তৃষ্ণা বসাক



মধ্যিখানে চর ( ধারাবাহিক)



 

দ্বিতীয় পর্ব
নবাবপুর রোডে ভোর হল। দশমীর ভোর। কিন্তু বোঝার উপায় নেই কোন।মাইকে অঞ্জলি দেবার জন্য তাড়া দিয়ে কোন ডাকাডাকি নেই, পাড়ার কুচোকাচাদের সেই মাইক দখল করে নানান সুরেহ্যালোবলার কোন প্রতিযোগিতা নেই। তবে বারান্দায় গিয়ে দেখলাম নাড়ু, নারকেল আর  ক্ষীরের ছাঁচের সন্দেশ বানাবার জন্যে ব্যস্ততা শুরু হয়ে গেছে বাড়ির মেয়েমহলে। সব শরিকের ঘর থেকেই একজন, দুজন মেয়ে এসে হাতে হাতে কাজ করছেন একজায়গায় বসে, কাজের সঙ্গে সঙ্গে মুখও চলছে সমানতালে। বুকের মধ্যে ছেলেবেলার  মামারবাড়ির গ্রামের পুজো ভেসে ওঠে। সারা গ্রামে ওই একটিই  বারোয়ারি পুজো। যেবার নন্দীদের ভাগে তাদের বাড়ির শরিকানি পুজো পড়ে, সেবার শুধু গ্রামে দুটো পুজো।

তবে সেটা লিপ ইয়ারের মতো চার বছর অন্তর। তাই ওই একটা পুজো  নিয়েই বাড়ি বাড়ি আত্মীয়সমাগম প্রতি শরতে। দূরে থাকা ছেলেমেয়েদের কাছে  পাওয়ার সময় সেটা। শহুরে ফ্যাশন দেখিয়ে একটু কলার উঁচু করার  সুযোগও আমাদের রাতে ঘুমের মধ্যেও  নারকেলের গন্ধ, করপুরের গন্ধ,মাসী আর মামীমাদের কলহাস্য। একাদশীর দিন ভোর থেকেই সারা গ্রামঝেঁটিয়ে শিশুদের ভিড়। একেকজন একাধিকবার নাড়ু নিমকি নিয়ে চলে যাচ্ছে, তাদের নজরদারির জন্য আমাদের কিশোর বাহিনীকে বসানো  হয়েছে দরজায়। করপুরের মতোই উবে যাওয়া সেইসব উৎসবের উষ্ণতা  ফিরে এল নবাবপুর রোডের বাড়ির বারান্দায় এদের দেখে। যদিও এখন  বেরোবার তাড়া। আজ ময়মনসিংহ যাব। রাতে কিছুই বলতে গেলে ব্যাগ  থেকে বার করা হয়নি,  এদের জন্যে আনা উপহার, রাতপোশাক, আর টুথব্রাশ

 ছাড়া। তাই গুছিয়ে নেওয়ারও তেমন কিছু ছিল না।ঢাকার বিখ্যাত পরোটা আর আলুর রসা দিয়ে নাস্তা হল।গতরাতে ডালের সঙ্গে বাড়িতে বানানো চমৎকার কচু  চিপস খেয়েছিলাম, সেটা এইবেলা বলে রাখি। ফুলমাসির কাছে বিদায় নিয়ে আবার সেই ভুলভুলাইয়া গলিপথ  দিয়ে বাইরে আসি। কণবমুনির আশ্রমের হরিণছানার মতো শিউলি ফুলের গন্ধ পিছু টেনে ধরে। এখান থেকে কমলাপুর স্টেশন।অটোতে।

এখানে যাকে বলে সি এন জি, আবার কখনো বেবি ট্যাক্সি।ময়ূরপঙ্খী নৌকার মতো  বাহারি রিকশায় চড়াটা তোলা থাকল আপাতত।   

 
আমাদের ব্যাগে কয়েক প্যাকেট জিরের গুঁড়ো, সাবুর পাঁপড়,
আলতা আর অশ্রু-
ওখানে কি এসব পাওয়া যায় না?
প্রথমে বাসের নাম লিখি-
সৌহার্দ্য, শ্যামলী, সোহাগ
তারপর সীমান্তের নাম লিখি-
বেনাপোল, পেট্রাপোল, চ্যাংড়াবান্ধা,
এরপর লিখি স্টেশনের নাম-
কমলাপুর, তেজগাঁও, টঙ্গী, জয়দেবপুর...
ময়মনসিংহ পৌঁছে আর কিচ্ছু লিখি না,
আমাদের ব্যাগে কয়েক প্যাকেট জিরের গুঁড়ো, সাবুর পাঁপড়,
আলতা আর অশ্রু-
এখানে কি এসব পাওয়া যায় না?
আজ দশমী,
ছোট মামীর আলতা,
নয়ামাসির সাবুর পাঁপড়,
ফুলমাসির জিরের গুঁড়ো
আর অনেক অশ্রু নিয়ে
১০৮ দুর্গানাম ব্রহ্মপুত্রে ভেসে চলে যায়...’
 

