অমিতাভ দাস

 


বাবা বাবা গন্ধ


 লিকার চায়ে শেষ চুমুক দিয়ে কাপটা ফেলে দিলাম ডাস্টবিনে। রতনকাকা একটা সিগারেট এগিয়ে দিয়ে বসলেন আমার মুখোমুখি। দোকান ফাঁকা থাকলে রতনকাকা সঙ্গে আমার অনেক গল্প করেন।তিনি নিজেও একটা লিকারে চুমুক দিয়ে বললেন, শোনো মাস্টার একটা গল্প বলি: রতনকাকা আমাকে মাস্টার বলেই ডাকেন।

বললাম, হ্যাঁ বলুন--

      তিনি বলতে শুরু করলেন: আমি তখন নৈহাটির দিকে একটা জুট মিলের সামনে ছোট্ট একটা চায়ের দোকান দিয়েছিলাম। ভালোই বিক্রি হত। বহু বছর আগের কথা। কত যে কথা আছে-- সেসব মনে পড়ে মাঝে মাঝে-- তুমি তো লেখক তাই তোমাকেই বলি।

    আমি মাথা নাড়ি। সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়ি।

      রতনকাকা বলতে থাকে, একদিন দুই মিলের শ্রমিক চা খেতে খেতে গল্প করছিল। একজন বললে, এই তো সামান্য রোজগার। তুই-আমি দুজনেই এই-ই মায়না পাই। অথচ আমি দালান বাড়ি করে পাকা কল-বাথরুম নিয়ে বেশ ভালো ভাবে আছি, আর তোর সেই এক-ই অবস্থা। অভাব ঘুচল না। সেই বেড়ার বাড়ি। বেড়ার ফাঁক দিয়ে শেয়াল-কুকুর দৌড়ায়। এই তো আর ক'দিন পর রিটায়ার করবি। তোর আর উন্নতি হল না।

              দ্বিতীয় জন চুপ করে শুনছিল। তারপর এক সময় মাথা তুলে বললে, ঠিক-ই বলেছিস ভাই। আমি তোর মতো দালান বাড়ি , ভালো কল-বাথরুম করতে পারিনি বটে কিন্তু আমার ছেলে দুটো যাদবপুর ইনভার্সিটিতে পড়ে। পড়াশুনোয় বেশ ভালো। খুব কষ্ট করে ওদের পড়াই। তোর ছেলেটা তো মাধ্যমিক ফেল। রকে বসে আড্ডা দেয়।

    প্রথমজন রাগে অথবা লজ্জায় বা অন্য কোনো কারণে উঠে দাঁড়ায়। হাতে ধরা চা-টুকু রাস্তায় ফেলে দিয়ে হনহন করে ঢুকে যায় মিলের ভিতরে। 

     রতনকাকা বললে, সেদিন ওই কথাটা আমার জীবনে একটা বিরাট পরিবর্তন এনে দিল। এত ভালো লাগল যে...

--আপনার একটা ছেলে ডাক্তার আর অন্যজন শিক্ষক, বললাম আমি। তাই তো?

   রতনকাকার মুখে ছড়িয়ে পড়ল হাসি। শীতের অলস দুপুরে দোকান ঘরের ভিতর পরিচ্ছন্ন সতেজ একটা বাবা বাবা গন্ধ সিগারেটের গন্ধকেও ছাপিয়ে গেল।

 

 


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন