দেবাশীষ মুখোপাধ্যায়

 




জুড়াইতে চাই


   আজ হলদিয়া অফিসে ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেটের পর্যবেক্ষণ।সাজ সাজ রব। কর্মীদের সতর্ক বাণী,কামাই করা যাবে না। ম্যাজিস্ট্রেট কেরালার লোক।কাজ ছাড়া কিছু বোঝেন না। কাউকে পরোয়া করেন না। অফিসে কর্মীদের কাজের দীর্ঘসূত্রিতার খবর খুবই চেনা।ভয় হচ্ছে অভীকের সেখানেই। কদিন ধরে ফাইল একদম তৈরি রাখার চেষ্টা করছে ।কোন ত্রুটি যেন ধরা না পড়ে।অবশ্য ওর সে ভয় একটু কম।ও সব ফাইলই তাড়াতাড়ি ছেড়ে দেয়। অদৃশ্য কারণের জন্য আটকে রাখে না।এ বিষয়ে অফিসে ওর সুনামই আছে। তবুও অভীক খুব সতর্ক।

     কাল কিছু ফাইল বাড়ি নিয়ে এসেছিল।আর একবার শেষবারের মতো নজর বোলানো।পরীক্ষার আগের রাতের পড়ার মতো।ব্যাগ যথারীতি খুবই ভারী। অফিসে আজ খাওয়া আছে ।তাই টিফিন নেই আজ ব্যাগে। তাছাড়া এতো সকালে মায়ের পক্ষে টিফিন তৈরি করাও অসুবিধা জনক।মা ঘুমের ওষুধ খেয়ে শোয়। আটটার আগে উঠতে পারে না। কাজের মাসি এসে ওকে চা টিফিন করে দেয় সকালে।অন্যদিন ও সাড়ে আটটায় ট্রেন ধরে।আজ সাড়ে ছটায় বেরিয়ে পড়েছে। যাবে হলদিয়া। দক্ষিণ পূর্ব রেলের অবস্থা যা ! কোথায় কতোক্ষন আটকে থাকবে, রাম জানে ! এজন্যই কিছু সহকর্মী অফিসে থেকেই গেছে। যদি ঠিক সময়ে আজ অফিসে পৌঁছতে না পারে।ওকেও বলেছিল। কিন্তু বাড়িতে ও না থাকলে মা খুব টেনশন করবে। এতে শরীর খারাপ হয়ে যেতে পারে।হাই প্রেশারের রোগী মা দীর্ঘ দশ বছর।বাবা মারা যাবার পর থেকেই।

  আজ ট্রেনে ওদের গ্রুপটা নেই। সাড়ে আটটার মেদিনীপুর লোকালের শেষ কামরায় ওদের জনা কুড়ির দল। হইহই করেই দীর্ঘ ট্রেন যাত্রা কখন কেটে যায় খেয়ালই হয় না।আজ সে সুবিধা নেই।একা একা যেতে হবে। কিছু পরিচিত মুখ পেলো ও। দুচার কথা বলেই সকলে ঘুমের আলিঙ্গনে। অভীক ট্রেনে ঘুমাতে পারে না।একা থাকলে ও বই পড়েই সময় কাটায়।আজ ব্যাগ খুব ভারী বলে আর বি নিতে পারে নি। মোবাইলে গান শুনতে শুনতে যাবে ঠিক করলো। রবীন্দ্র সংগীতে ডুব দিল ও। ট্রেনটার গতি খুব আস্তে। বিরক্ত লাগছে খুব।গানে ভালো মন দিতেও পারছে না যেন।

হঠাৎ উল্টোদিকে খুব জোরে ফোলালাপ কানে এলো।উৎসের দিকে মুখ ঘুরিয়ে দেখল,একটি বছর উনিশ কুড়ির মেয়ে ফোনে খুব জোরে কথা বলছে। প্রচন্ড রাগের কথাবার্তা সারা কামরায় ছড়িয়ে পড়ছে।মেয়েটির সেদিকে খেয়াল নেই।অভীক একদৃষ্টে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে রইল।সারা মুখের বদলাতে থাকা জ্যামিতি ওর খুব চেনা। সেই ভ্রু কোঁচকানো।চোখ ছোট হয়ে আসা। সেই মাঝে মাঝে জিভ দিয়ে ঠোঁট চাটা। মোবাইল এক হাত থেকে অন্যহাতে বারবার ঘোরা। কপালের রাগের বিন্দু বিন্দু ঘাম গাল বেয়ে নেমে আসা। মেয়েটা যেন এ মুহুর্তে খুব চেনা ওর। চেনা রাগ, চেনা ঘৃণা ...... মনের ভেতর যেন একটা বিস্ফোরণ হচ্ছে ওর। মেয়েটার চোখের জলের মতো অভীকের বুকভেজা কান্নার জল।

     সেদিনও অভীক এভাবেই রেগে উঠেছিল প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায়। তারপর আস্তে আস্তে শান্ত হয়ে গেছিল। ফোনের ও প্রান্তে সেদিন সঞ্চিতা বলে উঠেছিল দীর্ঘ ছয় বছরের প্রেমে এবার ও দাঁড়ি দিতে চায়।ছেলেখেলার মতো কারণগুলো শোনাচ্ছিল সেদিন অভীকের কানে। বাড়ি ফিরে শাওয়ারের তলায় দাঁড়িয়ে খুব কেঁদেছিল। কান্নার নোনা জল ধুয়ে মনকে শান্ত করেছিল মায়ের জন্য। সঞ্চিতার সাথে সম্পর্কের ভাঙ্গণ মায়ের শরীর খারাপের কারণ যেন না হয়।পরে বন্ধুদের মুখে শুনেছিল, প্রচুর পয়সার মালিকের একমাত্র ছেলেকে ও বিয়ে করেছে। হাওড়ার দাশনগরে রেলের পার্টস জোগানের দুটো বড়ো লোহার কারখানা। সেদিন থেকেই ঘৃণায় ওর ভালোবাসার ওপর বড়ো পাথর চাপা দিয়ে দিয়েছিল।ভেবেছিল, ভালোবাসার সবুজ ঘাস সব মরে সাদা হয়ে গেছে। কিন্তু আজ ঐ মেয়েটার চোখের জল দেখে এতো কান্না আসছে কেন ওর বুকে নদীর স্রোতের মতো ! তবে কি ভালোবাসা মরেও মরে না। ফিরে ফিরে আসে অপরের অভিব্যক্তির প্রপর্ণ সংরাগে !

   





কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন