তৃষ্ণা বসাক


 ore


মধ্যিখানে চর

তৃতীয় পর্ব


নীল সবুজ মাতৃভূমি

 

ময়মনসিংহ স্টেশনের মধ্যে বিশেষত্ব  কিছু নেই। এপার বাংলার যেকোন রেলস্টেশনের মতোই। নোংরা, ধুলো পড়া চেহারা, তবে বেশ বড়।  অচেনা আকাশের একটা টান থাকেই, বাকিটা শরৎ ঋতুর হাতযশ। তার ওপর যখন ভীষণ চেনা আর প্রিয় মুখ দেখা দিল অচেনা প্লাটফর্মে, তখন এই কাগজেকলমে বিদেশ, স্বদেশ হয়ে উঠল। বাঙ্গালির দুর্গাপুজো তো আসলে ঘরে ফেরার উৎসব। সেই ঘর আপাতত নাটক ঘর লেন। স্টেশন থেকে খুব সামান্যই পথ। হাতে হাতে লাগেজ নিয়ে পৌঁছে যাওয়া গেল। আর যেতে যেতে এক নজর চোখ বুলিয়ে নেওয়া গেল পথের দুপাশে। বড় রাস্তা থেকে ঢুকে পড়ে একটি ছোট রাস্তা, নাটক ঘর লেন। যদিও লেন, তবু একে গলি বলা যাবে না। সেই রাস্তায় ঢুকে ডানহাতের বাড়িটার সামনে দরজার দুপাশে মঙ্গল ঘট বলে দিচ্ছিল এ বাড়িতে কোন আনন্দ উৎসব আছে। অবশ্য উৎসবের একেবারে শেষ দিনে আমরা এসে হাজির হলাম।

আজ বিজয়া দশমী। আমরা আসার আগেই এ বছরের মতো  পুজো শেষ হয়ে গেছে। ছোট উঠোনে ছোট প্যান্ডেলে ততোধিক ছোট একচালার প্রতিমা।প্রতিমার নির্মাণে এক আশচর্য সারল্য চোখে পড়ে, মনে হয় এর মধ্যে এক আকাঁড়া বাঙ্গালিয়ানা আছে, নগর সভ্যতা যার খোঁজ রাখে না। প্রতিমার সামনে বসে পুরোহিত বিকেলের দেবী বরণের জন্য গোছগাছ করছেন, দু একজন বয়স্কা মহিলা আর দু চারটি নাছোড় শিশু মণ্ডপের সামনে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমার নিজের ছোটবেলার কথা মনে পড়ল। মামারবাড়ির গ্রামের মণ্ডপে একটিমাত্র পুজো। হাটতলায় সেই পুজোর মণ্ডপে পড়ে থাকা শুধু ঘুম আর খাওয়ার সময়টুকু বাদ দিয়ে।কিন্তু বিজয়া দশমীর সকাল একেবারেই অন্যরকম। সেদিন কোন খেলাতেই মন বসে না। ঘুরে ঘুরে কেবল চোখ চলে যায় প্রতিমার দিকে। সত্যিই কি আজ ঠাকুর চলে যাবে? একটা চাপা কান্না বুকের মধ্যে পাক খেতে থাকে।ঝিমিয়ে পড়া ঢাকীরা পাবলিকের দাবীতে ঢাকে বোল তোলে- ঠাকুর থাকবে কতক্ষণ, ঠাকুর যাবে বিসর্জন। মন আরও ছিঁড়েখুঁড়ে যায় পরের দিনের শূন্য মণ্ডপের কথা ভেবে, সেদিন যে আর তাকানোই যাবে না মণ্ডপের দিকে। রঙ্গিন কাপড়, বাঁশ খুলতে শুরু করবে ডেকরেটরের ছেলেরা, চারদিকে ছোট ছোট পেরেক ছড়িয়ে থাকবে, বড়রা বলবে, যাস না ওদিকে, পায়ে ফুটে টিটেনাস হবে।তারা তো জানত না, পায়ে নয়, পেরেক ফুটছে আমাদের মনে, স্মৃতির পেরেক। এই চারদিনে তৈরি হওয়া কত সখ্য, কত প্রেমের প্রতিমার বিসর্জন আজ।

নাটক ঘর লেনের মণ্ডপের দিকে তাকিয়ে নিজের ছোটবেলাটা এক লহমায় দেখতে পেলাম।যদিও প্রতিমা এখনো মণ্ডপে দাঁড়িয়ে, তবু ছোটদের মুখে বিষাদ জমতে শুরু করছে। আচ্ছা, আমাদের মতো ওরাও কি দেবীর চোখে জল দেখতে পাচ্ছে?

