহর। 

 কোলে নিয়ে দোল-দোল আদরে নমিতা তাড়িয়ে দিচ্ছে বর ছেড়ে যাওয়া, ভাইদের লাঞ্ছনা, নিজের কদর্য রূপের প্রতি সমস্ত ব্যঙ্গ এমনকি বৌমণির অপমানকেও। 

 কাঁধ থেকে মুখ তুলে নরম দুটো হাত থুতনি ধরে কত আবদার করছে একটু হাসার জন্য, তবু মোহরের আঁকা ছবির মুখোমুখি বসে কেন যে এত কান্না পাচ্ছে!

 


          শিপ্রা মালাকার 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