এই কবিতাটি ঠিক কবে লেখা মনে নেই। তবে ২০১৩ তে প্রকাশিতউল্টে মেলো’-তে  জায়গা পেয়েছে মানে  কবিতাটি ২০০৭ থেকে ২০১৩ মধ্যে লেখা। ভালো কবিতার জন্য আবেগ থিতিয়ে পড়া অব্দি অপেক্ষা করতে  হয়।কবি ওয়ার্ডসওয়ার্থ যেমন বলেছেন 

 “poetry has its origin in emotions recollected in tranquility.” 

অবশ্য এর ব্যতিক্রমও আছে।অনেক তাৎক্ষণিক লেখা কবিতাও উত্তীর্ণ হতে পারে।অবশ্য এই  নিয়ে একটু গোয়েন্দাগিরি করলে হয়তো দেখা যাবে কবিতাটি বহুদিন ধরেই ভেতরে ভেতরে জারিত হচ্ছিল। তবে যেভাবেই লেখা হোক না কেন, কবিতা সবসময় সত্যি কথা বলে।যেমন এই কবিতার মধ্যে আমার ২০০৭ সালের বাংলাদেশ সফরের কয়েকটি তথ্য নিখুঁত ভরা   আছে। যাকে বলা যায় সেই সময়কালের ডকুমেন্টেশন।সত্যিই শ্যামলী পরিবহনের সৌহার্দ্য বাসে যাওয়া হয়েছিল।চ্যাংড়াবান্ধা বর্ডার পেরিয়ে।

 সোয়াবিন, জিরের গুঁড়ো, সাবুর পাঁপড় - এইসব নেওয়া হয়েছিল আত্মীয়দের জন্য। শাশুড়ি বলেছিলেন ওখানে এইসব নাকি পাওয়া যায় না। নিরামিষ খাবার দিন খুব  অসুবিধে হয়। চ্যাংড়াবান্ধা বর্ডারে সেই বদরাগী কাস্টমস অফিসার সব শাড়ি উলঢাল পালঢাল করলেও এইসবে হাত দেয়নি।এইসব স্টেশনের নাম আমি সত্যি লিখছিলাম একটা ছোট্ট নোটবুকে। খানিক পরে হাল ছেড়ে দিই অবশ্য। কারণ এইসব লিখতে গেলে  ট্রেনের দুধারের দৃশ্য দেখা হচ্ছে না, আদিগন্ত সবুজ আর অফুরান জলরাশি, যেন সবুজ জমিতে রুপালি কারুকাজের একটি জামদানি, যা দেখে রবীন্দ্রনাথকে মনে পড়বেই।

আজ বাংলাদেশের হৃদয় থেকে কখন আপনি
কী অপরূপ রূপে বাহির হলে জননী
ওগো মা তোমায় দেখে দেখে আঁখি না সরে


বাংলাদেশের ট্রেনের চেহারা-ছবি বিশেষ সুবিধের নয়, বাবুলোকেরা কেউ বড় একটা চড়েও না।মাইক্রোবাস আর  বেবি ট্যাক্সি জনপ্রিয়। এগুলো বিদেশ থেকে আমদানি, দেখনদারিত্বে এবং আরামে বেশ ভালো, বিশেষ করে দূরপাল্লার বাসগুলো।  তবে ট্রেনে চড়ার একটা মস্ত  সুবিধে হচ্ছে দেশের আসল মানুষদের দেখার সুযোগ পাওয়া  যায়। তিনঘণ্টার জার্নিতে একেবারেই কেঠো বেঞ্চে বসে পিঠ, কোমর আরাম পেল না ঠিকই, কিন্তু চোখ যতটা পারল চেটেপুটে নিল। বরষা শেষের শরতের বাংলার রূপ যে কী মনোমুগ্ধকর। আর শুধুই তো প্রকৃতি নয়, গ্রামবাংলার মানুষ যে সারাদিন কত কাজ করে, তাদের সেই কর্মমুখর দিনের একটা ছুটন্ত ছবিও পাওয়া যায় ট্রেন থেকে।


শৈবালের ওপর অনেকগুলি ছোট ছোট কচ্ছপ আকাশের দিকে সমস্ত গলা বাড়িয়ে দিয়ে  রোদ পোয়াচ্ছে। অনেক দূরে দূরে একটা একটা ছোট ছোট গ্রাম আসছে।গুটিকতক খড়ো ঘর,  কতকগুলি চাল, শূন্য মাটির দেওয়াল, দুটো একটা খড়ের স্তূপ, কুলগাছ, বটগাছ, আমগাছ এবং বাঁশের ঝাড়, গোটা তিনেক ছাগল চরছে, গোটাকতক উলঙ্গ ছেলে মেয়ে হয়তো খেলছে’ রবীন্দ্রনাথের ছিন্নপত্রের উনিশ শতকের এই বাংলাদেশ আমি  একুশ শতকেও দেখতে পেলাম  ট্রেনের জানলা থেকে।