মামীর টানাটানিতে ভেতরে যেতে হল। যেতেই তিনি বড় বড় থালা ধরিয়ে দিলেন হাতে। মুড়ির মোয়া, চিঁড়ের মোয়া, নাড়ু, ক্ষীরের ছাঁচ, এগুলো প্রাক মধ্যাহ্ন ভোজনের স্ন্যাক্স।এত খেতে আপত্তি করায় শাসানি শুনতে হল দুপুরের খাওয়ার দেরি আছে। আশ্চর্য হয়ে দেখছিলাম মামীকে। নামমাত্র সরবত খেয়ে সারাদিন কাটে, সেই মধ্যরাতে ভাত খান। বাড়িতে পুজো করলে নাকি এমনি নিয়ম। একটা পুজো যেতে যেতে পরের বছরের পুজোর প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায়। চাল, ডাল, নারকেল জমানো  হয় একটু একটু করে। পুজোর খরচ অনেক। এখানে সবাই বলে বড়পূজা। বড়পূজাই বটে। এর জাঁকজমক আর খরচের তুলনায় সব পূজাই ছোট মনে হবে।

আগে পূজার সব রসদ আসত তারাইল গ্রাম থেকে। সেটা ছিল এই নাটক ঘর লেনের দেশের বাড়ি। দেশভাগের পর দেশের মানেই বদলে গেল। কোপ পড়ল অর্থনীতিতে। যে জমি থেকে, বাগান থেকে চাল, ডাল, নারকেল আসত, সেসব অনেকটাই লণ্ডভণ্ড হয়ে গেল। যা রইল, তাতে আর জাঁকের পুজো হয় না। তাই শহর বাজার থেকেই কেনাকাটা চলে, তবে পারিবারিক ঐতিহ্য বজায় রাখতে এখনো পুরোহিত আসেন তারাইল থেকে। সেই আদি পুরোহিত বংশের বর্তমান প্রতিভূ। এবারও পুরোহিত এসেছেন তারাইল থেকে, সঙ্গে এনেছেন ছোট মেয়েটিকে। গ্রামে পড়ে না থেকে শহরের পুজোয় একটু আনন্দ করুক, একটু ভালো মন্দ খেতে পাক।  আর এসেছেন  এ বাড়ির এক বৃদ্ধা পিসিমা। তিনিই বলতে গেলে পুজোর সব নিয়মনিষ্ঠা ধরে রেখেছেন।

দুপুরে খাওয়া চুকতে না চুকতেই বরণের সময় এসে গেল। পাড়া এবং দূরের আত্মীয় পরিজনের বাড়ির বধূরা সেজেগুজে এসে হাজির হলেন, ওপর থেকে ভাড়াটে মাসীমা নেমে এলেন, কথায় কথায় জানালেন, তিনি বরিশালের মানুষ, জীবনানন্দকে দেখেছেন।জীবনানন্দ দেশ থেকে কলকাতায় এসেছিলেন ১৯৪৬। তারপর আর ফিরে যেতে পারেননি। তাহলে মহিলা তাঁকে দেখলে নিশ্চয় ১৯৪৬ -র আগে। তাহলে তাঁর বয়স এখন কত? ইনি কি সত্যি কথা বলছেন নাকি স্মৃতি তাঁকে প্রতারণা করছে? নাগরিক মন সন্দেহে ভরা। কিন্তু জীবনানন্দ নামটিই তো সময়যানে চড়িয়ে নিয়ে যায় কোন সুদূরে।  চারদিকে চড়া সিঁদুর, হাসি, কলরব, ‘নাড়ুর থালা কোথায়?’ লক্ষ্মীর পট, দেওয়ালে ঝোলা কুৎসিত ক্যালেন্ডার, খাটের নিচে নারকেল আর হাঁড়ি পাতিলের সংসার মুছে চোখের সামনে ভেসে উঠল  বরিশাল, তার নদী, নদীর ধারের সাদা মঠগুলি। মণীন্দ্র গুপ্ত যাকে বলেছেন নীল সবুজ মাতৃভূমি।

বরিশালের শহরের উপান্তে বগুড়া রোডের উপর, কয়েক বিঘে জমি নিয়ে ছিল জীবনানন্দদের বাড়ি- ছন ও বাঁশের তৈরি ঘর, সুপুরির সারি, বাগান, গাছপালা ‘আবার অন্য এক পথে বরিশালের শ্মশানভূমি ও লাশকাটা ঘর ছাড়িয়ে কিছুটা গেলে দেখা যেত এক জায়গায় কতকগুলো রাবার গাছ। এদের ফেলে আরও আগিয়ে গেলে চোখে পড়ত ভাঙ্গা মন্দির ও ভাঙ্গা অট্টালিকা। নির্জন দুপুরে বা জোছনা রাতে এই জায়গাটিকে একটি স্বপ্নপুরী মনে হত’

বরিশাল থেকে যে দিকেই যাওয়া যাক না কেন, স্টিমার ছাড়া বেরুবার পথ নেই... বাংলা দেশের রঙ যে নীল তা এই সব যাত্রায় খুব টের পাওয়া যেত- আকাশ নীল, বাতাস নীল, প্যাডেলের আঘাতে ফেনিল জলটুকু ছাড়া পুরো মেঘনা কালচে নীল, তীরের পাটখেত নীল, সুপুরি-নারকেল বন নীল, গ্রামের গাছগাছালি নীল, ধূধূ জলের দূরের তীর শুধু একটা নীল রঙের রেখা।  এই নীল জীবনানন্দ আরও অনেক বেশি দেখেছিলেন, ঃ ‘অশ্বত্থে সন্ধ্যার হাওয়া যখন লেগেছে নীল বাংলার মাঠে/ মাঠে মাঠে ফিরি একা’, ‘সুদূর প্রবাস থেকে ফিরে এসে বাংলার সুপারির বন/ দেখিয়াছে- অকস্মাৎ গাঢ় নীল’, ‘ভাঙ্গা মঠ নীল হয়ে আছে শ্যাওলায়’, ‘রাতের আকাশ নক্ষত্রের নীল ফুটে ফুটে রবে’ ‘বিশালাক্ষী দিয়েছিল বর/ তাই সে জন্মেছে নীল বাংলার ঘাস আর ধানের ভিতর’

 

বরণ পর্ব শেষ হলে পাড়ার ছেলেরা জড়ো হল। গঙ্গা নয়, বিসর্জন হবে ব্রহ্মপুত্রে গিয়ে।গঙ্গাহীন এ দেশ। এ নিয়ে বিবেকানন্দের এক মজার গল্প আছে। এপার বাংলা থেকে জামাই গিয়েছে পুব বাংলায় শ্বশুরবাড়ি, তাকে ষোড়শ ব্যঞ্জনে আপ্যায়ন করছেন শাহুড়ি। শেষ পাতে সর পরা এক বাটি ঘন দুধ। জামাই দেখল শাশুড়ি তাতে সাদা গুঁড়ো মতো কী যেন  মেশালেন।সে দুধ পান করার পর সমবেত মহিলারা শংখ  ধবনি করলেন , জোকার দিলেন। জামাই ভাবল এ বুঝি এ দেশের জামাই আদরের স্ত্রী আচার।এদিকে  শাশুড়ি চোখ মুছে বললেন ‘ বাবা, তোমার পেটে তো মা গঙ্গা আছেন। এতদিনে তোমার শ্বশুরের গংগাপ্রাপ্তি হল।দুধে তোমার শ্বশুরের অস্থিচূর্ণ মেশানো আছে। ।’

গঙ্গা ফিক্সেশনের এই প্রেক্ষিতে, অনেক বয়স্ক মহিলাদের আক্ষেপ করতে দেখলাম প্রতি বছর মাকে ব্রহ্মপুত্রে বিসর্জন করতে হয় বলে। যাই হোক,  দেখি সব তরুণের গায়ে নতুন সাদা টি সার্ট, যার সামনে দুর্গামুখ, আর পেছনে লেখা শুভ বিজয়া, নাটকঘর লেন, ময়মনসিংহ। পাড়ার ক্লাব ছেপেছে পুজো উপলক্ষে।   সেই টি শার্ট একটি, উপহার পাওয়া,  আজো আমার কাছে রয়ে গেছে। আজ চোদ্দ বছর  পরে যখন দেখি, কেমন অলীক মনে হয়।

--------------------------------------

ছবি ঋণ: গুগল



1111

৩টি মন্তব্য: